জ্বলদর্চি

Public RSS Widgets

»

  • আভড়াপুনেই /ভাস্করব্রত পতি
  • পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব, পর্ব -- ৪৮

    আভড়াপুনেই

    ভাস্করব্রত পতি 

    'আভড়াপুনেই' অর্থাৎ অবিবাহিতদের পূর্ণিমা। আশ্বিন মাসে কোজাগরী পূর্ণিমাতে লক্ষ্মীপূজার দিন দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তবাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে সুবর্ণরেখার পাড় বরাবর পালন করা হয় এই 'আভড়াপুণেই' বা 'অব্যূঢ়া পূর্ণিমা' বা 'অব্যুঢ়া ব্রত'। ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়ার প্রান্তিক এলাকায় শিশু বয়স থেকে ষোলো বছর বয়স পর্যন্ত ছেলে মেয়েদের জন্য নির্ধারিত এই উৎসব।

    অব্যূঢ় (অপসারিত) > আবড়া > আভড়া > আইবুড়ো ( সংস্কৃত শব্দ 'ব্যূঢ়' অর্থে বিবাহিত)
    অব্যূঢ় অর্থে অবিবাহিত বা আইবুড়ো। ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের 'পারিবারিক প্রবন্ধ'তে আছে, "মনুষ্যে অব্যূঢ় জড় পদার্থের ধর্ম্ম, উদ্ভিদের ধর্ম্ম, পশুর ধর্ম্ম এবং মনুষ্যের ধর্ম্ম, এই চারিটি ধর্ম্মই একত্র মিলিত"। 'পুনেই' অর্থে পূর্ণিমা। আভড়াদের মঙ্গলার্থে যে পূর্ণিমা, সেটাই 'আভড়াপুনেই'।

    'কোজাগর' অর্থে দ্যূতপূর্ণিমা বা লক্ষ্মীপূর্ণিমা। 'তিথ্যাদিতত্ত্ব'তে লক্ষ্মী বলেন, এই পূর্ণিমায় যে জাগে তাহাকে ধন দিব। এই তিথিতে অক্ষক্রীড়া - নারিকেলজল - পান - চিপিটক ভক্ষণ বিহিত। 'দাশরথী রায়ের পাঁচালী'তে (১৩০৯) পাই "ঘুমে লক্ষ্মী হন বিরূপা, জাগরণে লক্ষ্মীর কৃপা, নৈলে কেন জাগে কোজাগরে"। আর পূর্ণিমার চাঁদ হলো পূর্ণশশী। কোজাগরীতে পূর্ণাবয়ব চাঁদ আকাশে ওঠে। আর তাই এই দিনে এই 'আভড়াপুনেই' পালিত হয় চাঁদের মতো চাঁদপানা মুখের জীবনসঙ্গীর কামনায়। 

    পশ্চিমবঙ্গের এই লৌকিক উৎসবটি অবিবাহিত ছেলে মেয়েদের জন্য করা হয়। পার্শ্ববর্তী রাজ্য ওড়িশার 'কুমার পূর্ণিমা'র আদলে আয়োজিত হয় 'আভড়াপুনেই'। ওড়িয়া সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটেছে এখানে। কালক্রমে যা হয়ে উঠেছে বাঙালির নিজস্ব একটি লৌকিক উৎসব। 

    এদিন সকালে স্নানপর্ব সেরে নতুন পোশাক পরানো হয়। যাঁদের পোশাক দেওয়ার সামর্থ্য নেই তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন ঘুনশী কোমরে পরানো হয়। এরপর বাড়ির মা স্থানীয় মহিলারা অবিবাহিত সন্তানের মঙ্গলকামনায় কপালে চন্দনের মঙ্গল টিকা পরান। মূলতঃ এই উৎসবে বাড়ির মা ঠাকুমা দিদিমা কিংবা বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলারা 'আভড়া' তথা অবিবাহিত ছেলে মেয়েদের কপালে চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে মাথায় ধান দুর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করে মঙ্গল কামনা করেন। যাতে তাঁদের অবিবাহিত সন্তান সন্ততিগণ ভবিষ্যতে যোগ্য, ভালো এবং পছন্দমতো জীবনসঙ্গী বা জীবনসঙ্গিনী পায়। তাঁদের বিবাহিত জীবন যেন ফুলপ্লবিত হয় -- এই কামনা করা হয়। একটু বেশি বয়সের অনেক ছেলেমেয়ে এই সময় নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবনে কার্তিকের মতো স্বামী বা লক্ষ্মী প্রতিমার মতো স্ত্রী পাওয়ার বাসনায় সারাদিন উপবাসে থেকে ব্রতকার্য শেষ করেন। 

    এদিন বাড়িতে পায়েস, পিঠা, লুচি, সুজি, ক্ষীর সহ নানারকম নিরামিষ খাবারের ঘনঘটা দেখা যায়। যাঁদের এই 'আভড়াপুনেই' হয়, তাঁদের অর্থাৎ অবিবাহিত ছেলে মেয়েদের সারাদিন ভুজা বা মুড়ি খাওয়ায় নিষেধ। এতে 'বুড়ি যাওয়া'র তথা ডুবে যাওয়া বা এই উৎসব পালনে ছেদ পড়ার ভয় থাকে। মানুষের বিশ্বাস যে, মুড়ি খেলে এ ব্রত ঠিকঠাক পালিত হবেনা। উদ্দ্যেশ্য সাধিত হবেনা। ফলে মনোবাঞ্ছা পূরণ হবেনা। তাছাড়া এদিন বাড়িতে কোনো রকম পোড়া জাতীয় খাবার রান্না করার নিয়ম নেই।

    পূর্ণিমার আকাশে গোলাকার চাঁদ ওঠার পর এই ব্রত পালন শেষ হয়। তখন বাড়ির উঠোনে থাকা তুলসীমঞ্চে জল ঢালে ঐসব ছেলেমেয়েরা। কখনো কখনো মায়েরাও ঢালেন। সূবর্ণরৈখিক সংস্কৃতি ও ভাষার ছাপ মেলে পরতে পরতে। একসময় ছেলে মেয়েদের মাথায় আশীর্বাদ করে মা ঠাকুমারা বলতেন, "পো পৈসা ঝি কৌড়ি, / নাড়িয়া নাড়ু কুঁদরি খাড়ু / পো মেনেকার নিস বাড়ু, / ঝি মেনেকার আইস বাড়ু"। অর্থাৎ 'ছেলে টাকা হলে মেয়েও কড়ির সমান'। এই 'পো মেনেকার নিশ বাঢ়ু' অর্থে ছেলে ছোকরাদের গোঁফ বাড়ুক। আর মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলা হতো, 'ঝি মেনেকার আইস বাঢ়ু'। অর্থাৎ মেয়েদের আয়ু বাড়ুক। বিশিষ্ট গবেষক শিক্ষক সুদীপ কুমার খাঁড়া জানান, "আমাদের বাড়িতে এখনও এই লৌকিক উৎসবটি পালন করা হয় শ্রদ্ধা সহকারে। তবে বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগ লোকজনের কাছেই এ সম্পর্কে তীব্র অনীহা লক্ষ্য করা গিয়েছে। মূলতঃ ছেলে মেয়েদের সমানাধিকার বোঝানোর জন্য এই 'আভড়াপুনেই' উৎসবের আয়োজন আজও পালিত হয় সূবর্ণরৈখিক এলাকায়"।
     
    পেজে লাইক দিন👇



  • ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০
  •  ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা  ১১০


    সম্পাদকীয়,
      ১৯৭৫-এ ৩৫ বছর বয়সে বিশ্বের প্রথম মহিলা হিসাবে মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন জাপানের জুঙ্কো তাবেই। সম্প্রতি অদম্য জেদ ও অনবদ্য সাহসিক মানসিকতার পরিচয় দিয়ে অক্সিজেন ছাড়াই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছালেন হুগলির চন্দননগরের মেয়ে পিয়ালী বসাক। সুতরাং মেয়েদের এই জয়যাত্রা অব্যাহত জয়াবতীর সময় থেকে আজও। জয়াবতীর সমুদ্দুর দেখার শখ পিয়ালীর এভারেস্ট জয়ের শখ যুগে যুগে নারীদের সাহসী করেছে। হ্যারি পটার  হচ্ছে  লেখিকা জেকে রাউলিং রচিত সাত খন্ডের কাল্পনিক উপন্যাসের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি সিরিজ। নারীদের এই ট্র‍্যাডিশান থামবার নয়। আমাদের ছোটোবেলাতেও আজ তৃষ্ণা আন্টি, মৌসুমী মাসি, রঞ্জনা পিসি গল্প কবিতা লিখে একই ভাবে নারীদের জয় জয়কার অব্যাহত রেখেছে। এত এত কথা বলবার কারণ কি জানো? বলে কিনা পথে নারী বিবর্জিতা, মেয়েদের বেশী পড়ালেখা শিখতে নেই...... কে বলেছে?  বলব না। তোমরাই পড়ে দেখো। তোমরাও আমার মতো রেগে যাবে। আর তারসঙ্গে অঙ্কিতের দুই বন্ধুর গল্পটাও পড়ে জানিও কিন্তু। ছোটো বন্ধুরা বছর শেষ হতে চলল, কিন্তু শেষের বেলায় একটা নতুন খবর দিই। তোমাদের দিদি দাদারা তোমাদের জন্য কলম ধরেছে। কি খুশি তো? আমিও খুব খুশি। এসো আমরা তাদের লেখা থেকে জেনে নিই, বছরের স্মরণীয় দিবসগুলি..... - মৌসুমী ঘোষ।

    ধারাবাহিক উপন্যাস
    জয়াবতীর জয়যাত্রা
    পর্ব ৩৫

    তৃষ্ণা বসাক
     ৩৯
    -ছিখেত্তর!
    এর থেকে জয়াবতী যদি সাত রাজার ধন মানিক কিংবা সাগর ছেঁচা মণিমানিক্য কিংবা পংখীরাজ ঘোড়া  এমনকি সাপের মাথার মণিও চাইত কিংবা রাক্ষসীর প্রাণ ভোমরা, তাতে জমিদারমশাই এত অবাক হতেন না,
    কিন্তু ছিখেত্তর! যেখানে তিনি এখনো যাননি, এই গাঁ থেকেও কেউ কোনদিন যায়নি, চার পাঁচ গাঁ পরে হরগৌরী বলে একটা গাঁ আছে, সেখান থেকে কজন গেছিল শুনেছিলেন, তারা ফিরেছে কিনা আর খবর পাননি, সেই ছিখেত্তর যেতে চায় এই পুঁটে মেয়েটা! ওর দুঃসাহস দেখে প্রথমে কী বলবেন কথাই খুঁজে পেলেন না প্রথমে। শুনেছিলেন বটে রামগতি পণ্ডিতের মেয়ের খুব চটাং চটাং কথা, তা বদ্যি হয়েছে বলে কি মেয়েমানুষের এত বাড় হবে যে সোজা ছিখেত্তর যেতে চাইবে? নাহ, ওর বাপকে ডেকে একটু ভাল করে বুঝিয়ে দিতে হবে। মেয়েকে সময় থাকতে সামলাও হে, নইলে পরে পস্তাবে। কথায় আছে না,
    কাঁচায় না নোয়ালে বাঁশ
    পাকলে করে টাঁস টাঁস
    তাঁকে চুপ করে থাকতে দেখে জয়াবতী বলল,
    ‘বুজতেই পারচি খুব আচ্চযয হয়েচেন আমার কতায়। ভাবচেন এত কম বয়সে ধর্মেকর্মে মতি কেন? না না ওসব মতি আমার নেই। পিথিমির কাজ ফেলে, মানুষের দুঃখের দিকে না তাকিয়ে চোখ বুজে হা ঠাকুর হা ঠাকুর করা আমার কম্মো নয়। তাছাড়া, নিজেরা কিচুই করব না, ঠাকুরকে ডেকে উদ্ধার হব, এ কেমন কতা বলুন তো? আসল কতা হল আমি শুনেচি ছিখেত্তরে সমুদ্দুর আচে। আমি এই উমাশশীর সঙ্গে সাগরজল মিতে পাতিয়েচি। তাই সবাইকে নিয়ে গিয়ে একবার দেকতে সাধ হয়েচে সাগর কত বড়’
    ধম্মোকম্মে মতি নেই,  শুধু সমুদ্দুর দেকতে ছিখেত্তর যেতে চায়- এমন কতা কোন বড় মানুষের মুখেও শোনেননি জমিদারমশাই। এ মেয়ে বলে কী?
    কিন্তু কী যে মায়া এই মেয়ের মুখে! রাগ করতে গিয়েও রাগ করতে পারেন না। সমুদ্দুর দেখতে চায় ও। শুনলেই মনে হয় কি দুঃসাহস। কবে কে শুনেচে ঘরের মেয়েরা আবার কোথাও যেতে চায়, তাও আবার স্পষ্ট বলে দিল তীর্থ নয়, সে চায় সমুদ্দুর দেখতে।রাঘবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যাঁর ভয়ে দশটা গাঁয়ের লোক কাঁপে, তিনি অন্যমনস্ক হয়ে যান এ কথা শুনে।
    মেয়েরাও তাহলে এমন ইচ্ছে পুষে রাখতে পারে মনের মধ্যে? কোনদিন ভেবে দেখেননি তো। তিনি কথা বলবেন, মেয়েরা শুনবে, রান্নার ফোড়ন নিয়ে, তরিতরকারির কাটার ধরন নিয়ে, নিজের ছেলে কেন মাছের মুড়ো পেল না- এই নিয়ে মেয়েমহলে প্রায়ই গজালি শোনা যায়। মেয়েদের ইচ্ছে বা মতামতের ওইটুকুই চৌহদ্দি তিনি জানেন। বড় জোর কেন মেঘডম্বুর শাড়ি পেল না পূজায়, বা বাঁড়ুজ্জে গিন্নির মত মান্তাসা বা কানবালা চাই- এইটুকু, কিংবা সারাবছর নানান বার ব্রত উপোস- এই তো ওদের জগত। তাছাড়া মেয়েমানুষ  বারো হাত কাপড়েও কাছা দিতে জানে না, পথে নারী বিবর্জিতা –এই কথা তো শাস্ত্রেই লেখা আছে। তাদের নিয়ে পথে বেরোনোর ভারি জ্বালা।  সেই মেয়েমানুষ বলছে সমুদ্দুর দেখবে, এই নাকি তার সাধ! মুখুজ্জেমশাই অবাক হয়ে ভাবলেন, তাঁর মা, স্ত্রী, কন্যারা কিংবা এই অন্য বাড়ি থেকে এ বাড়ির বউ হয়ে আসা সব্বো, তাদের কি মনে মনে এমন কোন সাধ জমে আছে? কোনদিন তারা কিছু চায়নি তো সামনে দাঁড়িয়ে! চাইবে কী করে? মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না- এমনটাই শেখানো হয় আঁতুড়ঘর থেকে। শুনতে শুনতে তারাও সেটাই বিশ্বাস করে নেয়। সেই যেমন একটা বামুনঠাকুর পুজো করে একটা পাঁঠা পেয়ে সেটাকে নিয়ে ফিরছিল। পথে তিনটে লোক দেখল তাঁকে, আর তাদের নোলা সকসক করে উঠল। কী করা যায়- ভাবতে ভাবতে তারা একটা বুদ্ধি করল। বামুনঠাকুরের যাবার রাস্তায় তিনজন দূরে দূরে আলাদা দাঁড়িয়ে রইল। প্রথমজন যখন বলল ‘ও বামুনঠাকুর একটা কুকুরকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছ কেন?’ তখন বামুন তার কথা মোটেই বিশবাস করল না। আর একটু দূরে যে লোকটা দাঁড়িয়ে ছিল, সেও বলল ‘ও বামুন ঠাকুর শুধুমুদু একটা কুকুর নিয়ে ফিরছ কেন?’ তখন বামুনঠাকুরের মনে সন্দেহ ঢুকল। দু দুটো লোক বলছে যখন, সত্যি হলেও হতে পারে। তবুও সে কিছু না বলে পাঁঠাটা নিয়ে হাঁটতে লাগল, এবার তৃতীয় লোকটির সঙ্গে দেখা। সেও যখন বলল এটা পাঁঠা নয়, কুকুর, তখন বামুনঠাকুর কোল থেকে ছুঁড়ে ফেললেন পাঁঠাটাকে। দূর হ অপয়া কুকুর। তিনি যেই ওকে ফেলে চলে গেলেন, অমনি লোক তিনটে পাঁঠাটাকে নিয়ে মহানন্দে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল, আজ তাদের পাঁঠার মাংস ভাতের মহাভোজ।
    এই গল্পটা ছেলেবেলা থেকে কত শুনেছেন, কিন্তু আজ তার প্রকৃত অর্থ তাঁর কাছে ধরা দিল। একটা মিথ্যে কথা অনেকে মিলে বললে সেটা সত্যির মতো শোনায়। আজ তাঁর প্রথম মনে হল, সমাজে কত কথাই এমন চলে আসছে, কখনো তাদের খতিয়ে দেখা হয় না। বিশেষ করে মেয়েদের নিয়ে কথাগুলো-
    -মেয়েমানুষ লেখাপড়া শিখলে বিধবা হয়,
    -মেয়ে  হল পরের ধন
    -পথে নারী বিবর্জিতা
    আর ওই বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না! আসলে যাদের কথা বললেই চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে চিরকাল, তারা কখন যে বোবা হয়ে গেছে। আজ তাঁর প্রথম মনে হল মেয়েদের কথা না বলতে দিয়ে জীবন থেকে কত কী হারিয়ে ফেলেছেন। কী মধুর বাচন ভঙ্গি এই মেয়েটির। আর যা বলছে তার প্রতিটি শব্দ যেন তার বুকের গভীর থেকে উঠে আসছে।ওর অসম্ভব জ্বলজ্বলে মুখ দেখে ওর প্রতিটা কথা বিশ্বাস হয় তাঁর।তিনি ভাবেন সত্যিই তো, শুধু জগন্নাথ দর্শন কেন, অমন যে সমুদ্দুরের কথা  পড়েছেন মহাকবি কালিদাসের রচনায় ‘ দূরাদয়াশ্চক্রনিভস্য তন্বী তমাল তালী বনরাজি নীলা। আভাতি বেলা লবণাম্বুরাশের্ধারা  নিবদ্ধেব কলংক রেখা’
    আহা সমুদ্রের কী রূপ, তার ধারের তাল তমাল নারিকেল বনের সারি, আর ঢেউর পরে ঢেউ, সমুদ্রতীরের অগাধ সোনালি বালি রাশি, তার ওপর এসে পড়া সূর্যের প্রথম প্রভাতী কিরণ- এইসবের কত বর্ণনা করে গেছেন কবিরা। নীলাচল কেন, তাঁদের কাছেই তো আছে সাগর, গংগাসাগর, যেখানে গংগা এসে মিশেছে সাগরে। এখানে কপিলমুনির আশ্রম, প্রতি বছর পুণ্যস্নানের জন্যে  সংক্রান্তিতে কত দূর দূর থেকে সাধু সন্ন্যাসীরা আসেন, তাঁরা এই গ্রামের ওপর দিয়েই যান। তাঁদের জন্যে চালাঘর বেঁধে দেওয়া আছে, রোজ সিধে পাঠানো হয়, চাল দাল ফলমূল মিষ্টান্ন- সামান্যই নেন তাঁরা, বেশিরভাগই ফেলে যান, সেসব পরে গ্রামের গরিব দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়।সেই সাগরেও যাওয়া হয়নি তাঁর। জমিদারির কাজে এমন জড়িয়ে গেছেন, যে বেরোনো শক্ত। তবে সাগরে একটি ভারি খারাপ প্রথা আছে তিনি শুনেছেন। শিশুসন্তান বিসর্জন দেওয়া হয় সাগরের জলে। মায়েরা কী করে এমন করতে পারেন? তাঁর আচমকা  মনে হয়, সত্যিই কি মায়েরা এটা করেন? নাকি তাঁদের মগজ ধোলাই করিয়ে করানো হয়! মেয়েদের মনের কথা কি জানতে চেয়েছে কেউ?
    তিনি দেখেন জয়াবতী চেয়ে আছে তাঁর দিকে সোৎসুক চোখে। তিনি বলেন ‘নিশ্চয় ব্যবস্থা করে দেব মা। কিন্তু সমুদ্দুর দেখতে চাইলে আমাদের গঙ্গাসাগর তো কাছেই আছে, সেখানেও একবার যেও।’
    (ক্রমশ)

    ঝাড়ুমাসির সারপ্রাইজ

    মৌসুমী রায়

    বাঁই করে একটা পাক খেয়ে ধপ করে মাটিতে পড়লো।পড়লো বললে খানিকটা কম বলা হয়।ঐ যাকে বলে কুমড়ো গড়াগড়ি একেবারে।

             গায়ের ধুলো ফুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালেও এখনো ঘোর এখনো কাটেনি। অমন মগডাল থেকে কোনদিন মাটিতে পড়েনিকো! বেয়ে বেয়ে ,ভেসে ভেসে ,ঝুলে ঝুলে এডাল ওডাল করেই, তার বলে, ম্যাক্সিমাম রাত কাটে।মায়ের ভোমাইল ফোনে ঝাড়ুমাসির আলপটকা ইনভিটেশন! খেতে এসে কি চিত্তিরেই না পড়া গেল! সজনে গাছে এর আগে কখনো চাপেনি যে! এখন ঝাড়ুমাসির নতুন স্যামসাঙ বাক্স ফ্ল্যাট এই সজনে গাছের আবডালেই কিনা। মাসি সেইরকমই ঠিকানা খানা দিয়েছিলেন। অগত্যা সজনে গাছে অ্যাডভেঞ্চার করতে গিয়ে এই বিপদ!

             কোনমতে পাক খেয়ে উঠে টলতে টলতে একটা গোল মত কি একটা ,কি যেন রেনপাইপ না ড্রেনপাইপ বলে,সেটা বেয়ে হাঁচোড়পাঁচোড় করে কোনমতে ঝাড়ুমাসির ফ্ল্যাটের আউট ইয়ার্ডে গিয়ে ফ্ল্যাট হলো সে। ঝাড়ুমাসির ফ্ল্যাটের গায়ে বড় বড় গোটা গোটা করে লেখা স্যামসাঙ ফর্টিথ্রি ইঞ্চেস সুপার স্মার্ট এল ই ডি টিভি! কি ঝিনচ্যাক্ নাম! 
     

           বাক্স থেকে বেরিয়ে এলেন ঝাড়ুমাসি।ঠিক দুক্কুরবেলা ভোম্বলকে দেখে মাসিও নেচেকুঁদে অস্থির।
    "ও মাই গড! কত্ত বড় লেজ হয়েছে তোর, ভোম্বল! আর গায়ে কি ফাইন গন্দো! তুই আমাদের ফ্যামিলির মুক উজ্জ্বল করবি বাপ!"

    "উঃ!সবেতেই ঝাড়ুমাসির বাড়াবাড়ি!" বেশ একটু লজ্জামত পাচ্ছে ভোম্বল।

    "ওগো,শুনচো! আমাদের ভোমলা এয়েচে।শিগগিরি রায়গিন্নীর ডাইনিং থেকে কাঁটাল আর কটা পাকা পাকা সবরি কলা নে এসো দিকিনি। সকালেই ঝাঁক মেরে দেকে এয়েচি, মক্কিচুষ রায়বুড়ো এই অ্যাত্তো ফলপাকুড় এনেচে।"

        ঝাড়ুমেসোর সামনে গিয়ে লেজ নেড়ে নেড়ে ঝাড়ুমাসি চিৎকার করতে লাগলো। মেসোর মধ্যে অবিশ্যি নড়াচড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। গভীর মনোযোগ দিয়ে একখানা ইনজিরি পেপার পড়ছেন। ভোম্বল একটু পিছিয়ে গেলো। স্মৃতি কথা বলতে কি, ভোম্বলের ইনজিরিতে বড্ড ভয়।বলতে গেলে এবছর ইনজিরির জন্যেই সে ক্লাসে লাড্ডু খেলো। তারপরে মা কি পিট্টিটা যে দিয়েছেন,ভাবলে এখনো ভোম্বলের পিঠটা টনটন টনটন করে।

    "কি হলো! কথাটা কি কানে ঢুকলোনি?"
    ঝাড়ুমেসো আচমকা মাসির চিৎকারে চমকে উঠে পেপার থেকে মুখ তুলতেই ভোম্বলকে দেখে খানিক ব্যোমকেই গ্যালেন মনে হচ্ছে।
    "ভোম,ভোম, ভোম্বল! কখন এলে? গাছের সকলে ভালো তো? তোমাদের ডাব গাছে এখনো সেরকম ই শক্ত শক্ত ডাব হয়? খোসাটা কি বিচ্ছিরি খেতে।সেই সেবার হানিমুনে তোমাদের গাছে গেছলুম,তোমার ঝাড়ুমাসিকে নিয়ে..."

    "থামবে তুমি? ঐ টুকুন বাচ্ছা ছোঁড়াকে তুমি হানিমুনের গপ্পো শোনাচ্ছো!সাধে কি বলি, বুড়ো ভাম একটা"

    "আহা চটো কেন ,গিন্নী?তুমি যেন কিসব কলা টলা আনতে বলছিলে"ঝাড়ুমেসো 
    ড্যামেজ কন্ট্রোলে নামেন,
    "বলছি কি গিন্নী, অন্ধকার না হলে তো ডাইনিংএ ঢুকতে পারবোনা। জানোই তো রায়বুড়োর শকুনের চোখ।ঠিক,টের পেয়ে যাবেন। আপাতত ,ভোম্বলকে এই বিস্কুট কটা দাও। এই যে, এই নাও"।পশমের পকেট থেকে চারটি পোস্ট বিস্কুট বার করলেন  ঝাড়ুমেসো।

    ঝাড়ুমাসি কটকট করে উঠলেন,
    "বিস্কুট দাও! ছেলেটার ঐ কচি কচি দাঁত।তোমার বিস্কুট খেলে আর দেকতে হবেনিকো।বিস্কুট তো নয়,যেন এক একটা থান ইঁট!
    খবদ্দার খাবিনে ভোমলা!"
        
           ভোম্বল একটু কনফিউজড হয়ে গেছে। কার কথা শোনে বেচারা?
    এরমধ্যেই ট্যাঁ ট্যাঁ ট্যাঁ করে একটা সরু চিৎকার ।যেন স্টেনগান থেকে একটানা গুলি চলছে!
    ট্র্যাঁ ট্র্যাঁ ট্র্যাঁ...
    মাগো!বুকটা কেমন ধড়াস ধড়াস করছে ভোম্বলের।
    ঝাড়ুমাসি শব্দটা শুনে, চোখের পলক ফেলতেই কেমন হাসি হাসি মুখ করে সাঁ করে বাক্সের ভিতরে সেঁধিয়ে গেলো!
    কি আছে ঐ বাক্সে?

    "ওলে আমার কুঞ্চুনি মুঞ্চুনি গ্যালাটা প্যালাতা ছোনা! ও কুচুমুচু পুচিয়াবুলি!ওলে বাবা গো! তত্ত খিদে পেয়েতে! তাইতো আমাল ছোঙ্কাবুলি এত্ত সুন্দর কোলে ডাতচে আমালে গোওওও..."

    ট্র্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যা.... চিলচিৎকারে বাক্সফ্ল্যাট ফেটে যাবার উপক্রম হতে, ঝাড়ুমেসো বুলেটের বেগে বাক্সে ড্রাইভ মারলেন। 

           ভোম্বল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে। কি করবে সে? আবার বাড়ি ফিরে যাবে নাকি! এই দিনমানে ঝাড়ুমাসির বাড়ি আসাটাই ঝাড় হয়ে গেলো! মা পাঁইপাঁই করে বারন করেছিলেন ,অ্যানুয়াল পরীক্ষার আগে এইসব সারপ্রাইজ নেমতন্নে না আসতে।পাঁইপাঁই করে মানে, ঘোষাল বাড়ির ছাদের রেলিং এ পাঁইপাঁই পাক খেতে খেতে আরকি! ভোম্বল মার পিছনে ছুটতে ছুটতে বায়না করেছিল, 
    "যাই না মা। ওমা, যেতে দাও না গো" ঝাড়ুমাসির ঘরে কত ভালোমন্দ খাওয়াদাওয়া হবে ,ভেবেই তার জিভ জড়িয়ে আসছিলো!

       কোথায় কি? এসে থেকে ঐ থান ইঁট বিস্কুটের অফার ছাড়া আর কিছুই জুটলো না যে! তার উপর ঐ স্টেনগানের ট্র্যাঁ ট্র্যাঁ! সারপ্রাইজ না হাতি! কি বিপদে পড়া গেলো! এই জন্যেই বাংলা মিস বলেন, "সর্বদা পিতা মাতার কথা শুনিবে"। এখন লেজ ছড়িয়ে ভ্যাঁ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে ভোম্বলের।

    কিন্তু ওকি! ঝাড়ুমাসি আর মেসো মিলে হাসি হাসি মুখে টি টোয়েন্টি ট্রফির মত ওটা কি কোলে করে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসছে?

    "সুইট সারপ্রাইজ ভোমলা। এই নাও তোমার ওয়ান এন্ড ওনলী সুইট সিস্টার!"
    বলেই তুলোর পুঁটুলির মত তুলতুলে বাচ্চাটাকে ঝপ করে ভোম্বলের কোলে বসিয়ে দিলেন।
    "মিট ইওর সুইট সিস মিস ভামিকা!"
    "ওমা! কি মিষ্টি! কি স্মার্ট নাম!  আমাদের লিটল ভাম ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে এমন স্মার্ট নেম কারো নেই! এই তাহলে তোমাদের সারপ্রাইজ ঝাড়ুমাসি!"
    ভোম্বলের মনটা বোনটার মতই নরম হয়ে ওঠে।

    "কি মজা,কি মজা! এতদিনে আমার একটা খেলার পার্টনার হলো।" ভোম্বল খুশীতে গদগদ ।

    "ইয়েস মাই বয়। এবার তোর মজার শেষ নেই। যখন ইচ্ছে আমাদের স্যামসাঙ ফ্ল্যাটে চলে আসবি।খেলবি ওর সঙ্গে"বললেন ঝাড়ুমেসো।

    ওমা এই ফাঁকে ঝাড়ুমাসি কখন রায়গিন্নীর ভাঁড়ার থেকে পাকা পাকা সবরী কলা নিয়ে এসেছে গো!
    ভোম্বলের প্রাণে আনন্দ আর ধরেনা।
    জয় হোক ঝাড়ুমাসির সারপ্রাইজ নেমন্তের। বাংলা মিস ঠিক ই বলেন গো
    "সব ভালো যার শেষ ভালো।"



    ছেলেবেলার বৃত্তে 
    রঞ্জনা বসু

    ভোর আকাশে সূর্য এল, ছড়িয়ে দিতে আলো
    বইল বাতাস গাইল পাখি, বলল সবাই জাগো

    খেলার মাঠে ফসল ক্ষেতে, ছুটলো যে যার কাজে
    খোকা-খুকু মন দিয়েছে নতুন বইয়ের পাঠে। 

    উঠোন ধারে আমের গাছে কাঠবিড়ালী বাঁধছে বাসা
    রান্নাঘরে মায়ের হাতে খাবার বুঝি হচ্ছে খাসা! 

    স্কুলে যাবার সময় হল, তৈরি হওয়া চাই
    পড়াশোনা, খেলায় মেতে কত না মজা পাই

    এমনি করেই একটা দিন আহ্লাদে আটখানা 
    সন্ধ্যা নামে সূর্যদেবের বিদায় নেবার পালা। 

    সত্যিকারের জীবন পেতে চলতে হবে নিয়ম মেনে
    খুশি খুশি বাজবে বাঁশি সফল হওয়ার উচ্ছাসে।


    অজয়ের স্বপ্ন
     অঙ্কিত ঘোষ
    নবম শ্রেণী
    সুখচর কর্মদক্ষ চন্দ্রচূড় বিদ্যালয়
    উত্তর ২৪ পরগণা


    রাহুল,আজ ভূগোলের পড়া মুখস্থ করেছিস?
    অজয় তোকে আগেও বলেছি আমার পড়া রেডি ,এখন তো মনে হয় তোর পড়া হয়নি,কী তাই তো?...। 
    রাহুল বলল,হুম শেষের দিকের একপাতা বাকি ছিল শুধু। 

    অজয় ও রাহুল দুই বন্ধু। ক্লাস টেনে পড়ে। পড়াশুনোতে খারাপ না। একই কোচিং এ পড়ে। আজ ভূগোল পরীক্ষা, সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। তাই ওদের ম্যাম পরীক্ষা নিচ্ছে।

    আচ্ছা রাহুল তুই মায়াবী জিনিস বিশ্বাস করিস, মানে যা একবার দেখলে খুব আকর্ষণ করে?

    রাহুল -কেন? কী হয়েছে? 
    অজয়- জানিস আজ রাতে মানে ওই ভোরের দিকে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। 
    রাহুল - কী?
    অজয় - আমি আর তুই সাইকেল নিয়ে বেড়িয়েছি কলকাতার দিকে। জানি অদ্ভুত,তাও।
    আমি কলকাতার বেশি রাস্তা জানি না তার মধ্যে কোন গলি গালার ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছি আমরা। সন্ধের দিক তার মধ্যে ঝিরঝিরে বৃষ্টি ও শুরু হয়েছে। হঠাৎ একটা রাস্তায় ঢুকলাম, সেখানে কোনো ইলেকট্রিক বাতি নেই। প্রদীপের আলো, একটা ঘাট ও দেখতে পেলাম সেখানে ঢুকলাম। সারা ঘাট প্রায় অন্ধকার কিছু জায়গায় প্রদীপ মাত্র। প্রথমে খেয়াল করিনি তবে একটু ঘুরে দেখলাম, সামান্য দূরে কিছু অজানা ভাষাভাষী মানুষ যাদের পোশাক পরিচ্ছদ ও আলাদা। কি এক মিষ্টি অজানা সুরে গুনগুন করে গান করে অজানা কোনো দেবতার পূজা করছিল। আমরা প্রায় চল্লিশ মিনিট ধরে সমস্ত দৃশ্য গুলো দেখছিলাম। কখন যে ওরা চলে গেছে বুঝতে পারিনি। ঘাটে প্রদীপের হালকা আলোয় আমি আর তুই। সেই গান, সেই লোক গুলো, ঘাটটা,প্রদীপের আলোয় কেমন একটা মায়াবী বশের অনুভূতি হচ্ছিল। তারপর ঘাট থেকে বেরিয়ে আসি। সেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি অবস্থাতেই সাইকেল চালাচ্ছিলাম আমরা। হঠাৎ কি করে আমি সাইকেল নিয়ে পুকুরে পড়ে গেলাম। এমনিতেই সাঁতার জানিনা তার মধ্যে.....। তুই দাঁড়িয়ে আছিস। আমার গলা অবধি জল, ডুবছি আমি,ডোবার ঠিক এক মুহূর্ত আগে পুকুরের পাশের বাড়িতে জানলায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ে হেসে যাচ্ছে দেখে....জলে তলিয়ে গেলাম....।

    বাপ্ রে ! অজয় এত কিছু দেখে ফেলেছিস। 
    হা.হা.হা.
    নারে , রাহুল বড্ড টানছে স্বপ্নটা আমায়। 
    রাহুল- ব্যাস্ হয়েছে এবার, সামনে ফাইনাল পরীক্ষা, পড়ায় মন দে। 

    ক্লাস টেনের পরীক্ষা টা অজয় আর রাহুল দুজনেই ভালোভাবে দেয়। এখন ছুটি কাটাচ্ছে। ওরা, মাঝে মাঝেই ঘুরে আসে দুজনে সাইকেল নিয়ে। এই যেমন বিকেলে বেরোবে।..

    রাহুল- অজয়, তোর কাছে পাঁচ টাকা খুচরো হবে? সাইকেলে হঠাৎ খেয়াল করলাম হাওয়া নেই।
    অজয় - হ্যাঁ, নে। 

    সামনের জগা জেঠুর সাইকেলের দোকান দিয়ে সাইকেলে হাওয়া ভরিয়ে বেড়িয়ে পরে ওরা।

    অজয় - এ রাহুল জানিস আজ ওয়েদার রিপোর্টে বলেছিলো, ঝিরঝিরে বৃষ্টি হতে পারে।

    রাহুল - তো! কিছু হবেনা ওতে।

    সন্ধ্যা তখন সাতটা হবে,ওরা ফিরবে এবার। রাস্তা দুটো আছে। একটা বড়ো রোড ধরে তবে সেটা বেশ লম্বা হয়ে যাবে, ওরা বোসের পুকুরের পাশ দিয়ে আসবে, সেটা শর্টকাট।

    রাহুল - ওই অজয়, রাস্তাটা বড্ড প্যাঁচ প্যাঁচে। যাওয়া যাবে নাকি?

    অজয় - কি করা যাবে,নাহলে দেরী হয়ে যাবে তো। মা বলেছিল সাড়ে সাতটার মধ্যে বাড়ি ঢুকতে। কেননা আজ মিলি পিসিরা আসবে।

    রাহুল - ঠিক আছে। আস্তে সাইকেল চালাস, সামনে পুকুরের সরু রাস্তা। 

    অজয় - আরে চাপ্ নিস না। কতবার এলাম আর গেলাম।

    রাহুল - হুম্, চল।

    ছোটো বেলা থেকেই অজয় এ রাস্তা ধরেই স্কুলে যাওয়া আসা করত তাই সরু রাস্তা  বলে ওর বিশেষ অসুবিধা হয়না। অজয় তখন তা রাহুলের কথা শুনে হালকা ব্রেক কষে ধীরে করে নিল সাইকেল।
     এমন সময় কি জানি কি করে হঠাৎ টায়ার পিছলে যায় অজয়ের। রাহুল আরে,আরে বলে চিল্লিয়ে  ওঠে।

    অজয় - আরে দাঁড়া উঠছি আমি।

    অজয় সাইকেল নিয়ে পুকুরে পড়ে গেছে। তবে বেশি দূরে পড়েনি। লতা গাছটা ধরে উঠলেই সহজে উঠে আসবে। এমন সময় হঠাৎ অজয় কান ফাটানো স্বরে চিৎকার করে ওঠে।

    অজয় - ওই রাহুউউল, সে - সেই মেয়েটা...

    রাহুল - কোন মেয়ে?

    অজয় - আরে স্বপ্নের সেই...

     রাহুল - ধূর, কেউ নেই এখানে, তুই ওঠ তাড়াতাড়ি।

    না। অজয় উঠল না, সে তখনো বিড়বিড়িয়ে যাচ্ছে "সেই মেয়েটা আবার হাসছে" হঠাৎ লতাটা ছেড়ে দিল অজয়। রাহুল 'পাগল' বলে চিৎকার করে যাচ্ছে। কিন্তু অজয় উঠল না, নেমে গেল জলে। সে দেখতে পায় মেয়েটা হাসছে, আরো হাসছে, চিৎকার করে হাসছে, হেসেই যাচ্ছে.... তারপর সব শান্ত... রাহুল পাথরের মত দাঁড়িয়ে সমস্তটা দেখে অজ্ঞান হয়ে যায়। শুধু সেই অজানা গানের সুরটা এখনো শোনা যাচ্ছে........


    পাঠপ্রতিক্রিয়া
    (জ্বলদর্চি ছোটোবেলা ১০৮ পড়ে দেবাশীষ দে যা লিখলেন)

    মৌসুমী ঘোষ সম্পাদিত জ্বলদর্চি ছোটোবেলা বিশেষ  সংখ্যা ১০৮ পেলাম।সুন্দর সম্পাদকীয়। প্রতিবারের মতোই  তৃষ্ণা বসাকের জয়াবতীর জয় যাত্রা খুব ভালো লাগলো। স্বাগতা ভট্টাচার্য্যর ছুটির মজা পড়ে ফিরে গেলাম নিজের ছোটোবেলায়। বাচ্চাদের কাছে পূজা খুব আনন্দের অবশ্য বড়রাও কিছুতে কম যায় না। প্রিয়াঞ্জলি দেবনাথের কবিতা বেশ ভালো লাগলো। আফরিন নিগারের ' ভূতের ভয় ' এ ভুত আসার প্রস্তুতি থেকে সত্যিই গা বেশ ছমছম করে, ওই খানে আমরা থাকলেও ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতাম। সুন্দর।
    শুভঙ্কর সেন ও  দীপেন্দু দেবনাথ এর আঁকা ছবি খুব সুন্দর।
    এই সংখ্যা সত্যি খুব ভালো লাগলো।

    পেজে লাইক দিন👇





  • আমি আমার মতো /পর্ব ২ / সুকন্যা সাহা
  • আমি আমার মতো 
    পর্ব ২

     সুকন্যা সাহা 

     ঝর্না  কলম 

    কলম  বলতেই ছোটোবেলার কালির ফাউণ্টেন পেনের  কথা  মনে  পড়ে ... আমরা   বলতাম ঝর্না   কলম... আর ছিল চাইনিজ পেন ... ড্রপারে  করে  কালি  ভরতে   হত ...নীল কালি... অন্য   কোনো কালিতে লেখা  অ্যালাউড ছিল না ... তখন সবে  ক্লাস ফাইভে  পেন হাতে   পেয়েছি... মহা মূল্যবান  জিনিস ... সেরা গিফট কালির পেন ... পেলেই  একরাশ আনন্দ ... তখন   কত   অল্পে খুশি  ছিলাম ... অবাক লাগে ... স্কুলের  খাতায় ডট পেনে  লেখা   চলবে  না ... হাতের  লেখা   খারাপ হয়ে যাবে যে !
                                            একবার   এক বন্ধুকে  জিজ্ঞেস   করেছিলাম ঝর্ণা কলম  নাম কেন রে ? সে   বিজ্ঞের মতো উত্তর   দিয়েছিল ঝর ঝর  করে লেখা বেরোয় তো এক্কেবারে  ঝর্নার   মত ; তাই  ঝর্না ।প্রথম প্রথম  লাইন টানা বাংলা খাতায় লেখা ...তার পর সাদা খাতা ... প্রথম  দিকের আঁকা বাঁকা লাইন পরে সোজা  হতে শুরু করে ... কালির পেনের  আরেকটা অসুবিধে   ছিল... খানিকক্ষণ খোলা   রেখে   দিলেই ব্যস  নিবের   কালি শুকিয়ে যেত  তখন আবার পেনটাকে  ঝাড়তে   হত... ঘরে  বিন্দু বিন্দু কালি পড়ত ... ঘর নোংরা ... বরাদ্দ মায়ের   বকুনি...
                     আমার  হাতের  লেখা  বরাবরই  ভালো । কালির  পেন দিয়ে   তাও  প্রথম  প্রথম  খুব ধরে  ধরে  লিখতাম । লাইন  সোজা  রাখার  আপ্রাণ  চেষ্টা । লেখার  কথা এলেই মনে পড়ে আমার দাদুমণির কথা । সাধারণ  নীল কালির  ডটপেন ;তাও  সাদা  পাতায়  ছোট্ট  ছোট্ট  অক্ষর । যেন  পাতা  জুড়ে  ফুলের মতো ফুটে  রয়েছে। সে দেখার মত হাতের লেখা ! কি বাংলা কি ইংরেজি ! পারতাম না   তবুও  অনুকরণ  করার  চেষ্টা করতাম খুব  ছোট  থেকেই । ছোটোবেলায়  মানে  ক্লাস  ফোর  পর্যন্ত, নিয়মিত পড়তাম দাদুমণির কাছে । পাতার  পর  পাতা ইংরেজী  ট্রান্সলেশান   পি. কে .দে   সরকারের গ্রামার   বই থেকে,  আর অঙ্ক করার ক্লাস। মনে আছে  একপাতা অঙ্ক নির্ভুল ভাবে   করতে পারলে পাঁচ  পয়সা রোজগার   ছিল । পয়সা   পেলে  কি যে  আনন্দ   হত !  মনে  হত নিজের উপার্জন ... পয়সা গুলো  জমিয়ে   রাখতাম মাটির লক্ষীর ভাঁড়ে । আশ্চর্য্য  হয়ে দেখতাম দাদুমনি ক্লাস ফোরের বাচ্চাকে পড়াতেন আবার একই সঙ্গে  এম এ ক্লাসের ইকনমিক্স বা পলিটিক্যাল সায়েন্স  পড়াতেন। এবং দুটোতেই সমান স্বচ্ছন্দ ছিলেন । আসলে  পড়াশোনার বেস যাদের ভালো, গভীরতা যাদের যত বেশী বিভিন্ন বিষয়ে তাদের   তত  দক্ষতা ... তবে আশ্চর্য্যের কথা পেশাগত ভাবে কিন্তু দাদুমনি শিক্ষক  ছিলেন  না , ছিলেন বিসিএস অফিসার । কিন্তু বাজি  রেখে  বলতে পারি পড়াশোনার এই গভীরতা আজকের  দিনের   অনেক ভালো ভালো শিক্ষকদেরও নেই । ক্লাস  ফোরেই আমাকে   একবার মাত্র দুপাতার   মধ্যে  রোমান  সাম্রাজ্যের পতনের কারণ লিখে   দিয়েছিলেন ... দাদুমনির  নিজের  হাতের লেখা সেই কাগজ দুটি আজও আমার কাছে সযত্নে   রাখা আছে ...
                                         
    অনেকের কাছে শুনেছি কালি কলম  মন / লেখে  তিনজন ... তা  এখন আর  সে কালি বা কলম  কোথায় ? তার  জায়গা   নিয়েছে  ল্যাপটপ মাউস, কি বোর্ড... ভাবনা গুলো  কলমের  ডগায় আসে  না ... কী বোর্ডে আসে ... আগে অনেক অফিস  যাত্রী  মানুষ  জামার   বুক পকেটে কলম  রাখতেন ... এখন  এসে  গেছে  বল  পয়েন্ট   পেন,  মার্কার   পেন, হাইলাইটার , জেল  পেন ... এই  জেল  পেন  এসে  ফাউণ্টেন  পেনের  বাজার  অনেক  খারাপ  করে  দিয়েছে । জেল  পেন  বহিরঙ্গে  ডট  পেন অন্তরঙ্গে  ফাঊণ্টেন  পেন । তবে  কালি  ভরা ,কালি  ঝাড়ার   সমস্যা  নেই। বাজারে  এসেছে  ইউজ  অ্যান্ড  থ্রো  ডট  পেন... মজার  ব্যাপার,পেনে  রিফিল  ভরার  ক্রেজ  এখন  অনেক  কমে গেছে ।  পেনের কালি  ফুরোলেই লোকে  নতুন  পেন  কিনে নেয় ... তাছাড়া  গো  গ্রীন  মুভমেন্টে  তো কাগজ আর কলমের পাট টাই প্রায় উঠতেই  বসেছে ...

                                              ডট পেনের   রমরমা   শুরু  হওয়ার  পর   সেসব  আর   দেখিনা ... যাই হোক  সব   জিনিসের   মতো পেনও এখন  ইউস অ্যান্ড   থ্রো... কম্পিউটার  এসে  যে   কত   জিনিসের ব্যবসা  কেড়ে   নিল! ঘড়ি  , পেন   সবই  ধীরে  ধীরে  অচল  হয়ে  যাচ্ছে ... আগে  যেমন ঝর্ণা   কলমের  পেডিগ্রি  ছিল; এখন   তো  বাজারে   হরেক  কিসিমের   হরেক  দামের   কলম... পার্কার , বেটা, কিছুরই   অভাব নেই...আর সব  কিছু  এত  সহজলভ্য  হয়ে  যাওয়ায় গুরুত্ব  কমে  গেছে সব  কিছুরই।

                                প্রাচুর্য্য বোধহয়  কেড়ে   নেয় সারল্য... কলমের   কথা  মনে   পড়লেই যেন   ফিরে যাওয়া   যায়  ছোটোবেলার  সেই নীল সাদা   সময়ে  এত   রঙ্গের  কালির   পেন যখনও আমাদের  বর্তমানকে গ্রাস   করে  নি...এখনকার   ছোটোরা   ছোটো  থেকেই  অভ্যস্ত  ল্যাপটপ  বা কম্পিউটারের  মাউস, কি বোর্ড ঘাঁটাঘাটিতে... আরো  সহজ  স্মার্ট  ফোনে  লেখালিখি... লিখেই  পোস্ট  করে  দেওয়া নিজের  ওয়ালে ...বেশ  কিছু  লাইক, কমেণ্ট  তো  ভাগ্যে শিঁকে ছিঁড়বেই...সবকিছু এত  সরলীকৃত হওয়া  আর সহজেই  হাতের  মুঠোর  মধ্যে  পেয়ে যাওয়ার  জন্যই বোধহয়  এই  জেনারেশান  এত  অধৈর্য ... অপেক্ষার যে মাধুর্য্য, অর্জনের যে আনন্দ, সেটাই ভুলে  গেছে এরা... 
    (ক্রমশঃ)

    পেজে লাইক দিন👇



  • যেতে যেতে পথে -৪৭/রোশেনারা খান
  • যেতে যেতে পথে

    রোশেনারা খান

    পর্ব ৪৭

    আজকের বেড়ানোতে মিসেস দত্তর সঙ্গে আলাপ হওয়াটা, একটা বাড়তি পাওনা। ভদ্রমহিলাকে বেশ ভালই লাগল। পোশাক আসাকে, আদব কায়দায় বাঙ্গালিয়ানাকে ধরে রেখেছেন। ১৯৮৫ সাল থেকে এদেশে আছেন। মাঝে একবার দেশে ফিরেছিলেন, কিন্তু থাকতে পারেননি। আবার এখানেই ফিরে এসেছেন। আর দেশে ফেরার ইচ্ছে নেই।  মাসিমার কথা ভেবে খুব খারাপ লাগছে। সেইসঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আতঙ্কিত হচ্ছি। সে ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের তো ফিরতে হবে। নাড়ির টানে, ভালবাসার টানে। আমাদের দেশ খুব গরিব, এখানকার মত এত সুযোগ সুবিধা নেই। তবুও মা তো মা-ই।
          আজ দীপ প্রথম নিজের গাড়ি চালিয়ে কুইন্স হাসপাতাল গেছে। এদিকে দেখতে দেখতে জারা সোনার তিনমাস বয়স হয়ে গেল। জুলাইয়ের মাঝামাঝি আমাদের ফেরার ডেট হয়েছে। আজ দীপ গাড়ি নিয়ে লেসটার গেছে কোর্স করতে। পথ চিনে যেতে হবে। প্রথম দিকে একটু অসুবিধা হবে। তারপর ঠিক হয়ে যাবে। সবই তো অভ্যাসের ব্যপার। ওখান থেকে ফিরে আমাদের নিয়ে সায়েন্সবেরি নিয়ে গেল। মস্তবড় সপিংমল, ঘুরে ঘুরে দেখতে ভালই লাগল। আমার কেনার কিছু ছিলনা। দীপ কারসিটসহ জারাকে ট্রলিতে বসিয়ে ঘুরল, ও কান্নাকাটি করেনি, চুপচাপ ছিল।
          বেশ গরম লাগছে। ১৫ ডিগ্রী টেম্পারেচার আজ। রোদের ও খুব তেজ। আজ জারার ওজন নেওয়ার দিন। আগে ১৫ দিন অন্তর মিডওয়াইফ বাড়িতে এসে ওজন নিয়ে যেতেন। এখানে ওজন যদি ঠিকমত না বাড়ে, ওরা বাচ্চাকে নিয়ে চলে যাবে। দুপুরবেলা বাবলি একাই ওকে জিপির কাছে নিয়ে গিয়ে ওজন করিয়ে নিয়ে এসেছে। ১৫ দিনে ৩৫০ গ্রামের মত ওজন বেড়েছে। বিকেলে ভ্যাক্সিনের জন্য আবার যেতে হল। পরপর দুই পায়ে ইঞ্জেক্সন দিল। একটাতে রক্ত বের হয়ে গেল। প্রচুর কাঁদছিল। এবার বাবলি ওকে আগেই প্যারাসিটেমল খাইয়েদিয়েছিল, তাই বেশি কান্নাকাটি করেনি।
          দেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছি। মাঝখানে আর কয়েকটা দিন রয়েছে, তারপর দেশে ফেরা। মনকে সান্ত্বনা দিচ্ছি এই বলে, ২ মাস পরে তো ওরাও যাবে। মামাঘরে মুখেভাত হবে। গিয়ে সে বিষয়েও বকুলের সঙ্গে ওর মামাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। তার আগে ভাবছি এই ক’মাসে ঘরদোরের  কী হাল হয়েছে?  ফোনে যাকে যা বলার বলে দিয়েছি। ওরা নিশ্চয় সব ব্যবস্থা করে রাখবে।
          এই সিটি হাসপাতালের কোয়ার্টার ও সংলগ্ন এলাকায় বাবলি আর বনিরা ছাড়া আর কোনো বাঙালি পরিবার আছে বলে মনে হয় না। তাই দুটি ফ্যামিলি পরস্পরকে জড়িয়ে জড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে। শুনলাম জার্মানি থেকে বনির মাসি মেসো এসেছেন সানকে দেখাশোনা করার জন্য। বনি দেশে ফিরে যাবে গান  ভালবেসে। সানকে এখানে স্কুলে ভর্তি করা হবে। আমি গেলাম ওনাদের সঙ্গে দেখা করতে। বয়স হলেও মাসি কাজকর্মে বেশ চটপটে। আসলে এদেশে নিজেদের কাজ নিজেদেরই করতে হয় বলেই নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই বাড়ির কাজে আভ্যস্থ।  কিন্তু বনির মেসোর অবস্থা দেখে আশ্চর্য হয়ে ভাবলাম, এই মানুষটি কী করে  এলেন? কী করেই বা ওনার স্ত্রী ওনাকে নিয়ে এলেন! মাসির ছোটখাটো চেহারা,  মেসোর দশাসই চেহারা, কিন্তু তিনি একেবারে চলৎ-শক্তিহীন। যন্ত্রনির্ভর। এটাই এদের জীবনযাত্রার বৈশিষ্ট্য। কোনো অসুবিধাকে এখানকার মানুষ বাধা বলে মনে করেন না। সবকিছুকেই স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়ে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে চলেন।
        এই বিদেশে বিভূঁইয়ে ভাল বন্ধু পাওয়া খুব মুশকিল। দীপ পেয়েছে জাভেদকে। যে কোনও প্রয়োজনে হাজির থাকে। বিশেষ করে গাড়ি সংক্রান্ত বিষয়ে তো সব সময় সাহায্যের জন্য প্রস্তুত। কথা প্রসঙ্গে একদিন দীপ ওর এক বন্ধুর কথা শুনিয়ে ছিল। ও তখন এম বি বি এস পাশ করে সবে ইংল্যান্ড এসেছে ডিগ্রি ও চাকরির জন্য। বিভিন্ন জায়গাতে কোর্স করতে যেতে হত। থাকত নরউইচে। কোর্স করতে আসতে হবে লেসটারে। কোথায় থাকবে? (তার আগে এটা নাকি  তিনদিনের কোর্স ছিল। কিন্তু এই রকম বেকার ডাক্তাররা বেশি সংখ্যক আসতে  শুরু করাতে, একদিনের কোর্স করা হয়েছে)। ওর এক সিনিয়র দাদা বলে, চিন্তা করিস না, ওখানে আমার এক বন্ধু আছে, ওকে বলে দেব। সেই বন্ধুটি হল একজন পাকিস্তানি ডাক্তার। ওখানকার হাসপাতালের ব্যাচেলার একমোডসনে থাকত।  ছেলেটি গাড়ি নিয়ে ওকে স্টেশনে নিতে এসেছিল। রাতে মাংসভাত রান্না করে  খাইয়ে ছিল, সকালে ট্রেনিং সেন্টারে পৌঁছে দিয়েছিল। ট্রেনিং শেষে আবার স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল। আগের রাতে আরও একটি ইন্ডিয়ান ছেলেরও ডিনারে আমন্ত্রণ ছিল। রান্না করতে করতে পাকিস্তানি ডাক্তারটি মজা করে বলেছিল, আমার  গ্র্যান্ডফাদার আর্মিতে ছিলেন, যুদ্ধের সময় কত ইন্ডিয়ান সোলজারদের হত্যা  করেছিলেন। আমি তার নাতি হয়ে  ইণ্ডিয়ানদের রান্না করে খাওয়াচ্ছি। সেদিন ও সারাটা পথ ভেবেছে, আমরা ছোট থেকে জেনেছি,  পাকিস্তানকে যে যত বেশি  ঘৃণা করতে পারবে, সে তত বড় দেশ প্রেমিক। ভুল জেনেছিলাম। সাধারণ মানুষের মানসিকতা আর নেতা মন্ত্রীদের চিন্তাধারার মধ্যে অনেক পার্থক্য। নির্মম সত্য হল গরিব ঘরের ছেলেরা অধিকাংশই অভাবের তাড়নায় আর্মি বা অন্যান্য যুদ্ধ বাহিনীতে যোগ দেয়। যারা মরে এবং যারা মারে তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো শত্রুতা থাকেনা। এই জন্যই বলা হয় রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয় / উলুখাগড়ার প্রাণ যায়। 
          মাঝে আর ১ দিন রয়েছে। তারপরেই দেশে ফেরা। বাবলিটার খুব কষ্ট হবে, একা বাচ্চা সামলানো, রান্না করা, বাড়ির অন্যান্য সমস্ত কাজ একাকে করতে হবে। আজ সন্ধ্যায় রান্না করিনি, দীপ ম্যাকডোল্যান্ড থেকে খাবার এনেছিল, সেটাই খাওয়া হল। গত কয়েক মাসে কত কি দেখলাম, কতকি শিখলাম, এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। যখন এসেছিলাম অধিকাংশ গাছে পাতা ছিলনা। কিন্তু রাস্তার রিংরোডের মাঝখানে ফুটেছিল হলুদ,সাদা ড্রফোডিল ও নানা রঙের টিউলিপ। এদেশের মানুষ নিজের দেশের প্রতি খুবই যত্নশীল। তাই নিজের নিজের কাজ ও দায়িত্বের বিষয়েও খুবই সচেতন। নিজের শহর পরিস্কার রাখার পাশাপাশি তাকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে তোলার জন্য একরকম ফুল ফোটা শেষ হলেই আর একরকম ফুলের চারা রোপণ করে দেয়। যেমন এখন দেখছি  নানা রঙ্গের জিনিয়া ফুটে রয়েছে। এদেশের মানুষের সৌজন্যতা বোধ, শিষ্টাচার  মুগ্ধ করার মত। আমাদের দেশে অনেক মানুষই সবার সঙ্গে কথা বলতে চান না,বা বলেন না। যাঁদের সমাজে বিশেষ পরিচিতি আছে, অঢেল টাকা পয়সা, বাড়ি গাড়ির মালিক। তাঁরা সাধারন মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা করেন না। ক্ষেত্র বিশেষে নিজের গরিব বা অনামি আত্মীয়দের না চেনার ভান করেন। এদের মধ্যে এক ধরণের ইগো কাজ করে। এই ইগোতে বেশি আক্রান্ত নায়ক,গায়ক, কবি সাহিত্যিকরা।অন্তত আমার অভিজ্ঞতা তাই বলে। এদেশে এমনটা ভাবাই যায় না। এঁরা পথেঘাটে আমাদের মত ভিনদেশি অচেনা মানুষদের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হলে হাই,হ্যালো বলেন। না হলেও হাসি বিনিময় করে থাকেন।
        আর একটা বিষয় হল, এদেশে যেমন বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইন আছে, তেমন মানুষ সবসময় সেই আইন মেনে চলার চেষ্টা করে। তাই মানুষজন নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে। পথচারিদের নিরাপত্তার দিকে যথেষ্ট নজর দেওয়া হয়। আমাদের দেশে দেখেছি যারা গাড়িতে চলাফেরা করেন তাঁদের অনেকেই পথচারিদের পথের জঞ্জাল ভাবেন। দুর্ঘটনা ঘটলে সব দোষ পথচারির ওপর চাপিয়ে দিয়ে গালাগালি পর্যন্ত দিয়ে থাকেন। ট্রাফিক আইনেরও তোয়াক্কা করেন না। আর এখানে রাস্তার ধারে লাইট পোস্টের মত পোষ্টের মাথায় ক্যামেরা বসানো আছে। প্রতিটি গাড়ির গতিবিধির ওপর নজর রাখছে। লাল আলো উপেক্ষা করে বা অজান্তে এগিয়ে গেলে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। গাড়ির স্পিড মাপারও সিস্টেম রয়েছে। যথেচ্ছাচারের কোনো সুযোগ নেই। এদেশে আরও একটা অবাক করা জিনিস হল, যে থেকে আসেছি, অল্প সময়ের জন্য হলেও পাওয়ার অফ হয়নি।  (ক্রমশ)

     পেজে লাইক দিন👇



  • বিষ্ণু দে'র কাব‍্যভাবনা।। সন্দীপ দত্ত
  •  


    বিষ্ণু দে'র কাব‍্যভাবনা।। সন্দীপ দত্ত


    কবিতার ক্ষেত্রে আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটেছিল বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে। যখন ক্ষয়ে যাচ্ছে মন,জমছে বিতৃষ্ণা,হারিয়ে যাচ্ছে বিবেক,তলিয়ে যাচ্ছে বিশ্বাসবোধ। একটা যুগ যখন আসে,সে এক বার্তা নিয়ে আসে। সেই যুগেরই বার্তা বহন করে সাহিত‍্য। কাব‍্যজগতে তাই সৃষ্টি হল নতুন গোষ্ঠী। যে গোষ্ঠী হৃদয়ের আঘাত সহ‍্য করে করে অনুভব করল সেই আঘাতের যন্ত্রণা। বোধহয় যন্ত্রণাই মানুষের মনকে জাগিয়ে তোলে। প্রতিবাদ করবার ভাষা জোগায়। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে সম্মানের জন‍্য পথান্তরের পথ চায়। রবীন্দ্রনাথ যাকে নদীর বাঁধ বলেছেন। ".........সেই বাঁধটাকেই বলতে হবে মডার্ন। বাংলায় বলা যাক আধুনিক। এই আধুনিকটা সময় নিয়ে নয়,মর্জি নিয়ে।" সেক্ষেত্রে জীবনানন্দের কবিতাতেও আধুনিকতা এসেছে। সুধীন্দ্রনাথ,অমিয় সকলের কবিতাতেই ফুটে উঠেছে সেই নতুন দিগন্তের ছবি। কিন্তু এখানের আলোচ‍্য বিষয় যেহেতু কবি বিষ্ণু দে,তাই মানুষটার কাব‍্য মানসিকতা ও কলম নিয়েই বলা যাক।

                 অনেকেই বলে থাকেন বিষ্ণু দে'র কবিতা বড্ড বেশি র্দুবোধ‍্য। র্দুবোধ‍্যতা আসলে কী,এটা আগে জানতে হবে। আমরা যে বোধটাকে সহজে জাগাতে পারিনা,বলা ভাল জানতে পারিনা তার জটিলতার ব‍্যাপ্তি,তখনই হোঁচট খাওয়ার একটা প্রশ্ন ওঠে। এই হোঁচটটাই চেনা ছন্দকে ভেঙে দেয়। পাঠকদের মনে রাখতে হবে আধুনিক কবিতার রাস্তাটা ভাঙাগড়ার মধ‍্যে দিয়েই এগিয়েছে। সময় যেখানে র্দুবোধ‍্য,মননে যখন গিঁট লেগে যাওয়ার ক্ষণ চলছে,কবির ভাষা,কবিতার ভাষা তখন তো র্দুবোধ‍্য হবেই। এই র্দুবোধ‍্যতা নিয়ে ইংরেজ কবি ও সমালোচক stephen spender এক জায়গায় ব‍্যাখ‍্যা দিয়ে বলেছেন,"The result of that excessive outwardness of 'a spiritually barren external  worlds is the excessive inwardness' of poets who prefer losing themselves within themselves to losing themselves outside themselves in external reality."

             একজন কবির অন্তর্দৃষ্টি যত সম্পূর্ণতার দিকে এগোয়,তত তাঁর ভাষাশৈলী,শব্দের কিছু পরিবর্তন দেখা দেয়। পাঠকের কাছে এই নতুন মোড়কটাকেই বলা যেতে পারে দুরূহতার মূল কারণ।আত্মবিরোধও কখনও কখনও প্রচ্ছন্ন বোধের সৃষ্টি করে। বিষ্ণু দে'র কবিতার মননধর্মিতা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অনেক অন্তজ্ঞানের সম্মুখীন হতে হয়েছে পাঠককে। এই অন্তরজ্ঞান তাঁর কবিতা না বোঝার পেছনে একটা বড় দিক ছিল।গঠনশৈলীর ক্ষেত্রে বৈদগ্ধ‍্যের এই ছ'টাই বিষ্ণু দে'কে বিষ্ণু দে'র জায়গায় রেখেছে। সম্মান দিয়েছে পর্যাপ্ত।

               এলিয়টের সঙ্গে বিষ্ণু দে'কে অনেকেই তুলনা করে থাকেন। এলিয়ট এবং বিষ্ণু উভয় কবির কাছেই এ যুগ হয়ে উঠেছে অসহ‍্য;গুমোট। তবে এলিয়ট মেঘের গর্জনই কেবল শুনতে পেয়েছেন। কিন্তু বিষ্ণু দে অপেক্ষা করেছেন কাতর চাতকের মতো। একফোঁটা জল কবির কাছে যেন বহুদিনের প্রত‍্যাশা। হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাসটা ফিরে আসুক--এটাই চাইছিলেন কবি।

                রবীন্দ্রনাথের মতো বিষ্ণু দেও সৌন্দর্যের পূজারী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই চিন্তা থেকে বিরত হতে বাধ‍্য হলেন আধুনিক যুগযন্ত্রণা দেখে। 'উর্বশী ও আর্টেমিস'কাব‍্যগ্রন্থের 'ছেদ'কবিতায় কোনও রাখঢাক না রেখে স্পষ্ট উচ্চারণ করলেন,"হেথা নাই সুশোভন রূপদক্ষ রবীন্দ্র ঠাকুর।"
               'চোরাবালি'কাব‍্যগ্রন্থের 'টপ্পা ঠুংরী'কবিতায়,কিংবা 'নাম রেখেছি কোমলগান্ধার' কাব‍্যগ্রন্থের 'যমও নেয় না' প্রভৃতি কবিতায় লোকউপাদানের বিশেষ শৈলীকে তিনি ব‍্যবহার করেছেন যথাযথ। আবার 'ক্রেসিডা'য় লোক উপাদান গ্রীক পুরাণ কথা হিসেবে উঠে এসেছে।

              রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে গভীর শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও বিষ্ণু দে'র মনে হয়েছিল,"......তবু তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) ব‍্যক্তিস্বরূপ নদীর মুখর স্রোত নয়,সংহত সত্তা হিমালয় নামে নগাধিরাজ যেন।.......তবু মোটামুটি বলতে হবে যে তাঁর নক্ষত্রবিহারী প্রতিভা বাংলার রসালো মাটিতে আমাদের প্রাত‍্যহিক বাস্তবতায় বিরাজমান থেকেও বহু ঊর্ধে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেখানে মধুসূদন বা দীনবন্ধু বরং আমাদের চেনা অগ্রজ।" এ বিরূদ্ধ আচরণ ব‍্যক্তি রবীন্দনাথকে নয়,রোম‍্যান্টিকতার আতিশয‍্যের বিরূদ্ধে খড়্গ তোলা।

                কবি বিষ্ণু দে'র কলম থেকে যখন যা কবিতা নেমে এসেছে,কিংবা কবিতাকেন্দ্রিক ভাবনা ও বক্তব‍্য---প্রতিবারই অবাক হতে হয়েছে পাঠকদের। হতে হয়েছে গর্বিত। পুণ‍্যে পুণ‍্যে ভরে উঠেছে বাংলার জল মাটি।

    পেজে লাইক দিন👇



  • সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায় /প্রসূন কাঞ্জিলাল
  • সর্বকালের প্রবাদপ্রতিম কবিসত্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায়

    প্রসূন কাঞ্জিলাল

    অতিথি অধ্যাপক হয়ে এসে বেশ কিছুদিন শান্তিনিকেতনে ছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়। ছিলেন পূর্বপল্লী গেস্ট হাউসের দোতলায় তেইশ নম্বর ঘরে। সারাদিন আড্ডা আর অধ্যাপনায় কেটে যেত কবির। একদিন কবি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শরৎ মুখোপাধ্যায় একত্রিত হয়েছিলেন এক কবিতা পাঠের আসরে। আসর বসেছিল বিকেলে। তারিখটা ছিল উনিশে মার্চ, উনিশশো পঁচানব্বই। শতরঞ্জি পাতা বড়ো ঘরে সবাই বসেছে। চায়ের পালা শেষ করে কবিতা পড়তে শুরু করলেন শক্তিই। একটার পর একটা। কী অসম্ভব ভেতর থেকে একটা তাগিদ আর আবেগ অনুভব করছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। কেউ আবার পড়তে বলছে কি বলছে না – সেদিকে তাঁর দৃষ্টি নেই। তিনি একটির পর একটি কবিতা পড়ে চলেছেন পাতা উল্টে উল্টে। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন তাঁর মধ্যে নেই। হারিয়ে গেছেন। বই হাতে তুলে বাবু হয়ে বসে পড়ছেন, কিন্তু মনে হচ্ছে তিনি যেন অনেক দূরের কোনও কবি, যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কী দীপ্তি বলিষ্ঠ সুউচ্চ উদাত্ত আত্মহারা কণ্ঠ! ধ্বনিত হোলো কবিতার লাইনগুলো –
    ‘সেগুনমঞ্জরী হতে ধাক্কা দাও, জাগাও আমাকে
    আমি আছি বিষঘুমে, জাগাও আমাকে
    আমি আছি সর্পদষ্ট, জাগাও আমাকে
    বৈবানে সন্ন্যাসে আছি, জাগাও আমাকে
    আমি জাগবো না, আমি বিষঘুমে, জাগাও আমাকে
    যথাব্রত করো, তুমি জাগাও আমাকে
    আগুনের ছোঁয়া দিয়ে জাগাও আমাকে
    পাপ স্পর্শ করে তুমি জাগাও আমাকে ... ।‘

    শেষ দুটি ছত্রে কবির উচ্চারণ –

    ‘আমি সব দিয়ে যাবো জাগাও আমাকে
    শুধু জাগরণ চাই বারেক জীবন।‘

    যে মানুষটা তাঁর গভীরতম তীব্র আবেগে জেগে ওঠার প্রার্থনা জানালেন তাঁর কবিতাপাঠে, সেই মানুষটাই দু’দিন যেতে না যেতে তেইশে মার্চ রাত্রে সেই যে শুলেন, আর জাগলেন না। থেমে গেল শক্তি চাটুজ্যের’পদ্য’।
    মৃত্যুর পূর্বে সত্যিই কিন্তু শান্তিনিকেতনে শক্তি জেগে উঠেছিলেন। শান্তিনিকেতনে সবাই তাঁকে জাগতে দেখেছিলেন। বলেছিলেন কলকাতায় ফিরে গিয়ে আবার কবিতা লিখবেন। এখানে বসে কবিতা লেখা যায় না, এখানে সংগ্রাম নেই, সংঘাত নেই – চারিদিক জুড়ে শুধু শান্তি আর শান্তি। শান্তির শান্তিনিকেতনে বসে আর যাই হোক, কবিতা লেখা যায় না। তবুও কি কিছু লেখেননি। অন্তত ছোট্ট একটি কবিতা এখানে বসেই লিখেছিলেন। কবিতার নাম “অকাল বৃষ্টিতে”। ছ’লাইনের কবিতা –


    ‘ হঠাৎ অকালবৃষ্টি শান্তিনিকেতনে 
    রাত ভোর বৃষ্টি হোলো শান্তিনিকেতনে
    আমের মঞ্জরী পেলো বৃষ্টি ও কুয়াশা
    বসন্তের মুখোমুখি শিমুল পলাশ
    ফুল বৃন্তচ্যুত হয়ে খসে পড়ে ঘাসে
    মানুষ স্থগিত ঘরেচক্রে বসে আছে’।

    শক্তি তাঁর সেই সময়ের মনের কথাটাই কবিতায় ব্যক্ত করেছেন। যা লিখেছেন সাহিত্যিক অধ্যাপক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য। আবার অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণ উপলক্ষে রচিত এক নিবন্ধে বলেছেন, “শক্তির প্রয়াণ ঘটল অতর্কিতে। কিন্তু সে জন্য আরও বিখ্যাত হয়ে ওঠার দায় নেই তাঁর, কেন না জীবদ্দশাতেই তাঁর কবিতার একূল-অকূল পূর্ণিমার যশোরেখায় ছেয়ে গিয়েছিল”। 
    মরার আবার সময় – অসময়। শক্তি নিজেই লিখেছিলেনঃ “মৃত্যু থেকে পার নেই, যেন তালকানা পাখি উড়ে এসে পড়বেই ফাঁদে”। কেমন সে মৃত্যু ? গোড়ার লেখাতেই অনেক বার শক্তি লিখেছেন মৃত্যু আর শবযাত্রা আর চিতার কথা। শুরু না হতেই এত মৃত্যু কেন ? শক্তি লিখেছেন, “ তবে হয়তো মৃত্যু এসব করেছিস জীবনের ভুলে”। আবার লিখেছেন, “তাঁকে চিতায় বেঁধে উল্লাস করছে মেঘেরা সারা রাত” – যেন সুখ করে লিখেছেন। পরে সেই মৃত্যুকে নিরূপিত করেছেন এই স্তবমালায় –

    “মৃত্যু, তুমি খাপছাড়া ইশকুলের টিফিনে ছেলে,
    মৃত্যু, তুমি রাসবিহারী ট্রামলাইন,
    মৃত্যু, তুমি মেয়েদের চুলে ভরা নীল কাঁচ পোকা ...”

    বর্ণালি ভরা এই মৃত্যুর রূপ বদলে গিয়েছিল পরের দিকে। তখন মৃত পিতার মমতাহীন চোখের মতন মৃত্যু এসে দেখা দেয় রাতে। মনে হয় সব পাওয়া,পাওয়া হয়ে গেছে, ফসলের কাল এসে গেল; ‘এখন শান্তি, ওঁ শান্তি, দাবা জুড়ে ধানের মঞ্জরী’। তবু যখন মুখ ঘুরিয়ে বলতে শুনি কবিকে –

    “এখন যাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে
    চাঁদ ডাকে; আয় আয় আয়
    এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে
    চিতাকাঠ ডাকে; আয় আয় –
    যেতে পারি
    যে কোনো দিকেই চলে যেতে পারি।
    কিন্তু, কেন যাব ?”

    কেন যাব ? এই সপাট অঙ্গীকারের ভেতরেই কানে আসে পায়ের নিচে জল সরার আওয়াজ। তারপর কবি মিনতি করেছেন দেখি আর কাউকে নয়, আগুনকে; “চলচ্ছক্তি হারিয়ে বসেছে পা, তাকে পোড়াও; দায় বইতে নুয়ে গেল কাঁধ, তাকে পোড়াও;” এখন দেখার বাকি থাকে যদি কিছু ‘সেই অশ্রুপাত শেষ হলে নষ্ট করো আঁখি’। শেষে বলেছেন, ‘হে চিরপ্রণম্য অগ্নি, আমায় পোড়াও’।
    এ তো ব্যাপক মানুষের নিয়তি। কেবল কবিই টের পান অভিযোগ। অকালমৃত্যু হয়েছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের। অকালমৃত্যুই বলবো। কাগজে, সভায়, আকশবাণীতে হাজার বার করে বাজলেও বিশ্বাস হতে চায়নি। শুনেছিলাম কবিতা উত্তমর্ণ অধমর্ণ কোন প্রশ্ন ওঠে না। শুধু পূর্বসূরি হিসাবে জীবনানন্দের রক্তি ভূমিকা আছে।
    শক্তি চট্টোপাধ্যায় কমিউনিস্ট থেকে হাংরি ধর্মান্তরিত হয়েও কোথাও দীক্ষিত হতে পারেননি। স্থায়ী হতে চাননি, হয়তো সম্ভবও হয়নি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় হাংরি জেনারেশনের অংশ গ্রহণ প্রসঙ্গে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন ১৯৬৩ –তে ‘এষনা’ পত্রিকায়। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘শক্তি চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত হাংরি জেনারেশনের কোনো মুখপত্র নেই – বস্তুত হাংরি জেনারেশন একটা আইডিয়া – যার বিষয়ে শক্তি গ্রন্থ সমালোচনা করতে গিয়ে প্রথমে কিছু লেখে। শক্তি খুবই অন্যমনস্ক বা অপ্রাসঙ্গিকভাবে কথাগুলি লেখেন। আমরা বন্ধুরা কেউ জানতাম না শক্তি এরকম ভাবছে, কিন্তু ঐ নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়ে যায়। ... পাটনা থেকে মলয় রায়চৌধুরি নামক এক যুবক এটির নেতৃত্ব কিছুদিন করেন। সাথে ছিলেন – সুবিমল বসাক, সুবোধ আচার্য্য, ত্রিদিব মিত্র। কিন্তু হাংরি জেনারেশন এমন এক জিনিস যে কারো হাতেই নেতৃত্ব বেশিদিন থাকে না’।
    সেদিক থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ওপর প্রভাব বলতে জীবনানন্দই ছিলেন। পঞ্চাশের কবিদের অতিক্রম করার মত এক জীবনানন্দ ছাড়া তেমন কোনো কবি ব্যক্তিত্বই ছিল না যা কবিতার রক্তমজ্জায় আক্রমণ করতে পেরেছিল। তখন অবশ্য আধুনিক বাংলা কবিতার সাম্রাজ্যের শাসনভার ছিল বুদ্ধদেব বসুর হাতে। সঞ্জয় ভট্টাচার্য ‘পূর্বাশা’ বা ‘নিরুক্ত’ সম্পাদনা করেও সে শাসনভার পাননি। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকার পর ‘কৃত্তিবাস’ বাংলা আধুনিক কবিতায় এক কবি সংহতি গড়ে তোলে। গোষ্ঠীর ক্ষমতায় অনেক বেশি ক্ষমতাবান এবং পরবর্তীতে এই ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠী এস্টাব্লিশমেন্টের অঙ্গ হয়ে ওঠে।
    ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীর শক্তিমান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় নিঃসন্দেহে কবিত্বের সহজাত অধিকারী। জীবনানন্দ দাশ ‘কবিতা চিরপদার্থ’ বলতে যা বোঝাতে চেয়েছেন তাও ছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার অন্তরসত্তার অন্তর্গত। কবিতাকে তিনি একমাত্র অবলম্বন বলে স্বীকারোক্তি করেছেন, ‘আমার নিজের কাছে একাকীর কাছে, কবিতা অবলম্বন। নিজেকে নিজের মত করে দেখার চমৎকার জলজ দর্পণ এক’। কবিতা তাঁর আত্মজৈবনিক উচ্চারণ হয়ে গেছে প্রথম থেকেই। প্রকৃতি, নরনারী সম্পর্ক কিংবা ঈশ্বর চেতনা এসব নিয়ে কখনই তাঁকে আলোড়িত হতে হয়নি। জীবনের স্বতোৎসারিত ভাবনাই তাঁর কবিতার কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। এমন কী রাজনৈতিক ও সামাজিক কোন সমস্যাও নয়, কবির একাকী জলজ দর্পণের প্রতিবিম্ব ফুটে ওঠে যখন যেমন মানচিত্র; যা কবি মনের রহস্য কুহকময় সব সময় তা মনননিষ্ঠ হয়ে ওঠে না; - 
    “কোমল বাতাস এলে ভাবি, কাছেই সমুদ্র।
    তুই তোর জরার হাতে কঠিন বাঁধন দিস।
    অর্থ হয়, আমার যা-কিছু আছে তার অন্ধকার নিয়ে নাইতে নামলে
    সমুদ্র সরে যাবে, শীতল সরে যাবে, মৃত্যু সরে যাবে।
    তবে হয়তো মৃত্যু প্রসব করেছিস জীবনের ভুলে।
    অন্ধকার আছি, অন্ধকার থাকবো, অন্ধকার হবো।
    আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে”।

    বিষাদ নয়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় মাঝে মাঝে আক্রান্ত হয়েছেন এক অসম্ভব হৃদয়ভারী বেদনাবোধে, পরবাসী আক্রান্ত অস্থিরতায়। এ তাঁর একাকিত্ব, নাকি কবির চিরন্তন দুঃখবোধ। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বেদনা বোধ কখনই স্থায়ী হয়নি কিংবা তাঁর বেদনা বিষাদের রূপ নেয়নি। প্রকৃতির কাছে ছুটে গিয়ে অরণ্য, নদী, জল, ঝরণায় তাঁর আত্মার আরগ্যলাভ ঘটেছে।
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের স্বভাবের মধ্যে ছিল স্বেচ্ছানির্বাচিত এক স্বেচ্ছাচারিতা। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ছিল এক পর্যটন মন, সবকিছুতেই ছিল মানিয়ে নেওয়ার মনোভঙ্গি তা কখনও জঙ্গলে বা বিদেশ বিভুঁয়ে, তবে তাঁর কবিতার শিকড়ে ছিল জননী জন্মভূমির মৃত্তিকা রসসম্পৃক্ততাই;
    “এই বিদেশে সবই মানায় –
    পা-চাপা প্যান্ট, জংলা জামা
    ধোপদুরস্ত গলায় রুমাল, সঙ্গে থাকলে অশ্বত্থামা
    এই বিদেশে সবই মানায়।
    ব্রায়ার পাইপ, তীক্ষ্ণ জুতো
    নাকের গোড়ায় কামড়ে – বসা কালো কাঁচে রোদের ছুতো
    এই বিদেশে সবই মানায়”। (এই বিদেশে)

    শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্থে ‘হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্যে’ থেকে ‘ও চির প্রণম্য অগ্নি’ পর্যন্ত চলেছে জলজ দর্পণে প্রতিবিন্বিত নিরন্তর প্রবাহিত অনুভূতি, যেখানে সহজাত কবিত্বের বর্ণময় প্রকাশ, যে বর্ণ প্রকৃতির পরাগ মাখা কখনও কখনও তীব্র বনবন্ধী। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় নাগরিক জীবনের টেনশন সেভাবে নেই, যেভাবে অরণ্য প্রকৃতির মদির আকর্ষণ আছে কিংবা নিসর্গে আত্ম আবগাহন। 
    “এবার জঙ্গলে সরাসরি নয়, পথ খুঁড়ে খুঁড়ে
    দুপাশে জঙ্গল রেখে ক্রমাগত ছুটে দৌড়ে যাওয়া
    জঙ্গলের মায়া মেখে, ছায়া মেখে উত্তরের দিকে
    ক্রমাগত দৌড়ে যাওয়া, পিছনে বলেও যাওয়া নয়
    শুধু যাওয়া, শুধু চলে যাওয়া”।
    কিংবা
    “গাছগুলো তুলে আনো, বাগানে বসাও
    আমার দরকার শুধু গাছ দেখা
    গাছ দেখে যাওয়া
    গাছের সবুজটুকু শরীরে দরকার
    আরোগ্যের  জন্যে ঐ সবুজের ভীষণ দরকার”।

    মৃত্যুর পর সারা দেশ জাতীয় কবির মতোই দুর্লভ গৌরব দিল কবিকে। আরম্ভের দিন ছিল আরেকরকম। সে ছিল চাপা প্যান্টালুন, চোখরা-বখরা হাওয়াই জামা, হাওয়াই চপ্পলের, বিরোধী বিপরীত কৃষ্টি সাধনার, ক্ষুৎকাতর হাংরির, নৈরাজ্য বোহেমিয়ানা আর যথেচ্ছাচারের,অবিরল কলাহলের দিন। আত্মপ্রাবল্যময় ভাঁজ-ধরা, জট-ধরা লেখারও দিন। ‘এমনও দিন কেটেছে একটিমাত্র ভাষাকে উলোটপালোট করে’-

    অথবা,
    “পা থেকে মাথা পর্যন্ত টলমল করে, দেয়ালে দেয়াল, কার্নিশে কার্নিশ,
    ফুটপাত বদল হয় মধ্যরাতে
    বাড়ি ফেরার সময়, বাড়ির ভিতর বাড়ি, পায়ের ভিতর পা,
    বুকের ভিতর বুক”।
    কিংবা
    “আমি একটি সোনার মাছি মারিয়ে ফেলব রাত দুপুরে
    স্বাদু ফলের চতুর্দিকে জালের তৈরি শক্ত বেড়ায়
    বাদুড় তুমি একলা পড়ো”-
    কিংবা,
    ‘ভাষার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে’…………

    পোকায় কাটা কাগজপত্র দেখলে শব্দ মনে পড়ে কবির – ‘রূপসীর বগলের কনিফেরাসার মত মেঘ’, ‘চৌরঙ্গির দশ ফুট উঁচু দেয়ালের মতো পোস্টারে পোস্টারে ভরে’ গিয়েছেন কবি।
    এ তো ‘ রবীন্দ্রনাথের হেলাফেলা সারা বেলা নয়’, ‘হৃদয়পুরের জটিলতার’, ভেতরে বসবাস, ‘প্রত্যেক কবির পাশে শোয়া’ আর হয়তো তারই ফলে কবি লিখছেন, ‘তোমার কবিতার ভিতর অমানুষিক পরিশ্রম’। অমানুষিক পরিশ্রমের স্থানে অবশ্য চোখে পড়ে সুছন্দ ছক একটুখানি, অনায়াস ভাষা বিন্যাস মুক্ত আর একটা পুনরাবৃত্ত রিফ্রেনের রোমাঞ্চ – সামান্য লক্ষণের মতো। ‘বাগানে কি ধরেছিল হাত / বাগানে কি ধরেছিল হাত’, ‘আজও আমি তেমিনই আনাড়ি / ‘আজও আমি তেমিনই আনাড়ি’ বা ‘কোনোদিন পাবে না আমারে / ‘কোনোদিন পাবে না আমারে’ – এই ভাবের অজস্র কবিতাশেষে স্তবকে স্তবকে বাজানো দ্বিরুক্তি, তারই ভেতর মায়া জমে ওঠে কোনোখানে ঃ ‘অবনী বাড়ি আছো, কিংবা ‘যেখানে সকলে বাঁধে ঘর / আলোতে ছায়াতে বসে / ভোগ করে নারী ও ঈশ্বর’। ‘প্রত্যেক কবির পাশে শোয়া’ও অনেকটাই এসেছে মিলের বা আবহের ঝোঁকে ঃ ‘লেভেল ক্রসিং, দাঁড়িয়ে আছে ট্রেন / এখন তুমি পড়ছ কি হাট ক্রেন’ কিংবা ‘দুঃখের নিস্পৃহ তুমি বটফল নাকি? / কীটসের হাইপেরিঅন?’ কিংবা ‘প্লাতেরো আমারে ভালোবাসিয়াছে, আমি বাসিয়াছি / আমাদের দিনগুলি রাত্রি নয়, রাত্রি নয় দিন......’ এইশক্তি কবিতা লিখছেন নব্য দিনে যখন অ্যান্টিএসটাব্লিশমেন্ট আর মড বীটনিক রকার, রবিবাসরীয় সাহিত্য আর ইলেকট্রিক গিটারের মাদক হাওয়ায়। পান-রমনের খোলা আমন্ত্রণের ছাউনি ঢেলে বিকল্প কলাকৃষ্টির স্ফুর্তি। কবিতার একান্ত ঝোঁক যখন স্বভাবোক্তির দিকে, তাঁর “খুব বেশিদিন বাঁচব না আমি, বাঁচতে চাই না”র মতো প্রসিদ্ধ পঙতির নিচেও গুঞ্জন করে হীট মড গানঃ “Hope I die before I get cold.” 

    তবু আস্তে আস্তে সব খুলে রেখে শক্তি কখন গলিয়ে নিয়েছেন আরেকটা সহজ দিশিয়ানা; ধুতি পরেন। শুনি বলছেন, ‘আমি একটু সহজ করে কথা বলব ভেবেছিলাম’, ক্রমে ক্রমে বলেছেন। এখানে বৃষ্টিপতনের মতো, পাথর ভেজানো হালকা স্রোতজলের মতো, ‘নীল একটা ছেলে ভুলানো ছড়ার’ও মতোঃ

    মা হয়েছেন ফটিকজল, পিতা জোনাক পোকা”
    কিংবা
    “বাজারটা ঘুরে আসি
    ছেলেবেলার বাঁশি
    কিংবা জলছবি
    কিনেই তো লুকোবি”।
    কিংবা

    “পাতার ফাঁকে উঠছে শামুক, শিকড় কাটে উঁই
    আমার মতন একলা মানুষ দুখান হয়ে শুই”।

    একলা মানুষ দুখান কেন, রুজু রুজু গেরস্থ সংসার হয়ে উঠেছেন ক্রমে ক্রমে লেখার ভেতরে। প্রথম বইয়ের সম্ভাব্যতা যেন ছাপা হয়েছিল। যেন অবিচ্ছেদ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে এবার। সেই যে অন্ধকার ভাঁড়ারের নুন-মশলার পাত্রের মতো পচা ধান, শ্যাওলা, তেচোকো মাছের আঁশ গন্ধ, সেই মরা মাছ, কুঁচ, স্প, নালডাঁটা, মুচিডাব, সেই আমরুলের পুঞ্জ পুঞ্জ নীল অম্লতা – প্রকৃতি-গেরস্থালির এই মিলমিশের ভেতরেই যেন এবারে তাঁর সহজ নিজস্ব লেখা। সে লেখায় মিটমিটে জমিজিরেত চরণ দাসের গাই গরু, নজরালির তালপুকুর, চকদিঘির মুচ্ছুদি খলিল আর নেয়েপাড়ার কান্ত, আবার আদায় তসিল ধার-কর্জ, ইশকুল-পাঠশালা, ছাঁচতলা উঠোন, তরজা কবি, কাপ মায়ের ঝরাপাতার কথকতা সব আছে, আবার আছে খেয়াঘাট, ইস্টিশন, টকিহাউস, মিস্ত্রিরির কারখানা, কলকাতার ছন্নছাড়া গলি – সবের মাঝখান দিয়ে আগাগড়া একখানা গেঁয়ো পথই যেন ফুঁড়ে চলেছে এপার ওপার, আর কবি টের পেয়েছেন, ‘সাত গাঁয়ে আমিই এক চলার লোক, পথটাও কম নয় নিতান্ত’ – সে পথ “ সব দিকেই যাওয়া চলে কিন্তু পিছু ফেরার রাস্তা নেই, ফিরলেই চাবুক”, কবি বলেছেন, ‘যাবেই যদি ঘন ঘন / পিছন ফিরে তাকানো কেন?’ 
    সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক কৌটিল্যমারির আঘাত শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে সেভাবে আলোড়িত করে না, যেভাবে প্রকৃতির মধ্যে পুরনো চাঁদ তাঁর চেতনার জাগরণ ঘটায়, গ্রিস দেশে স্মৃতির ভেতরে জেগে ওঠার বেদনা অনুভব করেন।

    “কাল সারারাত অতিশয় স্বপ্নে স্বপ্নে বিদ্যুৎ চমকে জাগিয়ে রেখেছিল
    আমায় পুরানো চাঁদ
    পল্লীদাস ক্ষণে ক্ষণে আমায় সেই স্বপ্ন ছায়াময় ঘুম থেকে জাগিয়ে বলেছিল
    এই তো গ্রিস দেশ, এখানে কেউ ঘুমায় না –
    তখনই চাঁদ অস্পষ্ট কালো এক ঝিনুকের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলো
    আমার আর গ্রিস দেশ দেখা হলো না।
    দেখা হলো না পল্লীদাসের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে
    অসচরাচর গ্রিসের হাজার হাজার বছরের শৌখিন সমাধি স্তবক বাগানের ফুল”।

      পিছুটান ছেঁড়া এই যাওয়া যেন ত্রস্ত প্রেমিকের মতো, যেন সন্ন্যাসীর মতো। প্রেমিকের ‘লালচে’ আর সন্ন্যাসীর ‘পরিব্রিজ্যা’ দুই অভিজ্ঞানই তিনি বদলে বদলে দেখতে দিয়েছেন পাঠককে। আগুন লাগলে পোশাক যেভাবে ছাড়ে তেমনি ভাবে সব ছেড়ে যাওয়া, আবার ভালবাসার ভাঙাচোরা উত্থান-পতন মাড়িয়ে যাওয়া আরো পরে, আরো পরে। গেরো খুলে ছড়িয়ে যায় খিড়কি পুকুরের মতো সমুদ্র। টান লাগে অতিদূর জঙ্গলের। হাট, মেলা, খুঁটিমারি বাংলো ছাড়িয়ে এসে পড়ে হিংস্র বন। কিন্তু হিংস্র তো তেমন হিংস্র নয়। ভালোবাসার বন কি হিংস্র হয় ? সন্ন্যাসীর বনও কি হিংস্র হয় ? শক্তির ভালোবাসার বন হল ঢেউতোলা হেমন্তের অরণ্য, পর পর চিঠি বিলোবার পোস্টম্যান বেরিয়ে আসছে গাছের কোনা দিয়ে। হয়তো চিরকেলে ভালোবাসার বাঘ বেরোলে হঠাৎ। শিরীষে ফুল এসেছে, নাগকেশরের গন্ধ পাই, মাথার ওপরে ঠেলা দিয়ে উঠল টেরা চাঁদ, কবি বলেছেন,

    “আকাশে চাঁদ শায়া শুকচ্ছে, কী নরম জ্যোচ্ছনা আলোয়
    আমরা দু’জন ছড়িয়ে বসছি…”

    আবার কবরের পর কবর পেরিয়ে পাতার করাতে ছিন্নভিন্ন চাঁদের সঙ্গে প্রব্রজ্যার জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে জিরোতে বসেও দেখা সেই ‘সুন্দর আমার কাছে শুয়ে আছে মানুষের মতো’। হয়তো মানুষীরই মতো, হাট বাড়িয়ে আছে আসঙ্গ লিপ্সায়। কিন্তু যখন লেখেন –
    “দু গণ্ডা লোক দু গণ্ডা পোক নেবু ঘাসের রসে
    পটাক করে চুল্লু মারে বিসরগ-সন্ন্যাসে …”

    মনে হয় এ তবে সঙ্ঘের সন্ন্যাস।

    আসলে শক্তি পুরোপুরি সঙ্গলিপ্সু মানুষ, মুহূর্ত চারণ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েও ছোটো ছোটো গেরস্থালি চৌকোনার ভেতরে তাঁর তৃপ্তি। মানুষ ও প্রকৃতি দুয়েতেই তাঁর স্পৃহা। ‘আমি ভাঙায় গড়ায় মানুষ’ শক্তি লিখেছেনঃ ‘আস্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছে আমায় ক্ষুধা আর প্রাণপণ গাছের শিকড়’, কিন্তু এখানেও সবই খায় তাঁর ভালবাসা – এঁটো পাতা, হেমন্তের খড়, সে রাবীন্দ্রিক,তাত্ত্বিক ও মনশ্চর কিছুই নন, তাঁর সন্ন্যাসী গুহাতেও তিনি টের পান ‘মানুষ লুকিয়ে থাকে ঘাস হয়ে মনের গভীরে’। ঘাস ও মানুষের এমন একটা অন্যোন্য তিনি গড়ে তোলেন যে মনে হয় অতি সাম্প্রতের চাপ। তিনি এড়িয়ে গেছেন, মানুষ প্রকৃতি মিলে এখন তাঁর মানুষ, এমন কি সামাজিক মানুষ; আবার প্রকৃতি-মানুষ মিলে এখন তাঁর প্রকৃতি, এমন কি অরণ্য প্রকৃতি। যখন তিনি লেখেন, ‘বৃষ্টি হলে মনে হয় আমি ঐ বৃষ্টির জলের সঙ্গে ঢুকে মিশে যাব পড়ে থাকা ভুবনে, মাটিতে’, কিংবা ‘যেন আমি মাটি, যেন পোড়ো ঘর, পুকুরেরপাঁক’, মনে হয় সর্বাত্ম প্রকৃতিরই কবি তিনি। আগের দিনের কবিরা যেমন, আবার দেশ প্রকৃতির কবিও তিনি। স্বদেশ প্রকৃতিরও। প্রকৃতি গ্রাম আর কথ্য গ্রামীণের মধ্যে যে মিশেল পড়েছিল নব্য রীতি আর কাউন্টার কৃষ্টির সে তাঁকে যেন আত্মহারা করেনি হয়তো আরেকটা ধরন দিয়েছে বয়ানে বিন্যাসে, সেই বাঁকটুকু বদলে যেতেই শক্তি লিখেছেনঃ ‘চলো গিয়ে দেখে আসি দেশ আমার, দেশ আমার মা’। লিখেছেনঃ ‘জন্মভূমি কথাটার মধ্যে এক আশ্চর্য মাদুর বিছানো আছে’। আবার লিখেছেন, ‘আরে বাপু আমি যে ওইটুকুর জন্যেই ব্যাকুল’। সত্যি তাই? ব্যক্ত করে বলতে দেখি তাঁকে তিনি দেশপ্রেমী,রাজনীতিবিদ নন। ‘সভায় যে কাঁদে, সে সংসদে / মানুষের শুভ পন্য বিক্রি করে দেশবন্ধু সাজে’, সেও নন তিনি। তিনি খালি ‘গন্ডগ্রামে ঘুরে / চাষিদের, হরিণের ঘাস খাওয়া এবং না খাওয়া’ অনেক দেখেছেন, তিনি দেখেছেন দুটো ইট পেতে খেলাচ্ছলে নিরন্নের বনভোজন,

    “কিছু পাতা-পুতো কালো তিজেলে ফুটছে ভাত
    জোর বরাত, আমাদের ঘরে রোদ্দুর এসেছে
    ভাতের গন্ধে পেটে ভোঁচকানি লাগে”।
    এই দেশখন্ডের সঙ্গে এমনি একাত্মা হয়েছেন বলে যেন সহজে লিখতে পেরেছেনঃ-

    “ছাতা নেই, ভাত নেই – কোন কাম পাথরে, মোচ্ছবে তোমাদের ?” 
    এ তো প্রতিবাদী অসামাজিকের নয়, সপাট বক্তব্যের লেখা, কথ্য গ্রামীণের শব্দ কটি ছাড়া কোন তির্যক বা অস্বচ্ছতাও নেই বয়ানে, কিন্তু এমনি অপরোক্ষ ভালোবাসায় লিখতে পেরেছেন যিনি দেশকে, দেশ তাঁকে আপন কবির ভালবাসা দেবে, সে আর বেশি কী ?
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় প্রকৃতি আদিম প্রেরণার মত, কবিতার মেদ মজ্জায় প্রোথিত হয়ে আছে। আদি কবির মত নিসর্গ প্রকৃতির কাছে প্রার্থী হয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
    শক্তি চট্টোপাধ্যায় ভীষণ পর্যটনময়; তাই উত্তর বাংলার অরণ্য প্রকৃতির কাছে বার বার তিনি ছুটে গেছেন, অনেক কবিতার উৎস স্থল এই অরণ্য, নদী, উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল। লোথার লুৎসের কাছে এক অনুষঙ্গ প্রসঙ্গে ‘ফুটবল’ কবিতাটি প্রসূতি পরিবেশ সম্পর্কে জানাচ্ছেন ভুটান গিরিমালা ও জয়ন্তী নদীর সান্নিধ্যে। নিসর্গ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার আদি উৎস এবং পৃথিবীর আদিম কবিত্বের মতন অবিনাশী। যে উত্তরবঙ্গের অরণ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ঈশ্বরের ঘর গড়ার সন্ধান পান ডুয়ার্সের জঙ্গলে। জঙ্গলের মধ্যে কবি তাঁর হৃদয়ের সাত মহলের সন্ধান পান। পরাবাস্তব কবিতায় জঙ্গল এসে যায়। 

    “বৃষ্টিতে ডুয়ার্স খুবই পর্যটনময়।
    মেহগনি-বীথি পার হলে পাবে দোতলা বাংলোটি
    কাঁটাতার বেড়া ঘেরা সবুজ চাদরে ঘাস বড়ো উচ্ছৃঙ্খল
    এখন এখানে।
    …………
    জঙ্গলের মধ্যে ঘর ঈশ্বর গড়েন”।

    স্বেচ্ছাচারীর মতন শক্তি চট্টোপাধ্যায় ঘুরেছেন; বন, পাহাড়, নদীর তল্লাস নিয়ে ফিরেছেন। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতন ব্যাপক ভ্রমণ বাঙালির কম কবিই করেছেন, শোনা যায় একসময় শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘টুরিস্ট গাইড’ লিখেছেন। শুধু প্রকৃতির মধ্যে নয় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও মাঝে মাঝে ঢুকে যেতে চেয়েছেন এক ধ্বংসের ভেতর, যে ধ্বংস সভ্যতা বহন করছে। যার বাসিন্দা হয়ে ব্যর্থ, ভাগ্যহত আরেক ক্লাউন –এর সন্ধান পান কবি; 

    “মাঝে মাঝে স্পষ্ট কোন ধ্বংসের ভিতরে আমি ঢুকে যেতে চাই
    যেখানে নিষিদ্ধ যাওয়া, সেখানে সার্কাসে ব্যর্থ, ভাগ্যহত আরেক ক্লাউন
    দর্শক কীভাবে বসে ? খেলা দ্যাখে, বগল বাজায় ? মাঝে মাঝে –
    এতো স্পষ্ট, রোদ্দুরে পুড়ন্ত তামা, ছেঁড়া জামা, কুহকে পথিক
    যেভাবে বিচিত্রগামী, যাই আমি ধ্বংসের ভিতরে ঢুকে, মুখোমুখি
    দাঁড়াই জীবনে, চোখ মারি, আয়নার স্পর্ধাকে কবি কাঁধ ঝোঁকে কুর্নিশ এবং
    নিজের পেন্টুলে মুতি অস্তি নিরস্তিত্ব কম্পমান
    ঘরের বাইরে রোদ মিছিমিছি দ্রুত পায়ে হাঁটে”।
    কবিতার ভুবন, কবিতার শব্দ এবং কবিতার দর্শন কোথাও কোন সেতুবন্ধন নেই, শুধু সম্পর্ক উত্তরসূরি, পূর্বসূরির।
    শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমৃত্যু প্রকৃতির কবি, সময় কিংবা সময় সংক্রান্তির চেতনা তাঁর কবিতায় অনুপস্থিত। শুধু প্রকৃতি তাঁকে আকর্ষণ করেছে এবং কখনও কখনও পরাবাস্তববাদী কবির মতই সেই প্রকৃতিকে তিনি দেখেছেন, ‘জঙ্গলে সবার জন্যে অকৃপণ নিয়ন্ত্রণ আছে’। এমন পঙক্তি তাঁর কবিতাতেই পাওয়া যায়। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় আছে মানসচিত্র।
    শক্তি চট্টোপাধ্যায় সার্থকতা বা ব্যর্থতার কবি নন, তিনি তাঁর নিজস্ব চমৎকার জলজ দর্পণটি আবিষ্কার করে শুধু আত্মমগ্ন হয়ে দেখেছেন নিরন্তর তাঁর মনের ছবিকে, যা তাঁর কবিসত্তার আদিম আলো অন্ধকারে ঢাকা ছিল। সহজাত কবি প্রতিভার মহৎ অধিকারী।
    কেউ কেউ বলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় জীবনানন্দমুখীদের মধ্যে সার্থকতম কবি। রবীন্দ্রসঙ্গীত, রবীন্দ্রনাথ যেমন, জীবনানন্দও তেমনি শক্তির চেতনার মধ্যে নিরুচ্চারে প্রবাহিত। এটাই তো স্বাভাবিক; এই চেতনার ধারা স্বকালের জীবন প্রবাহে অন্য বাঁকে মোড় নেবে; যে এই বাঁকে ঠিক নিজের নৌকো নিয়ে পাড়ি দিতে পারে, সে কবিই কবিতায় নতুন সকাল এনে দিতে পারে। রবীন্দ্রনাথ জীবনানন্দ তো বটেই, আরও অতীতের মননে সমৃদ্ধ না হয়ে বর্তমানের চেতনার মর্মমূলকে কেউ আবিষ্কার করতে পারেন না। যাঁরা হঠাৎ নতুন বাঁক নেওয়ার চমক দিতে চান তাঁরা কৃত্রিমতায়, প্রচ্ছন্নতায়, আত্মম্ভরিতায় কিছু লেখেন, নতুনভাবে সবাক হয়ে যান অবিরলধারায় কিন্তু পাঠক কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। শক্তি ভেঙেছেন, গড়েছেন, শক্তি অকপট অকৃত্রিম থেকেও স্বতন্ত্র থেকে গেছেন।

    “ আমি যাকে ভালোবাসি সে অন্তত আমাকে গোপনে মেরেছে সহস্রবার
    কিন্তু আমি মরিনি একাকী
    দৃশ্যত নিস্তব্ধ হয়ে, তাকেও মুখর করে রাখি
    ক্রন্দনে, মরিনি বলে তাকেও মুখর করে রাখি”।
    (আমি যাকে ভালোবাসি)

    কোথায় কীভাবে এ স্বাতন্ত্র্য প্রকাশ পেয়েছে, কীভাবে ওঁর কবিতা একটা নতুন বাঁক নীল, ওঁর কবিতার প্রসাদগুণ কোথায়, এ সব নিয়ে বিশদ আলোচনা চলবে। চলতেই থাকবে।

    “মানুষের কাছে এক শর্তে আমি বন্দী – আমি বন্দী!”
    (পথ তোমার জন্যে)

    তথ্যসূত্র –
    ১) ‘শক্তি সঙ্গ’- অরণি বসু। (পরবাস – ১৪০৬)
    ২) কবিপত্নি মীনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার – পারমিতা দাস। (১৪০৬ – পরবাস, তৃতীয় বর্ষ, তৃতীয় ও চতুর্থ সংখ্যা)
    ৩) ‘শক্তির কাছাকাছি’ – সংকলন ও সম্পাদনা – সমরজিৎ ও ইনা সেনগুপ্ত।
    ৪) ‘শক্তি চট্টোপাধ্যায়’ – সমীর সেনগুপ্ত (জীবনীকার)।
    ৫) ‘হাংরি জেনারেশন ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়’ – সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, ‘এষণা’, ১৯৬৩।
    ৬) ‘হাংরি কিংবদন্তী’ – মলয় রায়চৌধুরী।
    ৭) স্মৃতিচারণা – অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য।
    ৮) ‘শক্তি চট্টোপাধ্যায়’ – দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, ‘ময়ূখ’, জুলাই ১৯৯৫, (দ্বিতিয় বর্ষ, প্রথম সংখ্যা)
    ৯) “দুই মেরুর দুই কবি – জীবনানন্দ দাশ ও শক্তি ছত্তপাধ্যা” – সুব্রত রাহা, ‘ময়ূখ’, জুলাই ১৯৯৫, (দ্বিতীয় বর্ষ, প্রথম সংখ্যা)

    পেজে লাইক দিন👇



  • সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক) /ভাস্করব্রত পতি
  • মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ৩০

    সনাতন দাস (চিত্রশিল্পী, তমলুক)

    ভাস্করব্রত পতি

    সেটা ১৯৭০ সাল। রাজ্য জুড়ে খাদ্য সঙ্কটে জেরবার রাজ্যবাসী। চারিদিকে হাহাকার। একমুঠো ভাতের জন্য মানুষের সে কি আর্তি। তমলুক শহরের পাশ দিয়েই রূপনারায়ণ। সেই নদীর পাড়ে তখন আদুল গায়ের দুটো বেওয়ারিশ শিশু। খিদেয় পেট জ্বলছে। চোখের জল শুকিয়ে গেছে। মুখময় যন্ত্রনার প্রতিচ্ছবি। আর সেই দুই কচিপানা মুখগুলো দেখে নিজেকে সামলাতে পারেননি সনাতন দাস। সংস্কৃতিবান চিত্রশিল্পী। কোলে করে নিয়ে এলেন বাড়িতে। আদরে যতনে ভরিয়ে দিলেন না খেতে পাওয়া ছেলেদুটোকে। পরে অবশ্য এক রিক্সাওয়ালা তাঁদের দত্তক নিয়ে নেয়। কিন্তু সেদিন তিনি তাঁর শিল্পীসত্বা থেকে ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন মানবতার চূড়ান্ত নিদর্শন রেখে। 

    মানুষের পাশে দাঁড়ান বলেই তাঁর ছবি কথা বলে। মানুষের কথা। জীবনের কথা। বেঁচে থাকার কথা। একটা শহরের জীবনের চলমান রেখাচিত্র মূর্ত হয়ে ওঠে তাঁর তুলির ক্যানভাসে। 

    একসময় ছিলেন তাম্রলিপ্ত পৌরসভার কর্মী। পেটের জন্য চাকুরি তাঁকে করতে হত। আর অন্য সময়ে তিনি জীবনের জন্য ছবি আঁকেন। মানুষের ছবি, মনের ছবি, চেতনার ছবি... তাঁর মূল উপজীব্য বিষয়।

    চিত্রশিল্পী সনাতন দাস তমলুক পৌরসভার ৭ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা এবং অবসরপ্রাপ্ত পৌরকর্মী। ছেলেবেলা থেকেই ছবি আঁকছেন। ১৯৫৭ এর ১৬ ই আগস্ট তাঁর জন্ম। বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা কমিউনিস্ট নেতা ফণীভূষণ দাস তাঁর আঁকার শিক্ষাগুরু। ১৯৭২-৭৩ সাল নাগাদ ফণীবাবুর সংস্পর্শে আসেন। ব্যাস, সেই শুরু। এরপরই অঙ্কনশিল্প হয়ে ওঠে সনাতন দাসের রক্তের লোহিত কণিকা।

    তিনি কোনো স্বীকৃত আর্ট কলেজ থেকে আঁকা শেখেননি। ডিগ্রিও নেই। কেবল বিখ্যাত বিখ্যাত শিল্পীদের সান্নিধ্যে এসে এবং তাঁদের অনুসরণ করেই তাঁর অঙ্কন চলছে। স্বভাবজাত প্রতিভাকে পাথেয় করেই তিনি নিজেকে সাজিয়েছেন রঙ তুলির জগতে। সেই মহিমায় মহিমান্বিত হয়েছে আজ গোটা তমলুক শহর। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তিতে সেই ১৯৯২ সাল থেকে পোষ্টকার্ডে ছবি এঁকে সমাজের বিশিষ্ট মানুষদের কাছে পৌঁছে দেন বিশেষ উপহার। ১৯৯৬ তে দূরদর্শনে তাঁর আঁকা ২৪ টি ছবির প্রদর্শনীও হয়েছিল।

    পরিতোষ সেন, নির্মাল্য নাগ, সুনীল চৌধুরী, লেডি রানু মুখার্জীদের পাশে থেকেছেন বছরের পর বছর। মনোনিবেশ করেছেন অঙ্কনে। সেখান থেকেই তাঁর উত্তরণ। তুলির কারুকার্যে তিনি মূর্ত করে তোলেন মূর্তিকে। আপাতত নিষ্প্রাণ ছবিকে সপ্রাণ করে তোলেন রঙ আর জলের মিশ্রণে। কোনো আর্ট কলেজ থেকে না পড়েও কলকাতায় ছবি প্রদর্শনী করার দক্ষতা তিনি দেখিয়েছেন। এ কৃতিত্ব অর্জনে তমলুকের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি। আজ তাঁরই আগ্রহে এবং ইচ্ছায় গোটা তমলুক শহর জুড়ে অঙ্কন বিদ্যায় জোয়ার এসেছে। প্রচুর ছেলেমেয়ে আজ তমলুকের বুকে আঁকা শিখছে। এই মুহূর্তে তমলুক শহরে দু'হাজারের বেশি ছেলেমেয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আঁকা শিখছে। অনায়াসে এই তমলুক শহরকে ছবি আঁকার শহর বলা যেতে পারে। জনগণ অবশ্য তেমনটাই মনে করে। ছবি আঁকার প্রতি ছেলেমেয়েদের এই আগ্রহের পেছনে অনেকটাই অবদান তাঁর। মেদিনীপুরকে আলোয় আনতে সচেষ্ট তিনি। একান্তে সেই কাজ করে চলেছেন রঙ তুলি হাতে নিয়ে। 

    ১৯৭৮ এ প্রতিষ্ঠা করেন 'দি সোনা আর্ট এন্ড কালচার'। নিজেই এখনও তা পরিচালনা করেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন 'সোনা আর্ট এন্ড কালচার' এবং 'সোনা আর্ট'। আজ তাঁর কাছে অঙ্কন শিখে দেশ বিদেশ থেকে প্রচুর পুরস্কার পাচ্ছে তমলুক এলাকার ছেলেমেয়েরা। জাপান, পোল্যাণ্ড, বাংলাদেশ, চেকোস্লোভাকিয়া, ইউনেস্কো থেকে বিশ্বমানের পুরস্কার পাচ্ছে সনাতন দাসের ছাত্রছাত্রীরা। নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়াম, শেখর ইন্টারন্যাশনাল থেকে মিলছে পুরস্কার। আজ অনেকেই তমলুক থেকে গিয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অঙ্কন শিল্পে যথেষ্ট পরিচিত নাম। এঁদের কেউ কেউ সনাতন দাসের 'দি সোনা আর্ট এণ্ড কালচার' এর ছাত্র।

    এক সময় তমলুকের বুকে ছবি আঁকার চল আজকের মতো জনপ্রিয় বিষয় ছিলনা। তখন যাঁরা ছবি আঁকতেন তাঁরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। অন্যের কথা ভাবার সময় কোথায়? সেই পরিস্থিতি বদলে যায় সনাতন দাসের হাত ধরে। তমলুকের ছেলেমেয়েরা আজ ওয়াটার কালারে বিশারদ হয়ে উঠেছে। যা কিনা সারা ভারতের মধ্যে নামকরা।

    ১৯৯১, ১৯৯৪, ১৯৯৫, ১৯৯৬, ২০০২, ২০০৭, ২০১২ সালে কলকাতায় একক বা গ্রুপ প্রদর্শনী করেছেন ছবির। ১৯৯৫ তে অ্যাকাডেমী অব ফাইন আর্টসে সনাতন দাসের এক চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন লেডি রাণু মুখোপাধ্যায়। বিভিন্ন সময়ে তাঁর চিত্র প্রদর্শনীতে এসেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমীর আইচ, বিমানবিহারী দাস, পরিতোষ সেন প্রমুখ বিশিষ্ট মানুষজন।

    তাঁর আঁকা ছবি সংগ্রহ করেছে মেট্রো রেল, বাটা কোম্পানী, কলকাতা রোটারি ক্লাব, ফোর্ট উইলিয়াম সহ বিভিন্ন এলাকায় সংরক্ষিত। ভারতীয় সেনাবাহিনী তাঁর আঁকা কিছু ছবি সংরক্ষণ করে রেখেছে। মেট্রো রেল দিয়েছে 'সার্টিফিকেট অব মেরিট' সম্মান। ২০০৫ এ পেয়েছেন 'চিত্র বিশারদ' সম্মান। এছাড়া আর তেমন বড় মাপের সম্মান জোটেনি তাঁর কপালে। না, তাতে তাঁর দুঃখ নেই। কষ্ট নেই।

    তিনি চান ছবি আঁকতে। ছবি আঁকাতে। মূক মুখে ভাষা যোগাতে। তাঁর ছবি কথা বলে। শিল্পের কথা বলে। বেঁচে থাকার কথা বলে। অগ্রগতির কথা বলে। তাঁর হাত ধরে একটা শহরে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠছে একটা শিল্প। জন্ম নিচ্ছে বহু প্রতিভার। ছবি আঁকাও যে মানুষকে আপন করতে পারে, তা দেখিয়েছেন মেদিনীপুরের মানুষ রতন সনাতন দাস।

    চিত্র- সনাতন দাস

    পেজে লাইক দিন👇



  • বাঁদনা পরব: গোরু খুঁটান /সূর্যকান্ত মাহাতো
  • জঙ্গলমহলের জীবন ও প্রকৃতি

    পর্ব - ৪৬

    বাঁদনা পরব: গোরু খুঁটান

    সূর্যকান্ত মাহাতো


    "বাঁদনা" পরবে 'গরয়া' পূজা বা 'গোয়াল পূজা' ছাড়াও আরো দুটি অনুষ্ঠান বেশ সাড়ম্বরে পালিত হয়।

    বন্ধুর কথা শুনে বললাম, "কী কী ওই দুই অনুষ্ঠান?"

    বন্ধু বলল, "একটি হল 'গোরু চুমানো' আর অন্যটি হল, 'চোকপুরা' অনুষ্ঠান। আগেই আমরা 'গোরু চুমানো' নিয়ে আলোচনা করেছি। 'গোরু চুমানো'র এই অনুষ্ঠান এখন আর আগের মতো করে হয় না। আগে 'গোরু চুমানো'-কে ঘিরে বেশ হইচই হত। গোটা গ্রামের নারী পুরুষেরা একত্রিত হয়ে এই অনুষ্ঠান পালন করত।"

    আমি বললাম, "একত্রিত মানে! সবাই তো দেখলাম, যার যার বাড়িতে গোরু চুমানোর অনুষ্ঠান পালন করেছে।"

    বন্ধু বলল, "হ্যাঁ। এখন এমনটাই হয়। কিন্তু আগে তার  ব্যাপ্তি ছিল আরো বড়। আগে গ্রামের যিনি 'প্রধান' তার বাড়ি থেকেই প্রথম এই অনুষ্ঠান শুরু হত। তারপর সকলে মিলে একে একে অন্যের বাড়িতে গিয়ে এই অনুষ্ঠান পালন করত। গ্রাম প্রধানের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে গোরু চুমানোর সময় সকলে গান ধরত। সেরকমই একটি গান হল---

    "কনে ত দেয় ত ভালা ঝিলিমিলি শাড়ি গ কনে ত দেয় ত ধেনু গাই
    কনে ত দেয় ত ভালা দুই কানের সনা গ কনে দেয় সিঁতাকে সিন্দুর।"


    বললাম, "বাহ! আগে তো তাহলে বেশ জমকালো ভাবে  এই অনুষ্ঠান পালিত হত। তবে এই গানটার সুর ও কথা তো অনেকটাই বিয়ের গানের মতো।"

    বন্ধু বলল, "ঠিক বলেছিস। আসলে 'গোরু চুমানো' অনুষ্ঠানটা তো অনেকটা 'গো-বিবাহ'-রই অনুষ্ঠান। তাই 'অহীরা'র এই গানগুলোকে এই সময় বিয়ের গানের মতো সুর করেই গাওয়া হয়। অন্য একটা গানে যেভাবে 'বরযাত্রী'র কথাটি এসেছে তাতে আরো বেশি করে প্রমাণিত হয় 'গোরু চুমানো'র গানগুলো এক রকম বিবাহের গানই। সেরকম একটি গান হল---
    "ডিগিমিগি ডিগিমিগি বাজ বাজনা রে বেঁঘা রাজা সাজল বৈরাত রে
    গাঢ়ার ভিতর মশা যে গুঞ্জরে আমি দাদা যাব রে বৈরাত।"

    "এইসব গানে 'বর', 'কনে', 'বরযাত্রী', 'কন্যা দান', 'সিন্দুর দান' প্রভৃতি শব্দগুলো দারুণভাবে উপস্থিত। এতেই তো পরিষ্কার এটা এক রকম বিবাহেরই অনুষ্ঠান।"

    আমি বললাম, "আর একটা অনুষ্ঠান 'চোকপুরা' না কি যেন বললি, সেটা কী?"

    বন্ধু বলল, "হ্যাঁ। 'চোকপুরা' অনুষ্ঠান হল উৎসব পালনের অলংকরণ। এই উৎসব উপলক্ষে পাড়ার মূল রাস্তা থেকে বাড়ির গোয়ালঘর সহ সমস্ত আঙিনা জুড়ে এক ধরনের আলপনা আঁকা হয়। এটাই হল 'চোকপুরা' অনুষ্ঠান। আতপ চালের গুঁড়িকে 'পানিয়া' ( এক ধরণের লতানো উদ্ভিদ, যার রস অত্যন্ত পিচ্ছিল) লতার পিচ্ছিল রসে ভেজানো জলে গুলে চটচটে করে তোলা হয়। সেই গুঁড়িতে হাতের পাঁচ আঙুল ডুবিয়ে খুব দ্রুত হাত নেড়ে নেড়ে নানা রকমের ক্রসমার্কা চৌকো ঘর ও বিভিন্ন লতাপাতার ছবির আলপনা আঁকা হয়। আলপনার প্রতিটি মিলনস্থলে দেওয়া হয় একটি করে সিঁদুরের টিপ। এই আলপনা জুড়ে কিছুটা দূরে দূরে ছড়িয়ে দেয়া হয় ঘাসের আঁটি। সেই আলপনার উপর দিয়েই গোরু বাছুরগুলোকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে ঘাস খাইয়ে খাইয়ে গোয়াল ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। এখনকার বিশিষ্ট ও সম্মাননীয় অতিথিবর্গকে যেমন রেড কার্পেটের উপর দিয়ে হাঁটিয়ে আপ্যায়ন করা হয় ঠিক তেমনি। 'চোকপুরা'য় গোরুগুলোকে আলপনার ওপর এভাবেই হাঁটিয়ে সম্মান জ্ঞাপন করা হয়।"

    বন্ধু বলল, "এই অনুষ্ঠানের সময়ও গান গাওয়া হয়।"

    কন মাল্যানী ভালা গুঁড়ি যে কুটে রে কন মাল্যানে গুঁড়ি ঝাড়ে।
    কন মাল্যানী ভালা চোক যে পুরে রে, দাঁয়ে-বাঁয়ে ফেঁকে তরু ডাল।"

    বললাম, "পরের দিন তো দ্বিতীয়, তথা ভ্রাতৃ দ্বিতীয়ার দিন।"

    বন্ধু বলল, "হ্যাঁ, ওই দিনকে বলা হয় 'বুড়ি বাঁদনা' বা গোরু খুঁটানের দিন। এই দিন দুপুর গড়াতে না গড়াতেই গোরু ও কাড়াগুলো অদ্ভুত সাজে সেজে ওঠে।"

    বললাম, "কী রকম?"

    বন্ধু বলল, "তেল মেখে ওদের শিংগুলো চকচক করতে থাকে। কপালে থাকে পাকা ধানের 'মোড়' বা মুকুট। গলায় ফুলের মালা। সারা গায়ে ছোপ ছোপ রঙিন অলংকারের দাগ। এদিক ওদিক বাজতে থাকে মাদল ও নাগাড়া। কেউ না কেউ উচ্চকণ্ঠে গেয়ে চলে অহীরার গান। বেশ গমগমে একটা ভাব। এই সার্বিক পরিবেশটাই গোরু কাড়াকে বেশ উত্তেজিত করে তুলে। মাঝে মাঝে সেই উত্তেজনা বাড়াতে কখনো পরিয়ে দেওয়া হয় ঘুঙুরের মালা।"

    জিজ্ঞেস করলাম, "গোরু বা কাড়া খুঁটান বলতে ঠিক কি বোঝায়?"

    বন্ধু বলল, "এই উৎসবকে ঘিরে একাধিক মত প্রচলিত হয়ে আসছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই। তাই উৎসবের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে 'গোরু খুঁটান' আসলে কী সেটা আগে জানা দরকার। গোরু ও কাড়াগুলোকে একটা শক্ত খুঁটিতে বাঁধা হয়। গলায় পরানো হয় শক্ত দড়ি। সহজে যেন ছিঁড়ে না যায়। এবার গোরু কাড়াকে খেলানোর দল বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র যেমন ঢাক, ঢোল, মাদল, নাগাড়া, করতাল, ঝুনঝুনি প্রভৃতি গুরু গম্ভীর বাদ্যযন্ত্র নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়। প্রথমে এক বা একাধিক জন 'অহীরা' গান ধরে। গানের একদম শেষ মুহূর্তেই বাদ্যযন্ত্র গুলো একসঙ্গে প্রবলভাবে বেজে ওঠে। কেউ কেউ সেই উল্লাসে চিৎকারও করে উঠে। উদ্দেশ্য একটাই এভাবে গোরু ও কাড়াগুলোকে উত্তেজিত করে তোলা। গোরু খেলানোর দলের কারো হাতে থাকে পশুর চামড়া। সেটাকে বাঁধা গরুটির সামনে নাড়তে থাকে। উত্তেজিত গোরুটিও তখন শিং উঁচিয়ে সেই চামড়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মারমুখো হয়ে গুঁতোতে আসে। উপস্থিত জনগণ গোরুর এই মারমুখী আচরণে প্রচন্ড উল্লাস করতে থাকে। এটাই হলো 'গোরু খুঁটান'।"

    আমি ঐদিন গোরু-খুঁটান বেশ ভালোভাবে প্রত্যক্ষ করলাম। দেখলাম, সব গোরুগুলোই যে সমানভাবে খেলায় মারমুখো হয়ে উঠছে এমনটা নয়। কোন কোন গরু অদ্ভুত রকমের শান্ত। এত বাজ-বাজনাতেও বেশ নির্লিপ্ত। তাদেরকে তখন একটু জোরপূর্বক উত্তেজিত করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছিল। সেই সঙ্গে গোরু কাড়ার আক্রমনে একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ারও প্রবল সম্ভাবনা থাকে এই অনুষ্ঠানে। গোরু খুঁটানের অনুষ্ঠানে কেবল এই দুটো বিষয়ের ওপর আরো একটু বেশি সাবধানতা ও যত্নবান হওয়া উচিত বলে মনে করি। তা বাদে পুরো অনুষ্ঠানটি খুবই উত্তেজক ও উপভোগ্য। দেখতে দেখতে মনে পড়ে যাচ্ছিল তামিলনাড়ুর "জাল্লিকাট্টু"-র কথা। সেখানেও ষাঁড়েদের খেলা জঙ্গলমহলের এই গোরু খুঁটানের মতোই সমান জনপ্রিয়। মনে একটা প্রশ্ন জাগল, জঙ্গলমহলের মাহাতো, কুড়মি সহ যারা গোরু খুঁটায় তাদের সঙ্গে সুদুর তামিলদের এমন অদ্ভুত মিল কীভাবে হল?" বন্ধুকে সে কথা জিজ্ঞাসা করলাম।

    বন্ধু বলল, "জন গ্রিয়ারসন  তো বলেছে, বিশেষ করে জঙ্গলমহলের কুড়মিরা দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর একটি শাখা। (লিঙ্গুইস্টিক সার্ভে অফ ইন্ডিয়া পঞ্চম খন্ড পৃষ্ঠা ১৪৩)। তামিলেরাও দ্রাবিড় জনগোষ্ঠী ভুক্ত। তাই প্রাচীনকাল থেকেই হয়তো ষাঁড়েদের নিয়ে এই ক্রীড়া অনুষ্ঠান দ্রাবিড়দের একটি অন্যতম বিনোদনের অংশ ছিল। যা এখন তামিলনাড়ু ও জঙ্গলমহলে সমান ভাবে জনপ্রিয়।

    "গোরু খুঁটান নিয়ে ডক্টর আশুতোষ ভট্টাচার্য "বাংলার লোকসাহিত্য" গ্রন্থের 'তৃতীয় খন্ডে', লিখেছিলেন, "এই অনুষ্ঠানের একটি প্রধান অঙ্গ গরু মহিষ নাচানো। শক্ত খুঁটিতে একটি বলিষ্ঠ মহিষ কিংবা ষাঁড়কে বাঁধিয়া তাহাকে কাঠি দিয়া খুচাইয়া খুচাইয়া তাহাকে ক্ষিপ্ত করিয়া তোলাই ইহার উদ্দেশ্য। পূর্বে এইভাবে অস্ত্র দ্বারা আঘাত করিতে করিতে ইহাকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করা হইত। বর্তমানে লাঠি দিয়া খুচাইয়া ছাড়িয়া দেওয়া হয়।" (বাংলার লোকসাহিত্য, তৃতীয় খন্ড, গীত ও নৃত্য, পৃষ্ঠা- ২২৪)

    "এই লেখাটির দারুণ সমালোচনা করেছেন পশুপতি প্রসাদ মাহাতো তার "ভারতের আদিবাসী ও দলিত সমাজ" গ্রন্থে। তিনি ডক্টর আশুতোষ ভট্টাচার্য সহ আরো কয়েকজন গবেষক সম্পর্কে বলেছেন যে, "আসলে দীর্ঘদিন কোনো সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ না করে, বৈজ্ঞানিক শিক্ষনের প্রথাগত ও পদ্ধতি না জেনে সংবাদিকসুলভ মনোভাব নিয়ে কোনো কিছু লেখার লোভ এরা সামলাতে পারেন না।" খুঁটান সম্পর্কে আশুতোষ বাবুর লেখাটা তথ্য বিকৃত হতেই পারে। তিনি কলকাতার মানুষ। তাই বলে বঙ্কিমবাবু কীভাবে ভুল করতে পারেন! উনি তো জঙ্গলমহলেরই ভূমিপুত্র। নিজেও কুড়মি জনজাতির মানুষ। তারও কি তবে তথ্যগত ত্রুটি ঘটেছে! একই ভুল দুজন লেখক কীভাবে করতে পারেন? না কি এটাই আসল তথ্য?"

    বললাম, ""ঝাড়গ্রামের লোকসাহিত্য" গ্রন্থের লেখক বঙ্কিম চন্দ্র মাহাতোও একই কথা লিখেছেন না কি!"

    বন্ধু বলল, "হ্যাঁ। "ঝাড়খণ্ডের লোক সাহিত্য" গ্রন্থে বঙ্কিমচন্দ্র মাহাতো কী লিখেছেন, সেটা একবার দেখা যাক।

    "এই অনুষ্ঠানে মাতাল জনতাও যেন অনেকটা হিংস্র হয়ে ওঠে। গরু মোষকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে উত্তেজিত করে হিংস্র করে তোলে। (পৃষ্ঠা ১৩৮)। ওই গ্রন্থেরই ১৩৯ পৃষ্ঠায় আশুতোষবাবুর কথারই প্রতিধ্বনি যেন, "আমাদের বিশ্বাস সুদূর অতীতে ঝাড়খণ্ডেও এই বাঁধনা পরবে ষাঁড় হত্যা করে গোষ্ঠীর প্রত্যেকে তার মাংস ভক্ষণ করত। গরু খুঁটানো অনুষ্ঠানটি অতীতে ষাঁড়কে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করার স্মৃতিই বহন করে চলেছে।" (ঝাড়খণ্ডের লোকসাহিত্য, পৃষ্ঠা ১৩৯)
    বললাম, বঙ্কিম বাবুর সঙ্গে ডঃ আশুতোষ ভট্টাচার্যের লেখার এমন অদ্ভুত মিল কীভাবে হল? তবে কি বঙ্কিমবাবুর কথাই একরকম ঠিক! উনি বলেছেন, গোরুকে খুঁটানো নিছক খেলামাত্র নয়, আবার হিংস্র জীবজন্তুর হাত থেকে তাদের এইভাবে আত্ম রক্ষার কৌশল শেখানো নয়, গোরু খুঁটানো অনুষ্ঠানটি অতীতে ষাঁড়কে  খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করার স্মৃতিই বহন করে চলেছে।(পৃষ্ঠা ১৩৯)  এখন প্রশ্ন হল পশুপতি প্রসাদ মাহাতো মহাশয় তাহলে এই তথ্যের সমালোচনা করলেন কেন?  গো-ভক্তি বা গো-বন্দনা থেকেই বাঁদনা পরব হয়ে আসছে। সেখানে  গো- হত্যার কথা অবশ্যই মেনে নেওয়া যায় না। সুতরাং পশুপতি প্রসাদ মাহাতো মহাশয়ের যুক্তিগত ভাবে ভিন্ন মত থাকতেই পারে। 'গো-বন্দনা' কীভাবে 'গো-হত্যা' ছিল সেটা অবশ্যই সংশয়ের বাইরে নয়। তাই ভিন্ন মত প্রকাশ করা বা সমালোচনা করা কোনোটাই অযৌক্তিক কিছু নয়।"

    বন্ধু বলল, "বাঁদনা" পরবের শেষ দিন তথা তৃতীয়ার দিন হল "দেশ বাঁদনা" বা "কাঁটা কাড়া"র দিন।"

    আমি বললাম, "কাঁটা কাড়া কেন?"

    বন্ধু বলল, "আসলে ঐ দিন বাগালদের বিশ্রাম। বনে জঙ্গলে গোরু চরাতে গিয়ে পায়ে যে কাঁটা খোঁচার আঘাত হয়। ঐদিন পায়ের কাঁটা বের করে তার সেবা শুশ্রুষা করে বলেই এমন নামকরণ। আসলে ঐদিন  তাদের বিশ্রমই হল মূল উদ্দেশ্য।"

    'বাঁদনার' এমন গভীরতা সত্যিই জানা ছিল না। এক শ্রেণীর পশুকে ঘিরে এমন উন্মাদনা সত্যিই দ্বিতীয়টি আর নেই। এখানেই বাঁদনার তাৎপর্য সব থেকে বেশি।

    তথ্যসূত্র: ১)ঝাড়খণ্ডের লোকসাহিত্য/ লেখক- বঙ্কিমচন্দ্র মাহাত
    ২) ভারতের আদিবাসী ও দলিত সমাজ/ লেখক- পশুপতি প্রসাদ মাহাতো
    ৩) বাংলার লোকসাহিত্য, তৃতীয় খণ্ড/ আশুতোষ ভট্টাচার্য
     
    পেজে লাইক দিন👇



  • মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র /প্রসূন কাঞ্জিলাল
  • মহাভারতের স্বল্পখ্যাত চার চরিত্র

    প্রসূন কাঞ্জিলাল

    ১) বর্বরিক  ------

    প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগের কথা। দ্বাপর যুগ শেষ হতে আর দেরি নেই বেশি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আয়োজন চলছে জোরকদমে। সারা দেশের সব রাজারা হয় পাণ্ডব অথবা কৌরবদের পক্ষে নাম লিখিয়ে ফেলেছে। সবাই মহাব্যস্ত, তবে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। ধর্মের জয় সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে সারাক্ষণ আকাশ-পাতাল চিন্তা মাথায় ঘুরছে তাঁর। যুযুধান দুই পক্ষের সব মহারথীদের সাথে আলাদা আলাদা করে কথা বলেছেন তিনি। ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, কর্ণ, অর্জুন – একটাই প্রশ্ন করেছেন সকলকে… একলা লড়াই করে কে কতদিনে এই যুদ্ধ শেষ করতে পারবে বলে মনে হয়? আর কিছু না… আন্দাজ করার চেষ্টা করছেন প্রত্যেকের আত্মবিশ্বাস, এবং বিপক্ষের শক্তি সম্পর্কে ধারণা। কেউ বললেন কুড়ি দিন, কেউ বা পঁচিশ অথবা আঠাশ। খুব একটা ফারাক নেই এই সব মহাযোদ্ধাদের এস্টিমেটে। এখন একজনকেই জিজ্ঞেস করা বাকি রয়ে গেছে শুধু। ঘটোৎকচের ছেলে, দ্বিতীয় পান্ডবের পৌত্র – নাম তার বর্বরিক। এই যুদ্ধে যোগ দেওয়ার কোনোরকম ইচ্ছাই সে প্রকাশ করেনি এখনো পর্যন্ত।

    তবু তার কথা মাথায় আসার কারণ? শুনেছেন যে এই বয়সেই সে মহাবীর … কর্ণার্জুনের থেকে কম নয় কোনো অংশে। তাছাড়া তার কাছে আছে একটি বিশেষ ধনুক, আর মহাশক্তিশালী তিনটি বাণ – স্বয়ং শিবঠাকুরের সুপারিশে অগ্নিদেবের দেওয়া। ‘তিন বাণধারী’ নামেই সুপরিচিত সে। বাচ্চা ছেলেটার ক্ষমতা একটু যাচাই করে নেওয়া দরকার – ভাবলেন শ্রীকৃষ্ণ ।

    বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে দেখা করলেন বর্বরিকের সাথে। একথা সেকথার পর কায়দা করে প্রশ্নটা করলেন তাঁকে।

    ‘এক মুহূর্তেই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ করতে পারি আমি’ – উত্তর শুনে স্তম্ভিত শ্রীকৃষ্ণ। কী করে তা সম্ভব, জানতে চান তিনি। তার সেই বিশেষ ধনুর্বাণ দেখিয়ে বর্বরিক বোঝায় সেগুলোর ক্ষমতার কথা। প্রথম তীরটি নিক্ষেপ করলে তা গিয়ে যাদের নিধন করতে চাই তাদের চিহ্নিত করে ফিরে আসবে। দ্বিতীয়টি এর ঠিক উল্টো – যাদের মারতে চাই না তাদের চিহ্নিত করবে সেটা। আর তৃতীয়টাই আসল কাজ করবে – প্রথমটির দ্বারা মার্কা মারা সবাইকে, অথবা দ্বিতীয়টির দ্বারা মার্কা দেওয়াদের বাদ দিয়ে বাকি সব্বাইকে মেরে আবার তূণীরে ফিরে আসবে। বিশুদ্ধ সেট থিওরির হিসেব! সুতরাং শুধুমাত্র দুবার তীরনিক্ষেপ করলেই শত্রুপক্ষ নিঃশেষ হবে এক নিমেষে! কেবল কথায় ভোলার লোক নন শ্রীকৃষ্ণ। উদ্ভিন্নযৌবন বালকের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়তো পুরোটাই ?

    ২) বিকর্ণ ----

     মহাভারতের একটি ছোট কিন্তু নজরকাড়া চরিত্র ইনি। ব্যাসদেবের আশীর্বাদে ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর যে শতপুত্র জন্মগ্রহণ করে তাদের মধ্যে সবথেকে ধার্মিক ছিলেন বিকর্ণ। দুর্যোধনের ভাই হলেও তিনি তাঁর বাকি ভাইদের মত বদমেজাজি ও অহংকারী ছিলেন না। পান্ডবদের পাশাখেলায় পরাজয়হেতু সভামধ্যে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের একমাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন তিনিই। এর প্রতিবাদে এমনকি তিনি সেই সভাস্থল ত্যাগও করেন।

    পরবর্তীতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও তিনি কৌরব পক্ষের হয়ে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেন। ভীম কৌরবদের একশ ভাইকে বধ করবার পণ নিয়ে যখন কুরুক্ষেত্রকে প্রায় শ্মশানে পরিণত করেছেন তখন বিকর্ণ তার সম্নুখে দাঁড়িয়ে দ্বন্দের আহ্বান জানান, ভীম কিছুকাল ভাবেন , তার সভার কথা মনে হতে তিনি বিকর্ণকে বলেন তুমি একমাত্র কৌরব যে জানে ধর্ম কি? তুমি সরে দাঁড়াও আমি তোমাকে বধ করতে চাই না। তুমি একমাত্র যে সেই সভায় দুর্যোধনের প্রতিবাদ করেছিলে।কিন্তু বিকর্ণ বলেন আজ আমার সরে যাওয়াটাও অধর্ম হবে, আমি জানি কৌরবদের এই যুদ্ধে জয়লাভ কোনোদিনিই হবে না যেহেতু বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ পান্ডব পক্ষে আছে, কিন্তু আমি আমার বাকি ভাই দের এবং জ্যেষ্ঠ ভাই দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করতে পারব না। আমি ধার্মিক কিন্তু বিভীষণ নই। আমাকে যুদ্ধ করতেই হবে। তিনি বীর বিক্রমে বলেছিলেন  " সেই সভাস্হলে আমার যা কর্তব্য ছিল করেছি কিন্তু এখন আমার কর্তব্য আমার ভাইদের রক্ষা করা তাই এসো আমার সাথে দ্বন্দ্ব কর বৃকদর ভীম"। যুদ্ধে ভীমের হাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

    ৩) ইরাবন --------

    আরাবন অথবা ইরাবন। ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র। তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের পুত্র ছিলেন রূপান্তরকামী আরাবন। অর্জুন এবং নাগকন্যা উলুপির সন্তান ছিলেন তিনি। বাবার মতোই তিনি ছিলেন শস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী। পাণ্ডবদের হয় কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধে যোগ দেন আরাবন।

    মহাভারতের ৯-এর শতকের তামিল অনুবাদে পাওয়া যায় কালাপ্পালি নামে এক প্রথার উল্লেখ। এই প্রথা অনুসারে যুদ্ধে যদি কোনও বীরপুরুষ দেবী কালীর সামনে নিজেকে বলি দেন, তো যুদ্ধে সেই পক্ষের জয় অবশ্যম্ভাবী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের জয় সুনিশ্চিত করতে নিজেকে উত্‍সর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন আরাবন। রূপান্তরকামী আরাবন শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে ৩টি বর লাভ করেন। একটি হল যুদ্ধে বীরের মৃত্যু বরণ করা, দ্বিতীয়টি হল ১৮ দিনের যুদ্ধ পুরোটা দেখার সৌভাগ্য লাভ করা এবং তৃতীয়টি হল মৃত্যুর পর তাঁকে যেন দাহ করা হয়।
    আসলে সেই সময়ের রীতি অনুযায়ী অবিবাহিতদের মৃত্যুর পর দাহ না করে কবর দেওয়া হত। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় পর্যন্ত আরাবন ছিলেন অবিবাহিত। যুদ্ধে তিনি নিজেকে দেবী কালীর কাছে উত্‍সর্গ করবেন, এটা জানার পর কোনও নারী তাঁকে বিয়ে করতে চাইছিলেন না। তাই শ্রীকৃষ্ণ নারী শরীর ধারণ করে মোহিনী নাম নিয়ে আরাবনকে বিয়ে করেন এবং মৃত্যুর আগে তাঁরা এক রাত একসঙ্গে কাটান। আরাবনের মৃত্যুর পর নারীরূপী শ্রীকৃষ্ণ বৈধব্য বেশ ধারণ করে শোক পালন করেন। পরের দিন তিনি আবার নিজের আসল চেহারায় ফিরে আসেন।

    তামিলনাড়ুতে আরাবন ও মোহিনীর পুজো হয়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ যতদিন চলেছিল, সেই ১৮ দিন ধরে চলে উত্‍সব। তামিস মাস সিট্টিরাই-তে এই উত্‍সব হয়। স্থানীয় প্রথা অনুযায়ী, রূপান্তরকামীরা এই উত্‍সবের মধ্যে দিয়ে আরাবনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং আরাবনের উত্‍সর্গের পরে রূপন্তরকামীরা বৈধব্যবেশ ধারণ করে শোক পালন করেন।


    ৪) গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণ ----

     বারণাবত নগরে জতুগৃহ দাহ পর্বের পরে, রক্ষা পেয়ে পঞ্চপাণ্ডবরা গঙ্গা নদীর তীরে এসে পৌঁছান  ও সোজা দক্ষিণ দিকে চলতে লাগলেন।শুরু হোলো তাদের অঞ্জাতবাস।এই অঞ্জাতবাসের  কালে হিড়িম্ব বধ,  ভীমের হিড়িম্বাকে বিবাহ, বকরাক্ষস বধ ইত্যাদির পর তারা এক চারণ ব্রাম্ভণের কাছ থেকে শুনলেন পাঞ্চালরাজ ধ্রুপদ এর পুত্রার্থে যজ্ঞ ও সেই যজ্ঞাগ্নি খেকে যাঞ্জসেন ( ধৃষ্টদ্যুম্ন ) ও যাঞ্জসেনীর ( দ্রৌপদী ) আবির্ভাব বৃত্তান্ত । তখন মাতৃ আজ্ঞায় তারা পাঞ্চাল দেশের দিকে রওনা হলেন। এই পথে এক রাতে তাদের সাথে দেখা হয় গন্ধর্বরাজ অঙ্গারপর্ণের যাঁর অপর নাম ছিল চিত্ররথ। সোমাশ্রয়ণ তীর্থে গঙ্গাতীরে অঙ্গারপর্ণ যখন তাঁর ভার্যা কুম্ভীনসী ও অন্যান্য স্ত্রীদের নিয়ে জলক্রীড়া করতে এসেছিলেন, তখন পাণ্ডবদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। পাণ্ডবরা বারণাবতে জতুগৃহদাহের পর নানান জায়গা ঘুরে তখন পাঞ্চাল দেশের দিকে যাচ্ছিলেন। অঙ্গারপর্ণ পাণ্ডবদের স্থানত্যাগ করতে বললে, অর্জুন সন্মত হন না। তখন অর্জুনের সঙ্গে অঙ্গারপর্ণের যুদ্ধ হয়। অর্জুন দ্রোণ প্রদত্ত এক আগ্নেয় অস্ত্র নিক্ষেপ করতে অঙ্গারপর্ণের রথ দগ্ধ হয় এবং অঙ্গারপর্ণ হতচেতন হয়ে পড়ে যান। পরাজিত অঙ্গারপর্ণ পরে চেতনা ফিরে পেয়ে অর্জুনকে তাঁর চাক্ষুষী বিদ্যা (ত্রিলোকের যা কিছু এই বিদ্যাবলে দেখতে পাওয়া যায়) দান করেন। অঙ্গারপর্ণের পরামর্শে পাণ্ডবরা দেবল ঋষির কনিষ্ঠ ভ্রাতা ধৌম্যকে কুল-পুরোহিত হিসেবে নিযুক্ত করেন।

    পেজে লাইক দিন👇



  • খোঁজো তুমি গৌরাঙ্গ সহচরে /গৌতম বাড়ই
  • খোঁজো তুমি গৌরাঙ্গ সহচরে 
    গৌতম বাড়ই 


    দেখেছেন তিনি হাত বাড়িয়ে হাতের উপর 
    জননী আমার পাপড়ি মেলা পদ্মফুলে 
    একপাশেতে মাতা আমার 
    অন্য পাশে জনক-কে



    দু-মুঠো অন্নজল কিছু অবজ্ঞার খোসা তরকারি 
    বোঝে কী মানুষগুলো ছিল বড্ড দরকারি
    যে যখন বুকে লেগে থাকে আজও
    কৃষ্ণচূড়া হয়ে ওঠে অজানা ফুলটিও
    মুখ তুলে চাওয়া শুধু গভীর বাঁচবার
    জানি এ বেঁচে থেকে মরে যেতে চায় অনেকে
    তবে বাঁচা আর মৃত্যুর মাঝেও 
    আছে এক ঘনঘোর অন্য জীবন 
    যেখানে লেগে থাকে জন্মের স্বাদ 
    তন্ময় হয়ে খোঁজ করে মাতৃজঠর 
    'কেউ কিছু নিয়ে আসেনা আর কেউ কিছু 
    নিয়েও যায়না'
    এরকম একটি বোকাকথা ছড়িয়ে দেওয়া হয় 
    নরম বা জনাকীর্ণ বাজারে
    আর বাজারে  মাথা তুলে হরদম 
    দাঁড়িয়ে আছে তোমার-আমার বৃদ্ধাশ্রম 
    যে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ধর্মগ্রন্থ শোনেনা পড়েনা 
    চুপ করে শুধু চুপ করে 
    আকাশ দেখে যায় সারাবেলা
    তারাদের সাথে কথা বলে সারা রাত্তির  
    তাদের কী অ-ধার্মিক বলা হবে ? 
    অ-ধার্মিক বা কী করে বলি -
    সারাটা জীবন ধরে সংসারধর্ম  পালন করেছেন
    তাই একটা ধর্মযুদ্ধ চলে অনন্ত সারাজীবন 
    জীবন আর জীবের মাঝেও আরও এক ব্রহ্মধারা 
    আদি স্রোত কোল বেয়ে কুলুকুলু 
    সমস্ত উৎসরস আজও বড় নির্বোধ নিরাকার 
    শুধু মানুষের তিরস্কৃত ভণ্ডামী দিয়েছে আকার 
    মহাকার এই মহাশূন্যের -----


    আদিতে সংঘাত 
    উথাল- পাথাল করে দেয় এক অতল গহবর 
    মহাশূন্যের  সব অন্ধকার শুষে নিয়ে 
    চারিদিকে বিস্ফারিত হয়েছে আলোর সুষমা আর তেজ 
    সেই আদি আলোর স্রোত আমাদের আদিম জঠর 
    কল্পনা করে এঁকেছিল 'মা' 
    কল্পনার বাইরে যে নিত্যপুরুষ 
    তিনি আমাদের পিতা ---- প্রপিতামহ 
    আর এর মাঝখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আমরা 
    অযুত-বিযুত বংশধরেরা 


    দূরস্থানে  আছে আমাদের পূর্বপুরুষ আর 
    আমাদের জগণ্মাতার অপরিশোধ্য ঋণ 
    সাহস ছাড়ালে খোসা আর খোসা ছড়িয়ে পরে
    এক অবিভক্ত পেঁয়াজের
    পাঁচশো বছর আগেকার এক ছবি অবিকল ভেসে যাচ্ছে
    এক দুই তিন চার হাজার হাজারে 
    ছুটছে নীলাচল গৌরাঙ্গমাধবের সাথে 
    আমাদের বৃদ্ধাশ্রম আর তাদের পিতা-মাতারা 
    কেন তবে উড়ে চলে মাধবের পথে 
    কোনও কিছু জবর টেনেছে কি তাদের? 

    তিতিক্ষু তিতিক্ষু

    ঐ যে ছুটে চলে গৌড়ের প্রবীণ সজ্জনেরা 
    শতাব্দী প্রাচীন এক মায়াবী কেদারায় 
    দোদুল ঝুলনায়
    আকাশ আর চাঁদের এক অদ্ভুত সন্ধি ফুটে ওঠে 
    ক্রমে অন্ধকার হলে 
    খাদের কিনারায় 
    আহা কতদিন হল যে পার 
    ধর্মগ্রন্থ ছুঁয়ে মানুষ দেখিনা আর বিভেদের জ্বালায় 
    বহ্নিচিতা উঠে আসে বুকের কিনারায় 


    এখন বোঝে মানুষটা ছিল খুব দরকারি
    হন্যে হয়ে খুঁজুক সারা নীলাম্বর 
    বকের মতন শিথিল হতেই হবে বেলা বাড়লে আরও
    দুটি মুখ তাকিয়ে আছে পরস্পর-ও 
    একটু আগে না হয় বাড়ো
    আগে বাড়তে বাড়তে কোথায় চলেছে প্রভু দীননাথ
    এতটা বাড়লে নাকি 
    পিছিয়েই আসা হয় সময়ের  চাকায় 
    আমাদের মৃত্যুর আগে অনেক মৃত্যু ঘটেছিল 
    এ পৃথিবীর নানা ঘটনায় রোগে ভোগে অকালে
    তবুও অনেক মৃত্যু দেখি আজকের কালেও 
    আগামীতেও মৃত্যুর সাথে অনেক মৃত্যু 
    গায়ে মেখে নেব 
    সে সব কী চাপা পড়ে যাবে আহ্নিক গতির যাঁতাকলে
    অস্তিত্ব বিন্দুবৎ !
    এই প্রকাণ্ড ব্রহ্ম চেতনের আলোক তলে 
    রাতের সুদূর নীহারিকায় সফেদ দুগ্ধ রাজপথে 
    এ কোন চেতনায় বিস্মিত হই 
    যার অতল গভীর অন্ধকারেও চেতনার দরজাগুলি
    বারবার নড়ে ওঠে 
    ভেতরের ভেতরে বারবার কম্পন 
    তুফানের গায়ে মেঘ করে আসে ধুয়ো ওড়ে
    কৃশ- কৃশ ঘোড়াগুলি ছুটে চলে কালাপানি সাগরের নীলে 
    আমাদের বৃদ্ধাশ্রম অন্তর স্ফূরণের শেষ অধিস্থান


    আমাদের থেকে 
    এখন একক সত্তা অনুভব করি কালোত্তীর্ণ ভৈরবী!
    এক এবং একক মিশে যেতে পারি পাতাদের ক্লোরোফিলে
    অণু থেকে পরমাণুতে 
    জাগতিক এক অসম্ভব শক্তিশালী হয়ে ওঠা যায়
    বৃহতের জগত থেকে অণুতে অণুতে 

    উপলব্ধি

    আমি আজ পর্যন্ত কোথাও যায়নি
    আমার এই গভীর জলপ্রদেশ ছেড়ে 
    নীল থেকে নীলে মিশেছে আমার অপার বিস্ময়
    শুধু দৃশ্যের জন্ম দিয়ে যায় 
    কবেকার বণিকের মাস্তুলভাঙা জাহাজ 
    পড়ে আছে নীল উপহ্রদে 
    এই এখন আহারিকা বাসস্থানের পাশে 
    পৃথিবীর কারও কোন বাড়ি নেই ঘর নেই 
    প্রদেশ দেশ রাজ্য গ্রাম নগর 
    সবই তো দৃশ্যান্তর মাত্র! 
    দূর দ্বীপ প্রদেশে কারা যেন ঘরবাড়ি তোলে 
    বসত করে প্রবাল প্রাচীরে ঘিরে 
    সে'ও তো মুহূর্তের অবস্থান 
    বৃদ্ধাশ্রমের সাথে বড় মায়াবী প্রতীক একটি বৃক্ষের 
    কখনও নেমে তার বয়স্ক শেকড়ে হাত দিয়ে ফেলি 
    শিহরণ খেলে যায় শরীর অভ্যন্তরে 
    আশ্রিত পাখিগুলি ডানা  ঝটপট করে 
    উড়ে চলে সুদূরে আকাশের নীল প্রদেশে 
    মুখোমুখি বসবার চেয়ার শূন্য হয়ে যায় 
    ভেসে যায় সাগরের নোনাজলে 


    খোঁজো তুমি গৌরাঙ্গমাধবে
    যে গভীর দর্শনে তোমায় একদিন চলে যেতে হবে নীলাচলে 
    দৃশ্য আলোড়ন তোলে 
    আলোড়ন বুকের মাঝে বারবার 
    নিজস্ব কিছু তার 
    অন্তরের ঝকমকি 
    শ্বাস-প্রশ্বাসে দেয় উঁকি
    মন বৈচিত্র্যে শূন্যে মেলায় এই নরদেহ 
    ছুটে চলো ছুটে  চলো নিঃসন্দেহ
    সব কিছু কিছু নয় অতি সামান্য এই দেহ-পদার্থ 
    উচ্ছন্ন জীবন থেকে শূন্যতা ভালো 
    বটবৃক্ষ শেকড় গেড়েছে ছড়িয়েছে নিজের অবস্থানে 
    বড় মমতায় হাত বোলাই তার গায়ে 
    অবস্থানে ব্রহ্মলোক দেখো হে স্থিতধী
    আমি খুঁজে পেয়েছি আমার অমৃতলোক 
    আমার গৌরাঙ্গমাধব 
    জলথেকে উঠে আসা এই অনন্ত জীবন 
    জলপ্রদেশের অসীম বিস্তারিত গভীরতার  
    ছায়াপথের সলিলে হারাবে 
    শূন্যে মিলাবে 
    দৃশ্যে মিলাবে সমস্ত চরাচর 

    আমি বাড়িয়ে রেখেছি আমার দুই হাত 
    হাতে নেই আমার কোনও ধর্মগ্রন্থ
    চোখ রেখেছি আকাশে-আকাশে সমতলে-সমতলে 
    অসীম  উচ্চতায় 

    ------ শেষ--------
     
    পেজে লাইক দিন👇



  • দূর দেশের লোকগল্প— প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ (অস্ট্রেলিয়া)ক্যাঙারুর বাচ্চারা হারিয়ে যায় না /চিন্ময় দাশ

  • দূর দেশের লোকগল্প— প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ (অস্ট্রেলিয়া)

    ক্যাঙারুর বাচ্চারা হারিয়ে যায় না

    চিন্ময় দাশ


    [ ক্যাঙারু— প্রকৃতির বিস্ময়কর সৃষ্টি এক জীব। পেছনের ইয়াব্বড় দুটো পায়ের চেয়ে, সামনের পা দুটো এই একটুকুন মাত্র তার। সেই বেঢপ দু’জোড়া পা নিয়ে, লাফিয়ে লাফিয়ে তার চলা। 

    তো, এই চলাফেরার সময় ছোট বাচ্চাকে কোথায় রেখে যাবে বেচারা? দেখা যায়, তার নিজের পেটের সাথেই আছে একটা থলে। থলেটার মুখখানা বেশ বড়সড়, আর খোলা। সেই থলের মধ্যে বাচ্চাকে ভরে নিয়ে চলাফেরা করে ক্যাঙারু। অন্য সব জীবেরা তখন হাঁ করে চেয়ে চেয়ে দ্যাখে ক্যাঙারুকে। 

    এমন অদ্ভূত একটা কাণ্ড হোল কী করে? কে দিল ক্যাঙারুকে এই দরকারী জিনিষটা? যদি বা দিল, আর কাউকে না দিয়ে, বেছে বেছে কেবল ক্যাঙারুকেই দিতে গেল কেন?

    এমন হাজারো প্রশ্ন আর কৌতুহল আছে মানুষজনের মনে। 

    প্রশান্ত মহাসাগর এলাকাতেই দেখা যায় এই জীবটিকে। সেই এলাকার দেশে দেশে নানান কাহিনী প্রচলিত আছে ক্যাঙারুর থলে পাওয়া নিয়ে। হাজার হাজার বছর ধরে, মানুষের মুখে মুখে চলে আসছে গল্পগুলো।

    আমরা এই গল্পটি নিয়েছি অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশ থেকে।

    গোড়ার কথা অনেক হোল। এবার গল্পটা শোনা যাক বরং। ]


    সে কোন এক সুদূর অতীত কালের কথা। একটা ক্যাঙারু তার বচ্চাকে নিয়ে বসে আছে নদীর পাড়ে। ছোট্ট নদী। কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে। মা-ছেলে দুজনেরই ভারি ভালো লাগছে জলের গান শুনতে। 

    প্রায় দিনই এখানে আসে তারা মায়ে-পোয়ে। আজও এসেছে। মা বসে বসে লোম আঁচড়ে দিচ্ছে বাচ্চাটার। আদর খেতে খেতে, ঢুলুনি এসেছে বাচ্চাটার।

    হঠাতই একটা খরগোশ এসে হাজির। যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হোল তার! না কি, আকাশ থেকে এসে পড়ল ঝুপ করে! ধীরে সুস্থে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। 

    ক্যাঙারু ফিসফিস করে তার বাচ্চাটাকে বলল—দ্যাখরে, বাছা। কী বুড়োসুড়ো একটা খরগোশ। অনেক নাতিপুতিও হয়ে গেছে নিশ্চয়ই ওর।

    খরগোশটা আরও কাছাকাছি হতে, তার গলা শুনতে পেল ক্যাঙারু—অকম্মা আর আপদ, আপদ আর অকম্মা। 

    বলছেটা কী ও? মানেই বা কী এসব কথার? ক্যাঙারু বলল—কী হয়েছে গো তোমার? কী বলছো অমন করে? 

    খরগোশ একটু চমকে গিয়ে বলল—কে? কে কথা বললে?

    --আমি গো, একটা ক্যাঙারু আর আমার বাচ্চা। 

    খরগোশ বলল—আসলে আমি তো অন্ধ হয়ে গেছি। কিছু দেখতে পাই না চোখে। আর তাতেই সকলের চক্ষুশূল আমি। কেউ কাছে রাখতেও চায় না। কেউই । তাড়িয়ে দিয়েছে দূর দূর করে। খাওয়া জোটে না। মাথাটুকু গুঁজবার ঠাঁইও নাই একটুকু। 

    ক্যাঙারু চিরকাল ভারি দয়ালু। অন্যের কষ্ট দেখলে, মন কেঁদে ওঠে তার। সে বলল—নাগো, না। এভাবে বোল না। দুনিয়ার সবাই খারাপ নয়। এসো, আমি তোমার বন্ধু হবো। কোথায় নরম সবুজ ঘাস পাওয়া যায়, দেখিয়ে দেব তোমাকে। মিষ্টি জলের নদীর কাছে নিয়ে যাব। চিন্তা কোর না। চলো, নিয়ে যাচ্ছি তোমাকে।

    বাচ্চাটাকে নিয়ে উঠে পড়ল ক্যাঙারু। খরগোশকে বলল—নাওগো, আমার লেজটা ধরে থাকো। পেছন পেছন চলতে থাকো। তাহলে আর পথ হারাবে না।

    এমন মিষ্টি কথা কতদিন শোনেনি খরগোশ। ভারি ভালো লাগল তার। তার খুশি দেখে, ক্যাঙারুও খুশি। 

    সামনে চলেছে ক্যাঙারু। তার ঠিক পিছনটাতে বুড়ো খরগোশ। বাচ্চাটা চলেছে সবার পিছনে। খানিক দূর গিয়েছে, পিছন ফিরে ক্যাঙারু দ্যাখে, বাচ্চাটা নাই তো! কোথায় উধাও হয়ে গেল? ঠিক কোথায় সরে পড়েছে দুষ্টুটা। খরগোশকে দাঁড় করিয়ে, পিছনে দৌড় লাগালো ক্যাঙারু।

    এক বার নয়। দু’বার নয়। হতেই থাকল এমনটা। কিছু দূর যায়, আর বাচ্চাটা সরে পড়ে পিছিন থেকে। খুব ভয় করতে লাগল ক্যাঙারুর।

    একবার বাচ্চাকে খুঁজতে গিয়েছে। দ্যাখে, একটা রাবার গাছের নীচে শুয়ে আছে সে। দিব্বি ঘুমিয়ে পড়েছে। মায়ের মন। বুঝতে বাকি রইল না, অতটা পথ চলে, কাহিল হয়ে গেছে বেচারা। ঠিক আছে, থাক, ঘুমোক। 

    খরগোশের কাছে ফিরে চলল ক্যাঙারু। কাছাকাছি না হতেই, ঝোপের আড়ালে একটা ছায়া-শরীর দেখতে পেয়ে গেল। আদিবাসী শিকারী একজন। হাতে বুমেরাঙ। খরগোশটার দিকে তাক করছে। বুকটা ছাঁত করে উঠল তার। এখুনিই চালিয়ে দেবে অস্ত্রটা। বাতাসে শিস কেটে উড়ে আসবে ধারালো জিনিষটা। চোখের পলকটিও পড়বে না। কাটা পড়বে বেচারা! 

    ভয়ে বুক ঢিপঢিপ। দম আটকে আসছে বুকের ভিতর। ভাবল, আর দেরী নয়। শিকারীর চোখে পড়ে গেল, আর রেহাই নাই। প্রাণ বাঁচাতে হলে, পালাই এখান থেকে। অমনি মনে হোল-- না, না। তা হয় না। হোক না বুড়ো, এই অন্ধ খরগোশটা তো তার বাচ্চাটার মতই। তাকে ফেলে নিজে পালিয়ে যাওয়া? মোটেই ঠিক কাজ নয়। ওকেও বাঁচাতে হবে। 

    সামনেই একটা ঝোপ। তার ডাল ঝাঁকাতে লাগল ক্যাঙারু। মাটি আঁচড়াতে লাগল পা দিয়ে। ঝড়-ঝড়, খর-খর আওয়াজ শুনে, চোখ ঘুরিয়ে শব্দটার দিকে তাকালো শিকারী। অমনি ক্যাঙারু চেঁচিয়ে উঠল—পালাও। সামনে শিকারী। 

    চমকে গিয়ে ছিটকে উঠল খরগোশ। চোখে কিছুই দেখা যায় না তার। যেদিকে পারল, দৌড় লাগিয়ে দিল সে। 

    শিকারীর আর মন নাই সে দিকে। আস্ত একটা ক্যাঙারু সামনে পেয়ে গেলে, হাড় জিরজিরে একটা খরগোশের দিকে কে আর চেয়ে দেখে। ক্যাঙারুটাই এখন তার শিকার।

    খরগোশের দৌড় শুরু হতেই, লাফ দিতে শুরু করল ক্যাঙারু। সে কী লাফ! প্রাণ বাঁচাতে হবে। সরে পড়তে হবে শিকারীর দৃষ্টি থেকে। ঝোপঝাড়ের আড়াল রেখে রেখে ছুটে পালাচ্ছে ক্যাঙারু। রাবার গাছটার উদ্দেশ্যে চলেছে সে। বাচ্চাটা ঘুমোচ্ছে যে সেখানে। 

    কিন্তু বাচ্চার কাছে পৌঁছানো হোল না তার। ভয়ানক হাঁপিয়ে উঠেছে। বুক ধড়ফড়, ফেটে যাবে মনে হচ্ছে ছাতিটা। পা চলছে না আর। একেবারে কাহিল অবস্থা। 

    কপাল ভালো বেচারার। পাথরের গায়ে একটা খোঁদল দেখতে পেয়ে গেল সামনে। ধড়ে প্রাণ পেল যেন। টুক করে গর্তটার ভিতর সেঁধিয়ে গেল ক্যাঙারু। 

    শিকারী কিন্তু ঠিক তার পিছন পিছন চলে এসেছে। হতচ্ছাড়াটা যে গর্তে এসে ঢুকে পড়ল, তার চোখ এড়ায়নি। গর্তটার মুখে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল শিকারী। 

    কিন্তু ঐ পর্যন্তই। দাঁড়িয়ে থাকাই সার। কিছুই করবার নাই। ভিতর থেকে চোখ পিটপিট করে দেখছে ক্যাঙারু। তারও বুক ঢিপঢিপ করছে ভিতরে বসে। এবার কী হবে , কে জানে! এখানেই বসে থাকতে হবে তাকে। সরে পড়বার কোন উপায় নাই আর। 

    সময় যেন কাটতেই চায় না। কতক্ষণ পরে দেখল, হতাশ হয়ে ফিরে চলে যাচ্ছে শিকারী। যখন বেশ নিরাপদ দূরত্বে চলে গিয়েছে, বাইরে বেরিয়ে এল ক্যাঙারু। এবার কী করবে? বাচ্চাটা ঘুমিয়ে রয়েছে গাছের তলায়। তাকে নিতে হবে। এদিকে অন্ধ খরগোশটা যে কোন দিকে গেল! তাকেও তো খুঁজে বের করতে হবে। 

    ক্যাঙারু প্রথমে এল গাছটার কাছে। বাচ্চাটা আর ঘুমিয়ে নাই। একা একা খেলা করছে গাছের নীচে। বাচ্চাটার কোন বিপদ হয়নি দেখে, ভারি নিশ্চিন্ত!

    এবার দু’জন মিলে বেরুলো খরগোশের খোঁজে। অন্ধ জীবটাকে ফেলে তো আর চলে যাওয়া যায় না। কোথায় কী বিপদে পড়ে, তার ঠিক নাই। 

    ঘরের মুখো না হয়ে, ক্যাঙারু চলল খরগোশ খুঁজতে। 

    কিন্তু এ দিক গেল। ও দিক গেল। নদীর ধারে নাই। বনের দিকে নাই। ঘাসের মাঠ, সেদিকেও নাই তো! 

    কোথায় পাবে তাকে ক্যাঙারু? সে কি আর আছে এই দুনিয়ায়? তাকে পাওয়ার কথাই নয়। 

    হয়েছে কী, ক্যাঙারু জানে না, আদৌ ওটা খরগোশই নয়। আসলে,সে হোল ছদ্মবেশী বিধাতা পুরুষ। খরগোশের ছদ্মবেশে পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছিল, যাতে কেউ চিনে ফেলতে না পারে।

    আকাশের ঘরে বাস বিধাতার। সেখান থেকেই চেয়ে চেয়ে দেখেন নীচের পৃথিবীকে। একদিন বিধাতার মনে হোল-- একবার নীচে যাই। দেখে আসি, কোন জীবের মনে দয়া বেশি। কে বেশি দয়ালু? 

    এখন এইমাত্র ওপরে ফিরে গেছেন বিধাতা। বসে বসে দেখছেন, প্রথমে ছুটে ছুটে ফেলে আসা বাচ্চাটার খোঁজে গেল ক্যাঙারু। তারপর বাচ্চাটাকে পেয়ে, ঘরে পালিয়ে গেল না সে। খরগোশের খোঁজে বেরিয়েছে এখন। নদী, বন, মাঠ-- চারদিক ঢুঁড়ে ফেলছে। নেহাতই অপরিচিত একটা বুড়োকে খুঁজতে খুঁজতে, একেবারে হয়রাণ বেচারা! দেখে, একটু মৃদু হাসি ফুটে উঠল বিধাতার মুখে।

    তাঁর মনে হোল, এ সব দেখে তো কিছু না করাটা ঠিক নয়। ভালো কাজ করলে, তার প্রতিদান পাওনা হয়। পুরষ্কার দিতে হবে ক্যাঙারুকে। 

    চারজন অনুচরকে ডেকে বললেন—নীচে যাও তোমরা। পুরাতন ইউক্যালপটাস গাছ খুঁজে বের করবে। সূতো পাবে তার ছাল থেকে। সেই সূতো দিয়ে, হালকা অথচ মজবুত করে, থলে বুনবে একটা। থলেটা ক্যাঙারুকে দিয়ে বলবে, সেটা যেন বুকে ঝুলিয়ে রাখে সে। তাহলে আর বাচ্চাটাকে হারিয়ে ফেলতে হবে না।

    যেমন কথা, তেমন কাজ।  

    এমন একটা থলে পেয়ে ক্যাঙারু তো যারপরনাই খুশি। থলেটা ছাতিতে বেঁধে, তার ভিতর বাচ্চাটাকে ভরে যাতায়াত করতে ভারি সুবিধাই হয়েছে তার। বাচ্চাটা তো থলের ভেতর ঘুমিয়েও পড়ে যখন তখন। ক্যাঙারুর বাচ্চা কোন দিন হারায় না।  

    কিছুদিন না যেতে, শরীরের সাথে জুড়েই গেল থলেটা। যেদিন আর খোলাই গেল না থলেটা, সেদিন ক্যাঙারুর সে কী আনন্দ। মহানন্দে লাফালাফি জুড়ে দিয়েছিল সে। 

    সেই তখন থেকেই ব্যবস্থাটা চলে আসছে। একজন ক্যাঙারু দয়া দেখিয়েছিল। সব ক্যাঙারুই ভোগ করে চলেছে তার প্রতিদান। তখন থেকে, একটা করে থলে জুড়ে থাকে সব ক্যাঙারুর পেটেই।

    ক্যাঙারুর পেটের এই থলে আর কিছুই নয়। বিধাতা পুরুষের দান। অন্য পীড়িতকে দয়া দেখাবার জন্য পুরস্কার।

    পেজে লাইক দিন👇



  • শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা--৫২/প্রীতম সেনগুপ্ত
  • পর্ব ৫২

    শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা

    প্রীতম সেনগুপ্ত

     শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে হরিপ্রসন্ন দ্বিতীয়বার দর্শন করেছিলেন বেলঘড়িয়ায় দেওয়ান গোবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের গৃহে, সমাধিস্থ অবস্থায়। পরবর্তী সময়ে এই দর্শনের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা এইরকম -- “এক যুবক ( নরেন্দ্রনাথ ) ভক্তিগীতি পরিবেশন করছিলেন --‘জয়, জয় দয়াময়, জয় দয়াময়।’ সকলের মধ্যস্থলে সমাধিস্থ অবস্থায় দাঁড়িয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ, অপর এক যুবা ( বাবুরাম ) তাঁকে ধরে দাঁড়িয়েছিলেন যাতে তিনি না পড়ে যান। পরিপার্শ্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ বিস্মৃত ঠাকুরের পরনে ছিল সাদা পোশাক। সমগ্র মুখমণ্ডলে বিরাজ করছিল স্বর্গীয় স্মিত হাস্য। দেখা যাচ্ছিল তাঁর দন্তরাজি, আনন্দে সমগ্র মুখমণ্ডল যেন ফেটে পড়ছে, মনে হচ্ছিল ফাটা তরমুজ ফল। তাঁর নয়নদ্বয় দেখে মনে হচ্ছিল কোন এক আনন্দসাগরে মগ্ন! অপর একটি ঘটনা আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থেকেছে চিরকালের জন্য। সেটি হল -- ঠাকুরের মেরুদণ্ড একেবারে নিম্নাংশ থেকে মস্তিষ্ক পর্যন্ত স্থূল দড়ির আকার নিয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে এক মহাশক্তির ঊর্ধ্বগমন লক্ষ্য করেছিলাম, দেখে মনে হচ্ছিল ফণা বিস্তৃত করে এক সর্প যেন মহানন্দে নৃত্য করতে করতে ঊর্ধ্বগামী।”
     ১৮৮৩ সালে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হলেন হরিপ্রসন্ন। এখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন শরৎ চক্রবর্তী ( পরবর্তীকালে স্বামী সারদানন্দ ) এবং রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ( পরবর্তীকালে প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক ) প্রমুখ। ১৮৮৩ সালের ২৬ নভেম্বর তিনি এবং শরৎ অপর এক সহপাঠী বরদা পালের সঙ্গে নৌকাযোগে দক্ষিণেশ্বরের দিকে রওনা দেন শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দর্শনের আশায়। বিকেলের দিকে সেখানে পৌঁছে তাঁরা দেখেন ঠাকুর তখন কলকাতায় মণি মল্লিকের গৃহে গমনের জন্য প্রস্তুত, রওনা হওয়ার অপেক্ষায়। ঠাকুর তাঁদের মণি মল্লিকের গৃহে আসবার আমন্ত্রণ জানালেন। তিন সহপাঠী পুনরায় নৌকাযোগে কলকাতায় ফিরলেন। হরিপ্রসন্ন মণি মল্লিকের গৃহে এসে উৎসবে যোগদান করেন। এরপর একটু রাতের দিকে নিজগৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। সেই বিষয়ে তাঁর দেওয়া বর্ণনাটি এইরকম --“আমার মা আমায় বকাবকি ‌শুরু করে দিলেন। বললেন -- ‘হায় ভগবান! তুই ওই পাগল বামুনটার কাছে গিয়েছিলি? লোকটা সাড়ে তিনশো ছেলের মাথা বিগড়ে দিয়েছে!’ সত্যিই মাথা বিগড়োনোই বটে! এমনকী এখনও আমার মাথা গরম হয়ে আছে। মায়ের বকাবকি আমলই দিলাম না।”
     কলেজের দিনগুলিতে দক্ষিণেশ্বরে মন্দির উদ্যানে বেশ কয়েকবার শ্রীরামকৃষ্ণ সন্নিধানে আসেন হরিপ্রসন্ন। এই বিষয়ে কতিপয় ভক্তের কাছে অপূর্ব স্মৃতিচারণ করেছেন পরবর্তীকালে। ১৮৮৪ সালের ১৮ অগাস্ট শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিনে হরিপ্রসন্ন ঠাকুরকে দর্শন করতে দক্ষিণেশ্বরে যান। সেদিন সেখানে রাত্রিবাস করবেন বলে স্থির করেন। সেইদিনের অভিজ্ঞতা বিষয়ে বলছেন --“মাঝে মাঝে ঠাকুর আমায় মা ভবতারিণীর লুচি-মিষ্টান্নাদি প্রসাদ খেতে দিতেন। আমার জন্য বিছানা করে মশারি টাঙিয়ে দিলেন। শোয়ামাত্রই ঘুমিয়ে পড়লাম। মধ্যরাত্রিতে ঘুম ভেঙে গেল, দেখলাম ঠাকুর আমার বিছানার চারপাশে ‘মা’, ‘মা’ বলে ঘুরছেন। আমি বুঝে উঠতে পারলাম না ঠিক কী হচ্ছে। সেই রাত্রে শ্রীরামকৃষ্ণ আমায় কৃপা করেছিলেন।”
     ঠাকুরের সন্তানেরা তাঁদের গুরুর প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ বোধ করতেন। ঠাকুরের অনুপম জীবন দেখে ও তাঁর কথামৃত শ্রবণ করে যে শিক্ষালাভ করতেন তাঁরা, তা পুস্তক থেকে আহৃত জ্ঞানের তুলনায় নিশ্চিতভাবেই অধিক ছিল। ঠাকুরের সঙ্গে আরেক নিশিযাপনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন হরিপ্রসন্ন এইরকম --“ এক সন্ধ্যায় ঠাকুরের কাছে দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে সেদিন সেখানে রাত্রিবাসের ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। ঠাকুরও খুশি হয়ে সম্মতি দিলেন। দক্ষিণেশ্বরে তেমন যথোপযুক্ত খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত ছিল না। প্রতি রাতে তাঁকে জগজ্জননীর প্রসাদ পাঠিয়ে দেওয়া হত। সেসবের অতি সামান্যই তিনি গ্রহণ করতেন। বাকিটা তাঁর সঙ্গে যাঁরা রাত্রিবাস করতেন তাঁদের দিতেন। ঠাকুরের রাতের খাওয়া ছিল অতি অল্প -- পাখির আহারের মতো। কয়েকটি লুচি, সামান্য মিষ্টান্নাদি ইত্যাদি। অতি সামান্য পরিমাণ প্রসাদ দেখে আমি বেশ হতাশই হলাম। বুঝলাম রাত্রে উপবাসই করতে হবে। সেইসময় আমি সুগঠিত দেহের যুবা, প্রচুর খেতাম। ওই সামান্য পরিমাণ প্রসাদ আমার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। আমার মনের অবস্থা বুঝে ঠাকুর কাউকে নহবত থেকে কিছু রুটি ও তরকারি নিয়ে আসতে বললেন। সেই খাবারও আমার কাছে যথেষ্ট ছিল না, তবু খেয়ে নিলাম। তারপর ঠাকুরের ঘরের মেঝেতে শুয়ে পড়লাম।
     মধ্যরাত্রে হঠাৎই আমার ঘুম ভেঙে গেল, দেখলাম ঠাকুর ঘরের মধ্যে দ্রুত পায়চারি করছেন। আবার কখনও কখনও বারান্দায় চলে যাচ্ছেন। কী যেন বিড়বিড় করে বলছেন অথবা হাততালি সহযোগে বিভিন্ন দেবদেবীর নাম করছেন। দিনের বেলায় ভক্তদের সঙ্গে নানা কথা বলেন, রঙ্গরসিকতা করেন কিন্তু এখন এই নিশাকালে তিনি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। আমার ভয়ে মরে যাওয়ার মতো অবস্থা। বিছানায় শুয়ে থেকে চুপচাপ ঠাকুরের উন্মত্ত ক্রিয়াকলাপ লক্ষ্য করতে থাকলাম। তিনি কখনও নৃত্য বা সঙ্গীতে মেতে উঠছেন। কখনওবা কারোর সঙ্গে বাক্যালাপ করছেন। অবশেষে নিশাকালের অবসানে স্বস্তি পেলাম। দিনের বেলায় ঠাকুর আবার স্বাভাবিক!

     বাড়ি ফেরার পর আমার ভগিনী জিজ্ঞাসা করল, ‘গত রাতে কোথায় ছিলি?’ ‘দক্ষিণেশ্বরে মন্দির উদ্যানে‘, উত্তর দিলাম। সে বিস্মিত হয়ে বলল, ‘তুই কি দক্ষিণেশ্বরের সেই পাগল বামুনের সঙ্গে রাত কাটিয়েছিস? ওই লোকটার কাছে আর যাস না। লোকটা সত্যিই পাগল। আমি সেখানে কখনও কখনও গঙ্গায় নাইতে যাই। তাঁকে দেখেছি। ওঁর পাগলামি সম্পর্কে আমি জানি।’ আমি ওর কথা শুনলাম ও হাসলাম।” ( God Lived With Them -- Swami Chetanananda, Advaita Ashrama, Kolkata )
     শ্রীরামকৃষ্ণ সন্নিধান বিষয়ে বিজ্ঞানানন্দজীর স্মৃতিচারণ ভক্তমনকে উদ্বেল করে তোলে। তেমনই এক স্মৃতিচারণায় তিনি বলছেন --“একদিন ঠাকুরের পা টিপে দিচ্ছিলুম। এমন সময় কোন্নগর থেকে এক ভদ্রলোক এলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তিনি চলে যাওয়ার পরে আমায় বললেন,‘দেখ, আমি মানুষের মনের ভিতরটা সব দেখতে পাই, যেমন কাচের কেসের ভিতরের জিনিস বাইরে থেকে দেখা যায়। আমি মনে মনে ভাবলাম -- ‘তাহলে তো আমার মনের ভিতরের সবই উনি দেখতে পান! কী সাঙ্ঘাতিক লোক!’ কিন্তু ঠাকুর সকলের ভালো দিকটা নিয়েই বলতেন, খারাপগুলোকে নিয়ে নয়।”
     
    পেজে লাইক দিন👇



  • ক্যুইজ-২৬/ সাগর মাহাত
  • ক্যুইজ-২৬/ সাগর মাহাত


    ১. রুশ-জাপান যুদ্ধ হয়েছিল—
    ১৯০২ খ্রি.
    ১৯০৫ খ্রি.
    ১৯০৪ খ্রি.
    ১৯০৬ খ্রি.

    ২. রাশিয়ার লাল ফৌজ বার্লিন দখল করে—
    ১৯৪৫ খ্রি. ২ মে
    ১৯৪৬ খ্রি. ৩ জানুয়ারি
    ১৯৪৬ খ্রি. ৯আগস্ট
    ১৯৪৭ খ্রি. ১৫ আগস্ট

    ৩. মিত্রপক্ষের প্রধান সেনাপতি ছিলেন—
    প্যাটন
    মন্ট গোমারি
    রোমেল
    আইজেনহাওয়ার

    ৪. মুসোলিনী ফ্যাসিস্ট দল তৈরি করেন—
    ১৯১৯ খ্রি.
    ১৯৩৩ খ্রি.
    ১৯১৭ খ্রি.
    ১৯২০ খ্রি.


    ৫. 'The Roots of National Socialism' গ্রন্থের রচয়িতা—
    বাটলার
    হবসন
    লেনিন
    হবসবম

    ৬. জাতিসংঘ গঠিত হয়েছিল—
    ১৯১৯ খ্রি.
    ১৯২১ খ্রি.
    ১৯২২ খ্রি.
    ১৯২৪ খ্রি.

    ৭. কঙ্গো উপনিবেশ ছিল—
    বেলজিয়াম
    ইংল্যাণ্ড
    ফ্রান্স
    ইতালির

    ৮. সার্বিয়া স্বাধীনতা লাভ করে—
    ১৯৭৫ খ্রি.
    ১৮৮০ খ্রি.
    ১৮৭৮ খ্রি.
    ১৮৮৫ খ্রি.


    ৯. জার্মান সাম্রাজ্যবাদের প্রধান কেন্দ্র ছিল—
    উত্তর আফ্রিকা
    দক্ষিণ আফ্রিকা
    এশিয়া
    লাতিন আমেরিকা


    ১০. 'Age of Imperialism' গ্রন্থের রচয়িতা—
    জন এক্টন
    এরিখ হবসবম
    হবসন
    ফ্রেডারিক এঙ্গেল

    ১১. রুশ ভাষায় 'নারদ' কথার অর্থ—
    জনগণ
    বিদ্রোহ
    বিপ্লব
    সমিতি

    ১২. যে দেশে প্রথম শিল্পবিপ্লব হয়েছিল—
    ইংল্যাণ্ড
    জার্মানি
    রাশিয়া ফ্রান্স

    ১৩. শিল্পবিপ্লব কথাটি প্রথম ব্যবহার করেন—
    আগস্ট ব্ল্যাঙ্কি
    লুপি ফিলিপ
    কাল মার্কস
    নেপোলিয়ন

    ১৪. প্রথম যে বিদেশি শক্তি ভারত আক্রমন করেছিল—
    পারসিক
    গ্রীক
    হুন
    আভীর

    ১৫. মহাভারতে মোট জনপদের উল্লেখ রয়েছে—
    ২০টি
    ২৫টি
    ৩০টি
    ৩২টি


    ক্যুইজ ২৫-এর উত্তর

    ১. রাধাগুপ্ত ২. প্রকৃত জ্ঞান ৩. গম ৪. দার্শনিক ৫. উপজাতি ৬. ন্যায় ৭. গৌতম ৮. শেষভাগ  ৯. দূর্গ ধ্বংসকারী ১০. পোড়ামাটির পাত্র ১১. ঘর্ঘরা ১২. আয়তকার ১৩. পশুপাখির খাদ্য ১৪. মেহেড়গড় ১৫. ১৯৭৪ সাল

    পেজে লাইক দিন👇



  • ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯
  • ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা -১০৯
    সম্পাদকীয়,
    খেলতে ভালোবাসে না, এমন কেউ আছে নাকি? তারমধ্যে ফুটবল হলে তো কথাই নেই। শীত পড়ার এই আমেজে ২০২২, ফিফা বিশ্বকাপ আজ শুরু হচ্ছে। ৩২ টি দেশ থেকে প্রতিযোগীরা তাতে অংশগ্রহণ করছে। কাতারে এই বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে। আমি জানি তোমরাও টিভিতে দেখবে। তাবলে নিজেরা খেলবে না কেবলই অন্যের খেলা দেখবে তা তো হয় না। এবারের প্রচ্ছদে সুদীপ আঙ্কেল পুরুলিয়ার একটি গ্রামের দুটি ছোটো বন্ধুর খেলার  মুহূর্তের ছবি তুলে পাঠিয়েছেন। কি মজা না, ওদের সঙ্গে কে খেলছে জানো? ওদের ঠাম্মা। আরেবাবা ঠাম্মা দাদুরা শুধুই কি বসে বসে শীতে কাঁপে কিংবা শীতে ভূতের গল্প বলে নাকি, খেলেও তো। বীথি আন্টির গল্পে আবার বুনির ঠাম্মারা শিউলি ফুল তোলে। তারপর? তারপর হয়তো সেই শিউলির মালা গাঁথে। কে জানে আর কি কি করে! সেটা স্বপ্নের জানলা বলতে পারবে। আরে না রে বাবা, আমি বানিয়ে বলছি না। স্বস্তিকা দিদি তো লিখেছে দুগগা ঠাকুরের মতো দেখতে শিউলি বলে মেয়েটা শিউলি ফুলের মালা গাঁথছে। শিউলির কথায় জয়াবতীর কথা মনে পড়ে গেল। মস্ত বদ্যি হয়েছে সে। চিকিৎসে শুরু করেছে গো। বলে কিনা, সকালের জলপান খাবে রাজার মত, দুপুরের খাওয়া সাধারণ গেরস্তর মতো, আর রাতের খাওয়া খাবে সাধু সন্ন্যাসীর মত। ভাবতে পারো? এ যে আধুনিক ডাক্তারদের মতো কথা কয়। তৃষ্ণা আন্টিকে কুর্নিশ না জানিয়ে পারা গেল না। তবু মনে রেখো, শিউলি ফোটার দিন শেষ হয়ে এল বলে। মানে স্কুলে স্কুলে পরীক্ষা শুরু। তাই তো পীযূষ আঙ্কেল ইংলিশে মুশকিল ছড়ায় পড়ার কথা মনে করিয়েছেন। তোমরা যারা ছবি এঁকেছো / আঁকো, তাদের বলি শীতের খেলার ছবি এঁকে পাঠাও। খেলা চলুক বিশ্ব জুড়ে। খেলতে খেলতে খেলা দেখতে দেখতে ছোটোবেলা পড়তে ভুলো না কিন্তু। -- মৌসুমী ঘোষ।


    ধারাবাহিক উপন্যাস
    জয়াবতীর জয়যাত্রা
    পর্ব ৩৪

    তৃষ্ণা বসাক

    ভগ্যিস তখন ঘরে সব্বো ছাড়া কেউ ছিল না। অন্য মেয়েটি ধুনো জ্বেলে আনতে গেছিল, নিলে কী যে হত ভেবে পায় না পুণ্যি। জয়াবতী এত উতপ্টাং কথা বলতেও পারে, বাবা, বাবা। জমিদারমশায়ের কানে গেলে আর রক্ষে আছে? তিনি হয় গুমখুন করবেন, নয়তো এ গাঁ থেকে তাদের বাস উঠিয়ে ছাড়বেন। এখন না হয় তারা সোনাটিকরিতে থাকে, চিরকাল তো আর থাকবে না, শিক্ষে শেষ হলে এ গাঁয়েই ফিরে আসতে হবে। তাছাড়া শুধু কি নিজেরা? ওর মা, খুড়ি খুড়ো, জয়াবতীর মা, বাপ ভাই –সব তো এখানে। তারা কোথায় যাবে? ভেবে ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে এল পুণ্যির। সে চোখ পাকিয়ে দুটো কড়া কথা বলতে গেল তার গঙ্গাজলকে। ওমা, কাকে বলবে? সে মেয়ে তো তখন ওষুধের পেঁটরা বার করে হাঁটকে উটকে খল নুড়ি বার করে ফেলেছে, আর তাতে কী ঘষে যাচ্ছে একমনে। বড় খলনুড়ি তো বেজায় ভারি, সবখানে নিয়ে যাওয়া যায় না, তাই জয়াবতী পাতু কামারকে দিয়ে ছোট্ট এতটুকু একখানা খল নুড়ি তয়ের করে নিয়েছে। সেটাতে সে একমনে কীসব মেড়ে চলেছে একমনে, তার সেই একাগ্র মূর্তি দেখে কার এমন বুকের পাটা যে কিছু বলে?
    মাড়া হয়ে গেলে একটা ছোট্ট পাথরের বাটি, ঠিক ঠাকুরের মধুপর্কের বাটির মত, তাতে সেই ওষুধটুকু ঢেলে, তাতে একটুসখানি
    মধু মিশিয়ে জয়া পেরজাপতিকে বলল ঠাকমাকে মুখটা একটু ফাঁক করতে, তারপর সে ঠাকমার জিভে সেই ওষুধ ফেলল দু ফোঁটা। খানিকক্ষণের মধ্যে ভোজবাজির মতো কাজ হল। ঠাকমা চোখ মেলে বলল ‘ও বউমা, ঠাকুরমশাইকে একটু পাঁজিটা দেকে দিতে বলো তো, এই সপ্তায় আর একটা ভাল তিথি আছে শুনেচি’
    গলা ক্ষীণ, কিন্তু পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে কথা।জয়াবতী বলল ‘গরম দুধ নিয়ে এসো এখনি। খেয়ে উনি ঘুমোবেন। ঘুম ভাঙলে দুধ সাবু কলা বা দুখানা লুচি, যা চাইবেন খেতে, দেবে। খেতে না চাইলে জোর করে খাওয়াতে হবে, নইলে ওষুধে কাজ হবে না। এই ওষুধ তয়ের করে রেখে গেলাম, দুধটা খাওয়া হলেই আমরা চলে যাব। এখন আর থাকার দরকার হবে না। কাল আবার আসব, সকালের দিকেই’
    সব্বো বেশ কাজের মেয়ে দেখা গেল। সে ছুটোছুটি করে গরম দুধ নিয়ে এল ফুঁ দিতে দিতে, তারপর একটু একটু করে অনেকটাই খাইয়ে দিল ঠাকমাকে। জ্যাবতী ঠাকমার মুখের ভাব লক্ষ্য করছিল বসে বসে। আধশোয়া হয়ে খাচ্ছেন ঠাকমা, তাঁর চোখ আধখোলা, একটু যেন বল পেয়েছেন শরীরে, মনে হল তার। খানিকটা খাওয়ানো হতেই সে বলল ‘ থাক, আর কাজ নেই খাইয়ে। দুব্বল শরীর, বেশি নিতে পারবে না একসঙ্গে। সবাইকেই বলি, একবারে বেশি খাবে না কেউ, যাই খাও অল্প অল্প করে, পেটের এক কোণ খালি রেখে খাবে। দেখে যেন মনে না হয় এই তোমার শেষ খাওয়া, একটু পরেই তোমাকে শূলে চড়ানো হবে। আর একটা কথা বলি, সকালের জলপান খাবে রাজার মত, দুপুরের খাওয়া সাধারণ গেরস্তর মতো, আর রাতের খাওয়া খাবে সাধু সন্ন্যাসীর মত। মনে থাকবে তো?’
    ঘর থেকে যাদের বার করে দেওয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে যারা কমবয়সী আবার এসে জুটেছে ঘরে। তারা হাঁ করে গিলছিল জয়াবতীর কথা। বশীকরণ করলে যেমন অবস্থা হয়, তেমনি অবস্থা তাদের, ঘাড় কাত করতেও ভুলে গেছে যেন।
    ঠিক সেই সময়ে দরজার বাইরে একটা ভারি পায়ের আওয়াজ বাজল, গম্ভীর গলায় চৌকাঠের ওপার থেকে কে যেন বলল ‘কী মনে রাখতে বলা হচ্ছে শুনি? ‘
    সেই শুনে ঘরে জড়ো হওয়া ভিড় নিমেষে ভোজবাজির মত মিলিয়ে গেল।
    মিহিন ধুতি পরা, গায়ে একটি উড়নি জড়ানো, লম্বা, কিন্তু মোটা না, বরং বেশ পাতলা গড়নের সুন্দর একটি মানুষ ঘরে ঢুকে এলেন। তাঁকে দেখে জয়াবতী বেশ অবাক হল। মেয়েগুলো যেভাবে উধাও হয়ে গেল, তাতে বোঝাই যাচ্ছে, ইনিই হচ্ছেন জমিদারমশাই। আসার আগে কল্পনা করেছিল লম্বা তো বটেই, বিশাল মোটা সোটা, গণেশ ঠাকুরের মত মস্ত ভুঁড়ি থাকবে, আর অসুরের মত দাঁত কিড়মিড় করা রাগী রাগী মুখ-এমন কাউকে। তার বদলে যিনি এলেন, তিনি লম্বা হলেও মোটা মোটেই নন,  আবার রোগাও নন, দোহারা গড়ন, গলার আওয়াজ বেশ ভারি বটে, কিন্তু অসুরের মত দাঁত কিড়মিড় করা চেহারা তো নয়, বরং মা দুগগার মায়ের মাথার ওপর যে শিবের পটখানি থাকে, তার মত এক আশ্চর্য শান্ত রূপ, তবে চোখ দুটি বোজা নয়, খোলা। আর জয়াবতী লক্ষ্য করল সেই চোখ দুটিতে খেলা করছে কৌতুক। বাইরে থেকে সব কথাই তিনি শুনেছেন,  সে তো বোঝাই যাচ্ছে। এখন তিনি কী শুধুবেন সেটাই দেকার। জয়াবতী দেখল উমাশশীর তেমন কোন পরিবর্তন নেই বটে, কিন্তু পুণ্যি আর পেরজাপতির মুখ শুকিয়ে গেছে। ওদের ভয় দেখে ভারি রাগ হল জয়াবতীর। এই মেয়েগুলো তো এ বাড়িতে থাকে, তারা ভয় পেতে পারে, দোষ করে থাকলে বা না থাকলেও বাড়ির মানুষ বকাঝকা করে, মা যে বলে হাঁড়ি কলসি পাশাপাশি থাকলে ঠোকাঠুকি লাগেই। কিন্তু তারা তো বাইরের মানুষ, কথায় বলে অতিথি নারায়ণ, তার ওপর বদ্যি, এসেছে এঁরই মায়ের চিকিচ্ছের জন্যে। তারা ভয় পাবে কেন?
    সে গম্ভীর মুখে বলল ‘সে কতা বলচি জমিদারমশাই, তার আগে আপনার চটিজোড়া চৌকাঠের বাইরে ছেড়ে আসুন, রুগীর ঘরে রাজ্যের ধুলোবালি ঢুকলে অসুখ বেড়ে যাবে যে’ একথায় জমিদারমশাই যত না চমকালেন, তার চেয়েও বেশি চমকাল পুণ্যি, পেরজাপতি, উমাশশী, আর দরজার বাইরে ভিড় করা মেয়েরা। জমিদারমশাইকে চটি খুলে আসতে বলছে, বুকের পাটা কি এ মেয়ের, বাপরে! সবাই দম বন্ধ করে ভয়ানক কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছিল। এই বুঝি ওকে দশ ঘা বেত মারার আদেশ দেন জমিদারমশাই, কিন্তু তার বদলে তিনি বললেন ‘এহেহে, বড় ভুল হয়ে গেছে মা, মাপ করো, বেখেয়ালে চলে এসেছি, মার ঘরে আমি কোনদিন চটি পরে ঢুকিই না’
    চটি ছেড়ে ভেতরে এসে জমিদারমশাই দেখলেন, তাঁর মা বিছানায় আধশোয়া হয়ে রেয়েছেন, তাঁর চোখ খোলা, মুখে ক্লান্তি বটে,তবে একটা শান্তির ভাবও স্পষ্ট, তিনি পেরজাপতির হাতখানি নিজের হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করছেন ‘কী নাম তোমার মা?’
    দেখে জমিদারমশাই মুগ্ধ হয়ে গেলেন। কাল সারারাত কী ভয়ে ভয়ে কেটেছে। মাকে ফিরে পাবার আশাই ছেড়েছিলেন। এই মেয়েটি কি জাদু জানে?
    তিনি জয়াবতীর দিকে ফিরে বললেন ‘মা তোমার হাতে কি জাদু আছে? যে মানুষটা কাল চোখ খলেনি সারাদিন সারারাত, আজ সে উঠে বসে কথা কইছে! আমার মাকে সারিয়ে তুললে, বলো কী নেবে? মটরমালা না পান্না বসানো বাজুবন্ধ?’
    জয়াবতী খরখর করে বলল ‘আপাতক পালকিকে বলুন, বাড়ি যাব, সেই ভোরে রওনা দিয়ে এসেছি কিনা। ওরা সবাই ক্লান্ত। আর দেবার কিছু নেই। ইনি তো আমারও ঠাকমা। তবে   পরে একটা জিনিস চাইব, দেবেন তো?’
    জমিদারমশাই কৌতূকমাখা চোখে দেখেন তাকে ‘কী চাও বলো মা, আমার সাধ্যের মধ্যে হলে নিশ্চয় দেব’
    ‘আমাদের ছিখেত্তর যাবার ব্যবস্থা করে দিতে হবে’ (ক্রমশ)
     
    স্নেহা দাস, অষ্টম শ্রেণী, জওহর নবোদয় বিদ্যালয়, পশ্চিম মেদিনীপুর


    স্বপ্নের জানালা
    বীথি ব্রহ্ম 

    আমি ছোট্ট বুনি। এটা  আমার ডাকনাম। আরও নাম আছে। কিন্তু এই নামেই সবাই ডাকে। বাড়ির মধ্যে আমি সবার ছোট। একেকজন একেকটা নামে ডাকে। প্রথম প্রথম সব নাম ভুলে যেতাম। এখন অসুবিধা হয় না। আমার ঠাম্মি  আমার নাম বুনি রেখেছে। আর সব নাম হারিয়ে ফেলে শুধু বুনিটাই সবার মুখে মুখে ফেরে। আমার ভালো নাম ‘শুভদ্বীপ’। ওই নামে স্কুলের বন্ধুরা আর ম্যামরা ডাকে।
          রোজ ভোরে ঘুম থেকে উঠি আমি। অবশ্য এই ক’মাস ধরে। লকডাউনের মধ্যে ঘরে বসে অনলাইনে babyland - এর কিছুদিন ক্লাস করেছিলাম।  একটুও ভালো লাগে নি। কোনো ম্যাডামও , স্যারকে চিনতাম না। কোনো বন্ধুর সাথে মিশতে পারি নি। নাম জানি না কারো।
          বাবা-মায়ের কাছে শুনি অধিকাংশ বাচ্চা-ই ভোরে উঠতে চায় না। আর স্কুলে না যাওয়ার জন্য ছুঁতো খোঁজে। আমার ব্যাপারটা বেশ মজার- ই লাগে।
          ভোরে উঠেই জানালা দিয়ে তাকাই। পাশেই একটা মন্দির। সবাই মঠ বলে। অনেক প্রভু ও সন্ন্যাসী  থাকেন ওখানে। মন্দিরের বাগানের দিকে চোখ যায়। বাগান ভর্তি ফুল। আগে নাম জানতাম না। দিদিভাই ও পুপুর কাছে নাম শুনেছি। সাদা টগর, জুঁই, বোগেনভেলিয়া, বেলি, রঙিন সূর্যমুখী আর নানা রঙের দোপাটি আর অনেক সবুজ ঝাউ গাছ।  দেখে দেখে আর জানলা থেকে সরতে ইচ্ছা করে না। গেটের ওপরে ঝুলন্ত মাধবীলতা ও মালতীলতা। লালচে হলুদ হয়ে ঝুলে থাকে।
           আমার পুপু আমায় রোজ বলে- “ওই বাগানে মাঝ রাত্রিরে পরী আসে। মঠের প্রভুরা দেখেন। লাল, নীল, হুলদ, সবুজ পরী এসে কিছু ফুল নিয়ে যায়।“
    আমি ভোরে উঠেও কোনোদিন পরীদের দেখিনি। ঘুম থেকে উঠেই কাঁচের জানলা দিয়ে তাকাই নীচের বাগানে। শুধু দেখি বেশ কয়েকজন ঠাম্মা টগর ফুল সাজিতে তুলছেন।
          কয়েকদিন পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নেমেছি। মাধবীলতা বিতানে দাঁড়িয়েছি। ঠাম্মারা বলেছেন- “কি গো বুনি-বাবু , ঘুম ভেঙ্গে গেল।“ আমার গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি আর পরনে প্যান্ট। পায়ে হাওয়াই চটি। চুল এলোমেলো। আমি উত্তর দিয়েছি- “অ্যাঁ ভেঙ্গেছে। কিন্তু ঠাম্মু তোমরা কি ভোরের পরী দেখেছ?”
          ওরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে বললেন- “ও বুঝেছি! তুমি বুঝি পরী দেখতেই ভোরবেলা মন্দিরে এসেছ?”
          আমি  মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলেছিলাম- “অ্যাঁ ঠাম্মু। আমি একনো  ঠিক বুঝি না, সত্যি পরী আসে গো? “
          শুনে একজন ঠাম্মু ফুলের সাজি নামিয়ে বললেন- “ আহা বেচারা তাই প্রায়ই মন্দিরের বাগানে আসো, কিন্তু হতাশ হয়ে ফিরে যাও !” 
       আরেকজন ঠাম্মু বললেন, “আমরা রোজ ভোরে আসি তো! যদি পরীদের দেখা পাই তোমাকে ডেকে নেব।“
          আমি ওখান থেকে বাড়িতে চলে  আসি । তারপরে স্কুলের জন্য রেডি হতে থাকি। মা দুধ-রুটি খাইয়ে দেয়। বাবা জামা-প্যান্ট পরিয়ে দেয়। আর দিদিভাই আমার ব্যাগ-জলের বোতল। আমি কিন্তু অন্যমনস্ক থাকি। চোখ বারেবারে জানলায় চলে যায়। 
          ওরা জিজ্ঞেস করে- “কিরে বারবার ওদিকে কি দেখছিস!”
          ঘরের কেউ-ই জানেনা আমি ভোর ভোর মন্দিরে যাই। জানতে পারলে আমাকে খুব বকবে। দিদিভাই-ও জানেনা। শুধু ভোরে ওঠে আমার পুপু। ও জানে আমি ওখানে যাই। ও কিছু বলেনা। ঘরের জানলা দিয়ে আমায় ইশারা করে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে বলে।
          বাড়ির সবাই ভাবে আমি খুব পড়ায় মনযোগী, তাই স্কুলে যাই। আসলে আমি স্কুলের খেলার মাঠটা খুব পছন্দ করি। সব চাইতে বেশি পছন্দ করি বাসের জানলায় বসতে। বাবা,মা-দিদিভাই আমাকে বাসে তুলে দেয়। বাসের আঙ্কেল হাত ধরে আমাকে একটা সিটে বসায়। আমি কিন্তু ঘষটে ঘষটে জানলার ধারে বসবই। জানলার ধারে গিয়েই জানলার ফ্রেমে নিজের মুখ সেট করে নিই। বাড়ির সবাইকে টা-টা দিতে দিতে বাসটা অন্য একটা বন্ধুর বাড়ির গেটের সামনে দাড়ায়, ওই বন্ধুর নাম রামু। ওকে ওঁর মা ও দিদি বাসে তুলে দেয়। ও উঠে বাসে সিট খুঁজতে থাকে। আর আমি?
          জানলা দিয়ে দেখি- রামুর দিদিকে। রামুর চাইতে একটু লম্বা। একটা লাল রঙের গেঞ্জির জামা পরে। সেটার মস্ত দু’টো পকেট। লাল পকেট থেকে পুঁচকে দু’টো বিড়ালছানা উঁকি মারে। আমি গলা বাড়িয়ে মিয়াঁও করি। ওরাও উত্তর দেয়- “মিয়াঁও।” তরপরে ওদের টা-টা করি। পুঁচকে ছানা দু’টো অনেকক্ষণ ধরে ডেকেই যায়। মনে হয় বলে আমরাও বাসে চড়বো। আমার খুব খুব ভাললাগে ওদের।
          সেদিন পুপু জিজ্ঞেস করেছিল- “কিরে বুনি স্কুলে  সবার চাইতে তোর কি ভালো লাগে? “
          আঁদো আঁদো করে বলেছিলাম- “রামুর দিদির পকেটের ম্যাঁওদের আমার খুব ভালো লাগে।“ বলেই তিড়িং বিড়িং করে নেচেছিলাম।
          পুপু-র মুখটা হা হয়ে গেছিল। এতো বড়! ঠিক আমার স্বপ্নের বাসের জানলার মতো!

    শুভঙ্কর সেন,পঞ্চম শ্রেণী,সোদপুর হাই স্কুল,উত্তর ২৪ পরগণা

    ইংলিশে মুশকিল
    পীযূষ প্রতিহার

    ইংরেজি নিয়ে দাদা বড় মুশকিল
    কাইট মানে ঘুড়ি আর আকাশের চিল।
    ব্যাট থাকে ক্রিকেটে আর ওড়ে রাতে
    রাইট সাইড হবে গেলে লেফট হাতে।
    মাউসের কাজ বল কত কাটাকুটি
    কম্পিউটারে দেখ তার নেই ছুটি।
    ফ্যান মানে ভক্ত ও ফ্যান মানে পাখা,
    ওয়াচ মানে ঘড়ি বুঝি আর বুঝি দেখা।
    এইসব কত কথা মনে রাখি বলো তো
    মুশকিলে পড়ে গেছি, এইবার ছাড় গো।

    শুভশ্রী সরকার, সপ্তম শ্রেণী,সুখচর শতদল বিদ্যায়তন
    উত্তর ২৪ পরগণা


    শিউলি মাখা
    স্বস্তিকা চট্টোপাধ্যায়
    বটানি অনার্স, শ্রীরামপুর মিশন কলেজ, হুগলি


    ছাতিমতলা গ্রামে পড়ন্ত বিকেল । সেন'বাড়ির দুর্গা দালানে পঞ্চমীর আগের দিনের প্রস্তুতি তুঙ্গে । বনেদী  জমিদার পরিবারে বংশপরম্পরায় প্রতিমা গড়েন মিস্ত্রী পরিবার । বিগত চার বছর ধরে প্রভাত মিস্ত্রী এই দায়িত্বে রয়েছেন । এখন,দুর্গা প্রতিমার হাতে একে একে অস্ত্র তুলে দিচ্ছেন তিনি । সামনে ছয় বছরের মেয়ে শিউলি পা ছড়িয়ে বসে । ফুলের গন্ধ মেখে মালা গাঁথছে সে ,বিকেলের আহ্লাদী রোদে মুখশ্রী এক্কেবারে সেন বাড়ির দুর্গা প্রতিমার মত জীবন্ত দেখাচ্ছে । মালা গাঁথতে গাঁথতে  এক নাগাড়ে প্রশ্ন করে চলছে সে তার বাবাকে। 
      - "বাবা ; মা দুগ্গার দশটা হাত !!"
    প্রভাত হেঁসে উত্তর দেয়- , " হ্যাঁ মা ,তাকে জগৎ সংসারের কাজ সামলাতে হয় কি'না"
    - "বাবা! আমার কি করে তাহলে দুগ্গা ঠাকুরের মত দশটা হাত হবে ?!" 
      প্রশ্নের  উত্তর না পেয়েই আনমনে খেলতে চলে যায় শিউলি ।
     এরপরে বছর ষোলো কেটে গেছে । শিউলির বাবা আর নেই । ফলত আর অবান্তর প্রশ্ন করেনা সে , খালি এই স্বার্থপর জগতকে বুঝতে চেষ্টা করে , হেরে যায় বার বার । পাঁচ -ছয়  বছর আগে প্রবল শীতে নিজের চোখের সামনে ,বাবাকে কাতরে কাতরে বিছানায় মিলিয়ে যেতে দেখেছে সে । কিন্তু, কিছুই যে করার ছিলনা । সেন বাড়ি থেকে একটা পুরনো কম্বল দিয়েছিল বটে তবে, সেটা দিয়ে জ্বরের কাপুনি থামানো যায়নি । তখন বাড়িতে  অনটন । চাল , পরনের কাপড়ের কথা চিন্তা করে রাতে দুচোখের পাতা এক হয়না ।মা ,মানসিক স্থিরতা হারিয়েছে ; কই? তখন তো মা দুগ্গা দশটা হাতের একটাও বাড়ায়নি । জগৎ সংসারের খোঁজ সে কি আদৌ রাখে ? তবে এক্কেবারে শেষে যখন হারানোর আর কিছুই নেই মা দুগ্গা কেবল মানবিকতার হাত বাড়িয়েছিল । চাকরির appointment letter ।

                        ছাতিমতলা গ্রামে এখন এক জ্যান্ত দুগ্গা মায়ের বাস , তার হাতে ভারী ভারী অস্ত্র নেই আছে ভালোবাসা , মানবিকতা ,স্নেহ ,মায়া ।সে কোনো জ্যান্ত অসুর বধ করেনা ; বধ করে দারিদ্রতা অসহায়ত্বতাকে । শরৎকালে কাশবনে দুর্গা সেজে ক্যামেরা লেন্সের সামনে ঘোরে না তবে অসহায় বাচ্চাদের কোলে তুলে নেয় , উলঙ্গ উন্মাদদের চিকিৎসা করায়, ঘরহারাদের ঘর দেয় চাল দেয় কাপড় দেয় , সর্বহারাদের সবকিছু দিয়ে ভরিয়ে দিতে চায় । 
                         কাল দুর্গা পঞ্চমী । হঠাৎ মনে পড়ে যায় সেই দিনটার কথা সেন 'দের দুর্গা দালান । বাবা'কে জিজ্ঞেস করা শেষ  প্রশ্নের উত্তর পায় সে মনে মনে ।কালে কালে কত ভয়ানক অসুর বধ হলো কিন্তু কই রাতের গভীর অন্ধকারে একলা ছাদের কোণে দাড়িয়ে থাকা অসহায় মানুষগুলোর টলটলে চোখের জল থামলো কি? আসলে এই সমাজে এখন শিউলির মত জ্যান্ত  দুগ্গা মায়ের  ভীষণ দরকার ।


    পাঠপ্রতিক্রিয়া
    (জ্বলদর্চি ছোটোবেলা ১০৭ পড়ে দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে গড়বেতা, পশ্চিম মেদিনীপুর যা লিখলেন) 

    জ্বলদর্চি  ছোটবেলা বিশেষ সংখ্যা ১০৭ এ মৌসুমী (ঘোষ)দির সুন্দর সম্পাদকীয় টি পড়ে ফেললাম সঙ্গে অপু পাল মহাশয়ের তোলা ফটোটিও খুব সুন্দর অর্থ বহন করছে। এ যেন পুজো শেষে মায়ের চলে যাওয়ার ছবি আর সকল সন্তানের রূপক যেন ওই বাচ্চা ছেলেটি ও তার চোখের জল।

    এরপরে সেই গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকটি আছে, যেটা পড়ার আগ্রহ সেই প্রথম দিন থেকে আছে,তৃষ্ণা বসাকের লেখা "জয়াবতির জয়যাত্রা"। আজকের লেখাটি একটু বড় হলে ভালো লাগতো যাই হোক। পুণ্যিদিদি ও পেরজাপতির কথোপকথন  শুনে খুবই ভালো লাগলো যেমন, সেরকম আবার খারাপ লাগলো পুন্যি দিদির ভাই জন্মানোর সময় মা মারা যাওয়ার ঘটনায়।
    এরপরে দেখতে পাই সপ্তম শ্রেণীর একটি ছোট্ট ছাত্রি শুভশ্রী সরকারের আঁকা একটি সুন্দর ছবি।
    শ্রীছন্দা বোসের লেখা "গরিবের দীপাবলি"কবিতাটি খুব সুন্দর ছন্দ মেলানো কবিতা।
    বিপ্লব চক্রবর্তীর লেখা বড় গল্প "ঘোষাল বাড়ির ডাকাতি"একটি টানটান উত্তেজনার গল্প। বড় জ্যেঠার অসীম সাহস দেখে অবাক হয়ে গেলাম।
    এরপরেই মন ভালো করে দেওয় শ্রেয়া ব্রজবাসীর আঁকা সুন্দর ছবি দেখলাম।

    প্রথম শ্রেণীর ছাত্র সায়ক সরকারের "টুই" ছড়াটি ভীষণ ভালো লাগলো, এ যেন তার মনের কথা।

    নতুন সংযোজন সুব্রত দেবের তৈরি "শারদ শব্দছকটি" সমাধান করতে বেশ ভালই লাগছিল।
    সবশেষে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই, সম্পাদক মহাশয় মৌসুমী ঘোষের অক্লান্ত প্রচেষ্টাকে যা প্রতি সপ্তাহান্তে "জ্বলদর্চি ছোটবেলা" পত্রিকা কে প্রতিবারই নতুন করে সমৃদ্ধ করছে।

    পেজে লাইক দিন👇



  • কয়েকটি রম্য কবিতা /শুভশ্রী রায়
  • কয়েকটি রম্য কবিতা
    শুভশ্রী রায়


    ক্ষীর-খাবার 

    পুষি আমার সোনা, করছ তুমি কী?
    বিরক্ত কোরো না, মন দিয়ে পড়ছি।
    পড়ো তাহলে, আমি কাজকর্ম করি
    চাপ বেড়েছে, তাই  অ্যাত্তো পড়া করি।
    তাহলে এখন খাবে না বুঝি ক্ষীর?
    কী বললে মাম্মা, প্লিজ বলো ফির!
    বানিয়েছি ঘন ক্ষীর, চাই না তোমার?
    কী যে বলো, জিভ জানো না আমার!
    জানি বলেই কষ্ট করে এ সব যোগাড়
    মাগো, দু'জন মিলে খাব ক্ষীর-খাবার।



    সমব্যথী পুষি

    ওরে পুষি-বিল্লি, তুই করেছিস কী?
    দেখো না মা, কত বড় মাছ এনেছি!
    ওরে পুষি কোথায় টাকা পেলি তুই?
    বলছি মা, তোমায় কিচ্ছু কী লুকোই?
    ভয় নেই, চুরি করিনি আমি বড় মীন
    তোমার পুষি কী হতে পারে অত হীন?

    একটা বাড়ীতে মেরেছি ইঁদুর একশো
    খুশী হয়ে তারা দুশো টাকা দিল গো,
    গুনে গুনে টাকা ট্যাঁকে ভরেছি আমি
    যেমন তাদের অর্থ, আমার শ্রমও দামী।
    তারপরে মনে হল, একটু বাজার যাই
    কতটুকু ভালোমন্দ আমরা এখন খাই?
    ভাবলাম দরদাম করে কিনে নিই মাছ
    বড় দেখে, মা-মেয়ে মিলে খাব আজ।

    সোনা বিল্লি , তুই আসলে এত সমঝদার!
    বলি না তবু জানিস, কষ্টে চলছে সংসার 
    সোনা, চোখে জল এস গেল রে আমার,
    চোখ মোছো, মেয়ে বোঝে অভাব তোমার।


    ভান্ড কান্ড 

    কালকে পূর্ণিমায় কারা যেন করেছে এক কান্ড
    ছাদে রেখে ভুলে গিয়েছে জ্যোৎস্না ভরা ভান্ড!
    সেই ভাঁড় নিয়েই চলছে এখন তুমুল কাড়াকাড়ি
    মুখার্জিদা বলেন, "আমার", সেনবাবু বলেন তাঁরই।
    ফয়সালা হয় না দেখে কেউ পুলিস ডাকতে যাবে
    নেতা বললেন, পুলিস এলেই বা কে কী পাবে?
    এই দেখ, জ্যোৎস্নাটুকু শুষে নিয়েছে সূর্য রাজা
    যার জিনিস তার কাছেই ফেরত গেছে সোজা
    নামবে আজ রাতে নতুন করে চন্দ্রকিরণ হয়ে;
    ছাদের ওপর চাঁদের মায়া শত ধারায় যাবে বয়ে।
    তাই বলি, কষ্ট করে যাঁরা কৌমুদী করেন জমা,
    ঘরে তুলবেন, নয়তো সূর্যদেব করবে না তো ক্ষমা।
    শুষে নেবেই নিজের আলো, আত্মীকরণ করবে
    মাঝখান থেকে, অবুঝ মানুষ ঝগড়া করে মরবে।


    ইচ্ছে-বাড়ী এসো

    খটখটে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন এক সুশিক্ষিত মাছ
    গমগমে এক অফিসে করেন আজকাল কাজ।
    উড়ে উড়ে স্কুলে পড়াতে চললেন গুরু প্রজাপতি
    লেখাপড়া ভালো শেখান, করেন পড়ুয়াদের গতি!
    বনবন করে দেশভ্রমণ করছে বুঝদার খরগোশ
    দূর রাজ্যের মাটি-জল-হাওয়ায় পায় সে সন্তোষ,
    সাদা পোষাক পরে ক্রিকেট খেলছে সবুজ টিয়া
    তার ব্যাট-বল করা আমি দেখছি যে মন দিয়া!
    এ সব আজগুবি ভেবে যাদের হচ্ছে না বিশ্বাস
    চলে এসো তাড়াতাড়ি, যেখানে বহু দিনের বাস,
    আমার ইচ্ছে-বাড়ী খুঁজো হওয়া, না-হওয়ার মাঝে
    এখান থেকেই দেখে নেবে, নয় গো কথা বাজে!

    পেজে লাইক দিন👇



  • পুঁড়া পরব /ভাস্করব্রত পতি
  • পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব, পর্ব -- ৪৭

    পুঁড়া পরব 

    ভাস্করব্রত পতি 

    "ওই ছেনাটা সউ ছেনাটা ওই ছেনাটা সউ ছেনাটা / জলদি করি গাধুই আয় / কলঘাটে আছে হলদি বাটা / তেল মাখিলে আজকে গায়। / তুলসী মঞ্চে হয়টে পূজা, / বৈঠা ধূপে হলদি পতর / ধুবলা ঘাসে ফুল চন্দন, / শীত-আঘ্রাণে পড়নে কাকর। / লুয়া জামা লুয়া পেন্ট / আনা হিচে তোর পিনে, / ফোঁটা গটায় লিয়ার পরে, / পরবু সব অষ্টমীর দিনে / যারনে যারনে পড়ুয়ান আছো / জলদি জলদি আইস, / পিঠা পায়েশ লুচি পুরি / দুপুর হিনে মাংস। / ধানের কেরা গুহাল ঘেরা, / মার্কা কালীর ঝি, / বাছুর গাধায় কই গাড়িয়ায়, / আজ অষ্টমী তারনেকার বি। / পূজা হিলা, সকাল সকাল / গড় করিলে বাবু, / মামাঘরনু আইসচে সবলোক / ভালামন্দ কত খাবু। / ওউ ছেনাটা সউ ছেনাটা / কত অষ্টমী পাবু / সকললোকের আশীর্বাদে / মঙ্গলে তুই রইবু। / অনেক ভালায় রইবু"।

    সুবর্ণরৈখিক ভাষায় 'পুঁড়া পরব' বা 'পৌড়াষ্টমী' নিয়ে আঞ্চলিক কবিতায় কবি পবিত্র পাত্র তুলে ধরেছেন এক অনন্য লোকাচারের বিবরণ। একে কেউ বলেন 'পৌড়া অষ্টমী' বা 'পৌড়াষ্টমী' বা 'পোড়াষ্টমী' বা 'প্রৌড়াষ্টমী' বা 'পৌরাষ্টমী'। আবার কেউ বলেন 'পড়ুয়ান অষ্টমী' বা 'পোড়া অষ্টমী' বা 'পড়ুয়া অষ্টমী' বা 'প্রথমা অষ্টমী' বা 'পুঁড়া পরব'। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পূর্ব মেদিনীপুর এবং পশ্চিম মেদিনীপুর সহ সুবর্ণরেখা অববাহিকার দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তবর্তী উৎকল সংস্কৃতির এক অনন্য লৌকিক উৎসব এই 'পৌড়াষ্টমী'। মূলতঃ ওড়িয়া সংস্কৃতির এই লৌকিক উৎসবটি আজ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়।
    সম্পূর্ণভাবে পারিবারিক এই উৎসব উৎকল ব্রাম্ভণদের নিজস্ব উৎসব হলেও মাহিষ্য সম্প্রদায়ের মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। মূলতঃ জগন্নাথ মন্দিরের সেবাইতদের মন্দিরে পালিত যেসব লোকাচার এবং উৎসব ধীরে ধীরে ব্রাম্ভণদের মধ্যে সম্প্রসারিত হয়েছিল, সেইসব লোকাচারের একটি এই 'পড়ুয়া অষ্টমী' বা 'পুঁড়া পরব'। রাসোৎসবের ঠিক পরেই কৃষ্ণা অষ্টমী তিথিতে পালিত হয় এই সামাজিক লৌকিক উৎসবটি। 

    ওড়িয়া শব্দ 'পঁঢ়ুয়া' বা 'পঁঢ়ুহা'র অর্থ 'প্রথম'। অর্থাৎ জীবিত জ্যেষ্ঠ সন্তানের পূজা। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, যদি কোনো দম্পতির প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই ভ্রুণ অবস্থায় নষ্ট হয়ে যায় কিংবা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে মারা যায় তবে সেক্ষেত্রে তাঁর পরবর্তী জীবিত সন্তান কিন্তু 'পঁঢ়ুয়া'' তকমার অধিকারী নয়‌। তাঁর জন্য পুঁড়া পরব হয়না। একমাত্র গর্ভের প্রথম সন্তানই হয় 'পঁঢ়ুয়া' বা 'পুঁড়া'। কোথাও কোথাও গর্ভের অষ্টম সন্তানেরও 'পৌড়াষ্টমী' পালন করা হয়। কেননা, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন দৈবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তান। ফলে জগন্নাথ তথা বিষ্ণু তথা কৃষ্ণের উপাসক এইসব পরিবারের লোকজন অষ্টম সন্তানকে কৃষ্ণের সাথে তুলনা করেন। এঁদের আরাধ্য দেবতা দামোদর বা মদনমোহন। যা আসলে বিষ্ণুর ভিন্নতর নাম। শুধু পুরুষ নয়, প্রথম সন্তান যদি কন্যাও হয়, সেক্ষেত্রেও তাঁর জন্য পুঁড়া পরব হয়। এমনকি গোয়ালঘরের প্রথম হওয়া গরুকেও পঁঢ়ুয়া পূজা করা হয় স্নান করিয়ে এবং গলায় শালুকের মালা পরিয়ে। এ এক অসাধারণ লোকাচার। সেই প্রাচীন কাল থেকেই যে এক শ্রেণীর মানুষের চোখে নারী পুরুষের সমানাধিকারের রেওয়াজ ছিল তার পৌড়াষ্টমীই প্রমান দেয়।

    প্রথম সন্তান এবং অষ্টম সন্তানকে 'প্রৌঢ়' বা 'পুঁড়া' বলে ভাবা হয়। তাই একে 'প্রৌঢ়াষ্টমী'ও বলে। প্রথম সন্তানের জন্মের পাঁচবছর পূরণ হলে তাঁকে 'পুঁড়া বসানোর' আওতায় আনা হয়। প্রধানত বিজোড় সংখ্যক ৫, ৭, ৯, ১১ তম বছরে পুঁড়া বসানো হয়ে থাকে। বাড়ির উঠোনে তুলসীমঞ্চের কাছকাছি জায়গায় মায়েরা কলাপাতার উপর বিরি কলাই বেটে বড়ি দেন সন্তানের মঙ্গলকামনায়। যাঁদের অষ্টমী পালিত হয়, তাঁরা এদিন সকালে ঘি, কাঁচা হলুদ বাটা ও গঁধাউলার (আবাটা) মিশ্রণ মেখে স্নান করেন। এরপর নতুন পোশাক, নতুন রেশম বা ঘুনসী পরে কোমরে। একে বলা হয় পোঁনচি বা পৌঁচি।

    কোথাও কোথাও পুঁড়া বসানোর কাজ করেন দাদু বা দিদিমা। এনাদের অবর্তমানে বাবা, মা কিংবা পরিবারের পূজক তা করেন। পঁঢ়ুয়ার কপালে চন্দনের ফোঁটা দেন মা সহ বড়রা। বেনে দোকান থেকে আনা চন্দনের মতো বিশেষ 'চুয়া' টিকা হিসেবে পরানো হয়। মাথায় ধান, দুর্বা ছড়িয়ে আশীর্বাদ করেন। সেসময় শাঁখ বাজাতে হয়। উলুধ্বনিও দেওয়া হয়। মাথায় এবং গলায় পরানো হয় গাঁদা ফুলের মালা। আর 'আউলা' নামে এক ধরনের তরল পদার্থ ছড়ানো হয় পঁঢ়ুয়া সহ ঠাকুরের গায়ে।

    পঁঢ়ুয়া অষ্টমীতে মামাবাড়ি থেকে আসে নতুন পোশাক। সেইসাথে ধান, দুর্বা, ফুল, চন্দন, মিষ্টিও আসে। নিজের বাড়িতেও কেনা হয় নতুন জামাকাপড়। বাড়ির বিবাহিত পঁঢ়ুয়া ছেলে বা বাড়ির বৌদের মধ্যে কেউ পঁঢ়ু়য়া থাকলে তাঁরও পঁঢ়ুয়া অষ্টমী পালিত হয়। তবে বিয়ের পর মামাবাড়ি থেকে নতুন জামাকাপড় আসাটা বাধ‍্যতামূলক থাকেনা। এক্ষেত্রে বিবাহিত ছেলেদের শ্বশুরবাড়ি আর বিবাহিত মহিলাদের বাপের বাড়ি থেকে নতুন জামাকাপড় আসে। তবে কারো কারো তখনও মামাবাড়ি থেকে আসে। সেইসাথে নিজের বাড়িতে কেনা পোশাকও থাকে। এদিন বাড়িতে বানানো হয় আরসা পিঠা, ক্ষীর, মিষ্টি, পায়েস, গুড় পিঠা, এরসা পিঠা, গড়গড়্যা পিঠা, পোলাও সহ নানা ধরনের আমিষ নিরামিষ পদ। এছাড়াও পুনকা শাক পোড়া, বেগুনপোড়া দেওয়া হয় সন্তানের মঙ্গলের জন্য। পাকা কলা, নারকেল, চিনি, আটা এবং ঘি দিয়ে তৈরি আরসা পিঠে তুলসি মন্দিরে দেওয়ার চল আছে।

    যাঁদের পঁঢ়ুয়া অষ্টমী পালিত হয়, তাঁদের এদিন গরম ভাত, পানতা ভাত, ভুজা বা মুড়ি খাওয়া চলেনা। তবে চিঁড়ে কিংবা দুধ খাওয়া যায়। পুঁড়া বসার আগে পর্যন্ত তাঁদের না খেয়েই থাকতে হয়। এছাড়া কেউ কেউ সরাসরি মামাবাড়িতে গিয়েও পোড়া অষ্টমী পালন করে থাকে। একসময় এইদিন সন্তানের হাত ধোয়ার জন্য জলের পরিবর্তে দুধ দেওয়া হতো। এখন অবশ্য দুধ এভাবে দেওয়া হয়না হাত ধোওয়ার জন্য। বরং এই রীতিটি টিকিয়ে রাখতে হাত ধোওয়ার জলের সঙ্গে কিছুটা দুধ মেশানো হয়।

    পোড়া অষ্টমী'র পূজার জন্য দুখানা পিঁড়ি নিতে হয়। আল্পনা দেওয়া একটি পিঁড়িতে হলুদ গাছের পাতা বিছিয়ে তার উপর এঁড়ে গরুর গোবর দিয়ে তৈরি ছোট ছোট লেছির মতো (নাড়ু) 'উখুল' দেওয়া হয়। এগুলি আসলে গোবর্ধন ঠাকুর। সেখানে ঠাকুরের ৭ টি এবং ঠাকুরাণীর ৯ টি 'উখুল' রাখা হয় পিঁড়িতে। এবার অন্য একটি পিঁড়িতে পুঁড়া বা পঁঢ়ুয়াদের জন্য 'উখুল' দিতে হবে। এক্ষেত্রে ছেলেদের জন্য ৯ টি এবং মেয়েদের জন্য ৭ টি 'উখুল' দিতে হয়। যদি ঐ পরিবারে একের অধিক পঁঢ়ুয়া থাকে, তবে সেই গুণিতকে 'উখুল' দিতে হবে। গোবরের উখুলের উপর রোপণ করা হয় ধানের শিষ এবং দূর্বা। আর ছড়ানো হয় কুলের পাতা এবং মুলোর চারা।

    পিঁড়িগুলিতে সুন্দর করে সাজানো হয় নতুন ধানের শিষ, কাঁচা হলুদ, সিঁদুর, দূর্বা, গাঁদাফুল, কুলপাতা এবং চালবাটা দিয়ে। একটি ঘট বসানো হয়। পাশে থাকে কূলদেবতা। এই উপলক্ষে পুজো করা হয় পঞ্চ দেবদেবী গণেশ, সূর্য, শিব, বিষ্ণু এবং দেবী দুর্গার। সবশেষে সন্তানের মঙ্গল কামনায় পুজিত হন ষষ্ঠীদেবী। এবার নতুন জামা কাপড় ও ঘটে ছুঁইয়ে তা পরানো হয় পঁঢ়ুয়াদের। এবার পরিবারের বড়রা ধান দূর্বা মাথায় দিয়ে আশীর্বাদ করেন। একটা বরণডালা সাজিয়ে তা দিয়ে বরণ করা হয়। অনেকটা ঠিক ভাইফোঁটা বা জামাইষষ্ঠীর মতো। ঝাড়গ্রামের গবেষক ড. মধুপ দে জানান, বাড়িতে তাঁর জন্মদিন পালন হয়না কখনো। বরং এই পঁঢ়ুয়া অষ্টমীই সেই খেদ মিটিয়ে দিত!

    গবেষক এবং লেখক রামামৃত সিংহ মহাপাত্র বাঁকুড়ার উৎকলদের নিজস্ব এই উৎসবের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, "সমীক্ষায় উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী বাঁকুড়া জেলার প্রায় ৩০৫ টি গ্রামে, পুরুলিয়া জেলার প্রায় ৭৪ টি গ্রামে এই উৎকল ব্রাহ্মণ শ্রেণীর বাস রয়েছে। সিমলাপাল এঁদের মূল পদবিগুলি হলো - সৎপথী, মিশ্র, পণ্ডা, পতি, সিংহ মহাপাত্র, সিংহ বাবু, ষন্নিগ্রাহী, মোহান্তী,‌ পাঠক, হোতা, নায়ক, নাথ, দন্ডপাট, পাইন, পাত্র, সুবুদ্ধি, প্রহরাজ, কর, ত্রিপাঠী প্রমুখ। এই শ্রেণীর ব্রাহ্মণেরা মূলতঃ যজুর্বেদীয়। উৎকল ব্রাহ্মণ প্রধান গ্রামগুলিতে পুঁড়া পরব সাড়ম্বরে পালিত হয়"। যদিও অন্যান্য জেলায় এটি আর কেবল ব্রাম্ভণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

    পশ্চিম মেদিনীপুরের শিক্ষক এবং লোকসংস্কৃতির রক্ষক সুদীপ কুমার খাঁড়ার পৌড়াষ্টমীর স্মৃতি এখনও উজ্জল। তিনি বর্ণনা দিয়েছেন, "আমাদের তিন ভাইবোনের মধ্যে দিদি বড়। নিজের অষ্টমী না থাকলেও​ ছোট বেলায় এদিন সকাল থেকে রাস্তার ধারে 'দাঁড়দুয়ারে' (সদর দরজা) অপেক্ষা করতাম মামা কখন আসবেন। সেই সময়ের সহজলভ্য সবচেয়ে দ্রুততম যান সাইকেলে​ অন‍্য কারো মামা রাস্তা দিয়ে পেরোলেই, মোবাইলহীন সেই যুগে, রান্নাঘরে মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে অনুযোগ করতাম 'মোর মামা কতবা আসবেন'? বড়দি নতুন জামাকাপড় পরতেন, আর আমি ও ছোটদি ভাগ বসাতাম মামাঘর থেকে আসা মন্ডামিঠাইতে। এখন আমাদের পরিবারে আমার স্ত্রী ও আমার কন‍্যার অষ্টমী হয়"। তেমনি আরেক শিক্ষক এবং লেখক মনিকাঞ্চন রায়ের আবেগঘন বক্তব্য, "এই দিনটি আমার কাছে সত্যি স্পেশাল। এমনকি জন্মদিনের চেয়েও। সবার তো জন্মদিন হয়, কিন্তু 'পড়ুয়াঅষ্টমী' হয় কতজনের? আজকে আমি শহরের বাসিন্দা হয়ে অনেকটাই আপ্লুত। এখনো আমাদের ঘরে সকাল সকাল এই আয়োজনে হয়তো সেই রীতি নেই। কিছুটা পরিবর্ত হয়েছে। কিন্তু সকাল সকাল এভাবে মিসেস এর আয়োজন, মায়ের আনন্দঘেরা অশ্রু আমাকেও কাঁদিয়ে দিল। ফিরে গেলাম পুরোনো দিনগুলোতে। নতুন প্রজন্মকে এই সংস্কৃতিতে আবদ্ধ করলাম। মেয়ের পড়ুয়া অষ্টমী সেরে এ যেন এক অনন্য  স্মৃতি। জানি না আগামীদিনে আর এই দিন আবার আসবে কিনা। জানিনা মায়ের মুখের 'বাবু' ডাক আর কোনদিন শুনতে পাবো কিনা। সবকিছু চাওয়া পাওয়ার মাঝে থাকলো আজকের এই পড়ুয়া অষ্টমীপুজো"।

    পেজে লাইক দিন👇



  • তিনটি কবিতা / মলয় সরকার
  • তিনটি কবিতা 
    মলয় সরকার


    স্বপ্ন দেখা বুড়ি

    ছেঁড়া চটের ভাঙ্গা ঘরে প্রদীপ জ্বলে না।
    স্বপ্ন দেখে গাল তোবড়া হাড় ছাড়ানো বুড়ি,
    শীতের রাতে কুকুর যেন ছেঁড়া কাঁথায় মুড়ি,
    তুলসী তলা নেইত ঘরে প্রদীপ জ্বলে না।

    স্বপ্ন দেখে অতীত দিনের কোমর কুঁজো বুড়ি, 
    শাঁখ ঘন্টা বাজছে কোথায় ঠাকুর পূজোর ঘরে-
    জমি জিরেত হারিয়ে গেছে সবাই গেছে মরে,
    স্বপ্ন দেখে আজও মনে, চুলে শনের নুড়ি।

    কোন কালে কোন গ্রামে ছিল চোদ্দ ঘরের বাড়ি,
    বাপের ছিল স্বামীর ছিল গোয়াল ভরা ধান,
    কোন আকালে কেমন করে সবই অবসান,
    আপন যারা ছিল সবাই দিয়েছে আজ পাড়ি।

    স্বপ্ন তবু আঁকছে চোখে মায়ার কাজল টান,
    হাড় হাবাতে সব খোয়ানো ডাইনি সে এক বুড়ি-
    হারিয়ে গেছে কোন অতলে পুরানো সম্মান-
    মনের মাঝে তবু যেন ফুটছে সে এক কুঁড়ি।

    তুলসী তলা হারিয়ে গেছে প্রদীপ জ্বলে না,
    সব গিয়েছে বুড়ির তবু স্বপ্ন মরে না।


    পথজ

    পথের ধারেতে জন্ম হয়েছে পথই হয়েছে ঘর,
    আকাশের তলে ভূমিশয্যায় উন্নিদ রাত কাটে,
    পথে পথে আছে উল্লাস তার পথেই তো অবসর।
    সন্ধ্যা যখন রক্তিম ফেনা ছড়ায় সন্ধ্যামাঠে-

    স্বপ্ন হাজার ভিড় করে সেই আঁধার পথের কোণে,
    সাগরের মত মুক্ত জোয়ার খেলে যায় দিবা নিশি-
    প্রাত্যহিকের চাওয়া পাওয়া কিছু ছাপ রেখে যায় মনে।
    পথের মত বৈরাগ্যেই জীবন আজ সন্যাসী।

    তবু কি কখনও বসন্তবায় খেলে যায় খেলা মনে,
    পরভৃতের কুহুসন্দেশ এনে দেয় মধু লেখা,
    উদাসী পথে কি রক্তিম ছাপ এঁকে যায় নির্জনে,
    কি জানি কোথায় উতল হাওয়ার পড়েছে চরণরেখা।



    সপ্তর্ষি

    অনাদি অনন্ত কাল ধরে,
    অনন্ত জিজ্ঞাসা বুকে ধরে
    তাকিয়ে আছে সপ্তর্ষি;
    লক্ষ কোটি অতৃপ্ত হৃদয়ে তোলে
    অনুরণন,
    বিদ্রোহী হয়ে ওঠে
    অসংখ্য জিজ্ঞাসুদৃষ্টি,
    জেগে ওঠে লক্ষ কোটি বুদবুদের মত
    অগণ্য বিদ্রোহী-

    যখনই ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে
    এক পা এক পা করে,
    কালিমামুক্ত আকাশে জেগে ওঠে সপ্তর্ষি।

    লক্ষ কোটি প্রভাতী পাখীর কুজন
    আজ অবসন্ন-
    সত্য আজ বিদ্রোহী জিজ্ঞাসার নবকেতন।
     
    পেজে লাইক দিন👇




  • পতনমনের ছবি /শতাব্দী দাশ
  • পতনমনের ছবি

    শতাব্দী দাশ




    - ছবি তুলে দিবি? 

    -চল্।  দাঁড়া।

    -না, এখন নয়। একটা বাচ্চাকে জড়িয়ে চুমু খাব।  তখন।

    -চুমু! 

    -হ্যাঁ, তাতে কী? 

    -না মানে, করোনার সময়…

    -ধুর, এখন অনেকটা কম। ঠিক আছে। শুধু জড়িয়ে ধরব। 

    -তাতে কী হবে?

    -একটা মেসেজ যাবে না? একটা ক্লাস-ডিসক্রিমিনেশন বিরোধী মেসেজ। 

    -জড়িয়ে টড়িয়ে ধরার আগে কথা বলে নিস্। গ্রামের লোক কীসে ক্ষেপে যায়, তার ঠিক নেই।

    -ক্ষেপবে কেন? আরে! র‍্যাশন নিয়ে এলাম, কাপড় চোপড়… একটা ছবি তুললে ক্ষেপে যাবে?

    কোথাও খটকা লাগে। কোথায়, তা বুঝতে পারি না বলে অস্বস্তি থেকে যায়। ছুটোছুটি করে বন্যা বাচ্চা পাকড়েছে এর মধ্যে। বন্যা বন্যার মতো আগলভাঙা। আমার মধ্যে একটা নিষ্প্রভ কুনোভাব আছে, টের পাই। একটা জড়তা। দেখি বেশি, বলি কম। যা বলি, তাও যেন প্রত্যয়ের উচ্চারণ নয়। অনেক সংশয়। বন্যা উল্টো পুরোপুরি৷ সব বোঝে, সব জানে। নির্ভুল। তার চেয়ে বড় কথা, নির্ভুলতা বিষয়ে নিশ্চিত। যা ভাবে, তাই করে৷ যা করে, তার জন্য যুক্তি মজুত হরওয়ক্ত। কোন্ থিয়োরিকে কোথায় বসিয়ে যে কী প্রমাণ করে দেবে! মুগ্ধবিস্ময়ে দেখি। কিন্তু খটকা থেকে যায়। স্নেহহীন চুম্বন লালাময় ঘিনঘিনে মনে হয়। যদিও এমনটা কোনো ম্যানিফেস্টোতে লেখা নেই৷ কী যেন একটা মনে করতে চাই। অস্বস্তির উৎস হাতড়াই। 

    ঝাঁ করে স্মৃতির তাকের এক কোণায় চার ব্যাটারি টর্চের আলো পড়ে। আঙুরপিসির ফেসবুক অ্যালবাম। ইয়েস। ওটাই কারণ। আঙুরপিসির ভালো নাম মধুমিতা। প্রতিবেশী পিসি। নার্সিং করত। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে প্রণয় হওয়ার পর মাইতি থেকে চ্যাটার্জি হল। দুবছরের মধ্যে হাজরা লেন থেকে ভায়া বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড ঠিকানা বদল হল কানাডায়। সেসময় প্রতি অভিজাত পাড়াতে একজন করে এনআরআই থাকত না। আর আমাদের বাইলেনে তো…

    আমার শৈশব কৈশোর জুড়ে হতশ্রী দীনতা। শিশুমঙ্গলের উল্টো দিকে গোপন একফালি দেশ।   একটা করে ভাড়াঘর সবার, আর সামনে ঢালা উঠোন। বড় হয়ে জেনেছিলাম, ওকে বস্তি বলে। আরও বড় হয়ে জানলাম, বস্তিতে থাকার কথা ইস্কুলে চেপে যেতে হয়। ছুটির পর শিশুমঙ্গল পর্যন্ত বন্ধুদের সঙ্গে এসে হালকা পরে কেটে পড়তাম। যেমন হয় ছুটকো-ছাটকা সারভাইভাল স্ট্র‍্যাটেজি…

    বারো ঘর এক উঠোনের একপাশে একটাই চানঘর। একটাই কলতলা। তাছাড়া একটা পায়খানা, ইউরিনালও একটা। ব্যক্তিগত টয়লেট জেনেছিলাম রাজীবদের বাড়িতে  প্রথমবার।

    অবশ্য আমরা গড়িয়ার ফ্ল্যাটে উঠে গেছি এখন। বাপের আজীবনের সঞ্চয় গেছে এমন এক ঠিকানা খরিদ করতে, যা অভিজাত না হলেও, বস্তি নয়। অথচ দুই বাই এক বাই দুই হাজরা লেন-কে চোরাকুঠুরিতে যতই চালান করে দিই, সে ফিরে ফিরে আসে। যেমন এল, যখন বহুদিন পরে আঙুরপিসিকে দেখলাম ফেসবুকে। আজকাল সকলেই সকলকে অন্দরমহলে ঢুঁ মারতে দেয়। অন্তত যেটুকু প্রদর্শনযোগ্য, সেইটুকুতে ঢুঁ বড় কাঙ্ক্ষিত। মধুমিতা চ্যাটার্জির ঘর-বাড়ি দেখি৷ মাছি পিছলানো আসবাব, মানুষ পিছলানো মেঝে। কৃতি সন্তান-সন্ততি। কখনও চিনতাম পিসিকে, একথা ভেবে আরাম হয়। প্রতিফলিত গরিমা।

    ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর আগে ছবি থেকে ছবিতে পিছোই। আঙুরপিসির কাঁচাপাকা বয়কাট সময় পিছোলে লম্বা কালো কেশদাম হয়ে যায়৷ একটা ছবিতে আটকাই। ছবিটা মূল ছবি থেকে স্ক্যান করা। এ তো হাজরা লেন! দুটো তিনটে বাচ্চার মাঝে আঙুরপিসি। সিঁথিতে সিঁদুর। কানাডায় সেটল করার পর ওই একবারই ফিরেছিল বাপের বাড়ি৷ দামি চকোলেট পেয়েছিলাম। ছবির বাচ্চাগুলোর মধ্যে একজন আমি। ক্যাপশন- 'অ্যামিডস্ট লেস ফরচুনেট চিলড্রেন অফ ইন্ডিয়া।' মিথ্যাচার নেই। সবকটি অক্ষর সত্যি৷ আমরা কবে যেন আঙুরপিসির 'সোশাল ওয়ার্ক' হয়ে গিয়েছিলাম। রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়নি আর।
     
    বন্যারা বলে, দারিদ্র‍্য লজ্জার নয়। দারিদ্র‍্যই শক্তি৷ যার শিকল ছাড়া কিছু হারানোর ভয় নেই...ইত্যাদি। ওদের মতো আমার শৈশবে থরে থরে মহত্তর প্রগতির উপকরণ ছিল না বলে আঙুরপিসির ছবির ক্যাপশন আমাকে যখন তখন তাড়া করে। আমরা রুশ শিশু সাহিত্য পড়ে বড় হইনি। রবীন্দ্রসংগীত বা গণসঙ্গীত না, আমাদের পাড়াতে জুম্মা চুম্মা বা শীতলাগান হত। সকাল বিকেল জল ধরার লাইন, ঝগড়াঝাঁটি। বড় রাস্তার পর অনেক গলি-ঘুঁজি পেরিয়ে আমাদের বাড়ি পৌঁছতে হত। গলিগুলো লুকিয়ে ছিল ভদ্রবিত্ত ঝোলা বারান্দাওয়ালা বাড়িদের পিছনে৷ সে কারণেই হয়ত, নব্বইয়ের দশকে, সর্বহারার সরকারের উত্তুঙ্গ সময়েও আমাদের ওরা খুঁজে পায়নি। আশেপাশে কারখানা ছিল না, তাই ট্রেড ইউনিয়ানিস্টদেরও নজরে পড়িনি। আবার বড় রাস্তা থেকে দূরত্বের কারণে বস্তি ভেঙে হাইরাইজ বা উড়ালপুল হল না৷ অতএব উচ্ছেদ বিরোধীরাও পাত্তা দিল না। পাড়াটা শহরের বুকে আমারই মতো নিশ্চুপ ঘাপটি মেরে আছে একশো বছর। অপ্রত্যয়ী। ভাষাহীন। 

    ওই বাচ্চাগুলো, ওদের কি ভাষা আছে? একটা নয়, দুটো-তিনটে বাচ্চা। ওদের শ্যামলা মায়েরা দাঁড়িয়েছিল লাইনে একটু আগে। মলিন একটা সারি। ছিন্ন শাড়ি সব, তবু ঊর্ধ্বাংশ আবৃত তাদেরই শুধু। ন-দশ বছরের মেয়েরাও ইজের পরে ঘুরছে। ছেলেগুলো হাফপ্যান্ট। পাঁচের নিচে শিশুরা ন্যাংটো মূলত। কারও কারও কোমরে ঘুনসি, শরীরে সুতো বলতে ওটুকুই। নোনা হাওয়া ওদের আদুল গায়ে আদর দিয়ে যাচ্ছে। অথচ সেদিন হাওয়া ছিল নির্মম, সমুদ্র বেপরোয়া নির্দয় ছিল, যেদিন মেটে বাঁধ ভেঙ্গে গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে গেল। 

    মায়েরা অর্ধগোল করে হাঁমুখ শুনছে। হাত-পা নেড়ে বোঝাচ্ছে বন্যা। ওদের আপত্তি নেই বোঝা যাচ্ছে। সপ্রশ্রয় মাথা নাড়ছে। এসবে অভ্যস্ত মনে হয়। দুর্যোগের পরের মাসগুলোতে শুধু আমরাই তো এলাম না। কত গাড়ি, বাস এসেছে কলকাতা থেকে। মুড়ি, ছাতু, চাল, ডাল, ওআরএস দিয়ে ছবি তুলে নিয়ে গেছে। ফোটোশ্যুট কবে থেকে যেন আবশ্যক হয়ে গেছে ত্রাণে। যেন দলিল। সত্যতার প্রমাণপত্র। যেন ছবি ছাড়া কেউ বিশ্বাস যাবে না। বন্যা বলছিল, 'ত্রাণ নয়। বল্ অধিকার। আমাদের আছে, ওদের নেই। আসলে সবারই থাকার কথা ছিল। তাই আমরা দিচ্ছি।' আমি লজ্জা পেয়েছিলাম। ঠিকই তো। এজন্যই কথা বলি কম। কত কী ভুলভাল বলে ফেলি! বন্যা বা বন্যারা জানে। ভুল ধরে ফেলে চটপট। অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সঙ্গে শব্দহীন বশ্যতা প্রত্যাশা করার সম্পর্ক ঠিক কেমন? সে নিয়ে ওরা কখনও শেখায়নি কিছু। তবে বন্যা একদা কনসেন্ট শিখিয়েছিল। আদরে আপত্তির অধিকার ইত্যাদি। সেই যেদিন হাত জড়িয়ে কেঁদেছিল আমার। বলেছিল রানিবাঁধে গিয়ে প্রবালদা ওকে জোর করেছিল। ক্যাম্পেইনে গিয়ে পাশাপাশি শোয় সবাই শতরঞ্জি পাতা মেঝেতে৷ অন্ধকারে বন্যা চেঁচিয়ে উঠতে যেতেই প্রবালদা মুখ চেপে ধরেছিল।  বলেছিল, 'করতে দে, প্লিজ।' প্লিজটা অনুরোধ না আদেশ বুঝতে না পেরে বন্যা চুপ করে গিয়েছিল। আমাকে বলেছিল সকালে। আমি জানতাম, বন্যা প্রবালদাকে পছন্দই করে। কিন্তু অসম্মতির ঘনিষ্ঠতার ঘেন্নায় ওর মুখ ভেঙেচুরে যাচ্ছিল। পার্টির কাছে লিখিত অভিযোগ জানানোর প্রস্তাব ওঠার কিছুদিন পর প্রবালদা অবশ্য প্রোপোজ করল বন্যাকে। বন্যা অভিযোগ জমা দেয়নি শেষতক। খুচরো ব্যক্তিগত ঝামেলা ভুলে আমরা আবার শ্রেণিসংগ্রামে মন দিয়েছিলাম। 

    একটা বোল্ডারের উপর বসে আছে বন্যা। ছেলেমেয়েগুলো ত্রিভঙ্গ দাঁড়িয়ে ওকে ঘিরে। বন্যা ইশারা করছে। শট রেডি। আমি লেন্স ঠিক করি। বন্যা ধমকে বলল, 'মোবাইলে।' ক্যামেরা থেকে ছবি যাবে কম্পিউটারে, সেখানে থেকে মেইলে বা পেনড্রাইভে, সেখানে থেকে বন্যার কম্পিউটারে — অত ধৈর্য নেই। চটজলদি শেয়ার চাই। লাইভ টাইমে প্রায়। বন্যা ভীষণ ঘটমান। মোবাইল ঘেঁটে ক্যামেরা অন করি। এলোমেলো হাওয়ায় বন্যার চুল উড়ে যাচ্ছে। ও যেকোনো ব্যাকগ্রাউন্ডে সুন্দর। এখনও, কেমন মালিন্যর মধ্যে উজ্জ্বল ফুটে আছে! 

    ওদিকে কিছু একটা গোল বেধেছে। অসীমদার সামনে একটা বারমুডা পরা লোক ভুঁড়ি বের করে তড়পাচ্ছে। লোকটা ঘুরঘুর করছিল অনেকক্ষণ। তড়িঘড়ি সারতে বলছিল৷ অসীমদা পাত্তা দিচ্ছিল না। অসীমদার একটা এনজিও আছে এ অঞ্চলে। ঝড়ের পর থেকে ওদের কাছে মাল আসছে উপচে। লোকাল এনজিও বা নেতা না ধরে হুট করে সাহায্যের হাত বাড়ানো যায় না। তাছাড়া কে কী পেল না পেল, কেউ রিপিট পাচ্ছে কিনা, ওদের কাছে হিসাব থাকে। প্রবালদা বলেছিল, বটতলার মোড়ে দুটো বাইক থাকবে অসীমদাদের। বাইকদুটো আমাদের গাড়িকে পথ দেখিয়ে গাঁয়ে নিয়ে যাবে। পুরো সময়টা হেল্প করে দেবে। অসীমদা লোক মন্দ নয়। শুধু সঙ্গে যে শাগরেদ মেয়েটা এসেছে, সে চোখ মটকে দিতেই, তার জন্য মশারি চাইল একটা, মাল নামানোর সময়। মেয়েটার নাম মিতা। সে পছন্দমতো রঙ বেছে নিল।  

    ছবিটা তুলে অসীমদার দিকে এগোই। অসীমদা চিরঞ্জিত টাইপ ভাও নিচ্ছে। 

    -খুচরো ক্যাডারের মুখ লাগি না৷ যা গে তোর নেতাকে বল৷ অসীম মণ্ডল। নামটা বলিস। এমএলএ-র বাড়ি যাওয়া আসা আছে আমার। 

    লোকটা মিইয়ে গেছে। সিচুয়েশন আন্ডার কন্ট্রোল৷ মিতা এখন ভ্রু কুঁচকে বন্যাকে দেখছে। ওর চোখে কিছু আছে... রাতুল গোছগাছ করে নিয়েছে। বিড়ি ফুঁকে রেডি জয়ন্তদাও স্টিয়ারিং ধরল। মিতা আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। বন্যাকে দেখিয়ে বলল,

    -গার্লফ্রেন্ড?

    হেসে 'না' বলি। মিতা আরও ঘন হয়ে আসে৷

    -থ্যাংকু বলতে এলাম। মশারির কালারটা ভালো। মভ আমার খুব প্রিয়। মভ ল্যাভেন্ডার ম্যাজেন্টা ভায়োলেট পার্পল...আপনি আলাদা করতে পারেন? 

    আমি ওর চোখ দেখছিলাম। অনেক রকম চোখ দেখেছি আমি। ছোট না বড়, আয়ত না নরুনচেরা, সেসব দেখি না, মাইরি। পিউপিল, আইরিস, অক্ষিপল্লবের টান — তাও না। পাগলাটে শোনাবে...চোখের মধ্যে আমি রাস্তা দেখি। ভিতরে ঢোকার রাস্তা। এসব কথা কাউকে বলি না৷ উদ্ভট, সাক্ষ্যপ্রমাণহীন, অযৌক্তিক কথা বলা মানা আমাদের রাজনৈতিক চত্বরে। বলবই বা কী? নিজেও কি ঠিক জানি, কী দেখি আর কেমন ভাবে, চোখে?
    মিতার চোখে কিছু ছিল, যাতে ওকে ভরসাযোগ্য লাগে না। আবার বন্যা, ওর চোখ বদলায়। চঞ্চলতা  যখন, তখন তা খাঁটি। মাঝে মাঝে হিসেবও থাকে। ছবি, ফেসবুক, প্রচার, লাইক। বিপ্লবের গরিমা কিসে কত আউন্স বাড়বে, সেসব যে বোঝে — চোখ তা বলে দিচ্ছিল, যখন ও বোল্ডারে বসেছিল। 

    মিতাকে এড়িয়ে এগিয়ে যাই গাড়ির দিকে। বন্যা ফোন কানে গাড়িতে উঠল। প্রবালদার ফোন নির্ঘাত। আমাদের সবচেয়ে ঝকঝকে নেতা। ওর মতো যদি হতে পারতাম! ওর দিকে বন্যা আজকাল মুগ্ধচোখে চায়। চোখের রাস্তা বেয়ে সৎ নিবেদন দেখতে পাই। মাসিকে নিয়ে কিছু বলছে বন্যা। বন্যার মাসি হাইফাই। অসীম মণ্ডলের মতো ছোটখাটো এনজিও নয় ওঁর। নাম প্রায়শ বেরোয় কাগজে৷ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। উপযুক্ত শিক্ষা, বিকাশ আর বিনোদনের ব্যবস্থা করেন তাদের। মৃত্যুর পরে সন্তানের হিল্লে হবে ভেবে বড়লোক বাপ-মায়েরা একটা বড় অ্যামাউন্ট ওঁর অর্গানাইজেশনের নামে লিখে দেয়। মাসি সমস্যায় পড়েছেন মনে হয়। প্রবালদা আশ্বাস দিচ্ছে, দেখে নেবে।

    রাতুল সমুদ্রে যেতে চাইছে। বেলাভূমি পাঁচ-ছ কিলোমিটার বৈ নয়। কাঁচা রাস্তায় গাড়ি আস্তে চলছে। মিনিট দশের মধ্যে হাওয়ায় সমুদ্র সমুদ্র গন্ধ। হুড়মুড় নামছে বন্যা, রাতুল। রাতুলকে বন্যা বলছে, 'একটা ছবি তুলে দে প্লিজ!' এগুলো আজ ফেসবুকে যাবে না। বেমানান লাগবে দুর্গতি আর দুর্গতর পাশে। সময়-সুযোগ বুঝে প্রোফাইল পিক হবে টুক্ করে। সমুদ্রের পাশে কীভাবে দাঁড়ায় মানুষ? ক্ষুদ্রতায় সঙ্কোচ লাগে না?

    ছোটবেলায় বাবা-মার সংগে সমুদ্রে গিয়েছিলাম। একটা ঘরে আমরা তিনজন। অ্যাটাচড বাথ। ওখানে কেউ জানে না, আমরা বস্তিতে থাকি। ওখানে ধরা পড়ার ভয় ছিল না। সমুদ্র দেখে অথচ ভুলে গেলাম এসব ছোট ছোট লজ্জা। সমুদ্রের সামনে আমি আর পার্সোনাল টয়লেটওয়ালা রাজীব দুজনেই বড় ক্ষুদ্র। মজার ব্যাপার। বাবা-মাকে আজকাল প্রাচীন আর এঁদো মনে হয়। অথচ ওদের ছোঁওয়া সহজ হওয়ার কথা ছিল, রাজনীতির পথ বেয়ে৷ বরং হাজরার দুশো স্কোয়ারফিট আমাদের জড়িয়েমড়িয়ে থাকতে বাধ্য করত। 

    ফেরার পথে বন্যা কাচ তুলতে চাইল৷ এসি চলল৷ কুলকুল হাওয়া বেরোচ্ছে। সামনে জয়ন্তদার পাশে বন্যা। আমি আর রাতুল পিছনে। অভ্যেসবশে ফেসবুক খুলি। স্ক্রলিং-এ দৃশ্য এত দ্রুত বদলায় যে কোনোকিছুই ছাপ ফেলে না। সল্টলেকে বস্তি উচ্ছেদের প্রতিবাদ করছেন প্রবাল মিত্র। সংগে ছবি। 'বস্তির মানুষের পাশে, গতবছর বিশ্বকর্মা পুজোর দিন।' টেস্টিমোনিয়াল অ্যাটাচড হেয়ারউইদ।
    নিউজ ক্লিপে মানুষের হাহাকার শুনি। চারঘণ্টার নোটিসে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ভর্তুকি দু-চারটে ত্রিপল আপাতত। বোল্ডারের উপর শিশু-পরিবৃতা বন্যাও আসে। পাশে এঁকেবেঁকে 'অধিকার'-বিলির লাইন। ক্যাপশনে সকালের কথাগুলো: 'ত্রাণ নয়, মানুষের অধিকার'। ওদিকে শেয়ারে শেয়ারে ভাইরাল সন্তানহারা মা। মুর্শিদাবাদে কম্বল না পেয়ে শীতে মারা গেছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু। মাসির হোম না? লোকাল ছেলেরা হল্লা করছে হোমের সামনে। প্রবালদার ফোনে হয়ত হটে যাবে তারা। নাহলে মেরে হটানো হবে। হাহাকার থেকে হাহাকারে সার্ফ করি।

    বন্ধ গাড়ির ঘেরাটোপে আমার ক্লস্ট্রোফোবিক লাগে। গ্রুপে মেসেজ আসে টুং শব্দে। কাল সল্টলেকে উচ্ছেদ-বিরোধী ডেমনস্ট্রেশন। স্লোগান তৈরির দায়িত্ব আমার। আর একটা চিঠি করে লোকাল থানায় জমা দিতে হবে। মিডিয়ায় খবর দেবে রাতুল। বন্যা কলেজ ইউনিয়নগুলোর সংগে যোগাযোগ করবে। সবাই যেন নিজের নিজের পোস্টার নিয়ে আসে। গ্রুপে মুষ্টিবদ্ধ হাতের ইমোজি পড়তে থাকে টুপটুপ। সলিডারিটি এক ক্লিক দূরত্বে আজকাল। অস্বস্তিটা যাচ্ছে না মাথা থেকে। তাকে এড়াতে সামান্য এলিয়ে চোখ বন্ধ করি। হাজরা লেনের বারো ঘর এক উঠোন। ঢেউ এসে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ঢেউ মাথা তোলার সময় বুলডোজারের দাঁত হয়ে যায়। বন্যার গলা শুনতে পাই, 'ছবি, ছবি প্লিজ…' আমি উঁচু থেকে ক্যামেরা তাক করি। একটা উচ্চাকাশীয় জানালা থেকে শট নিচ্ছি৷ যেমন জানালার পাশে নেতাদের বসে থাকতে দেখি। হাই অ্যাঙ্গেল শটে সবকিছু ড্রামাটিক দেখায়, বিশেষত মানুষ। ড্রামাটিক দারিদ্র‍্য আর ড্রামাটিক দুর্গতি দেখি। আমি ভরহীনতা টের পাই। লিফটে নামার সময়ের যে ভরহীনতা। যেকোনো পতনে যে ভরহীনতা। আমি আঁকড়ে ধরতে চাই ডালপালা। উচ্চাকাশীয় জানালা থেকে আমি সটান দুই বাই এক বাই দুই হজরা লেনে পড়ি। সে আমাকে না আমি তাকে — কে যে কাকে বাঁচাতে চাইছে, গুলিয়ে যায়।  
     
    পেজে লাইক দিন👇



  • রাষ্ট্রের প্রবণতা হল তার বাইরে অবস্থিত সব কিছুই গ্রাস করা/সন্দীপ কাঞ্জিলাল
  • রাষ্ট্রের প্রবণতা হল তার বাইরে অবস্থিত সব কিছুই গ্রাস করা

    সন্দীপ কাঞ্জিলাল


    পান্ডবরা পাশা খেলায় প্রথম হেরে যেতে, ধৃতরাষ্ট্র মানবিকতার খাতিরে তাদের আবার ফিরিয়ে আনলেন। ফিরিয়ে আনতে শকুনি যুধিষ্ঠিরকে বললেন - রাজা ধৃতরাষ্ট্র আপনাদের সব ফিরিয়ে দিয়েছেন। তা নিয়ে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। তবে আর একবার পাশা খেলি আসুন। যুধিষ্ঠির তাতে সম্মত হয়ে পুনরায় পাশা খেলতেই, সব খুইয়ে বনবাসে গেলেন। এ কাহিনী আমাদের সবার জানা। এর ভেতর অন্যায় আছে বলে বোধ করি না। কারণ, রাষ্ট্রের প্রবণতা হলো, তার বাইরে অবস্থিত সবকিছুই গ্রাস করা, বা কুক্ষিগত করা। এটাই করে দেখিয়েছেন দুর্যোধন। 

    তাই আমরা দেখতে পাই পঞ্চায়েত, স্কুল, হাটবাজারে, প্রভৃতি জায়গায় নির্বাচনের নামে শাসকদলের দৌরাত্ম্য। কিন্তু আমরা জানি রাষ্ট্র সজীব নয়। রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ভর করে তার শাসন প্রণালীর বৈশিষ্ট্যের উপর। এই শাসন প্রণালী সবার এবং প্রত্যেকের জন্য হতে চায়। অর্থাৎ এই শাসন প্রতিটি ব্যাক্তি ও জনসমূহ, এই দুইয়ের জন্যই হতে চায়।

    আবার দেখতে পাই, মহাভারতের যুদ্ধে ভীষ্ম যখন শরশয্যায় শায়িত, কৃষ্ণ, অর্জুন, যুধিষ্ঠির ভীষ্মের কাছে গেলেন। তখন ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলছেন - রাজা হচ্ছে কালের কারণ। আবার রাজা তার রাজত্বের পরিবর্তন কিংবা ক্ষমতা ধরে রাখতে, নিজেই কালস্বরূপ হয়ে ওঠেন। ভীষ্ম আবার রাজাকে ধর্মস্বরূপ বললেন। তিনি বললেন- "আচারমেব মন্যন্তে গরীয়ো ধর্মলক্ষ্যনম"। আচারই সবচেয়ে বড়ো ধর্মের লক্ষণ। কেউ তার ধর্ম সঠিকভাবে পালন করছে কিনা, তার আচরণ দেখে বোঝা যায়। শাসকের ধর্ম কী? প্রত্যেকের স্বাধীনতা রক্ষা করা। সকলের হিতসাধন করা। বস্তু সামগ্রীর বিলিবন্টন ব্যবস্থা করা। 

    কিন্তু যে নিজে স্বাধীনতার দ্বারা গঠিত নয়, কিংবা যে নিজে স্বাধীন নয়, তার দ্বারা জনসাধারণের স্বাধীনতা রক্ষিত হয় না। যদি সত্যিই সরকার স্বাধীনতা দিয়ে গঠিত হতো, তবে যে কোনো নির্বাচনে আমরা এত রক্তক্ষয়, লুঠতরাজ, ধর্ষণ কিংবা ঘরছাড়াদের মিছিল দেখতাম না। 

    এর পরের বিষয় সকলের হিত সাধন। হিত সাধন মানে আইনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এখানে প্রশ্ন ওঠে - কে শাসন করছে? এই শাসনের উৎস কোথায়? এর বৈধতার ভিত্তি কী? এই সকল প্রশ্ন মাথায় নিয়ে যখন বর্তমান সময়ের কথা ভাবি, তখন দেখতে পাই- রাষ্ট্রের প্রতি আশা আশঙ্কা ভালবাসা ভয় বিতৃষ্ণা এইসব কিছু লগ্নি করে, আমরা মুখোমুখি হয়েছি রাষ্ট্ররূপী এক 'শীতল দানব'-এর কাছে।

    বর্তমানের কিছু মানুষ ভাবে কোনোরকম বেঁচে গেলেই হলো। আর কিছু মানুষ ভাবে-  কোনোরকম টেকা নয় ফুটে  ওঠা। আর ফুটে উঠতে গেলে চাই, এই পৃথিবীর সব রূপ রস গন্ধ ভোগ করা। কারণ তারা ভাবে এসব সম্ভোগ না করলে, দেহ, মন, সরস হবে না। আর দেহ মন সরস না হলে, আমি  বিকশিত হবো কি করে? তারা মনে করে যাদের মন বিকৃত, তারা সত্য ন্যায়ের দোহাই দিয়ে, আত্মনিপীড়নে বাহবার কারণ খুঁজে পায়। সুস্থ মন চায় সম্ভোগ। তাদের ভেতর একটাই রসায়ন কাজ করে, এই আধুনিক জীবনে বাঁচতে গেলে নিজের নায়কোচিত ধাত রাখতে হবে।আধুনিকতার মূল বিষয় হলো হিরো। 
    সেই মনোভাব থেকে এই সমস্ত মানুষেরা যা কাজ করে,  তাদের মধ্যে একটাই উদ্দেশ্য থাকে- নিজেদের পরিপুষ্ট করা। শুধু নিজের নয়, তার আত্মীয়স্বজন, পরিবার, চেনা পরিচিত, সবাইকে পুষ্ট করে তোলে। তারা শাসন ক্ষমতায় থেকে যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তার মধ্যে সাধারণ মানুষের উন্নতি থেকে, নিজের  উন্নতি বেশি প্রাধান্য পায়। তাই তো বর্তমান শাসকের অন্যান্য কার্যকলাপের মধ্যে, এবং এই নিয়োগ দুর্নীতিতে তার প্রতিফলন দেখতে পাই। সরকারের মাধ্যমে কিভাবে মানুষের মুক্তি হবে, তার কথা এরা ভাবে না। এরা ভাবে কি করে নিজেরা বিকশিত হবো। সেই কারণে বর্তমান সরকার বিভিন্ন ধরনের অসাম্য ও অ-স্বাধীনতা সৃষ্টি করছে। 

    কিন্তু এরা জানে না নিজেকে প্রকাশ করতে হলে আগে আপনাকে সমৃদ্ধ করা দরকার। তা না হলে সেই প্রকাশের কতটুকু মূল্য থাকবে। আর এই আত্মসমৃদ্ধির জন্য চাই, প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে ব্যাপক ঘনিষ্ঠ আত্নীয়তা। তা করতে হলে সময়ে সময়ে নিজের অনেক মনোবাসনাকে অগ্রাহ্য অবহেলা অবদমিত করতে হয়। এরা মনে রাখে না আমি মানুষ, তাই মানুষ সংক্রান্ত কোনো কিছুই আমার অনাত্মীয় হতে পারে না। যখন কোনো কিছু বিবেক বোধের দ্বারা পরিচালিত হয়, এগুলি বিকাশের সহায়ক হয়। যখন ব্যক্তি তার প্রাবল্যকে কিংবা তার অনুগতরা, ব্যক্তির সেই প্রাবল্যকে বারবার সামনে এনে অন্য মানুষদের নিজের আয়ত্তে আনতে চায়- তখন সাধারণ মানুষের বিকাশ শুধু ব্যাহত হয় না, নিজেদেরও বিকৃত এবং ভয়ংকর করে তোলে। যার সমাজের পক্ষে, দেশের পক্ষে, সাধারণ মানুষের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। ক্ষমতাবৃত্তিকে মানুষের ক্ষতি করার অভিমুখ থেকে মুক্ত করার জন্য চাই- প্রকৃত শিক্ষা, নীতি-নিয়ম। যা দেশের নেতৃত্বের মধ্যে আজকাল বড়ই অভাব। এগুলোর অভাবে শাসক তখন অপরকে শুধু নিজের উপভোগের বস্তু হিসাবে দেখে। যার প্রমাণ আজকের দিনে আমরা বিভিন্ন নেতা মন্ত্রীর সঙ্গে কামিনী কাঞ্চনের যোগ দেখতে পাই।
    এই সব নেতা মন্ত্রীরা কথায় কথায় ভোটে জেতার দোহাই দেয়। মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ায়। দার্শনিক নিটশের ভাষায়- "গণতন্ত্রে সকলেই তুল্যমূল্য, সেখানে সংখ্যার প্রাধান্যে যারা নিতান্ত নিকৃষ্ট, তারা প্রতিভাসম্পন্ন গুণীজনকে বিনাশ করে গুনহীন গড়পড়তার রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে"।

    কিন্তু গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে গড়পড়তা সাধারণ মানুষের যা করা দরকার, তা স্বীকার করে নেওয়ার সামর্থ্য অধিকাংশ মানুষের নেই। তাদের কাছে সত্যের চাইতে নিরাপত্তা অনেক বেশি কাম্য, নিরন্তর জিজ্ঞাসার চাইতে সুনিশ্চিত উত্তরে তারা অনেক বেশি আগ্রহী।
    প্রথম মানুষকে শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর হিংস্র জন্তু জানোয়ারের মুখোমুখি হয়ে প্রমাণ দিতে হয়েছিল, এ সবের বিরুদ্ধে তার টিকে থাকার ক্ষমতা আছে। সাধারণ আজকের গড়পড়তা মানুষ থেকে তারা ছিল স্বতন্ত্র।  শূন্যতার বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা যাদের, তাদের বলা হয় নিটশে বর্ণিত 'অতিমানব'।  যে অতিমানব মহাভারত বর্ণিত কৃষ্ণের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে, অর্জুন রুপি সাধারণ জনগণকে বোঝাবে, এই অপশাসন দুর্বৃত্তায়ন দূর করতে যুদ্ধ রুপ ধর্ম হতে তোমার বিমুখ হওয়া উচিত নয়। 

    পরিশেষে বলি- জনগণ যদি গণদেবতা হয়, দেবতা কিন্তু কংসের একশত দোষ ক্ষমা করেছিল, এর বেশি নয়।

    পেজে লাইক দিন👇



  • আষাঢ়ে গল্পের আল ধরে /পর্ব ২০ /তন্দ্রা ভট্টাচার্য
  • আষাঢ়ে  গল্পের আল ধরে 

    পর্ব ২০
    তন্দ্রা ভট্টাচার্য 


     " আমার  মন কেমন করে কে জানে কাহার তরে"

    মন এক অদ্ভুত  জিনিস সত‍্যিই আমি  বুঝে উঠতে পারিনা নিজেই জানিনা কার জন‍্য কেন মন খারাপ করে,  মহা মুশকিল  তো মন নিয়ে!  টেলিপ‍্যাথি বলে একটা জিনিস আছে  এক আত্মা আর এক আত্মাকে টাচ করতে পারে। সন্তানের  মন খারাপ  করলে দূরে বসে মায়ের  মন খারাপ করে। প্রেমিকের জন‍্য ব‍্যাকুল প্রণয়য়িনী, প্রেমিকও অস্থির পাগলপারা হয়ে ওঠে।মন হাওয়ার আগে দৌড়াতে  পারে। ইচ্ছে করলেই সারা পৃথিবী  ঘুরে নিতে পারে কয়েক ঘন্টায়। মনে মনে আমরা অনেক  জাল বিছাতে পারি। মন দিয়ে যা কিছু  করি তাই প্রাণ পায় সেই  কাজ সফল হয়।

    "কুসুম নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল, আপনার  কাছে দাঁড়ালে আমার  শরীর এমন করে কেন ছোটবাবু?

    শরীর। শরীর। তোমার  মন নাই কুসুম"  পুতুলনাচের ইতিকথার এই সেই  বিখ্যাত  উক্তি। সত‍্যিই তো প্রেম কি কেবল শরীরে? প্রেমের আবাসভূমি তো হৃদয়ের গভীরে।  মন যদি  স্থান দেয় তবেই তো শরীর  কথা বলবে। 

    " ভেবে নিয়েছ? অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করেছ?" এখনও ব‍্যাক-আউট করার সময় আছে? কাতর কন্ঠে কীর্তি  বললে, "সমস্ত রাত ভেবেছি। কিন্ত কথাগুলো   গুছিয়ে উঠতে পারিনি। আর ভয়ও করছে "। (রচনাবলী সৈয়দ মুজতবা আলী  খন্ড ছয়, পাতা 31)  এই ভাবনা চিন্তা  কে করে?  আমাদের  মনই তো  সচেতনভাবে কিংবা অবচেতন মনে। আমাদের  মন সারাক্ষণ চিন্তা  করতে থাকে। কোনো না কোনো ঘটনাকে    ভাবতে থাকে। সুখ,দুঃখ, বিরহ, ব‍্যথা মনের বিভিন্ন  পরিস্থিতি এক এক সময় এক এক ভাবে ক্রিয়া করে।  মন আর মনের পরিস্থিতি  এবং আমাদের  মানসিকতার  উপর দাঁড়িয়ে  আছে সমাজ সংসার। 

                I think therefore i am

      ফরাসি দার্শনিক  রেনে ডেকার্তের বিখ‍্যাত উক্তি।

    আমার  অস্তিত্বের জানান দেয় আমার  অনুভব।

    I love you এই বাক‍্যটি কাউকে বললাম না তবুও  সে বুঝে গেল আমি  তাকে ভালোবাসি। কিন্তু  প্রশ্ন জাগে সে কি করে বুঝল? তার অনুভবে, তার চিন্তায় এই বোধ হয়েছে যে আমি  তাকে ভালোবাসি। তৈরী হয়েছে দুই হৃদয়ের মধ‍্যে  অদৃশ্য এক বন্ধন।  আমার  অস্তিত্বের যে যে কাজ সেই  ব‍্যক্তিকে অণুপ্রাণিত করবে এবং  প্রমাণ  করবে আমি  তাকে ভালোবাসি।  আমাদের  ব্রেণ তো কখনোই চুপ করে থাকেনা, সে কিছু না কিছু চিন্তা করে। স্থান কাল পাত্র ভেদে চিন্তার পরিসর বা ভাবনা গুলো বিভিন্ন রকম হয়।

    "প্রেম  এসেছিল নিঃশব্দ  চরণে তাই স্বপ্ন মনে হল তারে দিই নি তাহারে আসন " 

     রবীন্দ্রনাথের প্রেমের এই গানটি কেমন বুকের ভেতর মোচড় দেয়। প্রেম অনুভবে ধরা দেয়। তাকে হৃদয়ে সযত্নে আসন পেতে দিতে হয়।প্রেমকে অবহেলা করার সময়  আমরা বুঝতে পারিনা। যেন মনে হয়  নিজের হাতে একটি তাজা গোলাপ কে ছিঁড়ে ফেলে দিলাম। প্রেম যখন বিদায় নেয় তখন  সাংঘাতিক ভাবে জানান দেয়। হৃদয়  টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায়  সে আর ফেরে না।


    "ভালোবেসে সখী  নিভৃত যতনে আমার  নামটি লিখো তোমার  মনেরও মন্দিরে"।

    মনের আর এক নাম মন্দির সেখানেই  তো

     হৃদয়- দেবতার বাস। রাধার অন্তরেই তো আছেন কৃষ্ণ। শ্রীরাধিকা হলেন কৃষ্ণের আরাধিকা। রাধা নামেই কৃষ্ণের মুক্তি।

    " জবাবে চোখ বুঁজে বলে ফেলেছিলাম__ আমি  তোকে চাই লালী।বল কেমন  করে তোকে পাব?

    আমাকে পেতে হলে তোকে দেউড় বাঁশের জঙ্গল পেরোতে হবে।

    তার মানে?

    লালী বলেছিল_ ওটা আমার  শর্ত। ঐ যে বাউড়ের মুখে কাঁটা ভরা বাঁশের জঙ্গল আছে, ওটার পুবধারে তোর জন‍্য অপেক্ষা করব।তুই পশ্চিম থেকে  ঢুকবি পেরিয়ে গেলেই আমাকে পেয়ে যাবি"

    (পাতা 163  শ্রেষ্ঠ গল্প সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ)

    বাবারে বাবা মন পেতে গেলে কত কষ্ট যে করতে মানুষ কে! মন এক জটিল যন্ত্র।

    মনকে সব সময় ভালো  রাখতে হবে, সজীব রাখতে হবে।" কাম কাঞ্চনে মন মলিন হয়ে আছে, মনে ময়লা পড়ে আছে।ছুঁচ কাদা দিয়ে ঢাকা থাকলে আর চুম্বক টানেনা" বল "হে ঈশ্বর আর  আমি  অমন করব না"  "অনুতাপে কাঁদ ময়লা টা ধুয়ে যাবে " (351 পাতা "পরমপদকমলে"  সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় )। পরম ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণের বাণী, তিনি বারবার  মনের ময়লা পরিষ্কারের কথা বলেছেন। সৎ চিন্তা শুদ্ধ চিন্তা না করলে কখনোই মনকে ভালো রাখা যায় না। সব হৃদয়ের মাঝে নারায়ণ আছেন যে নামেই ডাকো তাকে আল্লাহ্, গড তিনি আমাদের  বুকের মাঝেই  বসে আছেন। 

    আমরা যাকে ভালোবাসি যাকে ঘৃণা  করি আমরা কিন্তু  দুই ব‍্যক্তিরই স্বপ্ন দেখি।ভলো এবং  খারাপ  দুই আমাদের  মনের মধ‍্যে বাস  তাই আমাদের  সুখ এবং  দুঃখ  এই সব অনুভব কে নিয়েই আমাদের  চলতে হয়। স্বপ্নেও আমাদের  অবচেতন মন ক্রিয়া করে। ফ্রয়েড বলেন মানব মনের প্রায় নব্বই  শতাংশ অবচেতন অবস্থায় থাকে বাকি দশ শতাংশ  সচেতন থাকে।  

    " কে জানে, মনের ভিতরে, অনেক  গভীরে কিছু  রয়ে গেছে কি না। আকাশের  ভিতরে আবার আকাশ, তার ভিতরেও আবার আকাশ, মনও কি তেমনই, মনের ভিতরে মন,  তার ভিতরে আর একটা, তার ভিতরে আবার ( "পাউডার কৌটোর টেলিস্কোপ"   স্বপ্নময় চক্রবর্তী )।

    মনই আমাদের  বৃন্দাবন আবার মনই আমাদের সবচেয়ে জঘন্য জিনিস। আসলে  মন একটি জিজ্ঞাসা  চিহ্নের নাম।

    পেজে লাইক দিন👇



  • আমি আমার মতো /পর্ব ১ /সুকন্যা সাহা
  • আমি  আমার মতো
    পর্ব ১
    সুকন্যা সাহা 

    মুখবন্ধ 


    জীবন পথ একটা জার্নি। কত মানুষের  সঙ্গে পরিচয় যে হয়  এক জীবনে! কত ঘটনা,কত স্মৃতির মণি মুক্তো ছড়িয়ে থাকে জীবন  পথের  বাঁকে বাঁকে তার ইয়ত্তা নেই ! জীবন  সমুদ্রের তল থেকে সেইসব মণি মুক্তো তুলে এনে  মালা গাঁথার চেষ্টা এই লেখাগুলি।
    প্রত্যেক মানুষের জীবন  স্বতন্ত্র। নিজস্বতায়  ভরা ... এক্কেবারে unique।কারো সঙ্গে কারো জীবন মেলে না ... তাই  এই সব কটি লেখারই মূল সুর একটাই ... আমি আমার মতো ... এত খানি জীবন পথ পার হয়ে এসে ফিরে দেখাও  বলতে পারেন। কত মানুষের সঙ্গে যে
    আলাপ  হয় একজীবনে!কত বিচিত্র অভিজ্ঞতার  ঝুলি!তার ইয়ত্তা নেই... বিশেষতঃ আমরা  যারা মানুষ দেখি,তাদের কাছে এ এক পরম পাওয়া ... ছোটোবেলা থেকে আজ অবধি জীবনের নানা ঘটনাকে ঝাড়াই বাছাই  করে এই স্মৃতিগদ্যের স্বল্প পরিসরে নিয়ে আসা 
    বড় সহজ কথা  নয়... তবুও যেসব স্মৃতি, যেসব মানুষ, আমার মনে গভীর দাগ কেটে গেছে তারই  কিছু কিছু এখানে তুলে আনার চেষ্টা করেছি মাত্র ।আপনাদের  ভালো লাগলে সে হবে আমার পরম পাওয়া ...

             নিজের মূল্যায়ন করিনি কখনও ; বোধহয় করাও যায় না ... তবু আয়নায়  নিজেকে দেখতে  গেলে বলতে হয় ঠোঁটকাটা মানুষ, সোজা সাপ্টা,সাংসারিক ঘোর প্যাঁচ থেকে শত হস্ত দূরে। তাই রাত্তিরে এখনও শান্তিতে ঘুমোতে পারি , হাসতে পারি অনাবিল, হিসেব কষে জীবন চালাতে পারি না ...
    সব মিলিয়ে আমি আমার মতো ... আর সেই আমির জীবনের নানা ঘটনা, নানা মানুষের চরিত্র উঠে আসবে আজ  থেকে এই ধারাবাহিকের পাতায় পাতায়...বাকিটা আপনাদের ওপর ছেড়ে দিলাম...

              একজন  মানুষের জীবদ্দশায় কত লোকের সঙ্গে যে আলাপ হয়! প্রতিটা লোকের সঙ্গে আলাপ মনের মণিকোঠায় রেখে  যায় কিছু স্মৃতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে  সেই স্মৃতির উজ্জ্বল রঙ কিছুটা ফিকে হয়ে আসলেও প্রতিটা স্মৃতির বর্ণ গন্ধ অনুরণন এক্কেবারে আলাদা স্বতন্ত্র । এই ধারাবাহিকে আমি চেষ্টা করেছি
    কাগজে কলমে সেই অনুরণনের কিছু কিছু অংশ তুলে ধরার। মনের মণিকোঠার  গহ্বর  থেকে বের  করে আনতে সেইসব নানান বিচিত্র রঙের স্মৃতির ঝিলিমিলি।
             
            আমার আমি... নয় নয়  করেও পঁয়তাল্লিশ  বছর কাটিয়ে  দিলাম জীবনের এই আমিটাকে নিয়ে। এখানে যেন দুটো আমি।আমি প্লাস আমি।একটা আমি ধীর, স্থির,শান্ত তো আরেকটা আমি উচ্চকিত ; চঞ্চল।একটা আমি দুর্বার গতিতে সামনের দিকে এগোতে চায় অথচ আরেকটা আমি গোধূলিবেলায় ফেলা আসা দিনের 
    স্মৃতি রোমন্থন  করে । তবে এই দুটো আমির কেউই একে অপরের বিরোধী নই। অতীতকে ভুলে  নয় ... অতীতের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে সঞ্চিত পালকের  সাহায্যেই ভবিষ্যতের পথ  চলা... এটাই আমার আমি ...আমি এক্কেবারে আমার নিজের মতো... এর কোনো কার্বন কপি হবে না। সেই আমার আমির জীবনের পথ চলার নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে এই লেখার মালা...
    ভালো লাগল কিনা আপনারাই বলবেন ... 
                                                                       

    পর্ব ১

    ছেলেবেলার গন্ধ ...

    শহরের মধ্যে হলেও আমাদের ছোটোবেলায় গাছ গাছালির পাট একেবারে উঠে যায়নি ... তখনও পাড়া ব্যাপারটা ছিল... গগনচুম্বী  অভ্রভেদী ফ্ল্যাট বাড়ি তখনও গ্রাস করেনি মধ্যবিত্ত পাড়ার  নিজস্বতা। প্রত্যেক বাড়ি সংলগ্ন কিছু গাছ গাছালি থাকত।
    আমাদের বাড়ির সামনেই ঠিক ঢোকার গেটের মুখে ছিল একটা শিউলি গাছ ... জল,বাতাস আর আলোর অভাব ছিল না বলেই হোক বা মাটিতে গজিয়ে উঠেছিল বলেই হোক গাছটা বেড়ে উঠেছিল তরতর করে।ছোটো থেকেই শিউলি গাছটা ছিল এক্কেবারে  আমার বন্ধুর মতো ।
    কত গল্প,গান,অভিমান ... পুজো আসলেই ছোট্ট ছোট্ট সাদা ফুলে ভরে উঠত গাছের ডাল ... আর কি ঘ্রাণ ... সন্ধ্যে বেলা খেলা থেকে ফেরার সময় বুক ভরে নিতাম শিউলি ফুলের সুবাস ।রাতে বালিশের তলায় লুকিয়ে রেখে দিতাম শিউলি ফুল । বিছানায় ঘ্রাণ হবে । ঠাম্মা বলতেন বালিশের তলায় ফুল রাখিস না ... অত তীব্র মিষ্টি গন্ধে সাপ আসতে পারে! ধুর!কে শোনে কার কথা ! বর্ষাকালে ঘন নরম সবুজ কচি কচি পাতায় ভরে উঠত গাছের গা। আর পাতায় পাতায়
    সবুজ শুঁয়োপোকার ছড়াছড়ি। একদম বোঝাই যেত না। মহালয়ার দিন তো বন্ধুদের সঙ্গে রীতি মত কম্পিটিশন চলত কে কত শিউলি ফুল কুড়োতে পারে তার ... একদিকে রেডিওতে মহিষাসুর মর্দিনী অন্য দিকে শিউলি ফুল কুড়ানোর কম্পিটিশন। সাদা রুমালে জড়ো হত অজস্র শিউলি ।
    ফুল শুকিয়ে গেলেও রুমালের গায়ে লেগে থাকত কমলা বোঁটার ছাপ আর সুঘ্রাণ ...শিউলি  গাছটা  ছিল  আমার মান অভিমানের সাথী; কথা  বলার বন্ধু। কেউ না বুঝলেও আমি ওর কথা বুঝতাম ঠিক। সেবার ধরা পড়ল চোখ খারাপ।ছোট্ট একটা মুখে এই ইয়াব্বড় ধ্যাবড়া একটা চশমা। একদিন শিউলি গাছটাকে 
    জিজ্ঞেস  করলাম কেমন লাগছে গো নতুন চশমায় ? কিছুক্ষণ মুখের   দিকে চেয়ে চুপ করে রইল শিউলি গাছটা  তারপর গা দুলিয়ে জবাব দিল ..."উঁহু একদম বিচ্ছিরি... ঘরে এসে সে কি কান্না আমার ...মোটা কালো ফ্রেমের চশমা একদম যে মানাচ্ছে না আমায়! বলতে না পারলে কি হবে;সব বুঝতে পারতাম আমি ...
    একদিন ঠাম্মা  বলল ,"কাল থেকে সকালবেলা শিউলি পাতার রস  খাবি ।"
    না...না...বিচ্ছিরি তেতো... অজুহাত দিলাম আমি ।
    আসল কথা হল পাতা ছিঁড়লে শিউলি গাছটার যে ব্যথা লাগবে!আমার বন্ধু না ? 
    আমার সঙ্গে পাল্লা  দিয়ে লম্বা হয়ে উঠছিল শিউলি গাছটাও ... কত্ত ডাল!  পাতার কি বাহার !
    শরতকালে ডালে ডালে পাতার ফাঁকে ফাঁকে  ছোট্ট ছোট্ট মুক্তোর  মত ফুল... কি সুন্দর !
    একবার হয়েছে কি মামার বাড়ি  গেছি দিন দশ -পনেরোর জন্য । বাড়ি ফিরে গেট দিয়ে ঢুকতে গিয়ে একদম স্তব্ধ হয়ে গেলাম । কোথায় গেল? এখানেই তো ছিল!!ভালো করে খেয়াল করতেই দেখলাম...এক্কেবারে গোড়া থেকে পুচিয়ে কেটে দিয়েছে... পাশের বাড়ির পাঁচিল তৈরি হচ্ছে... এক দৌড়ে বাড়িতে ঢুকে ঠাম্মাকে ঝাঁকাতে থাকলাম, “বল,আমায় না জিজ্ঞেস করে কেন কাটলে আমার শিউলি গাছ? জানো না আমার বন্ধু ছিল?” 
    ঠাম্মা বলল," আরে ছাড় ছাড়!দেখো পাগল মেয়ের কান্ড!!আমি কেটেছি নাকি? পাশের বাড়ির পাঁচিল তৈরি হবে না?” আবার ছুটে গেলাম বাড়ির সামনে...দুচোখে উপচে পড়ছে জল...সেই বিচ্ছিরি কালো ফ্রেমের চশমার ওপারে অভিমানী দুটো চোখ জলে ভেসে যাচ্ছে... শিউলি গাছ তুমি কি দেখতে পারছ? শিউলি গাছ?
     
    (ক্রমশঃ)
     
    পেজে লাইক দিন👇



  • তিনটি কবিতা /গৌতম বাড়ই
  • তিনটি কবিতা 
    গৌতম বাড়ই

    কবিতা-১

    ম্যাজিসিয়ান


    আজকাল যে শূন্যতার ভিতর বাস করি 
    হয়ত তুমিও সেই শূন্যতায় প্রহর গোনো
    যে ভাষা পেয়েছিলাম আমি
    তুমিও পেয়েছ সেইভাষা
    তবুও কেন 
    দ্বিখণ্ডিত হল আমাদের চিন্তা চেতনা ভাবনা
    কেন পথ গেল পাল্টে 
    তারচেয়ে ভালো শোনো ম্যাজিসিয়ানের গল্প

    দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে চেয়ার এগিয়ে দিতেই
    লোকটি আমূল বদলে গেল 
    প্রথমেই পাল্টালো চোখের ভাষা
    এই ভাষাতেই প্রথমে সন্মোহিত হয় সকলে 
    তারপর পোশাকের রঙ 
    দেহের বর্ণে এলো রামধনু 
    আগুন ঝরছে মুখে
    এত আগুন তো চাইনি ম্যাজিসিয়ানের 
    আমরা পুড়ছি হু হু  এই অনলে 


    সেই ম্যাজিসিয়ানটা বলছে--
    আমাদের কণিষ্ক মুন্ডুকাটা 
    আমাদের হর্ষবর্ধন দানধ্যান করেন
    আমরা গাভীর পেছনে চরি অনবরত 
    আরও কঠিন সেই অজগরব্রত 

    ম্যাজিসিয়ানটা এখনও চেয়ার ছেড়ে উঠে বসেনি
    শেষ খেলাটা দেখাবে বলে 
    তার পায়ের কাছে বসে কিছু বাঘ
    কবুতররা রুমালের মতন নরম তুলতুলে 
    গ্রীবা তুলে বসে 

    সহকারী বারবার ঘোষণা করছেন--
    আজকের এই ভয়ংকর খেলা দেখতে হলে
    দর্শকদের ভয়ানক রকমের চুপ করে থাকতে হবে
    কারণ 
    এই খেলার শেষে হয় ম্যাজিসিয়ান বাঘের পেটে
    কিংবা বাঘগুলি বেড়াল হয়ে যাবে 

    ঘোষণার শেষে চারিদিক বিভিন্ন রঙের 
    আলোর খেলায় মেতে উঠল
    ম্যাজিসিয়ানের রামধনু রঙ ঢেকে গেল 
    সূচপতনের নিঃশব্দতা 

    খেলা শুরুর পর 
    কবুতররা বকম বকম করে উঠলো
    হঠাৎ সেই বিশ্বস্ত চেয়ার 
    ম্যাজিসিয়ানকে ছুঁড়ে ফেলে দিলো
    বাঘের মুখে 
    এখন সেই মঞ্চে হালুম  করে দু-চারটি 
    বাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে 
    দর্শকরা হাততালি দিলেন খুব জোরে-জোরে

    ম্যাজিসিয়ান যাদুলাঠি নাড়তে নাড়তে 
    ছায়াপথ ধরে বর্ণহীন নিরুদ্দেশ হলেন 

    তারপর

    চেয়ার অলক্ষ্যে দাঁড়িয়ে হুঙ্কার ছাড়লো
    এ যাবৎকালের সমস্ত খেলার আসল কারিগর 
    আমি একমাত্র আমি 
    ম্যাজিসিয়ানরা পাল্টে যায় বারবার 



    সহজ মানুষের কাব্যকথা এবং দিনলিপি 

    বাবা গ্রামে থাকেন। আমি থাকি নগরে। সেটাও ভিনরাজ্যে। বাবা হতভাগা এবং অভ্যস্ত। দারিদ্র্য গায়ে মেখে সামান্য শাক- ভাত আর সামান্য চাষবাস নিয়ে বেঁচে আছেন। আমার একমুঠো স্বপ্ন আর বাবার স্বপ্নছাড়া জীবন। আমাদের এই জীবনের মাঝে মা একটি করুণরসের ধারা। বাবা তার তোবড়ানো গালে অনিশ্চিতের হাত বোলাতে থাকেন। আর আমাদের পঞ্চায়েত ঝড়- বৃষ্টি- মেঘ করে এলে গ্রামের লোকেদের দিকে হাসি-হাসি মুখ করে বলেন, "বুঝলে গো তোমরা, ভয়ানক এক ঝড় আসছে। আমার দোতলা বাড়ির ছাদ আর স্কুলের পাকা বিল্ডিং সাতদিন থাকা-খাওয়া ফ্রি তোমাদের।" 
    ঝড় আসে, বাবা আরও নিঃস্ব হয়। আমি আরও আঁকড়ে ধরি ভিনরাজ্য, বেঁচে থাকবার জন্য। মায়ের কোলটি নড়বড় করে। আমাদের গ্রামে দেখবার মতন একটি মাত্র জিনিস হয়েছে ব্রিটিশ যুগের পরে--- আমাদের পঞ্চায়েতের প্রাসাদোপম বাড়ি।



    আগুন যখন বুকের ভেতর জ্বলে

    তখন ফাগুন এনে লাভ কী?
    বিষণ্ণ যখন মন 
    মেঘ করেছে বলিস 
    একটি দুটি ফুলকি উঠছে ফুটে আকাশে 
    আগুন নেভে হা-কপালের বাতাসে ? 

    আগুন যখন বুকের ভেতর জ্বলে 
    মৃত্যু তখন শিয়র ছুঁয়ে যায় 
    পুরো আকাশ জুড়ে হাসে চাঁদ আর তারায় 
    হাড়ির ভেতর ভাত 
    আমরা বাড়িয়ে রেখেছি দু-হাত 
    তাই
    এখন রাস্তাও জলভাত 

    ব্রহ্ম সত্য জীবন সত্য আর সত্য কী !
    কুরুক্ষেত্র ধ্রুবসত্য তার উপরে কী?

    পেজে লাইক দিন👇



  • যেতে যেতে পথে-৪৬/রোশেনারা খান
  • যেতে যেতে পথে

    রোশেনারা খান

    পর্ব ৪৬

    ক্রমশ ভিড় বাড়তে শুরু করল। বাস এসে দাঁড়াল ১০ টা ৪০ মিনিটে। হুড়োহুড়ির কোনো ব্যপার নেই ,সবাই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেই মতই বাসে উঠে ড্রাইভারের কাছে টিকিট কেটে জানালা ধারে বসলাম। এই বাসের যাত্রাপথ হল নটিংহাম থেকে ওয়ার্কশপ। ওয়ার্কশপ পর্যন্ত রিটার্ন টিকিটের মূল্য ৫ পাউণ্ড। ১০ পাউণ্ড দিয়ে আমরা দুজনের দুটি টিকিট কেটে নিয়েছি। শহর ছাড়িয়ে বাস ছুটে চলেছে গ্রামের বুক চিরে। রেপসিড কেটে নেওয়াতে দুপাশে নেড়া মাঠ দেখতে পাচ্ছি। এক জায়গায় দেখলাম সবুজ আলুক্ষেতে জল সিঞ্চন করা হচ্ছে অদ্ভুত কায়দায়। স্প্রিং এর সাহায্যে অনেক ওপরে উঠে কুয়াশার মত ছড়িয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে শূকরের ফার্ম, ছোট ছোট গ্রাম ও জঙ্গল দেখতে পাচ্ছি। বাসের প্যাসেঞ্জার যে যার গন্তব্য স্থানে নেমে যাচ্ছেন। আমরা বুঝতে পারছিনা কখন বোতাম টিপব। জানা না থাকলে মুসকিল। কারণ আগের স্টপেজ ছাড়ালেই পরের স্টপেজে নামার জন্য হাতের কাছে থাকা বোতামে চাও দিতে হবে। খান সাহেব পাশের এক ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন, আরও দুটো স্টপেজের পর। কিন্তু সেই নিগ্রো ছেলেটি ড্রাইভারকে কি জিজ্ঞেস করে পরের স্টপেজে জঙ্গলের মধ্যে নেমে গেল। দুটি জাপানি যুবকও ড্রাইভারকে কী যেন জিজ্ঞেস করে সিটে  এসে বসল। পিছন থেকে বাংলা কথা শুনতে পাচ্ছি। ভিক্টোরিয়া বাস ষ্টেশনে তিনজন বাঙালি ছেলেমেয়েকে দেখেছিলাম, ওরাই বাংলায় কথা বলছে।
          ইতিমধ্যে আমাদের বাস সেরউড বনের ভিতরে এসে দাঁড়াল। ভদ্রমহিলা আগের স্টপেজেই জানিয়ে দিয়েছিলেন এর পরেই সেরউড ফরেস্ট। দেখলাম বেশকিছু বাস ও প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের সঙ্গে অনেকেই এখানে নামলেন। সেই বাঙালি ছেলেমেয়েগুলিকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, ওরা বাংলাদেশী। নটিংহামে থাকে। সামান্য পথ হেঁটে আমরা ভিজিটর সেন্টারে পৌঁছালাম। এখানে বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট, ইনফরমেশন সেন্টার, টয়লেট, মিউজিয়াম, গিফটসপ ইত্যাদি রয়েছে। একটা ওক গাছের তলা ঘিরে কাঠের বেঞ্চ করা আছে। সেখানে অনেকে  বসে আছেন। খান সাহেব এখানে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই ফেরার সময় ঠিক করে ফেলেছেন।  ১টা ৪৬ শে ও ৩টে ৩৫ শে নটিংহাম ফেরার বাস রয়েছে।  উনি শেষ বাসে ফেরার ঝুঁকি নিতে চান না, ১টা ৪৬ এর বাসেই ফিরবেন। এখন ১২টা বাজে। লেডিস টয়লেট দেখতে পাছিনা, এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে পেলাম ইনফরমেশন সেন্টারের পাশেই লেডিস টয়লেট রয়েছে। টয়লেটে ঢুকতে আবার বাংলাকথা শুনতে পেলাম পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি দুজন সাড়ি পরা ভদ্রমহিলা একটি হুইলচেয়ার ধরে দাঁড়িয়ে কথা  বলছেন। এগিয়ে গিয়ে আলাপ করে জানলাম,  বছর ৫০ এর ভদ্রমহিলা ডাক্তার, সঙ্গের বৃদ্ধা ওনার মা। ওনারা ডার্বিতে থাকেন। ছেলে বারমিংহাম ইউনিভার্সিটিতে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছে। তাকে ওখানে ড্রপ করে মাকে নিয়ে সেরউড ফরেস্ট বেড়াতে এসেছেন। আমি জানতে চাইলাম কখন ওনারা ফিরবেন? ভদ্রমহিলা জানালেন, সঙ্গে গাড়ি আছে, বারমিংহাম থেকে বিকেলে ছেলেকে তুলবেন, ফেরা নিয়ে তাড়া নেই। আরও বললেন আমরা চাইলে আমাদের নটিংহামে ড্রপ করে দেবেন। আমি খান সাহেবকে ডেকে ওনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলাম। ভালই হল, বাস ধরার তাড়া রইল না। একটু বেশিক্ষণ  বেড়ানো যাবে। তাছাড়া উনি আগে একবার এসে ছিলেন, তাই দেখার জায়গাগুলো চেনেন।

          দেখার বলতে মানুষ মূলত এখানে হাঁটতে আসেন। সবুজ জঙ্গলের পথে  পায়ে হেঁটে কিম্বা সাইকেলে মানুষ বেড়ান। ভদ্রমহিলা, মানে মিসেস দত্ত ইনফরমেশন সেন্টারে গিয়ে খোঁজ নিয়ে এলে ম্যাপ দেখে আমরাও হাঁটতে শুরু করলাম। গভীর জঙ্গলে বিশাল আকৃতির ওকগাছ আর বার্চগাছ(Birch tree)বেশি সংখ্যায় রয়েছে। জনশ্রুতি রবিন হুডের বাহিনী ওকগাছের গুড়ির গর্তে লুকিয়ে থাকত। গুড়ির গর্তগুলো এত বড় আকারের যে সেখানে অনায়াসে একজন মানুষ লুকিয়ে থাকতে পারে। এই জঙ্গলের বিশেষ আকর্ষণ ‘মেজর ওক’। হাঁটতে হাঁটতে আমরা সেই ওক গাছের সামনে এসে তারের বেড়ার গা ছুঁয়ে দাঁড়ালাম। কাছে পৌঁছাতে পারলাম না। পাশে ফাঁকা জায়গায় পেতে রাখা কাঠের বেঞ্ছে বসে বয়স্ক মানুষ কয়েকজন রোদ মাখছেন, ওঁদেরই নাতিনাতনি হবে হয়ত, কয়েকটা ছোট ছেলেমেয়ে  রবির হুডের মত মাথায় ক্যাপ পরে হাতে তিরধনুক নিয়ে নকল যুদ্ধে মেতেছে। আবার আমাদের চোখ এসে স্থির হয়ে জায় মেজর ওকে। আমাদের মত আরও কয়েকজন পাশে দাঁড়িয়ে  অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন প্রায় হাজার বছরের  প্রাচীন ওক গাছটির দিকে। গাছের বিস্তৃত শাখাপ্রশাখাগুলিকে লোহার পাইপ দিয়ে  সাপোর্ট দেওয়া রয়েছে(১৯০৯ সাল থেকে)।গাছের মোটা কাণ্ডগুলির ওপর পিচের মত কিছু চাপান দেওয়া আছে।১৮০০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই ওক গাছটিকে বলা হত ‘ককপেন ট্রি’। এর তলায় মোরগ লড়াই হত, তাই এই নাম ছিল।  ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে মেজর হেম্যান রুক নামে একজন প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ এই জঙ্গলের প্রাচীন গাছগুলির ওপর একখানি বই লিখেছিলেন।সেই জন্যই সব থেকে প্রাচীন এই ওক গাছটির নাম হয় ‘মেজর ওক’।
          বাসে দেখা জাপানি ছেলেদুটি মনোযোগ দিয়ে সাইন বোর্ডের লেখা  পড়ছে। এখানে পাখির কলতান ছাড়া আর কিছু শোনা বা দেখা যাচ্ছে না। সেরউড শব্দের অর্থ ‘বৃক্ষময় ভূমি’। জঙ্গলের নাম শুনলে মনে হয়  এখানে অনেক বাঘ,ভাল্লুক ইত্যাদি হিংস্র পশুর বাস। বোর্ডের ছবি দেখে বুঝলাম এখানে হরিণ, কাঠবিড়ালি, বাদুড়, খরগোশ, বিভিন্ন ধরণের পাখি ও কীটপতঙ্গ রয়েছে। একটি পাথরের প্লেটে লেখা রয়েছে, ‘আমার গুড়িগুলি গর্তে ভর্তি। এই গর্তে বিভিন্ন প্রজাতির কীটপতঙ্গ ও প্রাণী ঘুমচ্ছে। আমার ওপর চড়লে ওরা ধ্বংস হয়ে যাবে’।
          আমরা যেখান থেকে হাঁটতে শুরু করেছিলাম, প্রায় একঘণ্টা পরে সেখানেই ফিরে এলাম। আরও কিছুক্ষণ হাঁটা যেত, কিন্তু মাসিমা, মানে মিসেস দত্তর মায়ের কথা ভেবে বেশি দূর গেলাম না। একটা জায়গায় বসে সঙ্গে নিয়ে আসা খাবার খেয়ে মিউজিয়ামে ঢুকলাম। মিসেস দত্ত ও মাসিমা আগেই ঢুকে ছিলেন। ওখান থেকে বের হয়ে একটা গিফট সপে ঢুকলাম। কয়েকটা জিনিস কিনে একসঙ্গে সবাই বেরিয়ে এলাম। এরমধ্যে মিসেস দত্তর ছেলে ফোন করে জানায়,  তার আরও ঘণ্টাদুই দেরি হবে।
          উনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন ‘রুফোরড কাউনট্রি পার্ক’এ সেরামিক  ফেস্তিভ্যাল হচ্ছে। আমাদের ফেরার পথেই পড়বে। তাই ওখানে যাওয়া ঠিক হল। অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা ওই পার্কে পৌঁছে গেলাম। জঙ্গলের মধ্যে গাড়ির সমারোহ দেখে বুঝলাম এখানে প্রচুর মানুষের সমাগম হয়েছে। মেনরোড থেকে  জায়গাটা কিছুটা ভিতরে। গুমটির মত ছোট্ট টিকিট ঘর থেকে টিকিট কেটে আমরা ভিতরে গেলাম।  মাসিমার দেখার ইচ্ছে ছিল না। তাই ওখানেই বসে পড়লেন। এরই এক ফাঁকে মাসিমা তাঁর কষ্টের কথা একরাশ বিরক্তি সহকারে আমার কাছে উগরে দিলেন। ওনার স্বামী পেশায় ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। প্রায় বিদেশ টুর করতেন। দুই ছেলেমেয়েকেই বিদেশে পাঠাতে চেয়েছিলেন এবং পাঠিয়েওছেন। মাসিমার সঙ্গে কোনো আলোচনা করেননি। মেয়ে ডাক্তার, সে এখানে থাকে। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, সে থাকে আমেরিকায়। স্বামী মারা গেছেন ৫ বছর পূর্বে। কলকাতার বাড়িতে একা থাকতেন কাজের লোকের ভরসায়। বাথরুমে পড়ে গিয়ে কোমরে  চোট পেয়েছেন, তাই হুইল চেয়ার সঙ্গি। দেশে আত্মীয়স্বজনরা খোঁজ রাখেন, কিন্তু কারো পক্ষে সবসময় থাকা সম্ভব নয়। তাই ওনাকে তাঁতির মাকুর মত  কলকাতা থেকে ব্রিটেনে ৬ মাস, আবার দেশে ফিরে আমেরিকা যাওয়া। ওখানে ৬ মাস কাটিয়ে আবার দেশে ফিরে ব্রিটেন যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া। এই বয়সে ওনার এরকম জীবন ভাল লাগছে না। তাঁর দেশে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুদের সঙ্গে থাকতে ভাল লাগে। এখানে মেলামেশার লোক নেই। মেয়ে, জামাই, নাতি, সবাই বেরিয়ে গেলে তাঁকে সারাদিন একা কাটাতে হয়। অনেক কষ্ট ওনার। শুনে বুঝলাম যারা  ছেলেমেয়ে বিদেশে থাকলে গর্ব অনুভব করেন, তাদের এই হয়রানি ও কষ্টের কথাগুলো ভেবে দেখা দরকার। তবে ছেলেমেয়েরা নিজেরা বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তাদের বাধা না দেওয়া উচিত। কারণ তাদের নিজের নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাদের আছে।
          একটা ভাঙ্গা মঠের ভিতরে বাইরে, পার্কের বিভিন্ন জায়গায় সেরামিকের  জিনিস সাজানো আছে। বিভিন্ন কলেজের ছাত্রছাত্রীরা তাদের তৈরি জিনিস সাজিয়ে নিয়ে বসেছে। এক জায়গায় দেখানো হচ্ছে কী ভাবে সেরামিকের জিনিস তৈরি করা  হয়। এক এক জন এক এক রকম আর্টের ওপর কাজ করেছেন। এত সুন্দর সব জিনিস যাকে বলে চোখ জুড়নো, মন ভোলানো। বিভিন্ন আকৃতির বিভিন্ন আকারের পাত্র যেমন রয়েছে, তেমন আদ্ভুত আকৃতির সুন্দর সুন্দর শো-পিসও রয়েছে। কী জানি কত দাম? জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি। তবে মনে মনে মিসেস দত্তকে ধন্যবাদ জানালাম এইরকম একটি অভিনব মনোমুগ্ধকর মেলায় নিয়ে আসার জন্য।
            একটা আশ্চর্য জিনিস দেখলাম, ছাদ উড়ে যাওয়া মঠটি ভাঙ্গাচোরা হলেও টাওয়ারের ওপর মস্ত ঘড়িটা অক্ষত এবং এখনও সঠিক সময় দিচ্ছে। ভিতর  থেকে একটা প্যাসেজ দিয়ে যখন বেরিয়ে আসছি, কিচিরমিচির আওয়াজ শুনে ওপরে তাকিয়ে দেখি ছাদ ও দেওয়ালের কোনায় ছোট ছোট এক ধরণের পাখি মাটি দিয়ে বাসা বানিয়েছে। বাসা থেকে মুখ বের করে বসে থাকা তিনটি পাখি আকারে কিছুটা চড়াই পাখির মত হলেও রং আলাদা এবং গোলগাল চেহারা।
        গাইড বুকে দেখেছিলাম এই পথে আরো কিছু দেখার জায়গা রয়েছে। কিন্তু সে সব দেখার মত হাতে সময় নেই। মিসেস দত্ত কারপার্ক থেকে গাড়ি বের করে নিয়ে এলে, মাসিমা মেয়ের পাশে আর আমরা দুজন পিছনের সিটে বসে সিটবেল্ট বেন্ধে নিলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই নটিংহামে পৌঁছে গেলাম। একেবারে কোয়ার্টারের পাশেই আমাদের ড্রপ করে দিলেন। কিন্তু হাতে বেশি সময় না থাকায় চা পানের অনুরোধ সবিনয়ে ফিরিয়ে দিলেন।

    ক্রমশ

    পেজে লাইক দিন👇



  • তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী/ অষ্টাদশ পর্ব /দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী
  • তানসেন - এক অসাধারণ সঙ্গীতশিল্পী               
    অষ্টাদশ পর্ব         
    দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী


    বিলাসখানি টোড়ি 
    তানসেনের শেষকৃত্য নিয়ে বেকায়দায় পড়লেন আকবর। তানসেনের শেষকৃত্য নিয়ে দাঙ্গা বেঁধে যাওয়ার উপক্রম। এমন সময়ে তানসেনের মেয়ে সরস্বতী বললেন তার মৃত্যুর পর যে এহেন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা তাঁর পিতা ঠিকই আঁচ করেছিলেন। তাই তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করা নিয়ে তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন বিস্ময়কর নির্দেশ। আর সেই নির্দেশ হল - গান। যে গায়ক তাঁর গানের প্রভাবে তানসেনের মৃত শরীরে সামান্য হলেও প্রাণের সঞ্চার করতে পারবেন, তাঁর ধর্মানুসারেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে আকবরের 'নবরত্নে'র অন্যতম এই 'রত্ন'টির।  

    অবাক হলেন আকবর নিজেও। এ অসম্ভব কাজ! গান গেয়ে মৃতের শরীরে প্রাণের সঞ্চার? কখনও সম্ভব নাকি? 

    সরস্বতী বললেন "হ্যাঁ জাহাপনা, তা সম্ভব। কারণ তা সম্ভব না হলে বাবা এরকম নির্দেশ দিয়ে যেতেন না। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের মধ্যেই রয়েছে সেগুলি, দরকার কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক সাধনা সুরজ্ঞান ও আন্তরিক পরিবেশনা"। 

    শেষ পর্যন্ত সরস্বতীর প্রস্তাব আকবর মেনে নিলেন। হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরাও একমত হলেন এই প্রস্তাবে। দেখাই যাক তানসেনের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তা সম্ভব হয় কিনা? তানসেনের মরদেহ বরফে আচ্ছাদিত করা হলো যাতে মৃতদেহে পচন না ধরে।

    তারপর শুরু হল সেই রুদ্ধশ্বাস গানের লড়াই।

    মৃতসঞ্জীবনী সুরসুধার সন্ধান এক কথায় ছিল অসম্ভব, কারণ তানসেনের পরবর্তী এমন কোন গায়ক সে সময় ছিলেন না তামাম হিন্দুস্থানে যিনি কিনা এমনই ঐশ্বরিক ক্ষমতাধারী, যার সুরের জাদুতে মৃতের শরীরেও প্রাণের সঞ্চার ঘটাতে পারে।

    তবু শুরু হল গান, সম্রাট আকবরের আমন্ত্রণে তামাম দুনিয়ার সেরা ওস্তাদ ও সুরসাধকদের ভীড় হলো গোয়ালিয়রের রাজদরবারে। 

    তিনদিন, তিনরাত দেখতে দেখতে অতিক্রান্ত। দিনরাত ধরে পালা করে চলছে ওস্তাদি গান। ওদিকে ফুল, আতর, বরফ আর ঔষধি দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে তানসেনের মরদেহ। মনে হচ্ছে যেন পরম নিশ্চিন্তে তিনি ঘুমিয়ে রয়েছেন, এক্ষুনি জেগে উঠে তানপুরার তার বেঁধে রেওয়াজে বসবেন তার গুরু হরিদাস স্বামীর সৃষ্ট 'বৃন্দাবনী সারঙ্গ' রাগে। তিনদিন ধরে সুরের বন্যা বয়ে গেল রাজ দরবারে, অথচ নিস্পন্দ তানসেন।  এত কিছু করেও কি তবে সব আয়োজন ব্যার্থ হতে চলেছে?  সকলেই ভাবতে লাগলেন যে তাহলে কি এত আয়োজন ব্যর্থ হয়ে যাবে? শুধু আয়োজনেই নয় তানসেনের নির্দেশও তাহলে ব্যর্থ হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি তো কোন সাধারণ গায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক ঐশ্বরিক সঙ্গীতসাধক। আকবরও এক এক সময় হতাশ হয়ে পড়ছেন।

    ভোরের আলো ফুটতে তখনও দেরী, একটু একটু করে সরছে রাতের পর্দা। এমন সময়ে ধীর পায়ে রাজদরবারে এসে দাঁড়ালেন এক দীন ফকির। তিনি বললেন, “আমি একবার চেষ্টা করতে চাই”। চালচূলোহীন সেই ফকিরের কথা শুনে হেসে কুটিপাটি সভাসদরা। তামাম হিন্দুস্তানের নামজাদা ওস্তাদেরা যেখানে কিছু করতে পারলেন না এই ফকির সেখানে কি অলৌকিক ঘটনা দেখাবেন? ফকির কিন্তু অনড়। শেষ চেষ্টা করে দেখতে তিনি যেন মরিয়া। 

    তার উজ্জ্বল দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে সায় দিলেন সুর রসিক আকবর। ফকিরকে দেখে স্বরস্বতীর মুখে এক বিদ্যুৎ চমক খেলে গেল। তার মন যেন বলতে লাগলো এঁর সাথে তার জন্ম জন্মান্তরের এক রক্তের সম্পর্ক বিদ্যমান। এই সেই সাধক যিনি বাবার নির্দেশ সফল করবেন।

    তানসেনের পায়ের কাছে বসে ফকির শুরু করলেন তার গান। কি আশ্চর্য! মূহুর্তে যেন পাল্টে গেল গোটা পরিবেশ। অজানা সেই রাগের অপার্থিব সুরের অদ্ভুত সেই মায়াজালে আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন সকলে। ভোর বেলার সেই রাগের এমনই মাধুর্য যেন আজকের সকাল এঁর জন্যই অপেক্ষা করে বসে ছিল। এরকম রাগ তো কেউ কখনো শোনেননি। কেউ কখনো ভাবতেও পারেননি গানের এই গায়কীরীতি, কোন স্রষ্টার কাছে তাঁর এই গানের তালিম? কি অপূর্ব সুর মূর্ছনা। সকলেই যেন তাঁর গান শুনে নির্বাক নিষ্পন্দ হয়ে গেছে। এমন সময় দেখা গেল রাজসভায় শায়িত মিঞা তানসেনের শরীরে বিন্দু বিন্দু ঘামের সঞ্চার হচ্ছে।       

    ফকির কিন্তু ভাবলেশহীন, তন্ময় হয়ে গেয়ে চলেছেন। কোন কিছুই যেন তিনি দেখতে পাচ্ছেন না, শুনতে পাচ্ছেন না। যেন পরম করুনাময় ঈশ্বরের সাধনায় লীন হয়ে গেছে তাঁর সকল সত্তা, বোধ, জাগরণ। এর পরে যখন তিনি একটি অসাধারণ গমক টানলেন তখন সকলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখলেন নিস্পন্দ বরফশীতল তানসেনের শরীরের ডান হাতটি কাঁপছে। সকলের দৃষ্টি সেই দিকে নিবদ্ধ। অবাক করার মতো ঘটনা। এরপরে মৃত তানসেনের ডান হাতের তর্জনি সেই গায়কের দিকে যেন নির্দেশ করে কিছু বলছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থমকে গেল। এরপরে ডান হাতটি কাঁপতে কাঁপতে বুকের উপরে এসে পড়ল। সব শেষ হয়ে গেল।                

    এই দৃশ্য দেখে সকলেই ধন্য ধন্য করতে লাগলেন। সম্রাট আকবর ও নবরত্ন সভার সদস্যদের একান্ত অনুরোধে সেই ফকির তাঁর পরিচয় দিয়ে বললেন তিনি সংগীত সাধক তানসেনেরই কনিষ্ঠ সন্তান, তাঁর নাম বিলাস খান। আসলে অল্প বয়সে তিনি গৃহত্যাগ করে সুফি সাধনায় নিজেকে মগ্ন করে দিয়েছিলেন যার জন্য অন্য সকলের কাছে তিনি ছিলেন অজ্ঞাত। কিন্তু তানসেন এই ঘটনা জানতেন যার জন্যই তিনি হেঁয়ালি করে তাঁর মৃত্যুর পরে সৎকারের ব্যবস্থার নির্দেশ এইভাবে দিয়েছিলেন এবং সমগ্র পৃথিবীকে দেখাতে চেয়েছিলেন তানসেনের মৃত্যুর পরেও তার বংশধরেরা এক একজন সংগীত জগতের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। যে রাগ গেয়ে তিনি মৃত পিতার দেহে প্রাণের সঞ্চার করলেন সেই রাগটি তাঁরই নিজস্ব সৃষ্টি- নাম বিলাসখানি টোড়ি। 


    সেদিন দরবার ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বিলাস খানকে নজরানা দিতে চেয়েছিলেন সম্রাট। বিলাস খান জানিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর যেন তাঁকেও তাঁর পিতার পাশে স্থান দেয়া হয়। আজও গোয়ালিয়রে পাশাপাশি শুয়ে আছেন পিতা-পুত্র।

    তানসেনের মৃত্যুর পরে তাঁর সমাধির উপরে পরবর্তীকালে দেখা গেল একটি তেঁতুল গাছের জন্ম হয়েছে। প্রবাদ এই তেঁতুল গাছের পাতা চিবিয়ে খেয়ে তানসেনের সমাধি স্পর্শ করলে যেকোনো সঙ্গীতজ্ঞ তানসেনের আশীর্বাদে সঙ্গীতে পারদর্শী হবেন। তানসেনের মৃত্যুর এত বছর পরেও হিন্দুস্তানী এমনকি আন্তর্জাতিক সঙ্গীতেও তানসেন এইভাবে বেঁচে আছেন। তানসেন যে কেবলমাত্র ধ্রুপদী রাগের ধ্রুপদী শিল্পী ছিলেন তাই নয় তিনি অনেকগুলি রাগেরও সৃষ্টি করেছিলেন। যেগুলি হলো দরবারী কানাড়া, দরবারী টোড়ি, রাগেশ্বরী, ভৈরবী, সারঙ্গ প্রভৃতি। বহু জটিল রাগকে ভেঙ্গে সহজভাবে গাইবার পদ্ধতি সৃষ্টি করেছিলেন যার জন্য তানসেনকে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জনক বলা হয়। এখনো পর্যন্ত প্রতি বৎসর ডিসেম্বর মাসে তানসেনকে স্মরণ করে গোয়ালিয়রে তাঁর সমাধিস্থলে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় 'তানসেন সঙ্গীত সমারোহ' অনুষ্ঠান পালিত হয়। তানসেনের পাশাপাশি তাঁর গুরু হরিদাস ও মহম্মদ ঘাউসকেও এই সমারোহে স্মরণ করা হয়। এছাড়াও ভারত সরকার দেশের সর্বোত্তম সঙ্গীতজ্ঞকে এই অনুষ্ঠানে 'তানসেন' সম্মান প্রদান করেন। তানসেন শুধু যে একজন গায়ক ছিলেন তা নন উপরন্তু তিনি একজন কবিও ছিলেন। তিনি বহু গান রচনা করেছেন এবং সেগুলিকে বিভিন্ন সুরে সুর দিয়েছেন। সবশেষে উল্লেখ করছি যে তানসেনের ঘটনাবহুল জীবন নিয়ে অনেকগুলি সিনেমা আমাদের দেশে তৈরি হয়েছে এবং ১৯৮০ সালে পাকিস্তানেও একটি টিভি সিরিয়াল তৈরি হয়েছে।            

    পরিশেষে একটি কথায় শেষ করছি। আবুল ফজল তাঁর 'আকবর নামা'য় কিভাবে লিখেছিলেন যে তানসেনের মৃতদেহ হিন্দু শাস্ত্র মতে সৎকার করা হয়েছিল? এর উত্তর ঐতিহাসিকরাই বলতে পারবেন।         
                                                                       সমাপ্ত

     
    পেজে লাইক দিন👇



  • ক্ষিতীশ সাঁতরা (গল্পকার, গীতিকার, লোক গবেষক এবং সংগ্রাহক, ভগবানপুর) /ভাস্করব্রত পতি
  • মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২৯

    ক্ষিতীশ সাঁতরা (গল্পকার, গীতিকার, লোক গবেষক এবং সংগ্রাহক, ভগবানপুর)

    ভাস্করব্রত পতি

    "টাকা সঙ্গে যাবেনা, পয়সা সঙ্গে যাবেনা
    সোনাদানা গয়নাগাটি, একদিন তোর হবে মাটি,
    এক টুকরো কাপড়ও কেউ, অঙ্গে দেবেনা
    টাকা সঙ্গে যাবেনা, পয়সা সঙ্গে যাবেনা।

    অনেক জমা অনেক জমি, কত না দেশ বিদেশ ভূমি
    তৈজসের গুমর নিয়ে, বারেক বাড়ি বারেক কমি
    সাড়ে তিন হাত জমির বেশী, কেউ তো দেবেনা।
    সোনাদানা গয়নাগাটি, একদিন তোর হবে মাটি,
    এক টুকরো কাপড়ও কেউ, অঙ্গে দেবেনা
    টাকা সঙ্গে যাবেনা, পয়সা সঙ্গে যাবেনা।

    পূজ্য পিতা মা জননী, পুত্র কন্যা ভাই ভগিনী
    মিলে লাখো স্বজন বান্ধব, শুধুই পথের চেনাচিনি।
    শেষের বান্ধব শুধুই হরি, আর কেউ সঙ্গে হবেনা।
    সোনাদানা গয়নাগাটি, একদিন তোর হবে মাটি,
    এক টুকরো কাপড়ও কেউ, অঙ্গে দেবেনা
    টাকা সঙ্গে যাবেনা, পয়সা সঙ্গে যাবেনা"---

    অতি সহজ সরলভাবে আমাদের সমাজের চিরন্তন রূপটি যিনি গানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন, তিনি মেদিনীপুরের বর্ষীয়ান কবি, গবেষক, গল্পকার ক্ষিতীশ সাঁতরা। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নীরবে নিভৃতে সাহিত্য সেবা করে চলেছেন মেদিনীপুরের মাটিতে। 

    এই মুহূর্তে চারিদিকে চলছে টাকা পয়সার ছড়াছড়ি। সেখানে ক্ষিতীশ সাঁতরার লেখা গানে সনজিৎ মণ্ডলের কন্ঠ হয়তো কারোরই চোখ খুলে দেবেনা, কিন্তু সামাজিক বার্তা দেবেই দেবে। যদিও টাকা পয়সা অর্থ সম্পদ নিয়ে আমাদের দূর্বলতা এবং লোভ সেই আদিম কাল থেকেই। 
    ১৯৪১ এর ২০ শে আগষ্ট কেলেঘাইয়ের পাড়ে ভগবানপুরের পশ্চিমবাড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
    বাবা হৃদয়নাথ ও মা কিরণমালা দেবীর পরিবারে ছিল সাহিত্য চর্চার বাহুল্য পরিবেশ। হৈমবতী দেবী ছিলেন তাঁর ঠাকুমা। তিনিও ছিলেন কবি। তেমনি পিতামহ যাদবচন্দ্র ছিলেন একজন বিদ্যোৎসাহী মানুষ। প্রাচীন পুঁথি 'পূর্ণ মাসীর জন্মপালা'র লিপিকার তিনি। এটি এক বীরাঙ্গনা নারীর জন্মকাহিনী। 

    তাঁর বেড়ে ওঠা কেলেঘাইয়ের জলের জোয়ার ভাটাকে আঁকড়ে ধরে। নদীর স্রোতের মতোই খরস্রোতা তাঁর কলমের গতি - 'আমার একটা আকাশ ছিল / আকাশে রামধনু ছিল / আর ছিল এক নদী / পাহাড় থেকে সোজাসুজি সাগর অবধি'। পড়ন্ত বিকেলে রোদের চহট যখন নদীর জলে পড়ে প্রতিবিম্বিত হয়, তখন তিনি আত্মমগ্ন হয়ে আত্মীকরণ করেন প্রকৃতির রূপ রস গন্ধ। স্বভাবকবির গেঁয়েলি ভাবনার জারকরসে তখন সিঞ্চিত হয় কবিতার শিরা উপশিরা। আর তখন 'রোদ্দুরটা' কবিতায় ভেসে ওঠে কথার ইমারত -- 'রোদ্দুরটা রোদ্দুর নয় যেন একটা বাঘ / দুপুরবেলা আকাশ থেকে / ঝাঁপিয়ে পড়ে হাত পা ছুড়ে / চোখ দুটো ঠিক আগুনভাঁটা / কি ভয়ানক রাগ'। 

    তাঁর কলম ছুঁয়ে বেরিয়েছে রাবন বধের পালা, মিথ্যুক, লড়াই, মঙ্গলকাব্যের গল্প, পুরনো পাতার বাঁশি, ঈশ্বরভাগ্যে পাথরবাটি, স্বপ্নলোকের চাবি, মজাদার ঘন্টাবাদক, ছড়রা, চিংড়িমাছ, বিদ্যাসাগর, পূজনীয় পিতৃদেব, রাহুমুক্ত, শিরোনামহীন, বড়দের ছেলেবেলা, কাঠঠোকরা, ঘুঁটে ও অন্যান্য প্রবন্ধ, গীত সঙ্গীত, জননী, প্রাচীন সাহিত্যের গল্প, কাল্লু গুণ্ডার গপ্পো, সৃষ্টি সম্ভব, রজনীগন্ধা ইত্যাদি কবিতা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটিকা, শিশু জীবনী, উপন্যাসের সম্ভার। মেদিনীপুরের কবিগান ও কবিয়ালদের নিয়ে খুব শীঘ্রই আত্মপ্রকাশ করবে এক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। সম্পাদনা করেন 'মাটি' পত্রিকার। এছাড়াও আমরা তৈরি, অভিযাত্রী, জোট পত্রিকার পরিচালনা করতেন। তাঁর লেখালেখির জন্য বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, কবিশেখর কালীদাস রায়দের সঙ্গে গড়ে ওঠে যোগাযোগ। যা তাঁকে নানাভাবে পরিশীলিত হতে সাহায্য করেছে। আসলে তিনি ভালোবাসেন জনগন। পছন্দ করেন জনমত। মানুষের সাহচর্য ছাড়া তাঁর হাই ওঠে না। ঘুম আসে না। এজন্যই 'জনমত' কবিতায় তাঁর অসাধারণ উপলব্ধি নিজেই প্রকাশ করেছেন -- 'জনমত হোক তৈরি মিথ্যার হব বৈরী / মেকি যাহা হোক ধ্বংস / লোপ পাক যত কংস'।

    আকাশবাণীর জনপ্রিয় গীতিকার ছিলেন তিনি। অজস্র গান লিখে চলেছেন এখনও। তাঁর গানে উঠে এসেছে প্রেম বিরহ প্রকৃতি পরিবেশ জীবনতত্ত্ব আর যন্ত্রনার চিত্র। তাঁর লেখা "যদি কারো সুখের সঙ্গে" গান গেয়েছেন আশা ভোঁসলে এবং "দুঃখ যে দেয় সে তো" গেয়েছেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়।  এছাড়াও তাঁর লেখা গানে গলা মিলিয়েছেন অমৃক সিং অরোরা, অমর পাল, অসীমা মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, প্রশান্ত মাইতি, শম্ভু মুখোপাধ্যায়, সনৎ সিংহ, দীনেন্দ্র চৌধুরী প্রমুখ বিখ্যাত শিল্পীরা। এরকম অসংখ্য গান লিখে গৌরবান্বিত করেছেন নিজেকে। উজ্জ্বল করেছেন মেদিনীপুরকে।

    আসলে তিনি কথাকার। সমস্ত শরীর দিয়ে কথা বলেন। আপাদমস্তক একজন কথাপ্রেমী। পায়ের পাতা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত ছলকে ওঠে কথার ঝড়। তিনি গল্পকার হলেও গল্প লেখেননা। গল্প বলেন। যা আমরা পাই সাদা কাগজের পিঠে। আর খোঁজ করেন পরশপাথরের। এই অন্বেষনের নির্যাস হলো -- 'পরশ পাথরের আজ পেলাম ছোঁয়া / লোহামন হল সোনা, নেই আর ভাবনা / হৃদয়ে ভালোবাসার উজান ধারা, কী যে করি / ফাগুনের আগুন জ্বলে মরি মরি মরি মরি'। তেমনি 'পাথর' কবিতায় তাঁর স্বগতোক্তি 'সইতে সইতে কেউ বা ভাঙ্গে / কেউ বা পাথর হয়ে যায় / অল্প ঘায়ে কাচ গুঁড়ো হয় / পাথরের কি বয়ে যায়'?

    চিত্রশিল্পী হিসেবেও তাঁর নান্দনিক চেতনা প্রতিভাত। বাস্তববাদী ভাবনার মিশেল তাঁর সৃষ্টিসুখের আঙিনায়। অসংখ্য পত্র পত্রিকার প্রচ্ছদশিল্পী তিনিই। তিনি তো থামতে জানেন না। তিনি ভালোবাসার কাঙালি। কিন্তু নিজের অপরাগতা স্বীকার করে নিয়ে অনায়াসে বলতে পারেন "ভালোবাসা দিতে যাকে পারিনি গো কোনো দিন / ভালোবাসা চাই তাঁর কি করে"?

    ঠাকুমা হৈমবতী দেবীকে অমর রাখতে বাড়িতে গড়ে তুলেছেন "হৈমবতী দেবী সংগ্রহশালা"। মেদিনীপুরের প্রাচীন ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং উপাদানগুলিকে পরম মমতায় রক্ষা করার জন্য তৈরি করেছেন এই প্লাটফর্ম। এই মিউজিয়ামে রয়েছে ছাপাখানার অসংখ্য ব্লক। যা আজ আর ব্যবহৃত হয়না। কিন্তু সযতনে গুছিয়ে রেখেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে। রয়েছে টেরাকোটার সামগ্রী এবং নানাবিধ পত্র পত্রিকা ও বইয়ের সম্ভার।

    সৃজন সাহিত্য সম্মান, অজগর সাহিত্য পুরস্কার, অনুপত্রী সাহিত্য সম্মান, নজরুল জন্ম শতবার্ষিকী সম্মান, বালিচক সাহিত্য সংসদ স্মারক সম্মান, পূর্ণেন্দু পত্রী স্মৃতি পুরস্কার, লোককৃতি সাহিত্য সম্মান, সর্বভারতীয় শিশু সাহিত্য সম্মেলন স্মারক, মেছেদা সাহিত্য একাডেমী সাহিত্য সম্মান পেয়েছেন জীবনের বিভিন্ন সময়ে। যদিও এইসব পুরস্কার তাঁর কাজের মাপকাঠি নয়। তিনি আপনভোলা এক পথিক। প্রত্যন্ত মেদিনীপুরের বুকে বসে চর্চা করেন ইতিহাস। চর্চা করেন সংস্কৃতি। চর্চা করেন সাহিত্য। আর ৮৪ বছর বয়সেও কেলেঘাইয়ের কাদামাটি মাখা বুড়ো কবি ক্ষিতীশ সাঁতরা নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে লিখে ফেলেন -- 'চলতে চলতে পথে, হয়তো অনেক হবে ভুল / তার মাঝে যদি ফোটাতে পারি কখনো একটা ফুল / হয়তো জীবন আকাশে হতেও পারে / অনেক তারা দিয়ে থাকবে ভরা'।

    পেজে লাইক দিন👇



Powered by Web RSS