জ্বলদর্চি

Public RSS Widgets

»

  • ভোলগার দিনকাল / বিজন সাহা
  • ভোলগার দিনকাল 

    বিজন সাহা


    (১) 
    সাদাকালো শাড়ি পরে
    বার্চগুলো নাচছে
    তা দেখে শেয়ালছানা মিটিমিটি হাসছে
     
    (২)
    ভোলগার শীতল জলে
    সূয্যি মামা দিল ডুব
    সারাদিন টো টো করে সে এখন ক্লান্ত খুব

    (৩) 
    গাছের ডালে ডালে
    জেঁকে বসে বসন্ত
    রূপেতে বসন্ত সত্যিই অনন্ত

    (৪)
    কপি পেস্ট ভালোবাসা
    আনন্দ বেদনা আশা
    কপি পেস্ট হ্যালো সুপ্রভাত
    কপি পেস্ট লেখাপড়া
    স্বপ্নের জীবন গড়া
    কপি পেস্টে কাটে দিন রাত

    (৫)
    মেঘের পাখায় ভর করে
    জল আকাশে উড়ে
    সূর্যের তেজে কান্না হয়ে
    পৃথিবীতে পড়ে

    (৬)
    ভোলগার কালো জলে
    মাছ দেখ নাচছে
    তাই দেখে হাঁসা হাঁসি  মিটি মিটি হাসছে 

    (৭)
    ফাঁকিবাজ সূর্যটা 
    লুকোচুরি খেলছে
    তাই দেখে মেঘ বালিকা ডানা দুটো মেলছে 

    (৮) 

    ভর দুপুরে হাজার মানুষ
    ভোলগার জলে নাইছে
    আপন মনে বুড়ো জেলে নৌকখানি বাইছে 

    (৯) 

    জাহাজ চলে উজান ভাটি
    সঙ্গে মানুষ ঘোড়া হাতি
    নদীর ধারে মানুষ নেড়ে হাত 
    জানায় তাদের ভালবাসা 
    জাগায় প্রাণে নতুন আশা 
    একটু হাসি চোখাচোখি তাতেই বাজি মাত  

    (১০) 

    আমাদেরই গাঁয়ের ভেতর ভোলগা নদী বয় 
    বরফের নীচে কাটে তার অর্ধেক সময় 
    গ্রীষ্ম কালে রোদের ডাকে ভাঙলে তার ঘুম 
    ছেলে বুড়ো সবার পড়ে সাঁতার কাটার ধুম


    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇



  • কুড়কুড়ে ছাতু বা পুটকা ছাতু /সূর্যকান্ত মাহাতো
  • জঙ্গলমহলের জীবন ও প্রকৃতি

    পর্ব - ২৭

    কুড়কুড়ে ছাতু বা পুটকা ছাতু

    সূর্যকান্ত মাহাতো


    তখনও ভালো করে প্রকৃতির ঘুম ভাঙেনি। বেশ ঝুঁঝলো অন্ধকার। একটু একটু করে আলো মেখে সবেমাত্র ফরসা হচ্ছে। শিশির মেখে গাছের পাতা ও ঘাসগুলো তখনও ঝিমিয়ে আছে। এমন কাকভোরেই উঠে পড়েছে রতনের বউ। তিন বছরের ছেলের মুখ থেকে স্তনবৃন্তটা সরিয়ে কোমর পর্যন্ত কাঁথাটা ঢাকা দিয়ে সে উঠে পড়ল।

    হাতে একটা লম্বা বাঁশের কঞ্চি নিয়ে এমন আলো আঁধারী ভোরেই বেরিয়ে পড়ল রতনের বউ। প্রায় দু কিমি পথ ওকে হেঁটে যেতে হবে। তবেই মিলবে সামনের জঙ্গল। হেঁটে যেতে যেতেই আকাশ আরও বেশি পরিষ্কার হয়ে উঠবে। অনেকে তো তারও আগে জঙ্গলে পৌঁছে যায়। তাই আর দেরি করা যাবে না। না হলে তখন আর বেশি বেশি করে ছাতু পাওয়া যাবে না। অন্যেরা কুড়িয়ে নেবে। তাই দ্রুত পা চালালো রতনের বউ।

    হ্যাঁ, "কুড়কুড়ে" ছাতুর কথা বলছিলাম। রতনের বউ কুড়কুড়ে ছাতু কুড়োতেই জঙ্গলে চলেছে। বর্ষা এলেই বাঙালির পাতে এখন ইলিশের ঝোল। নয় তো সরষে ইলিশ। আর জঙ্গলমহলে? বর্ষা মানেই নানান ধরনের ছাতুর ছড়াছড়ি। এইতো সবে বর্ষার সূচনা। ইতিমধ্যেই ফুটতে শুরু করেছে "কুড়কুড়ে" বা "পুটকা" ছাতু। এই ছাতুর বিজ্ঞানসম্মত নাম হল---Astraeus Hygrometricus(Pors.) Morg.

    এখন 'কুড়কুড়ে' বা 'পুটকা' ছাতুর মরসুম। জঙ্গলের এখানে ওখানে মাটিচাপা হয়ে ওরা ফুটে ওঠে। বেশি বেশি করে কুড়োতে পারলে বাজারে চড়া দামে বিক্রি করা যায়। প্রথম প্রথম তো ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত কিলো দরে বিক্রি করা যায়। রতনের বউ গতকালও সাতশ টাকা দরে দু কিলো ছাতু বিক্রি করেছে।

    রতনের বউয়ের মতো জঙ্গলমহলে এমন একাধিক অভাবী পরিবার আছে। এই সময়টায় ছাতু বিক্রি করেই ওদের হাতে দুটো বাড়তি টাকা আসে। সংসার কিছুটা সচ্ছল হয়। সেই সঙ্গে নিজেদেরও খাওয়ার চিন্তা করতে হয় না। তাই কুড়কুড়ে ছাতুকে একটি অর্থকরী ছাতুও বলা যেতে পারে।
    'কুড়কুড়ে' ছাতু নামটাও বেশ অদ্ভুত না! ভাবছেন, আরে এরকম নামে তো বাচ্চাদের চিপসের প্যাকেট হয়। ছাতুর নাম হয় নাকি! হ্যাঁ হয়। জঙ্গলমহলের বাজারে "কুড়কুড়ে ছাতু" আর "কুরকুরে চিপসের প্যাকেট" একই সঙ্গে বিক্রি হয়। কুরকুরে চিপসের মতোই কুড়কুড়ে ছাতুও খাওয়ার সময় 'কুড়কুড়' শব্দ হয়। কুরকুরে চিপসগুলো হয় লম্বা লম্বা। আর কুড়কুড়ে ছাতুগুলো হয় একেবারে গোল গোল। মার্বেলের মতো। সাদা ধবধবে। উপরের শক্ত খোলটা খাওয়ার সময় বেশ কুড়কুড় শব্দ হয় এবং সহজেই ভেঙে যায় বলেই কী এমন নামকরণ? 

    একে আবার "পুটকা" ছাতুও বলে। 'পুটকা' মানে হল ছোট। আসলেই তাই। কাঁচের মার্বেলের মতো হয় এদের গড় আকার। কিছু কিছু যে গুলতির মতো একটু বড় আকারের হয় না তা নয়। তবে বেশি বড় হলে সাধারণত সেগুলো বুড়িয়ে যায়। আবার এর থেকে ছোট ছোট আকারেরও হয়। সেগুলো তখন কিছুটা অপরিণত থাকে।

    বর্ষার শুরু শুরুতেই আবহাওয়া বেশ মনোরম থাকে। একদিন বৃষ্টি, আবার দুদিন রোদ। আবার একদিন বৃষ্টি, আবার কিছুদিন রোদ। আষাঢ়ের গরমটাও আবার বেশ গুমোট। এমন রোদ বৃষ্টির লুকোচুরি আবহাওয়াই হল কুড়কুড়ে ছাতু ফোটার অনুকূল পরিবেশ। বৃষ্টিতে গাছের পাতাগুলো পচে গিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। তারপর রোদ বৃষ্টি মেখে সেই মাটি ছাতু জন্মানোর মাতৃজঠরে পরিণত হয়। তবে জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে দিলে কিংবা দাবানলে জ্বলে উঠলে, অথবা প্রবল অনাবৃষ্টি হলে এই ছাতু জন্মানোয় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।

    জন্মকালে বা ছোট অবস্থায় এদের অস্তিত্ব কোনও ভাবেই বোঝা সম্ভব নয়। এরপর একটু একটু করে এরা বাড়তে থাকে। তখন মাটির উপরিভাগ বাড়তে থাকা ছাতুদের চাপে ফেটে যায়। সেই ফাটল দেখেই অনুমান করতে হয় ভিতরে ছাতু ফুটে আছে। সরু শক্ত কাঠি দিয়ে ফাটলের ভিতর থেকে ছাতুগুলোকে বের করে আনতে হয়। জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে এই ফাটলেরই অনুসন্ধান করে চলতে হয়। তবেই ছাতু মেলে। ক্ষুরধার দৃষ্টি নিয়ে অনুসন্ধান করতে হয়। একেবারেই আনাড়ি হলে জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও এই ছাতুর কোনও সন্ধান করতে পারবে না। ছাতু ফোটার এই ফাটল সঠিক ভাবে চিনতে শিখতে হয়। না হলে বৃথাই হবে অনুসন্ধান। যারা দীর্ঘদিন ধরে এই ছাতু কুড়িয়ে চলেছেন তাদের এমনই অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে যে, উপর থেকে মাটিটা দেখেই তারা বুঝে যায় নিচে ছাতু আছে কিনা। দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর ধরে ছাতু কুড়ানো সত্তর বছরের বৃদ্ধা শ্যামলী মাহাত তেমনটাই জানালেন। অনেক সময় মাটি আলগা থাকলে হাতের কিংবা পায়ের আঙুলেও মাটি সরিয়ে ছাতু কুড়ানো যায়।
    ছোট বড় মিলে একাধিক ছাতু একত্রে অবস্থান করে। প্রথমে গায়ে মাটি মাখা অবস্থাতেই ছাতুগুলো কুড়িয়ে আনতে হয়। কেউ ব্যাগে ভরে আনে, কেউ পলিথিনের প্যাকেটে, কেউ বা শাড়ির আঁচলে বেঁধে আনে। আবার কেউ শাল পাতার ঠোঙা বানিয়েও নিয়ে আসে।

    গায়ের মাটিগুলো ভালো করে জলে ঘষে ঘষে পরিষ্কার করতে হয়। ছোট ছোট ঝুড়িতে এ কাজটা করলে অনেক সহজ হয়। গায়ের মাটিগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করে দিলেই সাদা ধবধবে হয়ে ওঠে ছাতুগুলো। তখন উপরটা বেশ চকচকে ও মসৃণ হয়ে ওঠে।

    এই ছাতুর দুটি অংশ। বাইরের অংশটা হল একটু শক্ত। পুরু আবরণের একটি খোল বলা যেতে পারে। আর খোলের ভিতরের অংশটা হল মাংসল। একেবারে তুলতুলে নরম। ওই শাঁসযুক্ত অংশটাই সবথেকে বেশি স্বাদের। রঙ একেবারে ফুটফুটে সাদা। জঙ্গল থেকে কুড়িয়ে এনে ভালো করে ধোয়ার পর এদের দু টুকরো করে কেটে ফেলা হয়। যাতে ভিতরের শাঁসযুক্ত অংশটাও তেল নুন পায়। ভিতরের শাঁস যুক্ত অংশটা যদি কালো হয়ে উঠে, তাহলে বুঝতে হবে ওটা নষ্ট হয়ে গেছে। তখন আর ওটা খাওয়া যায় না। আবার বাইরের খোলটা অনেক বেশি শক্ত হলেও খেতে ভালো লাগে না। তাই কচি কচি নরম ছাতুগুলোই সব থেকে বেশি স্বাদের।

    এই ছাতুকে সচরাচর ঝোল হিসাবেই রান্না করা হয়। তবে আলু কুন্দরী প্রভৃতি অন্যান্য সবজির সঙ্গেও যে রান্না করা যায় না তা নয়, তবে ঝোলেই এর বেশি স্বাদ। প্রথমে একটু তেলে ভেজে তারপর রান্না করতে হয়। মাছ মাংস রান্নার মতোই মসলা দিয়ে এ ছাতু রান্না করা হয়। স্বাদে তাই মাছ মাংসকেও হার মানিয়ে দেবে।

    যারা জঙ্গলমহল বেড়াতে আসেন তারা যেন শীতের বদলে বর্ষাকালে আসেন। কারণ এ সময় প্রকৃতিও অপরূপ সাজে সেজে উঠে। পাহাড়গুলোর চূড়া থেকে সমতল ভূমিতে গাছ গাছালি ও সবুজ ধান ক্ষেত দেখলেই মনে হবে একটা সবুজের বিছানা যেন পাহাড় থেকে সমতলে গড়িয়ে নেমেছে। বেলপাহাড়ীর ন্যাড়া পাহাড়গুলো এই বর্ষায় সবুজ হয়ে ওঠে। মুকুটমনিপুর ড্যাম বর্ষার জলে কানায় কানায় ভরে ওঠে। নির্জন তীরে বসে তার ছলাৎ ছলাৎ জলের শব্দ শুনতে শুনতে আপনার মন বারে বারেই যেন কোথায় হারিয়ে যাবে। তারপর খাবারের পাতে তো অবশ্যই থাকবে কুড়কুড়ে ছাতুর ঝোল। আপনার শরীর ও মনকে আরও বেশি চাঙ্গা করে তুলবে।

    এই ছাতুর খাদ্য গুণাগুণও অসাধারণ। বিভিন্ন ধরণের ভিটামিন, খনিজ লবণ তো আছেই। সেইসঙ্গে কুড়কুড়ে ছাতু পুষ্টিগুণেও ভরপুর। তাই একাধিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও গড়ে তুলে এই ছাতু।

    জঙ্গল লাগোয়া গ্রামগুলোতে চোখ রাখলেই দেখা যায় সকালে ও বিকালে মহিলারা দল বেঁধে চলেছে জঙ্গলের উদ্যেশ্যে। ছাতু কুড়াতে। পরস্পরকে তারা ডাকছে,"কই লো, চল। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়। সন্ধ্যে হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে।"

    পথ হাঁটতে হাঁটতে ওদের মুখে সর্বক্ষণ চলে পি এন পি সি। সংসারের কত সব নিন্দা ও স্তুতির গল্প। সেই গল্প বলতে বলতেই চলে ছাতু কুড়ানো। তবু ছাতু কুড়ানোর রোমাঞ্চই আলাদা। যত না খেতে মজা। তার তুলনাই কুড়িয়ে মজা।

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇



  • খর্জুর বীথির ধারে--৩/মলয় সরকার
  • খর্জুর বীথির ধারে

    মলয় সরকার

    (৩য় পর্ব ) তৃতীয় পর্ব

    এখানে এখনও এই পাথরের উপরে মোজাইকের কাজ করা হয়। একটি ছোট মোজাইক ফ্যাক্টরী রয়েছে যেখানে মোজাইক শিল্পীরা একমনে কাজ করে চলেছেন।শিল্পীরা বেশির ভাগই সুন্দরী মেয়েরা।অবশ্য আমার মনে পড়ে গেল, আমাদের দেশে কিছুদিন আগেও আমাদের মা মাসীমারা কি অদ্ভুত কৌশলে কাপড়ের উপরে শাড়ির ছেঁড়া পাড়ের সুতো দিয়ে ফুটিয়ে তুলতেন নক্সী কাঁথার কাজ। আজও শান্তিনিকেতনে মেয়েরা শাড়ির উপরে বুনে চলেছেন কাঁথা স্টিচের কাজ। এই সব সুন্দর শিল্প কলা রক্ষার তো কোন নির্দিষ্ট প্রচেষ্টা নেই। সবই হারিয়ে যাচ্ছে বা যাবে কালের প্রভাবে।যেমন হারিয়ে গেছে মসলিন শিল্প, বালুচরী বা জামদানীও আজ মৃত্যুমুখে—

    পাশেই একটি প্রদর্শনী এবং বিক্রয় কেন্দ্র। নানা রকম পাথরের কাজ, মূর্তি, দেওয়ালে ঝোলানোর সুন্দর সুন্দর মোজাইকের নিখুঁত ফটো , ইত্যাদি বহু জিনিস বিক্রী হচ্ছে। দেখে মনে হয়, সবই নিয়ে নিই। কিন্তু ঐ দাম, নিয়ে যাওয়ার অসুবিধা ইত্যাদি নানা রকমের বাধায় পড়ে শেষে একটি উটপাখীর ডিমের উপর আঁকা  সুন্দর শৌখিন জিনিস নিলাম স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে।

    এখানে এসে আমার সেই বাইবেলের যুগে পড়া মোজেসের কথা গুলো মনে হচ্ছিল।এই এক মানুষ মোজেস, যিনি আজকের ইসলাম, খৃষ্ট ধর্ম , ইহুদী ধর্ম ইত্যাদি নানা ধর্মেই সম্মানিত । তাঁর জীবনও বড় অদ্ভুত। চোখের উপর দেখতে পাচ্ছিলাম, দূরে জেরুজালেম, ভাসছিল বেথলেহেমের গোয়ালে শিশু যীশুর জন্ম । আমি যেন এক দু’হাজার বছর আগেকার পৃথিবীতে ফিরে যাচ্ছিলাম। ইতিহাস যেন আমার সামনে টাইম মেসিনে চেপে ফিরে আসছিল।  অমি দিব্য চক্ষে অনুভব করছিলাম সেদিনের সেই প্যালেস্তাইন, ইস্রায়েলের সমাজকে। রাজা হেরডের সময়ের সেই  সমস্ত জায়গা ।

    চারিদিকে পরিস্কার আকাশে চকচকে রোদের আলোয় নীল চাঁদোয়ার তলায় আমরা দাঁড়িয়েছিলাম এক ঐতিহাসিক পটভূমিতে।
    এখান থেকে গেলাম কাছেই মাডাবায়। মাডাবা বা মাদাবা আসলে একটি বড় শহর। আমরা মাডাবার যে সবচেয়ে বিখ্যাত এবং প্রাচীন চার্চ, সেই সেন্ট জর্জ চার্চে গেলাম। এই চার্চটি একটি গ্রীক অর্থোডক্স চার্চ।এটি প্রথম সম্ভবতঃ ষষ্ঠ শতাব্দীতে তৈরী হয়েছিল।তার উপরে বর্তমান চার্চটি ১৮৯৬ সালে তৈরী হয়েছিল। এখানে রয়েছে এক বিশাল মোজাইক ম্যাপ।এতে নাকি প্রায় ২০ লক্ষ পাথরের টুকরো ব্যবহার হয়েছিল। এটি যদিও আগুন ইত্যাদিতে অনেকটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল , পরে আবার এটি  কিছুটা পুনরুদ্ধার  করা হয়।এটির আসল মাপ ছিল ১৫.৬ মি/ ৬ মি।(৯৪ বর্গ মি), যেটির মাত্র এক চতুর্থাংশ নাকি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এটিতে তৎকালীন ঐ অঞ্চলের সমস্ত জায়গার সঠিক অবস্থান দেখানো আছে। ফলে এই ম্যাপটি ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিকদের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।শুনেছি গত ২০১০ সালেও এই ম্যাপ অনুযায়ী মাটি খুঁড়ে অনেক কিছু জানা গেছে।এই ম্যাপটিই নাকি সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ম্যাপ এবং ভীষণ প্রয়োজনীয় একটি তথ্য সেই যুগের সম্পর্কে।এতে সেই যুগের লেবানন থেকে নীল নদ উপত্যকা ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত সুন্দর ভাবে দেখানো হয়েছে।এটি অনেকবার ভুমিকম্প , আগুন ইত্যাদিতে নষ্ট হয়েছে এবং আবার তাকে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

    চার্চের ভিতরটি বেশ সুন্দর।অসংখ্য সুন্দর সুন্দর মোজাইকের ছবি, সবই যীশুখ্রীষ্ট সম্পর্কীয় বা বাইবেলের ছবিতে চার্চটি সাজানো। একেবারে সামনেই রয়েছে কয়েকটি বেশ ঝুলন্ত  সোনালী রঙের ঝাড় লণ্ঠন। উপরে দেখা যাচ্ছে দোতলায় একট ব্যালকানি ধরণের বারান্দা, যেটি থেকে নীচের হলের ভিতরে জমায়েত মানুষদের দেখা যায়। দু পাশে ধর্মকথা শোনানোর জন্য রয়েছে দুটি মাউথপিস স্ট্যাণ্ড সমেত।গোটা চার্চটির মধ্যেই একটা ভীষণ ভাল পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।ভিতরটি বেশ ঝকঝকে ও ছবিগুলির জন্য বর্ণবহুল।

    ভিতরটি এত সুন্দর হলেও চার্চটির বাইরের গঠন একটু অন্য রকম, আমাদের দেখা সাধারণ চার্চের মত নয়। এখানকার পাথর দিয়েই যেন তৈরী, দেওয়ালেও বিশেষ কোন কারুকাজ নেই, যেমনটি হয়ে থাকে অন্যান্য চার্চে। একেবারে প্লেন ঝকঝকে চৌকো চৌকো পাথরের তৈরী। বাইরের দেওয়ালের রঙ অনেকটা বেলুড় মঠের মত।

    এখানে  আরও অনেক চার্চ আছে, কিন্তু আমাদের সময় একটু কম বলে আর খুব বেশি সময় এখানে দিলাম না। তবে আমরা আর একটা জায়গায় গেলাম, যেটি ছড়ানো ছিটানো একটি ‘খণ্ডহর’ এর মত হলেও, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব কিন্তু ভীষণ বেশি। এই অঞ্চলটা একটা জনমানবহীন রুক্ষ পাহাড়ী মরুভূমির মত।এখানে সমস্ত বাড়ি গুলিই কেমন যেন শুধু পাথরের একটা বাক্স মনে হয় । পাহাড়ে গায়ে গায়ে এখানে ওখানে কিছু এই ধরণের বাড়ি আছে আর আছে কিছু পাইন গাছ ধরণের গাছের ঝোপ এবং শুকনো ঘাসের ছোট ছোট ঝোপ।

    আমার মনে হল, যীশু খ্রীষ্ট বা হজরত মহম্মদ তো এই ধরণের মাটিতেই জন্মেছিলেন আর এই সমস্ত জায়গায় চতুর্দিকে যে দরিদ্র অশিক্ষিত রাখাল , পশুপালক এই সমস্ত উপজাতি রয়েছে তাদের মধ্যেই তো বড় হয়েছেন, কি ভাবে তাঁরা এত উন্নত মনের মানুষ হলেন, যে, আজ সারা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ তাঁদের কথা মানছে, এত শিক্ষার অগ্রগতির পরেও! কি হৃদয়ানুভূতি ছিল তাঁদের!! কি প্রচণ্ড জ্ঞান এবং বাস্তব বোধ!! আজ কি কোন মানুষ আর জন্মাচ্ছেন সেই রকম! ধর্মগুরুরা বোধ হয় এরকমই হন, তাঁদের খুব শিক্ষিত বলে তো খুব শোনা যায় না কোথাও। বেশির ভাগই স্বশিক্ষিত, তথাকথিত অশিক্ষিত বা অর্ধ শিক্ষিত।তবু আজকের যাঁরা শিক্ষিত পণ্ডিত তাঁরা কেন এঁদের শ্রদ্ধা করেন!  আসলে এঁরা জন্মগত ভাবেই বোধ হয় হৃদয় বোধে উচ্চশিক্ষিত। এটাই আসল শিক্ষা, যা কেতাবী বিদ্যার চেয়েও অনেক উঁচুতে।

     জায়গাটাকে সম্যক উপলব্ধি করছিলাম। যাঁদের এই মরুভূমির সম্বন্ধে ধারণা নেই, তাঁরা আমার লেখা থেকে কতটা বুঝতে পারবেন জানি না। তবে যদি সব ছবি তুলে ধরতে পারতাম, তাহলে হয়ত কিছুটা ধারণা হত। এখানকার মাটি দেখলেই মনে হয়, কি কঠিন এঁদের জীবন সংগ্রাম।না কোন কাছাকাছি চাষের জমি, না কোন দোকান পত্তর, না শ্যামলিমার ছবি। এই সমস্ত অঞ্চলে মানুষ থাকে কি করে বুঝেই পাই না।

    গিয়ে পৌঁছালাম শোবাক দূর্গে (Shobak Castle) । এই দুর্গটি তৈরী করেছিলেন ১১১৫ খ্রীষ্টাব্দে ক্রুশেডর রাজা প্রথম বল্ডউইন ।  তবে পরবর্তী কালে মামলুকদের হাতে এটি আসার পর এর অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়। এটি একটি পাহাড়ের মাথায় রয়েছে। এর উপর থেকে দেখলে বহুদূর পর্যন্ত উঁচু নীচু মরু পাহাড়ের বিস্তৃত রুক্ষ অঞ্চল চোখে পড়বে।
    এই অঞ্চলটিকে, তথ্য বলছে তুলনামূলকভাবে উর্বরা। কিন্তু আমার, চোখে দেখে তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হল।
    ক্রুশেড বললেই অনেকের চোখের সামনে ভেসে উঠবে সেই সমস্ত, মধুযুগের সাহসী যোদ্ধাদের  কথা, যারা মুসলিমদের কাছ থেকে তাদের পবিত্র ভূমিকে উদ্ধারের জন্য যুদ্ধযাত্রা করত, কিংবা সেই সমস্ত নাইটদের কথা যারা শৌর্য বীর্যে এককালে খুব নাম করেছিল ইউরোপে, নারীর সম্মান রক্ষায় কিংবা বিপদাপন্নের কি আর্তের সেবায় জীবন উৎসর্গ করতেও দ্বিধা করত না। আবার কারোর কারোর চোখের সামনে ভেসে উঠতে পারে সেই বিখ্যাত নাইট ডন কিহোতের ছবি। আর ক্রুসেড হল মধ্য যুগের ইউরোপীয়ান চার্চ গুলির নেতৃত্বে বা প্ররোচনায় যে ধর্মযুদ্ধ হয়েছিল ১০৯৫-১২৯১ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে মুসলমানদের হাত থেকে জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করতে, সেই সমস্ত যুদ্ধ।রাজা শার্লেমেনের কথা আমরা ইতিহাসে পড়েছি।এঁরাই প্রকৃতপক্ষে খ্রীষ্ট ধর্মকে, সেই যুগে, উদ্ধার করে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।এঁরা ধার্মিক খ্রীষ্টান তীর্থ যাত্রীদের পথে আপদে বিপদে রক্ষা করতেন।

    ইনিও সেই রকম এক ক্রুসেডার।এই দুর্গ থেকে মোটামুটি ভাবে নজর রাখা হত এবং শাসন করা হত ইজিপ্ট থেকে সিরিয়া পর্যন্ত।শুধু তাই নয়, এখান থেকে, এ অঞ্চলের ব্যবসায়ী বা মুসলিম ধার্মিক যাঁরা তীর্থ যাত্রা করতেন মক্কা বা মদিনা তে তাঁদের উপর কর নেওয়াটাও চলত। তবে এই দুর্গও বেশ জলকষ্টে ভুগত, অনেকটা ফতেপুর সিক্রীর মত অবস্থা।সেই জন্য এখানে কিছু গোপন কুয়াও তৈরী করা হয়েছিল। মুসলিম তীর্থযাত্রীদের উপর কর নেওয়ার কথা মনে হতেই আমার মনে হল, তাহলে আমাদের দেশের হিন্দুদের উপর যে কর চাপানো হত একসময় , সেই জিজিয়া করও তাহলে বিপরীত দিকে এখানেও ছিল।এখানে খ্রীষ্টানরা কর নিত মুসলমান তীর্থযাত্রীর উপর।এটি পরে ১১৮৯ সালে মুসলিমদের হাতে চলে যায়।

     এ অঞ্চলে নাকি এরকম দুর্গ আরও ছিল। তবে এখানে এখনও খনন কার্য সম্পূর্ণ হয় নি।অনেকখানিই বাকী। 
    এখানে আপাততঃ, বলে না দিলে বোঝা খুব মুস্কিল যে আরও কি কি ছিল। আমাদের রায়েধ গাইড হিসাবে যতই বড়াই করুক, বা রাস্তা সম্বন্ধে জ্ঞান দিতে দিতে আসুক, ও তো আর ‘ট্রেইণ্ড গাইড’ নয়। ওর যা কিছু জ্ঞান তা কিছু শুনে, কিছু আন্দাজের অর্ধজ্ঞান। আমাদের তাই অনেক জায়গায় অন্য সাহায্য নিতেই হয়েছিল। কিছু লেখা, কিছু চোখে দেখে বোঝা , কিছু পড়া ইত্যাদি। এখানে আমরা কোন বাঁধা গাইডও পাইনি। তবে যা দেখেছি একটু বলি।

    এর পর চলুন পরের পর্বে–

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇




  • মাটিমাখা মহাপ্রাণ। সাতাশ /শুভঙ্কর দাস
  • মাটিমাখা মহাপ্রাণ। সাতাশ

    শুভঙ্কর দাস 

    "সংসারে মোরে রাখিয়াছে যেই ঘরে
    সেই ঘরে রব সকল দুঃখ ভুলিয়া। 
    করুণা করিয়া নিশিদিন নিজ করে
    রেখে দিয়ো তার একটি দুয়ার খুলিয়া
    সে দুয়ার খুলি আসিবে তুমি এ ঘরে
    আমি বাহিরিব সে দুয়ারখানি খুলিয়া। "

    কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে কুমারচন্দ্র গৃহে ফিরলেন না,প্রথমেই ছুটলেন নিজের হাতে গড়া জাতীয় বিদ্যালয়ে।
    যখন অনন্তপুর পৌঁছালেন,তখন অপরাহ্নকাল। সূর্যের আলো দিগন্তের ঠিক ওপরে বলয় করে স্থির। বিদ্যালয়ের কাছে গিয়ে কুমারচন্দ্র থমকে দাঁড়ালেন। 
    একি দেখছেন!
    বিদ্যালয়ের সামনের বাঁশ-কাঠের বেড়াটি ভেঙে নুয়ে আছে। পুকুরের কাছে কাঠের কাজ শেখানোর জন্য খড়ের চালা করা হয়েছিল,তা ভেঙে মাটিতে মিশে গেছে।
    চারটি কক্ষের একটির খড়ের চাল উড়ে গেছে,সারানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তা সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি।
    দেওয়ালে সুন্দর করে লিখে দিয়েছিলেন, "অসতো মা সদ্গময় / তমসো মা জ্যোতির্গময় / মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়েতি " তা মুছে গিয়ে কিছু শব্দ জেগে আছে। কুমারচন্দ্র শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক বিদ্যালয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন,যাতে বিদ্যার্থীরা দিনেরাতে শিক্ষালাভ করে মানুষের মতো মানুষ হয়। কিন্তু এই সময় বিদ্যালয় থেকে যে পরিমাণ ছাত্রছাত্রীর শব্দ শুনতে পাওয়া যাওয়ার কথা,তার তো মিলছে না! তাহলে কি বিদ্যালয় আজ ছুটি?
    অথবা কোনো কি দুর্ঘটনা ঘটেছে! 

    কুমারচন্দ্র গেটের কাছে দাঁড়ালেন।চারিপাশে তাকিয়ে শেষে বেড়ার একটি অংশ বাঁধতে দেখেন বন্ধু সূর্যপদকে।
    সূর্যপদর উশকো-খুশকো চুল,পরনের পিরানটা ময়লা এবং তাঁর চক্ষু কোটারাগত। 
    একার পক্ষে বেড়াটিকে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না!
    সেটা পড়ে যাচ্ছিল,সূর্য বিদ্যালয়ের দিকে তাকিয়ে 'জীবেশ' বলে কাউকে ডাক দিলেন।
    কিন্তু কেউ সাড়া দিল না!

    তখন বাইরে থেকে কুমারচন্দ্র ছুটে গিয়ে ধরলেন।
    কুমারচন্দ্রকে দেখে যুগপৎ আনন্দ এবং অবাক হলেন।

    আরে কুমার, কখন এলি! জেল থেকে ছাড়া পেলি কবে? আমরা তো হিসেব করছিলাম,আরও তিনমাস! 

    আমার কথা ছাড়,কিন্তু এদিকে এ কী অবস্থা? 

    অবস্থা তো ভালোই, তুই ছাড়া পেলি কবে? শুনছিলাম, গান্ধিজি সর্বভারতীয় যে সত্যাগ্রহ করবেন বলেছিলেন,সেই পরিকল্পনা ত্যাগ করেছেন,তবে তার জন্য কি? 

    হ্যাঁ,তাই, কিন্তু এখানের অবস্থা সত্যি কি ভালো?

    আর কী বলি বল, একবেলা খেয়ে ছোট ছোট বাচ্চাগুলো পড়াশোনা করছে,হাতের কাজ শিখছে এবং আমার বেত্রাঘাতও সহ্য করছে।

    কী বললি? একবেলা খেয়ে!

    হ্যাঁ,বন্ধু, আমার মাঝেমধ্যে এই স্থান ছেড়ে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে,বাচ্চাগুলোর খিদে ভর্তি মুখ দেখে দেখে বুকে পাথর জমে গেছে!

    কেন? কেউ কি সহযোগিতা করছে না!

    আর সহযোগিতা! তুই তৈরি করেছিলি চালভিক্ষার ব্যবস্থা,তা বেশকিছুদিন চলছিল,তারপর তাও ভেঙে গেছে, তোকে পুলিশ গ্রেফতার করার পর লোকের মধ্যে একটা চোরা ভয় কাজ করছে।কেউ সরাসরি সাহায্য করতে চাইছে না!

    কুমারচন্দ্র মুখ নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।

    সহসা একটা চিৎকার শোনা গেল।বিদ্যালয়ের একটি কক্ষ থেকে শব্দটা এলো। কুমারচন্দ্র ও সূর্যপদ সেই দিকে ছুটে গেলেন।

    একটি ছাত্র ভয় পেয়ে একটি কক্ষের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে, তার মুখে লেগে আছে,সাদা মুড়ি। তার পায়ের সামনে মাটিতে ঢালা হয়ে আছে একগাদা মুড়ি,তার পাশে ভাঙা হাঁড়ি।
    পাশে দাঁড়িয়ে একজন মহিলা চিৎকার করে ককিয়ে উঠে, সেই ছেলেটিকে মারতে যাচ্ছে! 
    কুমারচন্দ্র তার হাত ধরে জিজ্ঞেস করলেন,কী হল সুশীলা? এতো ক্ষেপে গেছিস কেন?

    বিদ্যালয়ের আবাসিক বাচ্চাদের খাওয়ার ব্যবস্থাটি সেই লক্ষ্যনজর করে।

    দাদা! বলেই কেঁদে উঠল। 

    কিছুক্ষণ পরে।

    কী বলব দাদা, এইসব রাক্ষুসে ছেলেপিলে পড়তে এলে তো মস্ত বিপদ!

    কেন?

    কেন আবার,এই যে বিটকেল নন্দ, সকালেই মুড়ি খেয়েছে আবার ক্লাসের ফাঁকে লুকিয়ে উঁচু তাক থেকে মুড়ির হাঁড়ি থেকে মুড়ি চুরি করছে!

    আচ্ছা খিদে পেলে কী করবে বল?

    তাহলে রাতে কী খাবে?

    মানে? রাতে ভাত হবে না!

    ভাত!  দাদা গো গত একমাসের মধ্যে মনেই পড়ে না,কবে ভাত খেয়েছি, এই দেখো,বলেই চালের শূন্য হাঁড়িকুঁড়ি এনে কুমারচন্দ্রকে দেখাল।

    শূন্য হাঁড়ির দিকে তাকিয়ে কুমারচন্দ্রের চোখ ভিজে এলো।
    তিনি সূর্যপদর দিকে চেয়ে বললেন,বন্ধু, এইভাবে কি দেশসেবা করব বলে পথে নেমেছি,দুবেলা দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে পারছি না!

    কী বলছিস? দুবেলা,একবেলাই ভাত জোটানো পর্বত ঠেলার ব্যাপার দাঁড়িয়েছে!

    কুমারচন্দ্র চোখটায় হাত বোলালেন। 
    সুশীলা মৃদুস্বরে বলে উঠল,দাদা,ছাত্রদের কথা তো জানলে,এই অন্নাভাবের জন্য কত ছেলেপিলে পালিয়ে গেছে! তারপর এই সূর্যমাস্টার,কতদিন রাতে শুধু জল খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছ,যাতে অন্য বাচ্চাদের খাবারে কম  পড়ে যাওয়ার ভয়ে!
    তুমি যেদিন থেকে জেলে বন্দী ছিলে,আর মোরা এখানে সেদিন থেকে যেন বন্দী হয়ে আছি!
    এই দ্যাখো না,এক হাঁড়ি মুড়ি মাটিতে ফেলে নষ্ট করলে,এবার রাতে কী হবে?

    কুমারচন্দ্র একবার শুধু সূর্যপদের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন!

    পশ্চাতে ছুটে গেলেন সূর্যপদ।

    কোথায় যাচ্ছিস কুমার? 

    বারান্দায় এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে কুমারচন্দ্র বললেন, আজ এই বাচ্চাগুলোর জন্য যতক্ষণ না অন্ন জোগাড় করছি,ততক্ষণ ফিরব না!
    আমি চাষার ব্যাটা,খরা মাটির বুক চিরে ধান তুলে আনব...

    কিন্তু এই তো সবে জেল থেকে ফিরলি? বাড়ি গেছিস?

    কুমারচন্দ্র শুধু একবার সূর্যপদের দিকে তাকালেন!মুখে উচ্চারণ করলেন,বাড়ি! এই তো আমার বাড়ি! 
    তারপর বেরিয়ে গেলেন।

    সূর্যপদ বন্ধুর করুণ ও ব্যথাদীর্ণ মুখমণ্ডল দেখে নিজেই অন্তরে স্থির হয়ে গেলেন।
    মানুষের জন্য যুগ যুগ ধরে এমন কিছু মানুষ জন্মায়, যাঁরা অন্যের জন্য নিজেকে যেন জন্ম থেকে আত্মাহুতি দিয়ে বড় হতে থাকে।তারা অন্য আর পাঁচজন থেকে আলাদা।
    সূর্যপদ আজকে তাঁর বন্ধু কুমারের চোখে সেইসব আত্মাহুতি মহামানববের ছায়া দেখতে পেয়েছে! 

    তিনি ছুটে এসে কক্ষে এসে হাসিমুখে সকলকে বললেন,ওরে,আজ তোদের ভাবনা নেই, আজ রাতে সবাই আমরা ভাত খাব,পথের দেবতা পথে নেমে গেছে, মুঠো মুঠো অন্ন ছাড়া কিছুতেই ফিরবে না!

    সাড়ে সাতটার সময় জোনাকিঢাকা অন্ধকার ভেদ করে বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে পৌঁছালেন কুমারচন্দ্র। সারা শরীর ঘর্মাক্ত, চুলগুলো উসকো-খুসকো,মুখের মধ্যে এক ক্লান্তির ছাপ,কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁর মুখে একটা যুদ্ধজয়ের হাসি।
    পিঠে তাঁর একটি চালের পুঁটলি আট হাতে শাক-সবজিভরা ব্যাগ।সেই ব্যাগের হাতল থেকে দড়িতে বাঁধা চার-চারটে দেশি রুই মাছ।সাইজগুলো বেশ বড়।
    তা বারান্দায় রেখে ধপ্ করে বসে পড়লেন।
    সুশীলা রান্নাঘরে ছিল, কুমারচন্দ্র কে দেখে দৌড়ে এগিয়ে এলো।
    বাপরে বাপ,কুমারদা, এতো কী এনেছো গো? এতো দারুণ ব্যপার।আহ্ বাচ্চাগুলো আজকে পেটপুরে চাটি খাবে।
    কুমারচন্দ্র মৃদুস্বরে বলে উঠলেন,সুশীলা,আজ আমার এমন ক্ষুধা উঠেছে যে,গোটা অনন্তপুর খেয়ে ফেলতে পারি,নে নে, জোগাড়যন্ত্র করে ফ্যাল দেখি!

    সে আর বলতে, তোমার অপেক্ষায় ছিলাম, তুমি একটু জিরিয়ে নাও

    না,আমি চট করে পুকুরঘাট থেকে স্নান সেরে আসি,তারপর বাচ্চাগুলোর পড়াশোনা কেমন হচ্ছে একটু দেখব, সূর্য আবার কোথায় গেল?

    ঐ যে মশলাপাতি কিছু কিনে আনতে গেছে, এই ফিরলেন বলে!

    কতজন খাবেরে? 

    ও তোমার ধরো না,চল্লিশজনা মতো 

    আচ্ছা, এক কাজ কর দিকি, আরও দু'একজনের বেশি ভাত ধরবি, আহা!রে তোর বৌদিকে যদি ডেকে পাঠাতে পারতাম! তোকে একটু হাতে হাতে এগিয়ে দিতে পারত! 

    সুশীলা চুপ করে থাকল।

    তারপর সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলল,ওসব নিয়ে ভেবো না,সবকিছু ঠিক সামলে নেব, তুমি স্নান সেরে আসোগে...
    কুমারচন্দ্র পুকুরঘাটে গিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে স্নান সেরে অফিস কক্ষে এসে অবাক হল।সেখানে তার জন্য কাচা ফতুয়া-ধুতি রাখা ছিল।
    সেগুলো পরে নিয়ে ভাবলেন,সত্যি, সূর্যের কতদিকে খেয়াল থাকে,এরকম বন্ধু ক'জনের ভাগ্যে জোটে।
    একটি কক্ষে দুটি লণ্ঠন বাঁশের গায়ে ঝুলিয়ে দেওয়া।তাতে বেশ আলো হয়েছে। সেখানে জনা কুড়ি ছাত্র বসে আছে।
    কুমারচন্দ্র টেবিল সরিয়ে তাদের মধ্যে বসে পড়লেন। জিজ্ঞেস করলেন,তোরা সব মুড়ি খাবি এখন?
    তারা সমস্বরে মাথা নাড়ল।তাদের চোখেমুখে একটা দীপ্তি, কারণ দীর্ঘদিন পরে তারা ভাত খেতে পাবে। এ আনন্দ বোঝানো যাবে না!

    কুমারচন্দ্রের এই কথাটি ভেবে একদিকে যেমন আনন্দ হচ্ছে, তেমনি একটা অপরিমেয় কষ্ট। দুটো ভাতের জন্য তাঁর মানুষ গড়ার পবিত্র স্বপ্ন কীভাবে ধ্বংসের পথে চলে যাচ্ছে...
    দুটো পয়সা দিয়ে কেউ সাহায্য করার নেই! 
    দুটো অন্ন কেউ কি নেই এই ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর মুখে তুলে ধরে!
    অথচ দেশে কি পয়সার অভাব! দেশে কি অন্নের অভাব!
    জমিদারের বাড়িতে দিনরাত ফুর্তির লহর ছুটছে,তাতে পয়সা খরচ হচ্ছে নদীর জলের মতো,এই বাবু গণ্ডা গণ্ডা বিয়ে করছেন,গণ্ডা গণ্ডা বাচ্চা হচ্ছে, তাই মাসে মাসে হয় বিয়ে না হয় মুখেভাত লেগেই আছে!
    তার ওপর রয়েছে বিলাসবহুল সখ-আহ্লাদ! যার না আছে মাথা,না আছে মুণ্ডু! 
    এরা কি মানুষ!
    এতো গেল অজপাড়াগাঁয়ের অবস্থা, অন্যদিকে কলকাতায় দেখো,বেশির ভাগই বৃটিশ সরকারের পদলেহনকারী,শুধু সাহেব সাজার ধুম,বিলিতি কায়দায় কীভাবে নিজেদের তুলে ধরতে মরিয়া! ছিঃ
    দেশের কথা,দশের কথা ভাবে না! এই দেশের মানুষ,অথচ এই দেশকে, এই দেশের লোকজনকে ঘৃণা করে।তাই গুপ্তকবি এঁদের ব্যঙ্গ করে লিখেছিলেন,
    " যত কালের যুবো  যেন সুবো
    ইংরেজী কয় বাঁকাভাবে
    হোয়ে হিন্দুর ছেলে ট্যাঁসের চেলে
    টেবিল পেতে খানা খাবে "
    সহসা কুমারচন্দ্রের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ঠাকুরদার কথা মনে পড়ল।
    একবার বিদ্যাসাগরের ঠাকুরদা রামজয় তর্কভূষণ গ্রামের পাশ দিয়ে একটি মাঠের রাস্তায় হেঁটে চলেছেন।এমন সময় গ্রামের একজন লোক তাকে বলল,ওদিক দিয়ে যাবেন না পণ্ডিতমশাই, ওদিকে নোংরা বিষ্ঠা আছে।
    রামজয় তর্কভূষণ তা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েননি,তিনি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে চলতে লাগলেন,এবং মৃদু হেসে যেতে যেতে বলে উঠলেন,
    " এখানে কি মানুষ আছে,যে বিষ্ঠা থাকবে? আমি তো গোবর ছাড়া কিছু দেখতে পাচ্ছি না।যে গ্রামে একটাও মানুষ নেই সে গ্রামে মানুষের বিষ্ঠা থাকবে কী করে? এখানে তো সব গরুর দল বাস করে!
    সত্যি তাই গ্রামের পর গ্রামে মানুষ খুঁজে পাওয়া বড্ড ভার!  এই একই অবস্থা শহরেরও... 
    তাই তো গুপ্ত কবি বলেছিলেন ব্যঙ্গ করে,

    " মনের মানুষ কোথা পাই?
    মানুষ যদ্যপি হবে ভাই!
    যাহা বলি কর তবে তাই
    দ্বিপদ হয়েছে যারা   বিপদের হেতু তারা
    জগতে মানুষ কেহ নাই
    মনের মানুষ কোথায় পাই?"

    সত্যি জগতে এখন মানুষ খুঁজে পেতে হবে,আজ তো সেই অভিজ্ঞতা হয়েছে কুমারচন্দ্রের...
    দুটো জমিদারের গৃহে গিয়ে তাঁকে শূন্যহাতে শুধু ফিরতে হয়নি,গলাধাক্কা দেওয়ার আগের মুহূর্তে বেরিয়ে এসেছেন।
    অথচ যাদের প্রকৃত অবস্থা নিঃস্ব, অসহায়, তাদের দ্বারে দাঁড়াতেই,যে যেরকম পেরেছে, হাত ভরে দিয়েছে।
    সেই সব কুমোর,কামার,চাষা,জেলে, মুটে-মজুর, তাঁতির দল তাঁকে নিরাশ করেনি!
    কেউ বাড়ির চাল-ডাল, শাকসবজি, কেউ আবার সেই বিকেলবেলায় পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরে দিয়েছে
    এদের কথা কোনোদিন ভুলবেন না কুমারচন্দ্র।

    মাস্টারমশাই, মাস্টারমশাই, মোদের লেখা হয়ে গেছে,শতকিয়া লিখে ফেলেছি,তুমি কি দেখব? 
    একটি ছোট্ট ছেলে এসে সামনে দাঁড়িয়েছে।তার পরনের কাপড়টি এতবেশি সেলাই,তাতে কাপড় কম, সেলাইয়ের সুতো চোখে পড়ে বেশি। 

    কুমারচন্দ্রের ঘোর ভাঙল।হ্যাঁরে, সবার খাতা দেখব... 
    এবার কয়েকটি অঙ্ক কষতে দেবো..

    না, তার চেয়ে একটা গল্প বলো 

    গল্প! 

    হ্যাঁ,সকলে সমবেত কণ্ঠে বলে উঠল।

    কিন্তু অঙ্কটা যে শিখতে হবে, ওতে ফাঁকি দিলে চলবে না!

    সেই সুতোপূর্ণ বালকটি এবার করুণ স্বরে বলে উঠল,অঙ্ক না হয় কাল হবে,এখন গল্প হোক,অঙ্ক কষতে শুরু করলে ক্ষিদে পায় বেশি! 

    অপর একজন চেঁচিয়ে বলে উঠল,আর গল্প শুনলে,বেশ খিদে ভুলে থাকা যায়!কী বলিস তোরা? 

    সবাই সমবেতভাবে তাই সমর্থন করল।

    কথাগুলো শুনে কুমারচন্দ্র কেমন বিষণ্ণ হয়ে চেয়ে রইলেন। সত্যি, তাঁকে কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে,নিতেই হবে।

    বাইরে হালকা হেসে বলে উঠলেন,আচ্ছা,তাহলে মহাভারতের গল্প শোন.. 

    সকলে আনন্দে সায় দিল।

    তবে শোন, সবাই,মহাভারতের এক বিরাট বীর যোদ্ধা ছিলেন অভিমন্যু। কিন্তু তিনি তোদের মতোই ছিলেন ছেলেমানুষ। তাঁর মায়ের নাম সুভদ্রা,বাবার নাম অর্জুন। তিনি রূপে-গুণে-শৌর্যে-বীর্যে একেবারেই পিতা অর্জুনের মতো ছিলেন।
    পিতাই ছিলেন তাঁর গুরু।সর্বপ্রকার শস্ত্রবিদ্যায় তিনি ছিলেন নিপুণ। 
    সেই সময় কুরুক্ষেত্রের সেই ভয়ংকর যুদ্ধ চলছে।মহাগুরু দ্রোণ করলেন কী একটা অদ্ভুত যুদ্ধের সূচনা করলেন।তার নাম হল সপ্তরথী চক্রব্যূহ।মানে সব বাছাই করা যুদ্ধবাজ দিয়ে একটা এলাকাকে ঘিরে ধরা।কে কে ছিল জানিস, সেই সপ্তরথী চক্রে,দুর্যোধন, দুঃশাসন, কৃপাচার্য, কর্ণ,অশ্বথামা,জয়দ্রথ আর দ্রোণ নিজে।
    কী অবস্থা ভেবে দেখ তোরা!
    এই সময় এই চক্রব্যূহ নিয়ে সমরক্ষেত্র প্রস্তুত করে দুর্যোধন যুদ্ধে আহ্বান করলেন অর্জুনকে।কিন্তু মুসকিল হল, সেই সময় অর্জুন সেখানে ছিলেন না!
    তিনি দক্ষিন অঞ্চলে যুদ্ধ করতে গেছিলেন।আর পাণ্ডব পক্ষে একমাত্র এই চক্রব্যূহে প্রবেশ এবং বাহির হওয়ার কৌশল অর্জুন জানতেন।তিনিই নেই, তাহলে কী হবে?

    এই সময় তো যুদ্ধ না করলে কৌরবরা জয়ী হয়ে যাবেন।তখন এগিয়ে এলেন অর্জুনপুত্র অভিমন্যু। তিনি আবার চক্রব্যূহে ঢুকতে জানতেন, বেরোতে জানতেন না!
    তাহলেও তিনি এতোখানি সাহসী ও বীর ছিলেন,সেই যুদ্ধ করার জন্য এগিয়ে গেলেন।যুধিষ্ঠির বললেন,বৎস,তুমি শুধু একবার চক্রব্যূহের দ্বারমুখ খুলে দাও,তারপর আমরা ওটা দিয়ে প্রবেশ করে তোমাকে সাহায্য করব।
    অভিমন্যু সেই মতো চক্রব্যূহ ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেলেন। দ্বারমুখও খুলল,কিন্তু মহাদেবের শক্তিতে বলীয়ান জয়দ্রথ সেই মুখের সামনে দাঁড়িয়ে যুধিষ্ঠিরদের আটকে দিলেন।
    একবার ভেবে দেখ,সেই সব তাবড় তাবড় রথীমহারথীদের মাঝখানে একটি ছোট্ট বালক অভিমন্যু, কী করবে একা?
    সপ্তরথীগণ সেই বালকের ওপর গদা-তলোয়ার-তীর চালাতেই লাগল।কোনো অস্ত্র বাদ গেল না!
    কিন্তু অভিমন্যু থেমে থাকলেন না,তিনিও সমানে যুদ্ধ করতে লাগলেন।একটা সময় তাঁর খড়্গ, বর্ম,ধনু সবই ভেঙে গেল।
    একেবারে অসহায় হয়ে পড়লেন অভিমন্যু। 

    এতটা বলে চুপ করলেন কুমারচন্দ্র।

    সেই সুতোময় কাপড়ের বালক জিজ্ঞেস করল,তারপর কী হল? অভিমন্যু পালিয়ে গেল?

    না,রে না,তিনি খুবই সাহসী, তিনি একটা রথের চাকা তুলে প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ করতে লাগলেন।তারপর একটা সময় সপ্তরথীগণ তাঁকে হত্যা করল।

    মরে গেল?

    হ্যাঁ,মরে গেল বটে,কিন্তু মানুষের মনে একজন সত্যিকারের বীর হয়ে বেঁচে থাকলেন। তোরা কি এই রকম সাহসী ও বীর হতে চাস?

    সকলে চুপ। তারা অভিমন্যুর মৃত্যুতে শোকাহত।

    দেখেছিস, কীরকম যুদ্ধ করল শত্রুর বিরুদ্ধে, এই রকম যুদ্ধ তোরা করতে পারবি? জিজ্ঞেস করলেন কুমারচন্দ্র

    আবার নীরবতা। 

    তারপর সেই সুতোময় বালক উঠে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল,আচ্ছা মাস্টারমশাই, অভিমন্যু প্রতিদিন  ভাত খেতে পেত?

    নিশ্চয়, কত বড় রাজার ছেলে, তার ওপর শক্তিশালী হতে হলে তো ভাত খেতেই... 

    কথাটি শেষ হল কুমারচন্দ্রের 

    তার আগেই সেই বালকটি বলে উঠল,মোরা তো ভাতই খেতে পাই না,কী করে লড়াই করব মাস্টারমশাই? 

    প্রশ্নটা শুনে থমকে গেলেন কুমারচন্দ্র। সেই রুগ্ন ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন,কে বলল,তোরা ভাত খেতে পাবি না! পড়াশোনা করতে থাক,অবশ্যই ভাত খাবি,এটাও একটা যুদ্ধ বুঝলি,এটাও সেই চক্রব্যূহ,দেখছিস না,চারিপাশে ক্ষুধা, অভাব,কষ্ট, পরাধীনতা,অশিক্ষা, কুসংস্কার, মৃত্যু সবের সঙ্গে লড়তে হবে,লড়বি,ভাত খাবি,অভিমন্যুর মতো লড়বি... 

    চোখে জল এসে গেল কুমারচন্দ্রের। 

    দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন সূর্যপদ। তাঁরও চোখে জল।তিনি তাড়াতাড়ি জল মুছে হাসিমুখ এনে বলে উঠলেন,লড়াই করতে হলে গায়ে শক্তি দরকার,আর শক্তির জন্য চাই ভাত, চলো, সবাই খেতে চলো।

    এই আহ্বানে যেন সাড়া পড়ে গেল। হো হো হো শব্দ একটা নদীর স্রোতের মতো সকলে বারান্দার দিকে ছুটল।সেখানে আসন পাতা হয়েছে, সবাই হাত ধুয়ে একের পর এক বসছে। 

    সূর্যপদ বললেন, আয় কুমার,একসঙ্গে খাবি, তুই বসলে ওরা খুশি হবে

    কুমারচন্দ্র মাথা নেড়ে বললেন,দোর, তা হয় নাকি,বাচ্চাগুলো আগে খাক, তারপর, কী যে বলিস! 
    তুই তো খাসনি!

    দ্যাখ বন্ধু, আমি প্রতিদিন এদের সঙ্গে খাই,সে মুড়ি হোক বা শুধু জল, তুই কোনোদিন এভাবে আসিসনি, তারপর তোকে তো এই গণ্ডীর মধ্যে বেঁধে রাখা যাবে না,এই চলে যাবি,কবে ফিরবি কেউ জানে না,তাই বলছিলাম, এদের সঙ্গে খেতে বসলে,এদের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যেত।

    এবার কুমারচন্দ্র হেসে ফেললেন,তবে তাই হোক, প্রধানশিক্ষকের নির্দেশ কি অমান্যি করা যায়? চল আজকে হাঁড়ি উলটে খাব। 

    চল চল...

    বারান্দায় এসে বাচ্চাদের পাশে যখন কুমারচন্দ্র খেতে বসলেন,বাচ্চাদের মুখেচোখে একটা আনন্দের লহর বয়ে গেল। 
    সুশীলা খাওয়ার ব্যবস্থা করছিল। পর পর বাচ্চাদের সুন্দর করে কলাপাতায় খাবার সাজিয়ে দিচ্ছিল।
    কুমারচন্দ্রকে ভাত দিতে তিনি বলে উঠলেন,আমাকে মাছ দিবি না,এসবই বাচ্চাদের দিয়ে দিবি।

    সেকি! কেন?  সবার জন্য মাছ ধরা আছে

    হোক, তুই বাচ্চাদের দিবি,আরও আমার ভাগেরটা সূর্যকে দিবি,যা বললাম শুনবি 

    না,শুনব না,বলেই সুশীলা রান্নাঘরে উঠে গেল। তারপর ফিরে এসে একটা ছোট্ট বাটি কুমারচন্দ্রের থালার পাশে বসিয়ে বলল,এটা খেতেই হবে।

    কী এটা?

    তোমার প্রিয় 

    ছানার ঝোল

    হ্যাঁ

    তুই জানলি কী করে?  আচ্ছা, খেয়ে দেখি,মুখে দিতেই আপন মনে বলে উঠলেন,চারু! চারু এসেছে। 

    হ্যাঁ গো,ঐ দ্যাখো

    কুমারচন্দ্র মুখ তুলে রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন,দরজার কাছে অর্ধ আড়াল করে চারুশীলা দাঁড়িয়ে আছেন,তাঁর অর্ধেক ছায়া বাইরে এসে পড়েছে।

    বৌদি সেই সন্ধ্যার সময় উপস্থিত, যদি না আসত,মুই একেবারে আউলি যেতাম গো, তোমার বউ সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা, কীভাবে সামলে নিচ্ছে সবদিক,অথচ তিনি যে এসেছেন, কেউ জানতে পারেনি, দেবেনদা দিয়ে গেলেন!

    দাদা, এসেছিলেন 

    হ্যাঁ,আবার চলে গেছেন,তোমার খোঁজ করছিলেন,যখন দেখলেন,তুমি পড়াচ্ছ, তিনি চুপটি করে তা দেখে চলে গেলেন! 

    বুঝেছি,সবই তো হচ্ছে, তা সূর্য আমাকে একটি বলা যেতো না! এবার কুমারচন্দ্র বন্ধুর দিকে তাকালেন। 

    সূর্য হেসে বললেন,তোর বউয়ের নিষেধ ছিল,তাই কিছু বলিনি! তুই যেভাবে খাচ্ছিস,এতে তুই গোটা অনন্তপুর কেন, সামান্য 'অ' টাই খেতে পারবি না! অত অবাক-টবাক না হয়ে খা দিকি।

    কুমারচন্দ্র আনন্দের সঙ্গে ছানার ঝোল খেতে লাগলেন।
    ঠিক সেই সময় বিদ্যালয়ের অদূরে অন্ধকার মাঠের মধ্যে একটা অপূর্ব শ্রুতিমধুর গান ভেসে এলো,

    "ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে 
    কী সংগীত ভেসে আসে।
    কে ডাকে মধুর তানে,কাতর পানে
    আয় চলে যায়
    ওরে আয় চলে আয় আমার পাশে"

    কে! আব্দুল ফকির!  কুমারচন্দ্রের মুখের গ্রাস থমকে গেল!

    হ্যাঁ,লোকটার বয়স হলেও কণ্ঠটা মধুরই আছে।

    কী সৌভাগ্য, ওরে, ওঁকে ডেকে নিয়ে আয়, উনি যদি এখানে খান,আমাদের বিদ্যালয় ধন্য হয়ে যাবে 

    বলেই নিজেই উঠে পড়লেন কুমারচন্দ্র।

    ওরে কুমার,খেতে খেতে উঠতে নেই, তুই ফিরে আয়, আমি ডেকে আনছি, কাতর কণ্ঠে বললেন সূর্যপদ।

    আমি এখুনি আসছি,অন্য কেউ গেলে হয়তো আসবে না! বলেই কুমারচন্দ্র অন্ধকারে এঁটো হাতে বেরিয়ে গেলেন।

    একটু পরে কুমারচন্দ্র ও আব্দুল ফকির বিদ্যালয়ে প্রবেশ করলেন।আব্দুল গাইছিল,

    "বলে আয় রে ছুটে আয় রে ত্বরা
    হেথা নাইকো মৃত্যু নাইকো জরা
    হেথা বাতাস গীতিগন্ধভরা
    চিরস্নিগ্ধ মধুমাসে 
    হেথায় চিরশ্যামল বসুন্ধরা 
    চিরজ্যোৎস্না নীলাকাশে"

    আহা! এমন গান কার ফকির? 

    দ্বিজুবাবুর গান,একজন ফকিরদোস্ত কলকেতার থ্যাটার থেকে শিখে এসেছে, মুই তার কাছে শিখে নিয়েছি 

    বেশ, বেশ আরও শুনব, চাটি খেয়ে নাও ফকির

    খাব! তুমি খেতে দেবে? বড্ড খিদে পেয়েছে, ভাবলাম আল্লাতালা বুড়ো মানুষটার কথা হয়তো ভুলেই গেছে!  কিন্তু তুমি যখন অন্ধকারে হাত চেপে ধরলে, তখনই মনে হল, আজকে আর অভুক্ত থাকবে হবেনি! 

    আচ্ছা, খেয়ে নাও,ও চারু, দুটো ভাত দায় না

    আসন পেতে নিজের পাশে বসাল কুমারচন্দ্র। 

    মুই ভাত খাব,তবে মোর গান শুনতে হবে কিন্তু 

    নিশ্চয় শুনব,কতদিন পরে দেখা হল,কোথায় হারিয়ে যাও বলো দিকি?

    আল্লার দরবারে হারাবো কোথায়? এ যে মজার দুনিয়া,দেখি,শুনি আর মানুষরতন ছোঁবো বলে হন্যে হয়ে ঘুরে মরি, বলে গান ধরল,
    "ওরে সেই যে পরমানন্দ 
    যে আমায় ভালোবাসে
    কেন ঘরের ছেলে পরের কাছে
    পড়ে আছিস পরবাসে।"

    গানে গানে রাত কাটল।

    আব্দুল ফকিরকে একটি ক্লাসরুমে শোওয়ার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছিলেন কুমারচন্দ্র।
    কিন্তু তিনি সেই পুকুরপাড়ে গাছতলায় নিজের স্থান নির্বাচন করলেন।
    বাচ্চাগুলো ও মেয়েরা কক্ষে ভাগাভাগি করে শুয়ে পড়লেন।
    কুমারচন্দ্র ও সূর্যপদ বারান্দায় মাদুরে শুলেন।
    সকলেই প্রচণ্ড ক্লান্ত। প্রায় সকলেই একটু পরেই গভীর নিদ্রাদেবীর ক্রোড়ে আশ্রয় নিলেন। 

    ঘুম ভাঙল অতি ভোরে।

    আব্দুল ফকিরের গানে।

    "ধনধান্যপুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা 
    তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা
    ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে-দেশ, স্মৃতি দিয়ে ঘেরা

    এমন দেশটি কোথায় খুঁজে পাবে নাকো তুমি 
    সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি। 

    চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা কোথায় উজল এমন ধারা
    কোথায় এমন তড়িৎ এমন কালো মেঘে! 
    তার পাখির ডাকে ঘুমিয়ে উঠি,পাখির ডাকে জেগে! 


    সহসা ঘুম থেকে উঠে সূর্য চারিপাশে কুমারচন্দ্রকে খুঁজতে লাগলেন।
    আশেপাশে সর্বত্র খোঁজার পর চারুশীলাকে জিজ্ঞেস করলেন,বউঠান,আপনি জানেন,কোথায় গেল কুমার?

    চারুশীলা মাথা নাড়লেন।

    আপনাকেও বলেনি! গতরাতে আমাকে বার বার বলছিল,বন্ধু, এই বিদ্যালয়কে বাঁচাতে হবে, এই বিদ্যালয় তো শুধু পড়াশোনার জন্য নয়, ভবিষ্যত দেশ গড়বে যারা,তাদের জন্য এই বিদ্যালয়,কিছু একটা করতে হবে। 

    আমি বললাম, ভাই,ঘুমিয়ে নে, সকালে আলোচনা করব

    আমার তো ঘুম আসছে না,বন্ধু, একটা অগ্নিময় অস্থিরতা কাজ করছে,এই বিদ্যালয়ের উন্নতির জন্য পয়সা চাই? পয়সা জোগাড় করতে হবে।

    এইসব বলে সারারাত বিড়বিড় করছিল,তার মধ্যে কখন আমার চোখটা জুড়ে এলো,ফকিরের গান শুনে, উঠে দেখি নেই! 

    সেই সময় বিদ্যালয়ের গেট খুলে ঢুকলেন দেবেন।

    তিনিও জানালেন,কুমার বাড়ি ফেরেনি!

    তাহলে? 

    সহসা একটা চিঠি পেলেন সূর্য মাদুরের নিচ থেকে। 
    খুলে পড়লেন,

    বন্ধু, সূর্য

    আমি বেরিয়ে পড়লাম।রাত থাকতে থাকতেই। এই বিদ্যালয়কে বাঁচাতেই হবে।আমি আমার শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে চেষ্টা করব।
    পয়সা জোগাড় করতেই হবে।এই যুদ্ধে অভিমন্যুদের আমি জেতাবই...কিছুতেই তাদের মরতে দেবো না।

    চলি।চারুকে বুঝিয়ে বলিস।

    গান ভেসে আসছিল..

    ভায়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ?
    ও মা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি
    আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি... 

    এমন দেশটি কোথায় খুঁজে পাবে না ক তুমি, 
    সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি। "

    চারুশীলা প্রশ্ন করলেন সূর্যপদকে,আচ্ছা,ঠাকুরপো, সত্যি কি আমাদের মতো দেশ কোথাও নেই? সত্যি এই দেশ রানি? 

    সূর্যপদ বলে উঠলেন,বউঠান,যে দেশে কুমারের মতো মানুষ জন্মেছে, সেই দেশ সত্যিকারের রানি...  একদম সত্যিকারের রানি... 


    ক্রমশ....

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
     


  • দূরদেশের লোকগল্প – এশিয়া (চীন) -- ৯৩ /চারটি নদীর জন্মকথা /চিন্ময় দাশ
  • দূরদেশের লোকগল্প – এশিয়া (চীন)  -- ৯৩

    চারটি নদীর জন্মকথা

    চিন্ময় দাশ
     
    অনেক অ-নে-ক কাল আগের কথা। সারা পৃথিবীতে কোন নদী বা হ্রদ ছিল না সেসময়। তবে, তাই বলে কি জলও ছিল না কোথাও? না, না—তা কেন? জল অবশ্যই ছিল। তবে, সেসময় একমাত্র ‘পূর্ব সমুদ্র’ (জাপান সাগর)টাই যা সৃষ্টি করেছেন বিধাতা। আর কিছু নয়।
    তো, সেই পূব সমুদ্রে থাকতো চারটে দৈত্য—লম্বা-দৈত্য, হলুদ-দৈত্য, কালো-দৈত্য আর মুক্তা (সাদা)-দৈত্য। এক জলে চারজনের বাস। তাই ভারি ভাব চার দৈত্যের মধ্যে। যাকে বলে, একেবারে গলায় গলায় ভাব তাদের। 
    একবার চার দৈত্যের মনে হোল, জন্ম থেকে একই জলে থেকে থেকে, একঘেয়ে হয়ে গেছে জীবনটা। জল থেকে একটু বেরুনো দরকার। 
    যেমন ভাবনা, তেমনই কাজ। যার গায়ে যত জোর আছে, সব লাগিয়ে, বিশাল এক এক লাফ। সে কী লাফ, বলবার মত নয়। জল ছেড়ে উঠে গিয়েছে একেবারে আকাশে।
    কী মজা, কী মজা! ফুরফুরে বাতাস বইছে। মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। কখনও লাফাচ্ছে। কখনও দৌড়চ্ছে। এ ওর গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সে কী হুটোপাটি তাদের! মেঘেদের ভিতরে লুকোচুরি খেলা চলছে চারজনের।
    হঠাতই মুক্তো-দৈত্য চেঁচিয়ে উঠল—সবাই একবার এখানে ছুটে এসো। খুব তাড়াতাড়ি!
    ডাক শুনে, তিনজনেই অবাক। তিন জনেই হাজির হয়ে জানতে চাইল—কী হোল গো? 
    নীচে পৃথিবীর দিকে আঙ্গুলের ইঙ্গিত করল মুক্তো-দৈত্য—চেয়ে দ্যাখো, নীচে, ওই দিকে।
    দেখা গেল, বেশ কিছু লোক জড়ো হয়েছে এক জায়গায়। কেউ এনেছে ফল-মূল। সুগন্ধি ধূপ এনেছে কেউ বা। পূজার আয়োজন হয়েছে সেখানে। সামনে একজন বুড়ি। শনের নুড়ির মত এক ঝুড়ি চুল তার মাথায়। হাঁটু গেড়ে বসে, প্রার্থনা জানাচ্ছে বুড়ি-- হে সর্বশক্তিমান বিধাতা! একটু কৃপা করো আমাদের। তাড়াতাড়ি বৃষ্টি দাও, প্রভু। এক্মুঠো অন্ন নাই আমাদের শিশুদের মুখে। কতকাল বৃষ্টি নাই এখানে। একটু দয়া করো আমাদের। বেঁচে থাকতে দাও দয়া করে।  
    চার দৈত্যই চেয়ে দেখল—বহুকাল একফোঁটা বৃষ্টি নাই দেশটাতে। খেতের ফসল জ্বলে গেছে। মাঠের ঘাস, গাছের পাতা সব শুকিয়ে হলুদ। গনগনে রোদের তাতে মাঠ-ঘাট সব ফুটিফাটা।
    --আহা, কী দুর্দশা মানুষজনের! হলূদ-দৈত্য বলল—এখুনি বৃষ্টি না হলে, এরা সবাই তো মারা পড়বে। 
    লম্বা-দৈত্য বলল—এক কাজ করা যাক। চলো, সবাই দল বেঁধে, বিধাতার কাছে যাই। দরবার করি গিয়ে।
    সকলেই রাজি সে কথায়। লাফ দিয়ে চারটা মেঘের পিঠে চড়ে বসল চার দৈত্য। স্বর্গের উদ্দেশ্যে উড়ে চলল তারা। 
    আকাশ, পৃথিবী আর সমুদ্র—তিনেরই অধীশ্বর হলেন বিধাতা। তাঁর কথাতেই চলে তিনটে জগত। যা কিছু ঘটে তিন জায়গায়, তিনি আঙ্গুল নাড়ালেই। বিশাল ক্ষমতা তাঁর। 
    এক দল পরী নেচে নেচে গান গাইছে। সিংহাসনে হেলান দিয়ে বসে, গান শুনছিলেন বিধাতা পুরুষ। দৈত্যগুলোকে সেখানে হাজির হয়ে যেতে দেখে, মোটেই ভালো লাগল না তাঁর। একটু বিরক্তই হলেন বরং। 
    --এখানে এসেছ কেন তোমরা? বিধাতা ধমকে উঠলেন দৈত্যদের। তোমাদের তো পূব সমুদ্রে থাকবার কথা। নিজেদের এক্তিয়ার জানো না? 
    ভয় তো পেলই না, বরং সামনের দিকে দু’পা এগিয়েই এলো লম্বা-দৈত্য। মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালো বিধাতাকে—পেন্নাম হই, প্রভু। খেত-খামার সব জ্বলে যাচ্ছে পৃথিবীতে। না খেয়ে মরতে বসেছে সবাই। দয়া করে তাড়াতাড়ি বৃষ্টির মেঘকে পাঠান সেখানে।
    এতো সাহস দৈত্যগুলোর? তাঁর দরবার পর্যন্ত চলে এসেছে! তাঁকেই পরামর্শ দিচ্ছে! অবাক হয়ে গেলেন বিধাতা! কোন রকমে নিজেকে সংযত রেখে বললেন—ঠিক আছে, সে দেখা যাবে। আগে তোমরা চলে যাও এখান থেকে। 
    আবার নাচ-গানে মশগুল হয়ে গেলেন বিধাতা। 
    খুশি মনে ফিরে এসেছে দৈত্যেরা। কিন্তু ঐ আশ্বস্ত হওয়া পর্যন্তই। এক দিন যায়। দু’দিন যায়। চার দিন যায়। দেখতে দেখতে দশ দিন কেটে গেল গুণে গুণে। কালো মেঘের দেখাই নাই আকাশে। এক ফোঁটা বৃষ্টি তো অনেক দূরের কথা। 
    দুর্দশার শেষ নাই মানুষজনের। কেউ গাছের বাকল তুলে খাচ্ছে। ঘাসের শেকড় চেবাচ্ছে কেউ। কেউ বা কিছু না পেয়ে, সাদা রঙের কাদা (বিখ্যাত ‘চিনে মাটি’) খাচ্ছে তুলে তুলে।
    দেখে ভারি কষ্ট হোল দৈত্যদের। বেশ বুঝতে পারল, নিজের আমোদ-আহ্লাদ ছাড়া, অন্য কোন দিকে মন নাই বিধাতার। তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষজনকে। অথচ তাদের কথা অন্তর দিয়ে ভবেন না কখনও। 
    লম্বা-দৈত্যের মনে হোল, মানুষদের দুঃখ লাঘব করতে হলে, যা করবার, তাদের নিজেদেরই করতে হবে। কিন্তু তার উপায়টা কী ? কীভাবে অনাবৃষ্টির যন্ত্রনা থেকে রেহাই দেওয়া যায় মানুষদের? 
    সারা দিন ভেবে, মাথায় একটা উপায় এলো তার মাথায়। তিন দৈত্যকে ডেকে বলল-- এই সাগরে তো অনেক জল। এই জল থেকেই তো উপকার করা যেতে পারে মানুষের। 
    তিনজনে জানতে চাইল—কিন্তু জল আমরা পাঠাব কী করে পৃথিবীতে? 
    --কেন? মুখ ভর্তি জল নিয়ে, ফোয়ারার মতো আকাশে ছুঁড়ে দেব। বৃষ্টি ফোঁটার মতো সে জল গিয়ে পড়বে পৃথিবীর মাটিতে। তাতে ফসল বাঁচবে। মানুষরাও বাঁচবে তাতে। 
    সবাই খুশি এ কথায়। সবাই তারিফ করল ভাবনাটার।
    খানিক চুপ করে থেকে, লম্বা-দৈত্য বলল—তবে, একটা বিপদ আছে। বিধাতার নজরে গেলে, রেগে যাবে নিশ্চয়ই।
    --মানুষের দুর্দশা মেটানোর জন্য, আমি সব কিছু করতে রাজি। হলুদ-দৈত্যের গলায় বেশ দৃঢতা। 
    --চলো তাহলে। কাজে লেগে পড়া যাক। লম্বা-দৈত্য বলল—অনাবৃষ্টি ঠেকাতে, যত দূর যেতে হয়, যাবো আমরা। তাতে যাই ঘটুক, কোন কিছুতেই আফশোস করব না কোন দিন।
    কালো-দৈত্য আর সাদা-দৈত্যও পিছিয়ে থাকবার নয়। তারা দুজনেই এগিয়ে এল প্রথমে। হাঁ-মুখে জল নিয়ে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিতে লাগল আকাশে। লম্বা-দৈত্য আর হলুদ-দৈত্যও কাজে লেগে পড়ল। 
    চার দৈত্য জল ছুঁড়ছে। আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে চারটে ফোয়ারা। তারপর ঝরণাধারার মত নেমে এসে, বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে ঝরে ঝরে পড়ছে মাটিতে। বিশাল আকারের ঘণ কালো মেখ দেখে মনে হচ্ছে, যেন পুরো পূব সমুদ্রটাই উঠে গেছে আকাশে। অঝোর ধারে বৃষ্টি ঝরছে সেই মেঘ থেকে। 
    --বৃষ্টি পড়ছে গো, বৃষ্টি! ফসল বেঁচে যাবে আমাদের। আমরাও বেঁচে যাবো এবার। আনন্দে বৃষ্টির মধ্যে নাচানাচি করতে লাগল পৃথিবীর মানুষেরা।
    কিন্তু ভারি গোঁসা হোল একজনের। সে হোল সমুদ্রের দেবতা। তারই জল আকাশে তুলে দিয়ে, বৃষ্টির ব্যবস্থা করেছে চারটে হতভাগা দৈত্য। কিন্তু একবার মুখের কথাটাও বলেনি তাকে। জল কি ওদের নিজেদের? 
    আঁতে ভারি ঘা লেগেছে তার। সোজা বিধাতার দরবারে গিয়ে হাজির। দৈত্যগুলোর বিরুদ্ধে সাত-কাহন করে লাগিয়ে দিল বিধাতার কানে। 
    --কী, এত বড় আস্পর্ধা! হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন বিধাতা। আমার হুকুম ছাড়া, নিজেরাই বৃষ্টির ব্যবস্থা করেছে? চরম সাজা পেতে হবে হতভাগাগুলোকে। 
    নিজের চারজন সেনাপতিকে ডেকে আনলেন বিধাতা। হুকুম দিলেন—এক্ষুনি গিয়ে ধরে নিয়ে এসো চারটাকে। দলবল নিয়ে যাবে। সোজা এই দরবারে এনে হাজির করবে। 
    বিধাতার হুকুম বলে কথা। বেশি সময় গেল না। চার সেনাপতি পিছমোড়া করে বেঁধে দরবারে এনে হাজির করল চার দৈত্যকে।
    চার দৈত্যকে চোখে পড়ামাত্রই, ভয়াণক রাগে শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল বিধাতার। গোল গোল চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে। নিঃশ্বাস পড়ছে ঘণ ঘণ। 
    পাহাড়ের দেবতা হাজির ছিল দরবারেই। বিধাতা তাকে ডেকে বললেন—সবার চেয়ে বড় চারটে পাহাড় এনে চাপিয়ে দাও এই চারটে হতভাগার উপর। কেরামতি দেখানো তো দূরের কথা, ভবিষ্যতে জীবনে আর যেন নড়াচড়াটাও করতে না পারে কোন দিন। 
    পাহাড়ের দেবতার ক্ষমতা কারও চেয়ে কম নয়। তার হুকুমে, চার দিক থেকে চারটে বড় বড় পাহাড় উড়ে উড়ে আসতে লাগল বিধাতার দরবারের দিকে। আকাশ বাতাস ফুঁড়ে আসছে পাহাড়গুলো। শোঁ-শোঁ শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল চারদিক।
    পাহাড়গুলোর চেহারা দেখে, বিধাতা ভারি খুশি। হুকুম করলেন—এক জায়গায় নয় কোন মতেই। কোন দিন যেন আর এক জায়গায় জমায়েত হতে না পারে। দূরে দূরে চার জায়গায় নিয়ে যাও বেকুবদের। এক একটা পাহাড় চাপিয়ে রেখে দিয়ে এসো। 
    হুকুম মত, নীচের পৃথিবীতে ভিন্ন ভিন্ন চার যায়গায় নিয়ে যাওয়া হোল চার দৈত্য আর চারটে পাহাড়কে। নিজের হাতে ধরে, চারটে পাহাড়কে চার জন দৈত্যের উপর চাপা দিয়ে দিল পাহাড়ের দেবতা। হেসে-খেলে এতকাল ছিল সাগরের জলে। এবার শুকনো ডাঙ্গায় চিরকালের জন্য বন্দী হয়ে গেল দৈত্য চারজন।
    গল্পটা এখানেই শেষ নয় কিন্তু। 
    পাথর চাপানোর কাজ শেষ করে, বিধাতা পুরুষের দরবারে ফিরে গেল পাহাড়ের দেবতা। দৈত্যগুলো পড়ে রইল পাহাড়-চাপা হয়ে। 
    কিন্তু কোনও দুঃখ বা আফশোস হোল না একজন দৈত্যেরও। পৃথিবীর রুখাশুখা মাটি আর মানুষের উপকার করবে বলে পণ করেছিল চার জন। সে কথা তারা ভুলে যায়নি। চারজন দৈত্য করল কী, চারটে নদীতে পালটে ফেলল নিজেদের। কোথায় দৈত্য, কোথায় কী! তার বদলে, চারটে নদী বয়ে যেতে লাগল খর বেগে। 
    পূর্ব সমুদ্রের বাস ছিল চারজন দৈত্যের। সেই সমুদ্রের দিকেই চলতে লাগল চারটে নদী। উঁচু পাহাড়, গভীর গিরিখাত, বিস্তৃর্ণ মাল্ভূমি, গাঁ-গঞ্জ—কত কত জায়গা বেয়ে বেয়ে, এগিয়ে গেল নদীগুলোর স্রোত। পশ্চিম থেকে পূবমুখো হয়ে চলতে চলতে, পূর্ব সমুদ্রের জলেই এসে মিশে গেল চার জনে। এই পূব সমুদ্রই তো ছিল তাদের আদি বাসভূমি। 
    ……………………………………………………………………………… 
    এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে চীন দেশের চারটি বিখ্যাত নদী ঃ ইয়াং ৎজে, হোয়াং হো, আমুর আর ঝু জিয়াং। এখনও চীন দেশের বুড়োবুড়িরা এই গল্প শোনায় নাতিনাতনিদের। দেশ-বিদেশের সমীক্ষকরা, দিনের পর দিন বছরের পর বছর, গ্রামে গ্রামে ঘুরে সংগ্রহ করে এনেছেন এই কাহিনী।   
    ( ৪টি নদীর ভৌগোলিক বিবরণ-- অতি সংক্ষেপে) ঃ 
    ১ ইয়াং ৎজে-- দৈর্ঘ্য ৬,৩০০ কিমি। কেবল চীন নয়, এশিয়া মহাদেশেরও বৃহত্তম নদী এটি। এই নদীটি সারা বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম। তিব্বত উপত্যকায় তাংগুলা পর্বতমালার ‘জারি পাহাড়’ থেকে এই নদীর উতপত্তি।  
    ২ হোয়াং হো (হলদে বা পীত নদী)— মধ্য চীন এলাকার ‘বায়ান হার’ পাহাড় থেকে উতপন্ন এই নদীর দৈর্ঘ্য ৫,৬৬৪ কিমি। সারা বিশ্বে এর স্থান ষষ্ঠ। নিজের চলার পথে ২৬ বার পথ বদল করেছে নদীটি। এই নদীর ভয়াবহ সেইসব ধ্বংসলীলা। একারণেই, হোয়াং হো নদীর নাম হয়েছিল—‘চীনের দুঃখ’। 
    ৩ আমূর (কালো)— এ নদীর জন্ম ‘ইয়াব্লোনর’ পাহাড়ে। দৈর্ঘ্য ২,৮২৪ কিমি। দৈর্ঘ্যের হিসাবে বিশ্বে এ নদীর স্থান দশম। উত্তর-পূর্ব চীনের এই নদীটি, মানচিত্রে চীন এবং রাশিয়া—দুই দেশের সীমারেখা। 
    ৪ ঝু জিয়াং (সাদা বা মুক্তো)— একেবারে দক্ষিণ-চীন এলাকায় এ নদীর অবস্থান। পূর্ববাহিনী এই নদীর দৈর্ঘ্য ২,১৯৭ কিমি। চীনদেশের তৃতীয় বৃহত্তম এই নদী। পূর্বকালে এর নাম ছিল—ক্যান্টন নদী।)
    ……

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇



  • পথরেখা গেছে মিশে - পর্ব ১/মিলি ঘোষ
  • পথরেখা গেছে মিশে - পর্ব ১

    মিলি ঘোষ

    বট বৃক্ষের ছায়ায়

     অপরাজিতা তখন বেশ ছোটো, স্কুলেও ভর্তি হয়নি। পাখার তলায় গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে থাকত। হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখে বাবা পড়াচ্ছে আর কত কত বড় দিদিরা সব পড়তে এসেছে। অপা উঠেই দৌড়।  তারপর থেকে বাবা যে ঘরে পড়াত,ঘর খালি থাকলেও অপা আর যেত না সে'ঘরে ঘুমোতে। দিদিগুলো যদি আবার হাসে তাকে নিয়ে। মায়ের কাছে অনুযোগ করেছিল, "বাবা কেন আমাকে ডেকে দেয়নি।" মা শুনে হেসেছিল। 

    একটা জিনিস মাথায় ঢুকত না অপার, বাবা দুপুরের স্কুলে পড়ায়, সেখানে সবাই মাস্টার মশাই। আবার সকালে মেয়েদের স্কুলেও পড়ায় কেন, সেখানে তো অন্য কোনো মাস্টার মশাই নেই ? তবে, অপা এটা লক্ষ্য করেছে, মেয়েদের স্কুলে বাবা বেশিক্ষণ থাকে না। টিফিনের সময় বাড়ি আসে, মা'র বানানো রুটি, তরকারি খেয়ে, খবরের কাগজ পড়ে আবার চলে যায়। এক দেড় ঘণ্টার মধ্যে ফিরেও আসে। কিন্তু দুপুরের স্কুলে সেই যে বাবা যায়, ফেরে একদম বিকেলে। অপা জানত, বাবার স্কুল বাড়ির কাছেই। বাবা যে স্কুলের কাছেই বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল, তা বোঝার মতো বুদ্ধি বা বয়স কোনওটাই অপার তখন হয়নি। 

    অপাদের বড় সংসার। বাবা'ই একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তি। সে সময়ের শিক্ষকদের বেতন বর্তমানের প্রেক্ষাপটে বিচার্য নয়।
     ইতিমধ্যে অপা বুঝে গেছে সকালের স্কুলে একটু উঁচু ক্লাসের মেয়েদেরই বাবা পড়াতে যান। আর 'পার্ট টাইম' বলে একটা শব্দ তার কানে আসতে শুরু করেছে। এ ছাড়াও 'মর্নিং সেকশন', 'ডে সেকশন' এইসব শব্দের সাথেও সে পরিচিত হতে লাগল। সে দেখে, তার ঘুম থেকে ওঠার আগেই বাবার ছাত্রীরা পড়তে এসে যায়। তারা চলে গেলে ওই পার্ট টাইম না কী যেন বলে, সেখানে যান বাবা। ফিরে এসে স্নান করে খেয়ে দুপুরের স্কুলে যান। সন্ধ্যের পরে আবার ছাত্ররা আসে পড়তে। তারপর রাত নটার পরে অপাদের ইংরেজি পড়ান বাবা। এখানেই অপার যত আপত্তি। যদিও মুখে সে'কথা বলার সাহস নেই। তবে সুবিধা একটা ছিল, পড়া বুঝিয়ে আর পড়া ধরতেন না বাবা। এই সুযোগে মনের আনন্দে ফাঁকি মারত অপা। 

     কেউ যদি জানতে চাইত, "তোমার বাবা কি সকালের স্কুলেও পড়ান ?" 
    অপা ঘাড় নেড়ে গম্ভীর মুখে বলত, "হ্যাঁ, পার্ট টাইম।" 
    আসলে মর্নিং সেকশনে অপার বাবা উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রীদের ইংরেজি ক্লাস নিতেন। কিন্তু ডে সেকশনে তো আর পার্ট টাইম পড়ানোর ব্যপার নেই। সেখানে ক্লাস অনেক বেশি। 
    অপার বাবার মধ্যে ছিল সূক্ষ্ম রসবোধ এবং কখনো কোনো ছাত্রের সাথে রূঢ় ব্যবহার করতেন না। এর ফলে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হতো। বাড়িতে যারা পড়তে আসত, অপা দেখেছে, তারা অনেক সময়ই বাবার কাছে তাদের পারিবারিক সমস্যার কথা, আর্থিক সমস্যার কথা আলাদা করে ডেকে বলত। বাবা সেই মতো তাদের পাশে থাকতেন। অথচ, এই অর্থের জন্যই কিন্তু বাবা সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। 

    অপরাজিতাদের আদিবাড়ি ছিল, বাংলাদেশের বরিশাল জেলায়। বাবার কাছে শুনেছে অপা, বরিশাল বিএম কলেজে বাবা চার মাইল পথ পায়ে হেঁটে যেতেন। সেখানে ছাত্রীদের আলাদা বসার ব্যবস্থা ছিল। একই ঘরে ছাত্রীরা বসত একটা পর্দা ঘেরা অংশে। 
    বাংলাদেশ তখন উত্তাল। অপার বাবা, জ্যাঠা পরিবার নিয়ে কোলকাতায় চলে এলেন। শুধু থেকে গেলেন দাদু, একা। এদিকে কোলকাতায় বসে চিন্তায় অস্থির হয়ে যাচ্ছেন বাবা, জ্যাঠা। খবর নেবার কোনও উপায় নেই। এ সবই অপার জন্মের বহু আগের কথা। 
    এক সন্ধ্যায় একজন মুসলমান ভদ্রলোক, যিনি অপার দাদুকে খুব সমীহ করতেন, জানলা দিয়ে ডেকে বলেছিলেন, "দাদা, আপনি পালিয়ে যান। আজ এই অঞ্চল জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। এখনই পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান।"
    বাড়ি-ঘর-পুকুর-গাছপালা সব কিছু ফেলে রেখে এক বস্ত্রে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন অপার দাদু। 
    একদিন অপার মা, বাইরের দরজায় এলোপাথাড়ি কষাঘাত শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখেন দাদু দাঁড়িয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো। মা'কে দেখে চিৎকার করে কান্না, সব ফেলে এসেছি, সব ফেলে এসেছি। 
    এই ধাক্কা নিতে না পেরে মানসিক ভারসাম্য হারান দাদু। ঘরে আটকে রাখতে হতো, নাহলে জ্বালিয়ে দিল, জ্বালিয়ে দিল বলে ছুটে রাস্তায় বেরিয়ে যেতেন। 
    বাবার কাছে এসব ঘটনা যখন শুনত অপা, গলার কাছটা দলা পাকিয়ে আসত। প্রাণপণ চেষ্টা করত, চোখের জলটা যেন বাইরে বেরিয়ে না আসে। 

    অপার বাবা যেদিন স্কুলের শিক্ষকতা থেকে অবসর নিলেন, সেদিন মর্নিং সেকশনের ক্লাস ফাইভের একটি ছোট মেয়ে স্টাফ-রুমের সামনে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিল আর বলছিল, "মাস্টার মশাই আপনি যাবেন না।" এমন নয় যে, মেয়েটিকে কোনওদিন পড়িয়েছেন তিনি। ফাইভের ক্লাস তো তাঁর থাকতই না। তবু মেয়েটি চাইল, মাস্টার মশাই থাকুন। অবুঝ বালিকা আশা করেছিল, তার অনুরোধে হয়ত মাস্টার মশাই থেকে যাবেন। স্টাফ রুমের অন্য সব দিদিমণিদের তখন চোখে জল। প্রধান শিক্ষিকা মহাশয়া মেয়েটিকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ক্লাসে পাঠান। ভালোবাসার এ বন্ধন ছিন্ন করে বেরিয়ে আসা যে কী কঠিন, অপার বাবা সেদিন তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন। 
    আরও একটি ঘটনার কথা না বললেই নয়। অপা তখন টু কী থ্রিতে পড়ে। সেদিন স্কুলের বাৎসরিক পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। ইলেভেনের একটি মেয়ে প্রায় দৌড়ে এসে তার মাস্টার মশাইয়ের কাছে আছড়ে পড়ল। বড়োদের কোনওদিন এভাবে কাঁদতে দেখেনি অপা। সেই বড়ো দিদিটার আকুল কান্না, "মাস্টার মশাই, আমি পাশ করতে পারিনি," যা অপার শিশু মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। 
    বাবা বোঝালেন, "এবার প্রথম থেকে ভালো করে পড়ো, দেখবে তোমার ভালোই হবে।"
    কিন্তু মেয়েটির কান্না থামে না। অপার মা, বাবা অনেক বুঝিয়ে তাকে বাড়ি পাঠাতে পারেন। 
    একটি মেয়ে, তার অসাফল্যের কষ্ট কার কাছে উজাড় করে দিল ? তার মাস্টার মশাইয়ের কাছে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কতটা সহজ, সাবলীল ও আন্তরিক হলে, এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটতে পারে। 
    কালের নিয়মে বয়স বাড়ে অপার। আজকাল তার অদ্ভুত লাগে, যখন দেখে ছাত্ররা শিক্ষকদের চূড়ান্ত অসম্মান করছে। উপাচার্যকে ঘেরাও করে অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলছে, হিসেব মেলে না অপার। এই কী ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক! 

    অপার বাবা তখন মৃত্যুর সাথে শেষ লড়াই করছেন। খবর পেয়ে অপা শ্বশুরবাড়ি থেকে ছুটে গিয়েছিল নার্সিংহোমে। বৈশাখের শেষ বিকেলে ঝড় উঠেছিল খুব। বাবা বললেন, "বলো তো কাল বৈশাখী ঝড় ইংরেজি কী ?"
    অপা তো অনেক কিছুই বলছে। কিন্তু বাবার মন ভরে না। 
    বললেন, "নরওয়েস্টার ( norwester)।
    উত্তর পশ্চিম কোন থেকে আসে বলে এর নাম 'নরওয়েস্টার'।"
    শিখিয়ে গেলেন মৃত্যুশয্যায়। আর ভুল হয়নি কোনওদিন অপার। এখনো কালবৈশাখী ঝড় উঠলে মনে পড়ে সে'কথা। 

    সেই বৈশাখের এক রাতে হারিয়ে গেলেন মাস্টার মশাই চিরদিনের জন্য। রেখে গেলেন অগণিত ছাত্রছাত্রী। স্কুল থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকারা এলেন। বহু লোক ফুলে মালায় ঢেকে দিলেন প্রিয় শিক্ষককে। যে গাড়িতে করে তাঁকে শেষ যাত্রায় নিয়ে যাওয়া হলো, সেই গাড়ির চালক মাস্টার মশাইয়ের এক আত্মীয়ের কাছে জানতে চাইলেন, "ইনি কি মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ?"
    আত্মীয় বলেছিলেন, "না। ইনি একজন স্কুল শিক্ষক। ওঁর একটাই পরিচয়, 'মাস্টার মশাই'।"
    গাড়ি ছেড়ে দেবার পরেও রাস্তা আটকায় প্রায় শ'দুয়েক লোক। বক্তব্য, "একবার আমরা প্রিয় মাস্টার মশাইকে দেখব।"
    গাড়ি দাঁড় করিয়ে মালা ও একটি মানপত্র দেওয়া হয়। দেখতে পেলেন না মাস্টার মশাই। জানতে পারলেন না, এত মানুষের চোখের জলের খবর। মানুষ গড়ার কারিগর তখন চিরঘুমে।

    একজন নিরহংকার, পরিশ্রমী, সৎ শিক্ষকের জীবনাবসান হলো। খবর পেয়ে ছুটে এলো ভিন্ন রাজ্যে কর্মরত ছাত্ররাও। আর দেখা হবে না জেনেও ছুটে এলো। 
    এতকাল নিশ্চিত আশ্রয় ছিল অপাদের এক বটবৃক্ষের ছায়ায়। অপা অনুভব করল, মাথার ওপর থেকে সেই ছায়াটা যেন সরতে সরতে বহুদূরে একটা বিন্দু হয়ে গেল।

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇



  • গুচ্ছ কবিতা /শুভশ্রী রায়
  • গুচ্ছ কবিতা 
    শুভশ্রী রায়

    প্রশ্ন করি

    তুমি কী সবটা আমার, অস্তিত্বের আয়না?
    দাঁড়াব সামনে গিয়ে, গা জ্বালানো গয়না!
    তুমি কী প্রভু আমার, মুক্তির চেয়েও উঁচু?
    হাজার হুকুম তাই নিয়েই আসো পিছুপিছু
    তুমি কী শাসক আমার, না গো না মোটেই
    খুঁজলে মন এই ধরায় ঈশ্বর উদার জোটেই
    কে কাকে শাসন করে, কে ওঠে কার ওপর?
    পাল্টে যাবেই যাবে সাবেকি চাপানউতোর।
    তুমি বড় জোর বন্ধু ভালো, সঙ্গী দীর্ঘ পথের
    চেও না রাজা হ'তে ধুয়ো তুলে বাঁধা গতের। 



    বালি বাড়ি

    বালির ওপরে নাম লিখি
    মুছে দেয় চঞ্চল নীল ঢেউ
    ফিরে আসতে চাই কোথাও
    ঠিকানা ভাসিয়ে দেয় কেউ।

    জীবনের নোনা সমুদ্র গভীর
    সমস্ত সুখ আর স্বস্তিই ফেনা
    গভীর জলজ এই সাম্রাজ্য
    তার কাছে জীবনের দেনা।

    বালির ওপরে প্রাসাদ বানাই
    সমুদ্র স্বয়ং ধ্বংস করে দেয়
    ক্রমশ জীবনের সমস্ত স্বপ্নকে
    নিজের ভেতরে টেনে নেয়।

    তারপরেও হাতে নিই বালি
    ফের গড়তে শুরু করি বাড়ি
    জানা কথা, নতুন ভবনটিও
    অনন্তের স্রোতে দেবে পাড়ি।



    ভন্ড থাকুন মৌন

    যৌনতা মন্দ কথা! কোথা থেকে আপনি এলেন?
    যৌন মিলন বিনাই নিজের এই শরীর পেলেন?
    এ দেহেরই তো অঙ্গ মাথা সব কিছু বোঝে জানে
    বুঝেও কী করে সে নিজের উৎসকেই মন্দ মানে?
    দেহে হৃদকমল থাকে সম্পদ যার আবেগ ভাঁড়ার
    অগুনতি বার ধড়কায়, নেই তার উপায় থামার
    থেমে গেলে মরণ আসে, কে জানে তার পরে কী?
    যতটুকু সময় আছি, সাধ করে সব দেখি শুনি।
    দেহে পাঁচ ইন্দ্রিয় অপূর্ব এই দুনিয়াকে বোঝার তরে
    জগৎ-ব্যাপার কিছু কিছু নিয়ে আসে চেতনঘরে।
    ধরে রাখে চেতনাকে দেহ-বাড়ি, রহস্যময় কারখানা!
    যৌন মিলন বিনা এমন পুণ্য-শরীর ধারণ হয়ই না
    দেহ থেকে শুরু তবু দেহ অতিক্রমী সংবেদন যৌন
    খোলাখুলি উত্তম না বলতে পারেন, থাকুন মৌন।


    রক্তমাংসের কবিতা        

    আমি মর্তের নারী, ভালোবাসা না পেয়ে ফুঁসে উঠি
    নিজস্ব পুরুষ ভেবে নীল দেবতার পিছু পিছু ছুটি
    দু' দু' খানি নয়ন জ্যোৎস্না দিয়ে যতটা পারি ভরি
    চাঁদের আলো চেটেপুটে খাই, জ্যোৎস্না পান করি
    তার পরেও অবশ্য যেমন শ্যামলা তেমন থেকে যাই
    নীল দেবতার পিছু পিছু দ্বাপর থেকে কলিযুগে ধাই
    আমি রাধা নই গৌরবর্ণা, নেই কোনো কুটিলা ননদ
    সঙ্গে বাস করে না কোনো পুরুষ বা অপুরুষ মরদ
    শুদ্ধ কলঙ্ক অর্জন করেছি নীল দেবতার পিছু হেঁটে
    পেয়ে যাবে এ নারীকে কাহিনীর স্রোতস্বিনী ঘেঁটে
    চির প্রেমিকা রমণী আমি, ভালোবাসায় তুখোড়
    যে প্রেম বিরহ উপহার দেয় তার ভাবেতে বিভোর
    আমি ভালোবাসার খোঁজে পেরিয়ে যাই রীতিনীতি
    প্রেমের পিছু নিতে নেই গো আমার সহজাত ভীতি
    আমি বারবার প্রেমে পড়ি, কামনায় অসহ্য জ্বলি
    এমন কী দেবতার সাথেও দেহ-মিলনের কথা বলি
    আমি মানবী, এই পৃথিবীর রক্ত ও মাংসের নারী
    কখনো যেন দেবী হওয়ার লোভে কামকে না মারি
    ভালোবাসায় আমি হয়ে যাই একদম উথালপাতাল
    মদ লাগে না আমার, ভালোবাসার ঘোরেই মাতাল।



    হৃদয়ধর্ম

    জ্বলে হৃদয় আগুন বিনাই ধর্মই তার প্রেমে পোড়া
    ভালোবাসা ভাঙলে তাকে কী করে যাবে জোড়া!
    এই জগতে ক' জন মানুষ চিনে নেবে তোমার হৃদয়
    ক' জন মানুষ গাইতে জানে ভালোবাসার বিজয়?
    সারা জীবন ঘোরা শুধু ভালোবাসার গোলকধাঁধায়
    কাঁটায় ভরা রাস্তা, নিছক কষ্টই তোমার সাথে যায়
    যাকে হৃদয় সবটুকু চায় তাকে পাবে কেমন করে?
    সে তো ধরে-বেঁধে রাখার নয় যে বলব , 'রেখ ধরে'
    কী মায়া! যাকে পাইনি তার জন্য পুড়ে মন হল ছাই
    হায়, তার পরেও পোড়া মনের কসম, তাকেই চাই।
    চাওয়া পাওয়া, পেয়ে হারানো, জীবন জুড়ে ঘটে
    মনের মনই জানে, এ সব কিছু কলঙ্ক নয় মোটে!
    আজব-বসত মাঝে কারা পায় ভালোবাসার দাম?
    মন রে, বড় মহার্ঘ এ কলঙ্ক, যার ভালোবাসা নাম!


     অঘটন

    হৃদয় ফের করেছে ভুল
    নিজেই নিজের চক্ষুশূল
    বিষাদ থেকে ফুটেছে ফুল।

    চোখ ভর্তি এ কার জল?
    নিজেকে সিক্ত রাখার ছল
    ভালোবাসার স্বল্প বল!

    মাটির অন্ধকার নরম
    বিরহ ঋতু টানা গরম
    কামনা জাগে বেশরম।

    কোথায় যাস ভুল হাওয়া
    কারো দিকে কেন যাওয়া,
    ফুরিয়েও চাওয়া-পাওয়া?

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


  • শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা- ৩২/প্রীতম সেনগুপ্ত
  • পর্ব ৩২

    শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী সন্তানেরা

    প্রীতম সেনগুপ্ত


    স্বামী ব্রহ্মানন্দজীর দেহত্যাগের পর দ্বিতীয় সঙ্ঘগুরুর পদে আসীন হন স্বামী শিবানন্দজী। সঙ্ঘগুরু হওয়ার পর তিনি শ্রীরামকৃষ্ণময় হয়ে উঠেছিলেন। এই সময় তাঁর মধ্যে শ্রীশ্রীঠাকুরের বিশেষ শক্তির বিকাশ হয়েছিল। দক্ষিণ ভারতের কুনুর পাহাড়ে একটি নির্জন বাংলোতে একবার স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য অবস্থান করেন। সেখানে বহু রাজা, রানি, পদস্থ ব্যক্তিগণ, রাজকর্মচারীদের গমনাগমন শুরু হয়, তাঁকে কেন্দ্র করে লক্ষ্য করা যায় বিশেষ উদ্দীপনা। বহু মানুষ আসতেন দীক্ষাপ্রার্থী হয়ে। তিনি কাউকেই বিমুখ করতেন না। ঠাকুরের শক্তি তাঁর ভিতর এমনভাবে কাজ করেছিল যে আগত ব্যক্তিরা দু-একটি কথা বলেই মুগ্ধ হয়ে যেতেন। মহাপুরুষজীর কথা শুনে এক মুসলমান ডাক্তার সস্ত্রীক এসেছিলেন সন্তানসহ। এই ডাক্তারের স্ত্রী ছিলেন শ্রীকৃষ্ণরূপী ঠাকুরের ভক্ত। ঠাকুরকে দেখতেন গোপালভাবে। মহাপুরুষজী তাঁর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলে ভাবে কাঁদতে থাকেন। অবিরাম কান্নার পর শান্ত হন।

     বেলুড় মঠ মহাপুরুষজীর অতি প্রিয় স্থান ছিল। বেলুড় মঠের মাহাত্ম্য বিষয়ে বলতেন, “বেলুড় মঠ কি কম স্থান গা! স্বয়ং শিবাবতার স্বামীজী এখানে বাস করতেন -- এখানেই তিনি সমাধিযোগে দেহত্যাগ করেন। কিন্তু এখনো তিনি সূক্ষ্মদেহে এ মঠে রয়েছেন। তাঁকে দেখতে পাওয়া যায়। আমি তো তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে যেতে কখনো কখনো দেখি তিনি ঘরে রয়েছেন। এ স্থানটি তাঁর খুব প্রিয় ছিল। ঠাকুর বলেছিলেন স্বামীজীকে, ‘তুই কাঁধে করে আমায় যেখানে নিয়ে যাবি আমি সেখানেই (দীর্ঘকাল) থাকব।’ তাই তো স্বামীজী নীলাম্বরবাবুর বাড়ি থেকে আত্মারামের কৌটাটি নিজে কাঁধে করে এনে এ মঠে স্থাপন করেছিলেন। তখন থেকে ঠাকুরকে কেন্দ্র করে এ মঠে কত ধ্যান-জপ, সাধন-ভজন, ত্যাগ-তপস্যা, শাস্ত্রাদি পাঠ-আলোচনা ও ভজন-কীর্তন হয়েছে -- এখনো হচ্ছে। এ বেলুড় মঠ সমগ্র সঙ্ঘের মাথা। এখানে ঠাকুরের সেবাপূজাদি ঠিক ঠিক হলে, বেলুড় মঠটি ভালভাবে চললে -- সমগ্র সঙ্ঘই ঠিক চলবে। তাই তো ঠাকুরের সেবায় এতটুকু ত্রুটি হলেও তোমাদের এত বকি, এত শাসন করি। এ মঠ কি কম স্থান গা! -- এ যুগের মহাতীর্থ।”

     বেলুড় বিষয়ে আরও বলছেন, “শ্রীশ্রীমা-ই তো প্রথম নিজের হাতে ঠাকুরকে পূজা করে এখানে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। স্বামীজী এ মঠের জমি কেনার আগে শ্রীশ্রীমা একবার ঘুসুড়ি থেকে নৌকায় মাঝগঙ্গা দিয়ে দক্ষিণেশ্বর যাবার সময় দেখেন যে, ঠাকুর আদুর গায়ে ঐ জমিতে বেড়াচ্ছেন। তখন ঐ জমির একপাশে কয়েকটি কলাগাছ ছিল। ঠাকুরকে ঐভাবে ওখানে বেড়াতে দেখে মা অবাক হয়ে ভাবছিলেন -- তাই তো ঠাকুর এখানে কেন এলেন! তিনি ও কথা তখন কাউকে বলেননি, পরে স্বামীজী ঐ জমিটি মঠের জন্য কেনার পর মা যোগীন-মা প্রভৃতি স্ত্রীভক্তদের কাছে তাঁর ঐ দর্শনের কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন -- ‘ঠাকুরের ইচ্ছাতেই ঐ জমিটি হলো। তিনিই মঠের জন্য ঐ স্থানটি নির্বাচন করেছিলেন ইত্যাদি’।” 

     মহাপুরুষজীর মধ্যে ছিল অদ্ভুত সরলতা, নিরাভিমান ভাব। এই বিষয়ে স্বামী নিখিলানন্দ উল্লিখিত একটি ঘটনা এইরকম -- “১৯২৬ সালে মঠে প্রথম সন্ন্যাসি-সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। পূজ্যপাদ মহাপুরুষ মহারাজের সভাপতির ভাষণ ইংরেজি ভাষায় লিখবার জন্য আমাকে মঠে আহ্বান করা হয়। আমি তাঁর উপদেশ, নির্দেশ ও আশীর্বাদ নিয়ে ভাষণটি রচনা করে প্রথমে স্বামী সারদানন্দকে পাঠ করে শুনিয়েছিলুম। তিনি সামান্য দু-একটি পরিবর্তনের উল্লেখ করে বলেছিলেন ভাষণটি একটু দীর্ঘ হয়েছে। তবে এ দেশের শ্রোর্তৃবর্গের কাছে অবশ্য চলবে। একবার মহাপুরুষ মহারাজকে শুনিয়ে নিও। মহাপুরুষ মহারাজ ভাষণটি শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন এবং তাঁর অনুমোদনও জানিয়েছিলেন। আমারও মনে হয়েছিল তাঁরই আশীর্বাদে আমি ঐ ভাষণে তাঁর ভাব প্রকাশ করতে পেরেছিলুম।

     স্থির হয়েছিল যে, বোস্টন কেন্দ্রের স্বামী পরমানন্দ ভাষণটি সম্মেলনে পাঠ করবেন। সম্মেলনে মহাপুরুষ মহারাজ এবং স্বামী সারদানন্দ মঞ্চের উপর উপবিষ্ট ছিলেন। অনেক সাধু এবং কলকাতার বহু বিশিষ্ট ভক্ত নাগরিক সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন।
     স্বামী পরমানন্দ যখন ভাষণটি পাঠ করছিলেন তখন মহাপুরুষ মহারাজ মধ্যে মধ্যে বলছিলেন -- ‘ছোকরা বেশ লিখেছে।’ সম্মেলনের শেষে অনেকে মহাপুরুষ মহারাজকে ভাষণটির অনবদ্যতার জন্য অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তিনি সহাস্যে বলেছিলেন, ‘ভাষণ লিখেছে দীনেশ, পড়ল বসন্ত। এর মধ্যে আমি এলাম কোথা থেকে হে’?”
     সাধুজীবন বিষয়ে শিবানন্দজী মহামূল্যবান কিছু কথা বলেছিলেন সঙ্ঘের এক সন্ন্যাসী স্বামী দেবানন্দজীকে। দেবানন্দজী স্বামী ব্রহ্মানন্দজীর দীক্ষিত সন্তান ছিলেন। মহাপুরুষ বলেছিলেন --“...ধ্যানজপ না বাড়িয়ে শুধু কঠোরতা করে শরীরকে কষ্ট দেওয়া আমাদের ঠাকুর পছন্দ করতেন না। ওটা শুধু লোক-দেখানো ধর্মেই দাঁড়িয়ে যায়। অবশ্য যাঁরা যথার্থ ত্যাগী ও আত্মারাম সন্ন্যাসী তাঁদের সম্বন্ধে বলার কিছুই নেই। আর বিশেষত বাঙালি শরীরে এত কঠোরতা সইবে না, কয়দিন পরেই অসুস্থ হয়ে পড়বে, ধ্যানজপ করতেই পারবে না। তাই যার যতটা সয় ততটাই করা উচিত। তবে শুধু শরীর শরীর করাও ভাল নয়। চাই শুধু জ্ঞান ভক্তি বিশ্বাস বিবেক বৈরাগ্য আন্তরিকতা ব্যাকুলতা। ভগবানের উপর অনুরাগ না এলে কিছুই হবে না, জেনো’।” ( শিবানন্দ স্মৃতিসংগ্রহ -- স্বামী অপূর্বানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয় )
     বয়সে বড় ও দীর্ঘকাল সন্ন্যাসজীবনে অভ্যস্ত থাকার কারণে শিবানন্দজী গুরুভ্রাতাদের কাছে পৃথক সম্মান ও আদর লাভ করতেন। শ্রীরামকৃষ্ণের মানবলীলা সংবরণের বছরেই ( ১৮৮৬ সাল ) ডিসেম্বর মাসে ঘটে একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা। গুরুভ্রাতারা প্রায় সকলে একসঙ্গে উপস্থিত হন বাবুরাম মহারাজের পৈতৃক ভিটে ও জন্মস্থান হুগলি জেলার আঁটপুরে। সেখানে বড়দিনের রাতে ধুনি জ্বেলে অগ্নি সাক্ষী রেখে সন্ন্যাসের প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন তাঁরা। মধ্যমণি ছিলেন অবশ্যই নরেন্দ্রনাথ। পরবর্তী সময়ে যথাকালে শ্রীশ্রীঠাকুরের পাদুকাসম্মুখে বিরজাহোম অনুষ্ঠানাদি সমাপন করে তারকনাথ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন ও শিবানন্দ নামটি প্রাপ্ত হন। 

    শিবানন্দজী দীর্ঘায়ু ছিলেন। আশি বছর বয়স পর্যন্ত ইহজগতে ছিলেন। ১৮৫৪ থেকে ১৯৩৪ সাল -- এই ছিল তাঁর জীবৎকাল। শেষ বারো বছর অর্থাৎ ১৯২২ থেকে ১৯৩৪ পর্যন্ত তিনি ছিলেন সঙ্ঘনায়ক। এই এক যুগ সময় ছিল রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগ। নিজেকে ঠাকুরের নেহাত এক অযোগ্য যন্ত্র বলে মনে করতেন। ১৯৩৩ সালের ২৫ এপ্রিল দারুণ পক্ষাঘাতে তাঁর বাকশক্তি রুদ্ধ হয় ও শরীরের দক্ষিণ অংশের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এইভাবে প্রায় এক বছর সময় কাটে। অবশেষে এসে পড়ে শেষের সেইদিন। ১৯৩৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। তার দু'দিন আগে অর্থাৎ ১৮ ফেব্রুয়ারি  মহাসমারোহে পালিত হয়েছে শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্মতিথি। ২০ তারিখ বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ তাঁর মুখমণ্ডল অদ্ভুত জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। সারা অঙ্গে দেখি দিল পুলক। মস্তক ও অঙ্গের কেশরাশি কদম্বপুষ্পের কেশরসদৃশ দণ্ডায়মান হল। এমন আনন্দপুলকের ভিতরই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, মিলিত হলেন হৃদয়েশ্বর শ্রীরামকৃষ্ণের পাদপদ্মে।

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇



  • ক্যুইজ৬ / সাগর মাহাত

  • ক্যুইজ৬ / সাগর মাহাত

    ১. মেলানোসিস রোগের কারন—
    বায়ুদূষণ
    শব্দদূষণ
    এলার্জি
    আর্সেনিক 

    ২. নেহেরু প্রাণী উদ্যান অবস্থিত—
    আসাম
    নেপাল
    হায়দ্রাবাদ
    মুম্বাই

    ৩. IUCN এর সদর দপ্তর—
    সুইজারল্যাণ্ড
    জাপান
    কানাডা
    দুবাই

    ৪. ভারতবর্ষে EIA চালু হয়—
    ১৮৭৮
    ১৯৭৮
    ১৯৩৬
    ১৯৪০

    ৫. পেট্রোল পাম্প থেকে যে গ্যাস বের হয়—
    বেঞ্জিন
    মিথেন
    ওজন
    কার্বন ডাই অক্সাইড

    ৬. জাপান জাতিসংঘের সদস্যপদ ত্যাগ করেন—
    ১৯৩৩
    ১৯৩৪
    ১৯৩৬
    ১৯৩৯

    ৭. স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়কাল—
    ১৯৩৬-৩৯ খ্রিঃ
    ১৯৩৭-৩৯ খ্রিঃ
    ১৯৩৮-৩৯ খ্রিঃ
    ১৯৩৮-৪০ খ্রিঃ

    ৮. The Roots of National Socialism গ্রন্থটির রচয়িতা—
    বাটলার
    হবসন
    লেলিন
    হবসবম

    ৯. আদা উৎপাদনে প্রথম—
    মধ্যপ্রদেশ
    মণিপুর
    পশ্চিমবঙ্গ
    মহারাষ্ট্র

    ১০. লাজম উপজাতির মানুষদের বাস—
    আফ্রিকা
    ভারত
    জাপান
    তুন্দ্রা

    ১১. 'ব্যাটল ফিল্ড অব ইউরোপ' বলা হয়—
    বেলজিয়াম
    রোম
    লন্ডন
    বুদাপেস্ট

    ১২. ভারতে ১০০ টাকার নোটে Singnature থাকে—
    প্রধানমন্ত্রী
    মুখ্যমন্ত্রী
    রাজ্যপাল
    গভর্ণর(রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া)

    ১৩. ভারতীয় দশ টাকার নোটে যতগুলো ভাষা থাকে—
    ১৭
    ১৮
    ১৯
    ২১

    ১৪. ভারতের সিকিউরিটি ও এক্সচেঞ্জ বোর্ডকে বলে—
    SEBI
    TRIPS
    PPP
    NCR

    ১৫. 'যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল' কাব্য-উপন্যাসটি রচনা করেন—
    সুবোধ সরকার
    জয় গোস্বামী
    নবনীতা দেবসেন
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়


    ক্যুইজ-৫ এর উত্তর
    ১. সুরেশ রায়না  ২. চক্রবর্তী রাজ গোপালচারী ৩. মহাত্মা গান্ধী  ৪. ২১ বছর ৫. হাঁস মুরগির ডিম উৎপাদন ৬. ১৯৪৪  ৭. অস্ট্রেলিয়া ৮. ৬২ তম  ৯. মধ্যপ্রদেশ ১০. নাগাল্যাণ্ড ১১. মধ্যপ্রদেশ  ১২. ১৯৯০ ১৩. বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৪. জীবনানন্দ দাশ ১৫. আষাঢ়

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇




  • রম্য কবিতা, পর্ব-৮ /তথাগত বন্দ্যোপাধ্যায়
  • রম্য কবিতা, পর্ব-৮
    তথাগত বন্দ্যোপাধ্যায়

     
    (১)
    উপচানো গোঁফ

    উপচানো গোঁফে গিয়ে চুমু যায় আটকে,
    অমাবস্যায় প্রেম ওঠে তাই আঁতকে।
    ধুলোবালি ধরা পড়ে সতর্ক পাহারায়,
    খোঁজা দায় হয় যদি লাল-পিঁপড়ে হারায়।
    শব্দরা বেরোনার সিধে পথ পায়না,
    কথা তাই বাঁকাচোরা, ঠিক বোঝা যায়না।
    ঠোঁটেদের গতিবিধি ঢাকা থাকে যে মুখে;
    বোঝে না সে মুখরতা- মূকে আর চুমুকে।
    পানীয় ভিজিয়ে যায় গোঁফ, ঝুলে রয় সর,
    কোদালের কোপে তাই ওড়ে গোঁফ সত্বর।


    (২)
    পেটকাটা উর্দি

    আর কই গোলাগুলি, খুনোখুনি হয়না!
    বসে বসে ভুঁড়ি বাড়ে, বিরক্তি সয়না।
    চোর-বাটপাড় আর নেই বলা চলে, তাই-
    সুখের চাকরি, শুধু বসে বসে টাকা পাই।
    তাস পিটে মাস কাটে শরীরচর্চাহীন,
    পেট গরমের চোটে গুড় গুড় সারাদিন।
    শেষে সব পুলিশেরা ভেবে বের করলুম,
    বানিয়ে উর্দি পেটকাটা -সবে পড়লুম।
    বাইরের হাওয়া লেগে খোলা পেট ঠাণ্ডা, 
    নিমেষে হজম হয় গোটা দশ আণ্ডা।
    সরাসরি জলপটি পারি পেটে লাগাতে,
    “এটাই নতুন কেতা”-বলে টেরি বাগাতে।
     সমস্যা শুধু- কারো পেটে কথা থাকেনা,
    ব্যথারা বাঁধনহারা, কাঁচা থাকে, পাকেনা।


    (৩)
    নতুন জুতোয় পড়া ফোসকা

    পরিপাটি বাবু চলেছেন ভোর-দৌড়ে,
    থামলেন, এগোলেন, থামলেন শিউরে!
    হয়তো বাঁ-পায় চোট, হাঁটছেন যে ভাবে!
    চলেন খুঁড়িয়ে প্রায়- বুঝি তারই প্রভাবে।
    চোখে চোখ পড়ে যেতে, হেসে বুলি বর্ষণ-
    “ডার্মিস-এপিডার্মিসে হয়ে ঘর্ষণ,
    প্রথমে রক্তরস, হলুদাভ, অচ্ছোদ,
    জমে, ফুলে, ফাটতেই দেখছেন কি আপদ!
    জুতো লেগে গোড়ালিতে জ্বালা না করে যাতে,
    জুতোর আগা আঁকড়ে পাতা ফেলি, তফাতে।”

    শুনে বলি- “দেখবেন পাতা যাতে না ঘামে,
    পাউডার মেখে যান হাঁটতে বা ব্যায়ামে।
    খুবই ভালো হয় যদি বিশোষক মোজা পান,
    বেরোনোর আগে গোড়ালিতে স্পঞ্জ সেঁটে যান।
    আটা, মধু, ভেসলিন নয় অ্যালোভেরা জেল-
    বোলাতে পারেন গোড়ালিতে রান্নারও তেল।
    বেশি আঁটো নয়, তবে আলগাও বেশি নয়,
    সে জুতোই কিনবেন যা পায়ের মাপে হয়।
    জুতোর অনমনীয় গোড়ালির প্রান্ত,
    দুমড়ে কোমল করে নিন আগে, চান তো।”


    (৪)
    ফিরতি ট্রেনে

    অনেকটা উৎপাতে, টিকিটটি নিয়ে হাতে, নিজেকে ভেবেছি যেই ষণ্ডা;
    কত বাপ-বাপান্ত, দোষারোপ চূড়ান্ত, বেলাইনে কি বাগবিতণ্ডা।
    যুগলের ফাঁক দিয়ে, বগলের বাঁক দিয়ে মাসিমার দেওয়া পাটিসাপটা-
    ট্রেনের ঘোষণা এলো, ‘এই বুঝি ছেড়ে দিলো!’-ভেবে গলে যেতে চিঁড়ে-চ্যাপটা ।
    ভিড় ঠেলে নীড় পেলে- তবেনা তীক্ষ্ণ ছেলে, পেলাম একটুখানি বসতে,
    হকারেরা আরো বীর, খিমচে বা মেরে শির, মুখোমুখি দর কষা কষতে।
    অর্ধেক লেগে রই, মাঝে মাঝে তাও নই, অকথ্য যেন অজাযুদ্ধ,
    বাকি নাই ঠাঁই অতো, মাছি গলবার মতো, হৃদরুগী হবে শ্বাসরুদ্ধ ।
    সামনে দাঁড়ানো দাদা, ভারসাম্যের বাধা কাটিয়ে ডলেন দেখি খইনি!
    উপান্তে বসা জন, কাঁধে মাথা রেখে শোন, ন্যূনতম হতবাক হইনি।
    কারোর পোয়াতি বউ, বমি করে তোলে ঢেউ, বসতে দেয় না লোকে শৌখিন,
    দাঁড়িয়ে রয়েছে যারা, মারমুখী হয়ে তারা, গালি দিয়ে গোটাচ্ছে আস্তিন।
    তবুও কি সন্তোষে, না জানি কে বসে বসে, গোপনে ছড়ায় দুর্গন্ধ!
    অযাচিত সৌরভে, ভাসি যেন রৌরবে, বাড়ি নিয়ে যাবো নিরানন্দ!

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇





  • পাহাড়পূজা /ভাস্করব্রত পতি
  • পশ্চিমবঙ্গের লৌকিক উৎসব, পর্ব -- ২৭

    পাহাড়পূজা

    ভাস্করব্রত পতি

    কানাইসর পাহাড়ে পাহাড়পূজা মেদিনীপুরের এক আঞ্চলিক লৌকিক উৎসব। বেলপাহাড়ীর দক্ষিণ পশ্চিম দিকে ৬ কিমি দূরে ঝাড়খণ্ড সীমান্তবর্তী এলাকায় পাহাড়ের সারি। এখানেই আষাঢ়ের তৃতীয় শনিবার আয়োজিত হয় এখানকার পাহাড় পূজা। বেলপাহাড়ী থেকেও যাওয়া যায়। অথবা দক্ষিণ পূর্ব রেলের চাকুলিয়া থেকেও ট্রেকারে যাওয়া যায়।

    ৩০০ মিটার উঁচু বেলপাহাড়ীর গাড়রাসিনিতে আষাঢ়ের দ্বিতীয় শনিবার পূজা হয়। কানাইসর পাহাড়ে পূজা হয় আষাঢ়ের তৃতীয় শনিবার। এখানকার পাহাড়পূজাই সর্ববৃহৎ। খড়িপাহাড়িতে আষাঢ়ের চতুর্থ শনিবার হয়। বেলপাহাড়ীতে ৩৪৫ মিটার উঁচু চিতি পাহাড় সংলগ্ন গ্রামগুলি হল বালিচুয়া, বদাডি, নটাচুয়া ইত্যাদি। এই চিতি পাহাড়ে আষাঢ়ের চতুর্থ রবিবার হয়। এর সাথেই যুক্ত বেলপাহাড়ীর খট্টধরা মৌজার ২৫০ মিটার উঁচু সোরেঙ্গাসিনি পাহাড়। এখানেও পূজা হয়। পার্শ্ববর্তী ধলভূমগড়ের গোটাশিলা পাহাড়ে পূজা হয় আষাঢ়ের তৃতীয় শনিবারের পর যে মঙ্গলবার আসে সেইদিন। ফুলডুংরি পাহাড়েও পূজা হয় এই সময়। শ্রাবণের প্রথম মঙ্গলবার চুটিয়াভদরি এবং চন্দনপুরের মধ্যে খড়িডুংরি পাহাড়ে পূজা হয়। ২০০ মিটার উঁচু লালজল পাহাড়ের আদিম মানুষের গুহার নিচেও একদিনের মেলা হয়। আষাঢ়ের শেষ মঙ্গলবার লোয়াদা ও চুটিয়াভদরি গ্রামের মাঝে অবস্থিত গজডুংরি পাহাড়েও পূজো হয়। 
    প্রায় ৭০০ ফুট উঁচু এই কানাইসর পাহাড়ের উপরেই একসময় পূজা হত। একটা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনো আছে সেখানে। কিন্তু এখন ওখানে পাহাড়পূজা হয়না। নিচে হয়। কেন নিচে হয় তা নিয়ে একটা সুন্দর কাহিনী রয়েছে। ড. মধুপ দে জানিয়েছেন সেই কাহিনী --- "কানাইসর পাহাড়ের পূজার নিয়ম ছিল, পূজা এবং বলি শেষ হবার পরে আর ভুলেও সেদিন সেখানে ফিরে যাওয়া যাবে না। শোনা যায়, একবার বলি ও পূজার শেষে পাহান ভুল করে বলির খড়্গটি পাহাড়ের উপরে ফেলে চলে এসেছিল। পাহাড় থেকে নামার সময়ে মনে পড়ায় মাঝ রাস্তা থেকে সে উপরে ফিরে গিয়েছিল৷ উপরে উঠে দেখে যে, পাহাড় দেবতা দুটো বাঘের সঙ্গে বলির মাংস খাচ্ছেন। পাহানকে দেখে দেবতা রেগে খড়্গটি তাঁর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলেন যে, আর কোনো দিন যেন সে উপরে পূজা করতে না আসে। এবার থেকে পূজা যেন নিচেই করে। দেবতার ভয়ে হোক, কিংবা বাঘের ভয়ে হোক, কিংবা পাহাড়ে ওঠার দুর্গমতার জন্যই হোক, সেই থেকে পূজা প্রথমে হয় পাহাড়ের নিচে ‘হরির থান' নামক একটি প্রশস্ত স্থানে। দ্বিতীয় পূজা হয় পূর্বদিকে পাহাড়ে ওঠার মাঝামাঝি একটি অপ্রশস্ত স্থানে। এই ঢালু ও অপ্রশস্ত স্থানে একসঙ্গে বেশি লোক থাকতে পারেনা বলে, একদল পূজা দিয়ে নামলে আর এক দল উপরে উঠতে পারে। এখানে পূজার থানে একটি প্রায় দেড়শ ফুট লম্বা ও আশি ফুট চওড়া পাথর আছে। প্রকাণ্ড বেধবিশিষ্ট এই পাথরের উপরে মাঝখানে একটি গর্ত আছে। পূজার পরে ব্রতীরা তাঁদের মনস্কামনা পূর্তির জন্য গর্তের উপরে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে গর্তের নীচে হাত পেতে থাকে। পুষ্পাঞ্জলির ফুল যদি হাতে পড়ে, তবে পাহাড় দেবতা পূজা নিয়েছেন ও মনস্কামনা তাড়াতাড়ি পূর্ণ হবে বলে ব্রতীরা বিশ্বাস করে।"
    'কানাইসর' নামের মধ্যে দুই দেবতার খোঁজ মেলে।  
                         কানাই + সর > কানাইসর
    'কানাই' অর্থে শিব। আর 'সর' অর্থে দুর্গা। এই কানাইসর পাহাড়ের একটি অংশকে বলে 'রাজা' পাহাড়। আর একটি অংশকে বলে 'রাণী' পাহাড়। শ্রাবণ মাসের প্রথম রবিবার রাজা পাহাড়ে কানাইবাবার তথা শিবের পূজা হয়। মুরগী ও পাঁঠা বলি হয়। এই পূজাতে কোনো মহিলার প্রবেশ নিষিদ্ধ। এমনকি এই পূজার প্রসাদও মহিলাদের খাওয়ার বিধান নেই। বিশেষ করে যেসব মহিলাদের এখনো বিয়ে হয়নি বা তাঁদের বাচ্চা হওয়ার বয়স রয়েছে তাঁদের এই প্রসাদ দেওয়া যাবে না। শুধুমাত্র যেসব মহিলা আর সন্তানের মা হবে না, তাঁরাই খেতে পারে। ডুলুং নদী পেরিয়ে নিয়েও যাওয়া যাবেনা কানাইবাবার প্রসাদ। নদীর এপারেই খেতে হবে। কানাইবাবার পূজক হলেন খেড়িয়া শবর গোষ্ঠীর মানুষ কেন্দ্রাপাড়ার সন্তোষ শবর। তিনিই মূল পূজক। 

    আর রাণী পাহাড়ে আষাঢ়ের তৃতীয় শনিবার 'সর' মায়ের তথা দুর্গা মায়ের পূজা হয়। এই পূজার পূজক হলেন ঢেঙ্গাআম গ্রামের সহদেব নায়েক। এখানে পাঁঠার পাশাপাশি মুরগি বলিও দেওয়া হয়। লুচি, মাংস ও কাঁঠাল খাওয়ার প্রাচীন চল রয়েছে এখানে। আসলে বর্ষার শুরুতে ভালো চাষের আশায় বৃষ্টির কামনায় পাহাড়পূজায় শামিল হন মানুষজন। প্রকৃতিকে সন্তুষ্ট রাখার ভাবনায় পাহাড় পূজা। এই কানাইসর পাহাড়ের অর্ধেক অংশ পড়ে বেলপাহাড়ী ব্লকের সন্দাপাড়া পঞ্চায়েতের মধুপুর মৌজায়। বাকিটা পড়ে ঝাড়খণ্ডের চাকুলিয়া ব্লকের মধ্যে। দুই রাজ্যের সীমান্তে কয়েক বর্গমিটার জুড়ে পাহাড়টির অবস্থান।

    কানাইসর পাহাড়পূজাতে ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন মৌজার মানুষ ওতোপ্রোতভাবে যুক্ত থাকেন। সেই গ্রামগুলি হল দুয়ারিশোল, জয়নগর, তুলসীবনি, শালগেড়িয়া, জোড়াআম, কিয়াশোল, বিদ্যহ, ভাণ্ডারু, বৈকুন্ঠপুর, শিলাখুনি, দুবরাজপুর, পচাপানি, বেহারপুর সহ আরো তিনটি গ্রাম ঢেঙ্গাআম, লুহামাইলা ও বরালটা। এই মৌজাগুলির প্রতিটির একজন করে গ্রামপ্রধান পূজার কমিটিতে আছেন। এঁদের মধ্যে প্রধান নির্বাচিত করা হয়েছে (২০১৬) জয়নগরের সমায় মাণ্ডিকে‌। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের যেসব গ্রামের মানুষ এই পাহাড়পূজায় যুক্ত থাকেন সেগুলি হল শিলদা, মধুপুর, সীতাপুর, ঝেঁটাড়া, কেন্দ্রাপাড়া, চুটিয়াভদরি, মুনিয়াদা, খাঁকড়িঝর্ণা, ডুমুরিয়া এবং বাগালপাড়া। এগুলির মধ্যে খাঁকড়িঝর্ণা গ্রামের দেওয়া পাঁঠা প্রথম বলি দেওয়া হয়।

    পাহাড়পূজায় এখানে মূলতঃ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ উপচার পালন করেন। আবার মুণ্ডাদের আরাধ্য দেবতা 'সিংবোঙ্গা' আসলে পাহাড় দেবতা। তাঁরা আষাঢ় মাসে কানাইসর পাহাড়ে পাহাড় দেবতার পূজা করলেও মুণ্ডা কিশোরীদের 'কানফোঁড়' অনুষ্ঠান করে ১ লা মাঘ। যা 'টুকাই লুতুর' নামে পরিচিত। বাগাল সম্প্রদায়ের লোকেরা এই ১ লা মাঘ আইখান দিনে পাহাড় পূজা করে। এজন্য তাঁরা উইঢিপি কেটে এনে পাহাড়ের প্রতীক হিসেবে শুদ্ধাচারে পূজা করে ফুল, ফল, সিঁদুর সহ হাঁড়িয়া নিবেদনের সাথে সাথে বলিদানের মাধ্যমে। এঁরা পাহাড়পূজা করে গবাদি পশু যাতে না হারিয়ে যায় এবং রোগাক্রান্ত না হয় এই কামনায়। কালো পাঁঠাবলি দিয়ে সেই পাঁঠা ও খিঁচুড়ি সহযোগে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। এইদিনে মুণ্ডাদের মতো বাগাল কিশোরীদের 'কানফোঁড়' করার উত্তম দিন বলে বিবেচিত। ঐ কিশোরী নতুন কাপড় পরে আলপনা দেওয়া মাটির  মেঝেতে রাখা কাঠের পিঁড়ি 'মারুয়া' তে বসে। আর দেহরীর অনুমতি নিয়ে বেলকাঁটা দিয়ে কানফোঁড় করা হয়। আর একজন ঘরের চালে উঠে পিঠা ছড়ায় সেখানে। ফোঁড় শেষ হলে সেখানে রাখা একটা জ্যান্ত মুরগিকে আছড়ে মেরে ফেলা হয় কিশোরীর মঙ্গল কামনায়। এইদিনে বাগাল সম্প্রদায়ের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে 'জোড়' বা প্রনাম করে।
    কানাইসর পাহাড়ের উপর পাহাড়পূজা না হলেও প্রচুর লোকজন এখানে ওঠেন। মনোরম পরিবেশ অবলোকন করেন। অত্যন্ত দুর্গম এবং শ্বাপদসংকুল পাহাড়ী পথ। ছোটখাটো একটা ট্রেকিংয়ের আস্বাদন মিলবে পাহাড়ের মাথায় উঠলে। এখানে শ্রীনাথ বাস্কে নামের এক সাধুবাবার ছবি টাঙিয়ে পূজা চলে। মানুষ এখানে শুকনো চিঁড়ে, নকুল দানা এবং নারকেল দিয়ে পূজা দেয়। এখানে মূল পূজক হলেন বেলপাহাড়ীর সীতাপুর গ্রামের রামেশ্বর কর্মকার। দুদিন ধরে পূজো চলে শ্রীনাথ বাস্কের। এই রামেশ্বর কর্মকার নিজেকে সাধুবাবার শিষ্য বলে দাবি করেন। কানাইসর পাহাড়ের উপর মিলবে কাঁচা ছোলার ২০ - ২৫ টি দোকান। এছাড়া মিলবে ঠাণ্ডা জল, নানা খাওয়ার দোকান। 

    কানাইসর পাহাড়ের নিচে বসে বিশাল মেলা। বিভিন্ন এলাকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন আসেন। অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনও এখন আসছেন। দুদিনের মেলা। প্রথম দিন সকলের জন্য খোলা। দ্বিতীয় দিন শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষজন আসেন। মেলায় দেদার বিক্রি হয় কাঁঠাল, জিলিপি, বাদ্যযন্ত্র, পাথরের সামগ্রী থেকে হাঁড়িয়া, মদ, বিয়ার ইত্যাদি। ভাত খাওয়ার হোটেল বসে যায়। বহু দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন এখানে। ভিড়ে ভিড়াক্কার হয়ে ওঠে কানাইসর সংলগ্ন এলাকা। 'ঘঙ' পাতার টুপি এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। বারোডাঙা, মালিবনি গ্রামে এগুলো তৈরি হয়। এ এক অন্য ধরনের লৌকিক উৎসব। একটা আস্ত পাহাড় হয়ে ওঠে উপাস্য দেবতা।


  • পদ্মপাতায় শিমুল-২৯ /সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়
  • পদ্মপাতায় শিমুল-২৯

    সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

    !!পল দো পল মেরি কহানি হ্যায়!!

    শিরা-উপশিরা নিয়ে জীবনের আর কত বিজ্ঞাপন দিতে হবে শিমুলে পলাশেও... জানি না ।

    ইতিমধ্যে একদিন ইয়াহু তে জানতে পারলাম অমর্ত সেনকে নিয়ে নর্থ আমেরিকা থেকে একটা বই প্রকাশ করবে আমেরিকার বাঙালিরা।

    'যারা ইচ্ছুক তারা ওনার সম্বন্ধে এক লাইন বা দু লাইন এ কিছু লিখে পাঠান।' আমি লিখে পাঠালাম। তখন একদিন দেখি আমার অফিসের আইডি তে একজন আমেরিকার নামকরা ভদ্রলোকের নাম।

    তিনি লিখেছিলেন মনে আছে যে, “কি দারুন লেখাটা । আপনি তো খুব ভালো লেখেন।”

    তখন সেই ভদ্রলোক এবং আমার লেখাও সিলেক্ট হয়েছিল। ঢাকা, বাংলা ডিপার্টমেন্টের হেড, উনিও লিখেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন আমাকে। ব্যটন রুজের একজনের মারফত বাংলাদেশের হেড-ওনার সাথে আলাপ হয়। উনি লিখলেন, “বিদেশে থেকেও এত সুন্দর বাংলা চর্চা করেন, গর্বিত হচ্ছি”। মনে আছে সেই সব কথা। তবে নিজে যে কি লিখেছিলাম তা আজ পর্যন্ত মনে করতে পারছি না। অদ্ভুত লাগে।

    বটীর শিবপুরের বন্ধু ছিল সেই ভদ্রলোক। তবে বটী এইবার বেশী বলে নি। একবার ধোঁকা খেয়েছিল তো। তাই নিজেকে অপরাধী ভাবত সব সময়। দিদিয়ার সাথে ওনার সব কথা হয়েছিল তখন।

    সে'জদা আর দিদিয়া কার সাথে প্রায়-ই গল্প করত... বুঝতে পারতাম না। অফিসের কাজ, “ব্যটনরুজ গ্রীন -ভলান্টারি কাজ”... এইসব নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকতে হত।

    তারপর সেই ভদ্রলোক বটির কাছে আমার সম্বন্ধে সব জানতে চাইলেন। তারপর আমার অফিসে ফোন করলেন একদিন কাজের অজুহাতে। নিজের কথা বললেন। কথায় কথায় বেশ আমরা দুপক্ষই পরিচিত হয়ে গেলাম। আমরা নানা রকম গল্প করতাম। আমি জানতাম না যে ভদ্রলোক দিদিয়া, সেজদার সাথে নিয়মিত কথা বলেন। তিনি ডিভোর্স । অবশ্যই সেই নিয়ে কোন কথা হয় নি মনে আছে।

    সেই সময়ে ওনার মা ছিলেন সাথে। তারপর একদিন সে'জদা অফিস যাওয়ার সময় আমাকে বলল, “শিমুল, অফিসে একজন ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করছিল-তুই এভেলেবল কিনা? বলেছি না-বুঝলি? ইদানিং মন্টুর(বটির) বন্ধু একজন বাঙালি ভদ্রলোকের সাথে কথা হয়েছে, মনে হল ভালো এবং সৎ।”

    গাড়ি চালাচ্ছিলাম-“কিছু বলি নি”-শুনতে পাই নি এমন ভাব করলাম।

    যাই হোক, একদিন বটীর সাথে উনি এলেন আমাদের বাড়ি। বুঝতে পারি নি। কথাবার্তা হল নানারকম। উনিও এনভাইরণমেন্টাল ইঞ্জিনীয়ার।

    শিমুলের বাড়ির লোকজনেরা ওনার অনেককিছুই চেপে গেল।

    সব শুনে হয়ত শিমুল বেঁকে বসবে কারণ সে এই ধরণের আলোচনা হলেই বলত - “যাদের ছেলে মেয়ে আছে তাদের দ্বিতীয়বার বিয়ে করাটাকে সে সাপোর্ট করে না। মা বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে বাচ্চারা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

    তাই সবাই ব্যাপারটাকে চেপে গেল। সবাই জানত যে, পরে শিমুল জানতে পারলেও কোনরকম অভিযোগের মধ্যে দিয়ে যাবে না। তার জীবন থাকতে আবার দাগ লাগা একটা সংসারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না ।

    শনিবার দেখে সেই ভদ্রলোকের মা শিমুলের দিদিয়াকে ফোন করলেন।

    ক্রিং... ক্রিং... ক্রিং!

    ফোনটা ধরতে দেরী হওয়াতে ওনার মা ভাবলেন হয়ত শিমুলের ইচ্ছে নেই এই বিয়েতে। মিন্টুর চেহারা বেশ খারাপ হয়েছে। সব মেয়েরই একটু সুন্দর ছেলে পছন্দ, এইরকম নানান কুচিন্তা ওনাকে কুরে কুরে খেতে লাগল। মেয়েটার ছবি কী মিষ্টি। আবার ফোন করে পেলেন।

    “হ্যাঁ মা! তোমাদের ফোনটা কি খারাপ ছিল?”

    “না, মাসীমা আমরা একটু বেড়িয়েছিলাম। অনেক বুঝিয়ে শিমুলকে রাজি করিয়েছি, মাসীমা। এখনও স্পষ্ট করে বলে নি অবশ্য। বড্ড চাপা মেয়ে-মুশকিল সেখানেই।
    তাও আর চিন্তা নয়। আমরা তৈরী হই। দুজনকে এক যায়গায় করতে পারলে আপনি ও আমরা নিশ্চিন্ত হই।”

    মাসীমার কথা শুনে মনে হল মাসীমা আনন্দাশ্রু ফেলছেন, সেকথা সেজ'দাকে দিদিয়া বলল। কুশলাদি জিজ্ঞেস করে ফোন নামিয়ে রাখলেন।

    আমি তো 'হ্যাঁ' বলিই নি। দিদিয়া কিভাবে বলল, “শিমুল রাজি হয়েছে?” মনে একটা প্রশ্ন খচখচ করতে লাগল।

    তারপর সেই ভদ্রলোকের কাছ থেকে ফোন পাবার পর ছলেবলে কৌশলে দিদিয়া আবার বোঝাতে শুরু করে... “বৃক্ষতলে বৃক্ষছায়া সব সময় থাকে না রে। বৌদিরা দেখছিস তো স্বয়ংকৃ্তিসার। তুই তো সেরকম মেয়ে নস যে, একা বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারবি। একজন সাথি থাকলে জীবন টা এগিয়ে যায় তড়তড় করে। প্রিয়বাদিনাম মানে জানিস তো? প্রিয়ভাষী ব্যক্তির শক্রু জন্মায় না।”

    “জন্মায় দিদিয়া জন্মায়। আড়ালে আবডালে জন্মায় সেই আগাছাদের মত- আমরা চিনে উঠতে পারি না। কিন্তু-এর একটা খেলা চলে আমি বুঝতে পারি। একটা গল্পের স্রোত যখন বয়ে চলে--বাধা আসে বৈকি। মাঝি তখন যদি হাল-টাকে শক্ত করে ধরে থাকে--নৌকা টলমল করলেও এগিয়ে চলে তার লক্ষ্যে।”

    একটা প্রবল ধুর্ণিঝড় উঠল। সকাল থেকে তো সূর্য দাপাচ্ছিল খুব। হঠাৎ করেই আকাশে বিদ্যুৎ গলার শির ফুলিয়েই বা চিৎকার করে উঠল কেন? কেঁপে উঠলাম আবার একবার। বিদ্যুৎদের মান রাখতেই ঝমঝমে বৃষ্টিতে শান্ত হল পরিবেশ। আর আমি তখন চিন্তার খেয়ায়... ভেসে চলেছি ।

    “সব বুঝি গো দিদিয়া। জীবন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলে তা কি আর জোড়া লাগে। যা আছে, যদ্দিন আছে, যেমন আছে সেইরকমই থাক। দেখাই যাক না শেষে কী হয়।” শিমুল তার দিদিয়াকে বোঝাবার চেষ্টা করল।

    “শিমুল গাছে তূলোর বীজ ফাটলে, একটা দুটো পলাতক বীজ পাখা মেলে উড়তে উড়তে জানলা দিয়ে অন্য কারুর ঘরে ঢুকে বাতাসে ভাসতে থাকে। মাঝে মাঝে এক উড়ো চিন্তা মনের ঘরে ভেসে আসে। মেয়ে বা পুরুষ একবার, দুবার তিনবার বিবাহ করতেই পারে। বিপন্তীক বা বিধবা হলেও আবার সংসার পাততে পারে, কোন বাধা নেই। অত বিধান দেখলে চলে না। আমি তা বিশ্বাস করি মনে প্রাণে।” বুঝলি শিমু।

    কিন্তু আমার প্রশ্ন... “নিজের জীবন তুচ্ছ করে তুই এত কষ্ট করে আমাদের মানুষ করলি। কি পেলি? বল! ইচ্ছা হয় তুই আমি চলে যাই দূরে। যেখানে কেউ থাকবে না। তুই সারাজীবন ভাই বোন করে কী পেলি? কিছু না। মা বাবা তাদের কর্তব্য করেন কিন্তু তুই? এত শিক্ষিত হয়েও কি কিছু করতে পারলি? একটা না দু দুটো বিষয়ে এম.এ। ভাবা যায় না। শুধু দিয়েই গেলি সারাজীবন। নিজেও চাকরী করতিস, সব ভাইদের সংসারে ঢেলে দিতিস। তুই কেন এরকম ভাবে নিজের জীবন সমর্পণ করেছিলি। বলতে পারিস?”

    “সেইজন্যই তো তোকে সাবধান করে দিচ্ছি। মেয়েদের জীবন বর্ণপরিচয়ের প্রথম দু অক্ষরেই পড়ে থাকে। অ আর আ। অ-এ অজগর আসছে তেড়ে, আর আ-এ আমটি খাব পেড়ে। আমি কিন্তু কোন বই পড়ে তোকে বলছি না রে শিমু। ওরে তোকে যে আমি মেয়ের মতন করে মানুষ করেছি। হয়ত ঠিক মতন করে মানুষ করতে পারি নি। তাই তো বারবার করাতের শব্দ শুনি মনের ভিতরে।” দিদিয়ার গলা ধরে এলো।

    “চুপ করে থাকিস না। কিছু বল! চাকরি করে খালি বড় বড় কথা বলতে শিখেছে!” দিদিয়া আদরের ধমক দিল।

    “ঠিক আছে। আমি যা বলছি শোন ভালো করে। বাজে বকছিস বলে উড়িয়ে দিবি না বুঝলি দিদিয়া? তাহলে বলব না। জানিস তো কোকিলেরা বর্ষাকালে মৌণব্রত নিয়ে থাকে। এটা কিন্তু ভালো কাজ করে। কারণ তখন ভেকগণ বক্তা হয়-তাই কোকিল নীরব থাকাকেই বেচে নেয়।” এই বলে দিদিয়ার গলা জড়িয়ে ধরল শিমুল।

    আর এটাও ঠিক সেইরকম, তাই না রে দিদিয়া...

    “এই দেখ,আবার তুই মন খারাপ করছিস …? এ যে আমার কি অবস্থা -তা আমি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। এখন তো আমি প্রেস্টিজিয়াস জব করি। দেখবি, এই তোর শিমু কত শক্ত হয়ে গেছে। একটুও কি বদলাইনি বল? একা একা অফিস যাচ্ছি, ছেলেদের সাথেও কথা বলছি। অফিসে কত নাম হয়েছে...সব কিছু কিন্তু তোর জন্য দিদিয়া। অনেক মা ও তাদের মেয়েকে ঠিক নৌকায় বসাতে পারে না--সেখানে তুই তো জিতে গেছিস।

    দেখ মানুষ অভ্যেসের দাস। নিজে স্বাধীন থাকলে অনেক কাজ করা যায় জীবনে। আমার খুব শখ... জীবনে কিছু করি। একটু টাকা, একটু স্নেহ যাদের দরকার... তাদের জন্য কিছু করা। টাকা না থাকলে তো কিছুই করা যাবে না। এসব করার জন্য কিছু টাকা সাথে থাকা চাই। অফিসে কিছু ভালো কাজ করছি না, একদম বলব না।

    আমেরিকান প্রিয় বান্ধবী ইভেটকে সিগারেট খাওয়ার বাজে অভ্যাস থেকে সুস্থ জীবনে আনতে পেরেছি, তাই তো সে সব সময় আমাকে বলে, “মরে গেলেও তোকে ভুলব না, শিমুল। তাই তো এত ভালোবাসে আমাকে। কি সুন্দর বিয়ে হয়েছে-দুটো ফুটফুটে বাচ্চার মা সে এখন। অফিসে অন্যান্য বন্ধুরাও বলত, “ইউ ডিড এ গুড জব।” এটাই আমার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার।

    আর দেখলিই তো, স্কলারশীপ নিয়ে পড়লাম। কারুর কাছে হাত পাতলাম না। এটা তো তোর আমার গর্ব তাই না? 'যশো দেহি' বলে তো আমি কোনোদিন প্রার্থনা করিনি, বলেছি 'বলম দেহি'। দিদিয়া শুনে হেসে ফেলেছিল।

    “পারিস বটে শিমু তুই-সময় পেলে লিখিস সোনা। আমার আশীর্বাদ রইল।” তোর আবার “নিউ রোডস, নিউ রাইটস” শুরু হোক। আমি দেখে যেতে চাই।”

    “হুম! কি লিখব? ছোটবেলায় পড়তে দিয়েছিস কোনো বড়দের বই? লুকিয়ে রাখতিস। কিন্তু দিদিয়া। আজ আমি সত্যি কথাটা বলেই ফেলি। আমি তো বড় হয়ে গেছি এখন। আমি না লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম...তুই আর বৌদি যখন নেপিয়ার টাউনে বৌদির বাড়ি যেতি...”

    “তাইইই? ওরে দুষ্টু মেয়ে! তাই ভাবতাম পাতাগুলো মোড়া কেন?” হি হি করে হেসে ফেলল দুজনেই।

    বাবা একদিন দেখে ফেলেছিল আমাকে দেশ পড়তে। দিদিয়াকে বলেছিলেন, “ফাউ আজকাল নভেল পড়ছে, কিন্তু? একটু লক্ষ্য রেখো।”

    হি হি হি আমি কি খারাপ হয়েছি? সত্যিই বল তো দিদিয়া আমার।

    “অ্যা...অ্যাই! শোনো! এইবার সেই ভদ্রলোকের গল্প করো তো শুনি। না না সেই ভদ্রলোকের গল্প কিঁউ নেহি বলতা? এদিক ওদিক গল্প করতা খালি।

    আচ্ছা তাকেই কি …শিমুল? পলাশ মুখ চোখ মটকে বলে ফেলল কথাগুলো।

    “কোন ভদ্রলোক আবার? বাব্বা! নিজের গল্প শুনতে কি ভালোবাসে।”

    এই যে প্রেম! এই প্রেমের প্রথম অনুভূতিটি পাবার জন্যে এই জীবন পর্যন্ত প্রতীক্ষা করতে হয়েছিল, মশাই। একটা বীজ পুঁতলেই তক্ষুণি তো আর একটা গাছ হ্য় না। কত তমিস্রার তপস্যা করে রাত্রি প্রভাত-হিল্লোলের মুখ দেখে। ডালাসে সজল দাশের কাছে আমার সম্বন্ধে শুনেছিলে যে, আমি ব্যাটন রুজ কি রকম ছিলাম।”

    “ওই দেখো আবার হিল্লোল?আমার এই নাম রাখার কথা মা ভেবেছিল। কোথায় কাজ করতেন সেই ভদ্রলোক?”

    “উনি কাজ করতেন ডালাসে এনভাইরণমেন্টের ওয়াটার এনফোর্সমেণ্টে প্রোগ্রাম ম্যানেজার হিসাবে আর আমার বড় ভাইঝিও কলেজ পাশ করেই কাজে ঢুকেছিল সায়েন্টিস্ট হিসেবে লুইজিয়ানায় ওয়াটার এনফোর্সমেন্ট-এ । কাজেই ভাইঝি খুব ইন্টেরেস্টেড। আমেরিকায় EPA পুরো স্টেট গর্ভমেন্ট কে কন্ট্রোল করে, সেটা জানতাম না। সেই ভদ্রলোকের কাছে জানতে পারি। তখন থেকেই সেই ভদ্রলোক প্রভু আর আমি ভৃত্য। ভদ্রলোক ব্যাটন রুজ যেতেন ঠিকই তবে আমাদের অফিসে না, পরে বটী বলেছিল। ঘুরে ফিরে সেই ব্যটনরুজের LDHH(লুইজিয়ানা ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথ অ্যান্ড হস্পিটালস) অফিসে যেতেন অডিট করতে।

    একদিন উনি হঠাৎ দিদিয়াদের কাছে প্রস্তাব করলেন, আমার ফটো দেখতে চান।

    আমি তখন ফটো কাউকে পাঠাতাম না বা দেখাতে চাইতাম না। ফটো চাওয়াতে একটু বিরক্ত হয়েছিলাম । বেশ কয়েকদিন চুপচাপ ছিলাম, তারপর উনি আমার অফিসের ই-মেল এড্রেস এ একটি মেল পাঠান। ওনার মা-এর সম্বন্ধে লিখলেন। অনেক বলাতে বাড়ী থেকে একটা ফটো পাঠাল ।

    (চলবে)

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇


  • ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ৯০
  •  ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ৯০


    সম্পাদকীয়,
    বর্ষাকাল মানেই খোকা বায়না ধরে বৃষ্টিতে ভিজবে। এই বায়না নিয়েই ছড়া লিখেছে রূপা আন্টি। আর ঋপণ আঙ্কেল ছবি পাঠিয়ে বলেছে, খোকাদের বায়না কেমন করে পুরণ হচ্ছে দেখ। আমি তো প্রচ্ছদের ছবি দেখে হা। বৃষ্টিতে ভিজে এবার যদি বাচ্চাদুটোর ঠান্ডা লাগে তখন? তখন তো মায়েরই যত জ্বালা। তবে এটা ঠিক, বাচ্চাদুটোর মোরগ লড়াই খেলা দেখে আমারও ভারি আনন্দ হয়েছে। খেলার কথায় মনে পড়ে গেল। মতি নন্দীর নাম। পীযূষ আঙ্কেল তাঁকে নিয়েই এবারে লিখেছেন আর মিহিকা তাঁর প্রতিকৃতি এঁকে পাঠিয়েছে। মতি নন্দী সারাজীবন খেলা নিয়ে লিখে গেছেন। তোমাদের বন্ধু রিয়া আবার কাদা নিয়ে ছোটোবেলায় খেলতে খুব ভালবাসতো। বর্ষাকালে অনেকে আবার মাছ ধরতে যায় পুকুরে, সেই ছবি এঁকে পাঠিয়েছে অনুশ্রুতি। নোবিতা আবার ডোরেমনের সঙ্গে খেলতে ভালবাসে। সেটা ছবি এঁকে পাঠিয়েছে শুভঙ্কর। খেলার গল্প অনেক হল এবার কাজের কথায় আসি।  দেখতে দেখতে ছোটোবেলা ১০০ তম সংখ্যার দিকে এগিয়ে চলেছে। জানিনা এর কোনো নাম আছে কিনা। মুক্তি জেঠু জানলেও জানতে পারেন। এবারে জেঠু তোমাদের জন্য এই নিয়ে একটা দারুণ অজানা নিবন্ধ লিখেছেন। তবে এটা জেনে রাখ, ১০০ তম সংখ্যা এলেই তার সঙ্গে সঙ্গে এসে যাবে শারদীয়া সংখ্যা। ওদিকে জয়াবতীর জয়যাত্রাতেও তৃষ্ণা আন্টি মহালয়ার গল্প বলেছেন। আর ধারাবাহিক ভ্রমণে জয়তী আন্টি ব্যাংককের দুর্গাপুজো নিয়ে লিখে পাঠিয়েছেন। সুতরাং তোমরা সকলে অতি সত্বর পাঠিয়ে দাও গল্প আর ছড়া শারদীয়া ছোটোবেলার জন্য। আঁকা পাঠাতেও ভুলোনা যেন। রথের দিনই তো প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে খুঁটি পুজো হয়, ঠাকুরের বায়না দেওয়া হয়। আর আমরাও শারদীয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। এসো আঁকায় লেখায় উৎসবে মেতে উঠি। -- মৌসুমী ঘোষ।


    ধারাবাহিক উপন্যাস
    জয়াবতীর  জয়যাত্রা
    দ্বাবিংশ পর্ব
    তৃষ্ণা বসাক


    সাগরজল   
    ২৬
    ডাকাত তুলে নিয়ে গেছিল! আহা গো! ভয়ে আদমরা হয়ে আছে, তবু তার মধ্যেই তেজ ঝলসে উঠেছে।পিতৃপক্ষের আজ শেষ, দেবীপক্ষের শুরু। মহালয়ার দিন যেন স্বয়ং উমা এসে দাঁড়িয়েছেন সবার মাঝে। ঘটিতে দুধ ছিল, সেই খাওয়াতে আস্তে আস্তে চোখ মেলল সে।
    ‘কী নাম গা তোমার?’
    ‘উমাশশী’
    ক্ষীণ কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল মেয়ে। জয়াবতীর মনে হল এ নাম আর বদলাতে হবে না।
    ‘ডাকাত তোমায় কেমন করে ধরলে গা?
    পুণ্যি রেগে গিয়ে বলল ‘তোকে কি এখুনি সব শুনতে হবে? দেখছিস তো মেয়েটা কেমন বাঁশপাতার মতো কাঁপছে, ওকে দুদণ্ড জিরুতে দে, আমরা তর্পণ সেরে বাড়িই তো ফিরব, তখন  যত ইচ্ছে কথা বলিস’
    পুণ্যির কথার যুক্তি আছে, যদিও জয়াবতীর মনে হল পুণ্যি আসলে ভয় পাচ্ছে এসব গোলমালে তর্পণের লগ্ন না পেরিয়ে যায়। তবে ওর কথার মধ্যে একটা ইশারা ছিল যেটা খুব ভালো লাগল তার। পুণ্যি ধরেই নিয়েছে এই মেয়েটাকে সেনমশাই নিয়েই ফিরবেন, ঘরে ঠাঁই দেবেন, যেমন পেরজাপতিকে দিয়েছেন।  উহহ কি আনন্দই না হবে। কত খেলুড়ে বাড়ির মধ্যেই। পাঁচ পাঁচ জন। সে, পুণ্যি, পেরজাপতি, প্যাঁকাটি আর এই উমাশশী। একে সে উমা বলেই ডাকবে। দেখে মনে হচ্ছে তার থেকে ছোটই হবে। শুধু তার থেকে নয়, সব্বার থেকেই ছোট হবে বয়সে।

    কিন্তু তার মাথায় একটা নতুন ভাবনার উদয় হল। এমন কথা আগে কখনো তার মাথায় আসেনি।সেনমশাইয়ের নিজের পরিবার হয়তো পাঁচজন। কিন্তু দাস দাসী অতিথি অভ্যাগত নিয়ে নিত্য দশ পনেরোজনের পাত পড়ে। তারপর তারা দুজন হাজির হয়েছে, সে শুনেছে পিতাঠাকুরের হাজার অনুরোধেও সেনমশাই ওদের খাইখরচ কিছুতেই নিতে রাজি হননি। শুধু কি খাইখরচ?  পরনের কাপড় থেকে ওষুধ পালা কিছুই নেন না। ওঁর কথা হল- তাঁর নিজের মেয়েই তো ওঁরা। তারপর জুটল পেরজাপতি।এবার আবার উমাশশী ! এতজনের ভার কি টানতে পারবেন সেনমশাই?এমন কথা আগে কখনো মাথায় আসেনি তার। এ কথাও মনে হল যে তাকে শিগগির উপার্জন করতে হবে। সেনমশাইয়ের ঘাড়ে এতগুলো মানুষ বসে খাবে-সে হয় নাকি? ওদিকে পিতাঠাকুরেরও তো বয়স হচ্ছে। নিজেরই কেমন অবাক লাগল এসব ভাবনা তার মাথায় আসছে দেখে। সে কি বড় হয়ে যাচ্ছে তবে?
    বড় হয়ে যাওয়া ব্যাপারটা কেমন? ভেবে দেখলে এর মধ্যে খুব বাখানা করার মতো আছেটাই বা কী? এই তো আদুরী বেড়ালের কুচি কুচি বাচ্চা হল, যেন শিমুল তুলোর বল উড়ছে, ফুঁয়ো ফুঁয়ো লোম সারা গায়ে। ছোট থাকলে মনে হয় সারাক্ষণ চটকাই। মার চোখে পড়লে আর রক্ষে নেই। বলবে মেয়েমানুষকে নাকি বেড়াল ঘাঁটতে নেই, বেড়ালের লোম পেটে গেলে আর কোনদিন মা হতে পারবে না। পারবে না তো পারবে না। মা হওয়া ছাড়া কি মেয়েমানুষের কাজ নেই সংসারে? মা হলেই তো একেবারে নাক অব্দি সংসারে ডুবে যায় মেয়েমানুষ। ছেলে ওই পড়ল, ছেলে ওই কাঁদল, দুটো ভাত মুখে দেবার জো নেই, অমনি প্যাঁ প্যাঁ করে কাঁদবে খোকন। দূর, দূর, এই যদি মায়ের জীবন, তবে মা হয়ে কাজ নেই কো। তার মাকে তো কোনদিন গাছে চড়ে পেয়ারা পাড়তে দেখেনি জয়াবতী, গালে হাত দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে দেখেনি দুপুর বেলা, উটোনে বড় আমগাছটায় কী সুন্দর দোলনা বেঁধেছে জয়াবতী, জীবনে মা চড়েছে সে দোলনায়? সবসময় খালি দেকো হয় রাঁধছে, কি বড়ি দিচ্ছে, কি আমসি শুকুত দিচ্ছে, নয় কাঁথা সেলাই করছে, কিংবা তাদের খাওয়াচ্ছে বা ঘুম পাড়াচ্ছে বা পিতাঠাকুরের বেলের পানা তয়ের করছে। সব কাজই তাদের, পিতাঠাকুরের, এই সংসারের জন্যে। একেবারে নিজের জন্যে , একেবারে এমনি এমনি, নিজের আনন্দের জন্যে বুঝি মায়েদের কিছুই করতে সাধ যায় না? যায় না কি আর? খুব যায়। কিন্তু সে কতা কেউ কোনদিন জানতে পারবে না, এমনকি নিজের পেটের মেয়েও না। কতায় কতায় বলবে মেয়েমানুষ হবে এমন যার বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না! মুখ ফোটে না বলেই তো ধরে ধরে জ্বলন্ত চিতায় ফেলে দিচ্ছে। এমন বোবা মেয়েমানুষ যে গায়ে আগুন লাগলেও চেঁচায় না, ভাবে  দয়ালু ভগমান গায়ে হাত বুলোচ্ছেন। মুখ্যু মেয়েমানুষ এইজন্যেই বলে। ভেবেও দেখে না, এই যে ভগমান, যিনি নাকি  এই পিথিমি তৈরি করেছেন, এতগুলো প্রাণ এনেছেন পিথিমিতে,  মায়ের স্নেহ মমতা তাঁর আছে বলেই তো পেরেছেন। তিনি কি তাঁর একটা সন্তানকেও আগুনে পুড়িয়ে মারতে পারেন? তবু দেকো মেয়েমানুষের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। ঘরের মধ্যে মেয়েমানুষে মেয়েমানুষে ঝগড়া করে মরবে, কিন্তু যেখানে দুটো উচিত কতা কইলে সুসার হয়, সেখানে বেবাক চুপ। হেই ভগমান, এবার থেকে তুমি মেয়েমানুষকে জিভ কেটেই পাটিও, জিভ যখন কাজেই লাগাতে পারল না, ও আপদ আগে থাকতে বিদেয় হওয়াই ভালো। সেই যে কে একজন ছিলেন, খনা, এমন জ্যোতিষ জানতেন যে তাঁর শ্বশুরের কাছে আর কেউ যেত না ভাগ্য জানতে। শুধু কি তাই? মেঘ, বৃষ্টি, মাটির গুণ, কোন সময় কী চাষ করলে কেমন ফসল পাওয়া যায়, তা ছিল তাঁর নখদর্পণে।

    যদি বর্ষে মাঘের শেষ
    ধন্যি রাজার পুণ্যি দেশ
    কিংবা
    আউশ ধানের চাষ
    লাগে তিন মাস
     
    এসব চাষিদের মুখে মুখে ফিরত। রাজ্য জুড়ে যেখানেই কান পাতো, শুধুই খনার নাম। রাজার কানে গেল সে কথা। শ্বশুর, স্বামীর মাথা হেঁট। বাড়িতে পুরুষ ছেলে থাকতে, বাড়ির পরিচয় হবে কিনা একজন মেয়েমানুষের নামে? তাও আবার বংশের কেউ না, বাইরে অন্য বাড়ি থেকে আসা একজন বৌ মানুষ, সে কি সহ্য হয় কারো? তাই যা হবার হল, খনা যাতে আর বচন দিতে না পারে, তার জন্য তার জিভটাই কেটে ফেলা হল। জয়াবতীর কথার জ্বালায় বিরক্ত হয়ে ছোট থেকে মা ওকে খনার গল্প শুনে ভয় দেখাবার চেষ্টা করেছে। এত কথা বললে তোর একদিন জিভ কেটে নেবে সবাই। মা যাই বলুক, জয়াবতী কোনদিন ভয় পায়নি সে কথা শুনে। উল্টে সে পিতাঠাকুরের কাছে গিয়ে যাচাই করতে চেয়েছে এ গল্পের সত্যতা, সত্যিই খনা বলে কেউ ছিল কিনা, সত্যিই তার জিভ কাটা হয়েছিল কিনা। পিতাঠাকুর অবাক হয়েছেন মেয়ে এত খুঁটিয়ে এসব কথা জানতে চাইছে দেখে। এমনিতে জয়াবতীর সঙ্গে পুথির কোন সম্পর্ক ছিল না। সে শুধু  খুব যত্ন করে পুথি লেখার কালি তয়ের করে দিত, ব্যস। শুখনো পুথি পড়া পণ্ডিত হবার বাসনা তার কোনদিন ছিল না। তবু সে খনার গল্প শুনেছিল মন দিয়ে, আর শুনতে শুনতে তার মনে একটা কথা স্পষ্ট হয়েছিল। মেয়েমানুষের জিভকে এই সমাজ সংসার খুব ভয় পায়। তারা যত পোষা পাখির মতো শেখানো মিস্টি মিস্টি বুলি আওড়াবে, তত সবার আমোদ। ইস, সব্বাইকে অত আমোদ দিতে ভারি বয়ে গেছে তার। এই মুহূর্তে ভীষণ জরুরি একটা কাজ তার মাথায় নড়ে উঠল। সে পুণ্যিকে বলল ‘এক দণ্ড দাঁড়ালে তোর তর্পণের কিছু যায় আসবে না। এমন তো না যে তেনারা না খেয়ে আছে। তোদের  তর্পণের থেকেও ভারি দরকারি একটা কাজ আছে। দাঁড়া দিকি’
    পুণ্যি ভেবলে গিয়ে বলল ‘কী কাজ শুনি?’
    ততক্ষণে জয়াবতী একটা কাঁসার রেকাবিতে নাড়ু আর বাতাসা সাজিয়ে ফেলেছে, তাতে দুটো ফুলও রেখেছে, একটা নতুন গামছাও বের করে ফেলেছে পুঁটলি থেকে। ঘাটে নেমে ছোট চুমকি ঘটি করে গঙ্গাজলও নিয়ে এল হুড়মুড়িয়ে। সেনমশাই খুড়িমা ঠাকমা অবাক হয়ে দেখছে কী করছে মেয়েটা। পুরুত ঠাকুর বিরক্ত গলায় বলল ‘ও কবরেজ মশাই, বলি তর্পণের লগ্ন বইয়ে কি কাজ করবেন নাকি?’
    সে কথাও হজম করার পাত্রী নয় জয়াবতী। সে খরখরে গলায় বলল ‘ লগ্ন অমনি বয়ে গেলেই হল। এখনো মেলা সময় আছে। আপনি বকবক করে মাতা খাবেন না। আমার কাজটা দেকুন দিকি চুপ করে’
    পুরুত তো অবাক। এমন মুখরা মেয়েমানুষ জন্মে দেখেননি তিনি। সেনমশাই ইশারায় চুপ করতে বলেন তাঁকে। সবাই দেখে নতুন গামছার ধারের সুতো ছিঁড়ে ডাকাতের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া মেয়েটার হাতে বেঁধে দেয় জয়াবতী। গায়ে একটু জল ছিটিয়ে দেয়। মুখে একটা নাড়ু গুঁজে বলে ‘আজ থেকে তোতে আমাতে সই পাতালাম। সাগরজল সই’
    ‘সাগরজল!’ কেমন এক বিস্ময় খেলে  যায় সবার মুখে চোখে। পুণ্যির বুক ধড়ফড় করে ওঠে। সে বলে ‘সাগরজল তুই কোনদিন চোখে দেকিচিস নাকি?’
    ‘গঙ্গাও কোনদিন দেকিনি, আজই পেত্থম। তবু তুই আমার গঙ্গাজল। তেমনই এই সাগরজল পাতিয়ে আমি একদিন ঠিক সাগর দেকতে পাব। শুধু আমি না, আমি মা, খুড়িমা, ঠাকমা, আর তোদের সব্বাইকে সাগর দেখিয়ে আনব, ছিখেত্তর ঘোরাব।এই মা গঙ্গা সাক্ষী রইল। হেই মা গঙ্গা, যদি কোনদিন এই পিতিজ্ঞের কথা ভুলে যাই, তুমি মনে করিও মা’   সবাই অবাক হয়ে তাকায় জয়াবতীর দিকে, পুণ্যি বলে ‘হায় হায়, মা গঙ্গা আবার কী করে মনে করাবে?’
    ‘কেন স্বপ্নে দেখা দিতে পারে না বুঝি? ওই দেখ কত শুশুক মাথা তুলচে আবার ডুবে যাচ্ছে, তেমনই মাতার মধ্যে সব স্মৃতি শুশুকের মতো ভেসে উটবে’
    ‘আহা আহা
    গঙ্গার শুশুক সম
    উদিবে স্মৃতি মম
    সার্থক এ জনম-’
    সবাই চমকে যায় শুনে। কে, কে বলল এই পদ?এ যে কবিতা!
    উমাশশী! এই নতুন মেয়েটা কবিতা রচনা করতে পারে!  জয়াবতী ওকে জড়িয়ে ধরে বুকে। একটু আগে ও ভাবছিল নতুন কোন সাথী আসবে তার জীবনে! সে যে এত গুনী হবে, তা কে ভাবতে পেরেছিল? পুণ্যি ভালো, পুথি পড়া পণ্ডিত সে, কিন্তু পুথির বাইরে অন্যরকম করে সে ভাবতেই পারে না।আর পেরজাপতি তো সবসময় ভয়ে লুকিয়ে থাকে, আর পানু সারাক্ষণ তিড়িংবিড়িং করে লাফায়, ওর মনের খবর পায়নি জয়াবতী। কিন্তু এই নতুন মেয়েটা, যেন ধুলোর নিচে পড়ে থাকা অমূল্য মানিক, তার তেজ কেউ ঢাকতে পারছে না।
    সে উমাশশীর হাত ধরে বলে ‘তুই ছড়া কাটতে পারিস? ভারি সুন্দর তো রে!’
    ওকে ধরে উঠে দাঁড়ায় উমাশশী। বলে ‘আমিও যাব তো ছিখেত্তর, ও সাগরজল? তার আগে ডাকাতদের ডেরায় যেতে হবে। ওখানে আরো মেয়েদের আটকে রেকেছে ওরা’। ( ক্রমশ)



    জুবিলী

    মুক্তি দাশ

    কোনো বিশেষ উল্লেখযোগ্য স্মরণীয় ঘটনার বিভিন্ন সংখ্যক বর্ষপূর্তিকে আমরা ভিন্ন ভিন্ন নামে চিহ্নিত করে থাকি। যেমন কোনো স্মরণযোগ্য ঘটনার পঁচিশতম বর্ষপূর্তিকে আমরা বলি, সিলভার জুবিলী বা রজত-জয়ন্তী। পঞ্চাশতম বর্ষপূর্তিকে বলি গোল্ডেন জুবিলী বা সুবর্ণ-জয়ন্তী। তেমনি ষাটতম বর্ষপূর্তি হলো ডায়মন্ড জুবিলী বা হীরক-জয়ন্তী। আর সেইভাবে পঁচাত্তরতম বর্ষপূর্তিকে প্লাটিনাম জুবিলী নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এই ধরণের নামগুলি বহুল প্রচারিত ও ব্যবহত বলেই আমাদের সকলের জানা।

    কিন্তু অনেকেরই বোধহয় জানা নেই যে, যে-কোনো স্মর্তব্য ঘটনার বিভিন্ন বর্ষপূরণের আলাদা আলাদা নাম রয়েছে – যা প্রায়শই ব্যবহৃত হয়না। সেকথায় পরে আসছি। তার আগে ইংরেজিতে   ‘জুবিলী’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত দিকটা একবার দেখে নেওয়া যাক।

    মূলত, ‘জুবিলী’ (Jubilee) শব্দটি এসেছে ল্যাটিন ‘জুবিলিয়াস’ (Jubilaeus) থেকে। হিব্রুভাষায় ‘ইয়োবেল’ (Yebel) বা ‘ইয়োভেল’(Yobhel) নামে একটি শব্দ আছে। ইয়োভেল শব্দটির অর্থ ভেড়া বা মেষ। ভেড়ার শিং দিয়ে নির্মিত হতো একপ্রকার মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট যার নাম ‘শোফার’ (Shofar)। পবিত্র উৎসবের দিনটি ঘোষণা করা হতো এই শোফার বাজিয়ে। দেশবাসীর উদ্দেশে শোফার বাজিয়ে ঘোষণা করা হতো এইজন্যে যে, সবাই যেন প্রার্থনাসভায় যথাদিনে ও যথাসময়ে উপস্থিত থাকে। এর থেকেই ‘জুবিলিয়াস’ (Jubilaeus)। একটি স্মরণীয় ঘটনা বা উৎসবের দিনটি সম্পর্কে সচেতন করা। এইভাবেই 'জুবিলিয়াস' থেকে 
    ‘জুবিলী’ শব্দটি ক্রমে একসময় সারাবিশ্বের কাছে পরিচিতি লাভ করলো।

    এইবার পরিচিত হয়ে নেওয়া যাক নানারকম বর্ষপূর্তির নামের সংগে –

    প্রথম বর্ষপূর্তি – পেপার জুবিলী
    দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি – কটন জুবিলী
    তৃতীয় বর্ষপূর্তি – লেদার জুবিলী
    চতুর্থ বর্ষপূর্তি – লাইনেন জুবিলী
    পঞ্চম বর্ষপূর্তি – উড জুবিলী
    ষষ্ঠ বর্ষপূর্তি – আয়রণ জুবিলী
    সপ্তম বর্ষপুর্তি – উল জুবিলী
    অষ্টম বর্ষপূর্তি – ব্রোঞ্জ জুবিলী
    নবম বর্ষপূর্তি – কপার জুবিলী
    দশম বর্ষপূর্তি – টিন জুবিলী
    একাদশ বর্ষপূর্তি – স্টীল জুবিলী
    দ্বাদশ বর্ষপূর্তি – সিল্ক জুবিলী
    ত্রয়োদশ বর্ষপূর্তি – লেস জুবিলী
    চতুর্দশ বর্ষপূর্তি – আইভরি জুবিলী
    পঞ্চদশ বর্ষপূর্তি – ক্রিস্টাল জুবিলী
    সপ্তদশ বর্ষপূর্তি – টার্কোয়াইজ জুবিলী
    অষ্টাদশ বর্ষপূর্তি – ল্যাপিস জুবিলী
    বিংশ বর্ষপূর্তি – চায়না জুবিলী
    পঞ্চবিংশ বর্ষপূর্তি – সিলভার জুবিলী
    তিরিশতম বর্ষপূর্তি – পার্ল জুবিলী
    পঁয়ত্রিশতম বর্ষপূর্তি – কোর‌্যাল জুবিলী
    চল্লিশতম বর্ষপূর্তি – রুবি জুবিলী
    পঁয়তাল্লিশতম বর্ষপূর্তি – স্যাফেয়ার জুবিলী
    পঞ্চাশতম বর্ষপূর্তি – গোল্ডেন জুবিলী
    পঞ্চান্নতম বর্ষপূর্তি – এমার‌্যাল্ড জুবিলী
    ষাটতম বর্ষপূর্তি – ডায়মন্ড জুবিলী
    পঁয়ষট্টিতম বর্ষপূর্তি – ব্লু-স্যাফেয়ার জুবিলী
    পঁচাত্তরতম বর্ষপূর্তি – প্লাটিনাম জুবিলী
    আশিতম বর্ষপূর্তি – ওক-ওয়েডিং জুবিলী

    এরকম আরো আছে বা থাকতে পারে। তবে আপাতত সেগুলি এই প্রতিবেদকের সংগ্রহসীমার বাইরে।



    খোকার বায়না 

     রূপা চক্রবর্ত্তী 
     
     বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর 
     কচু পাতার 'পরে ,
     রয় না খোকার পড়াতে মন 
     রয় না আপন ঘরে | 

     মুখ বাড়িয়ে জানলা দিয়ে 
     তাকায় কচুর বনে ---
     কোলাব্যাঙে গান ধরেছে 
     খেয়াল খুশি মনে |

     সোনাব্যাঙে ঢোলক বাজায় 
     ঝুনঝুনিতে টিয়া ,
     ভেজা চড়ুই উড়ে বলে 
     আজ শেয়ালের বিয়া |

     বায়না করে সেজে খোকা 
     ছাতা মাথায় দিয়ে ---
     দেখতে যাবে  মায়ের সাথে 
     শেয়াল মামার বিয়ে |


    ছোটোবেলা
    রিয়া মন্ডল
    নবম শ্রেণী
    জওহর নবোদয় বিদ্যালয়
    পশ্চিম মেদিনীপুর

    আবার আমি চাই  সে  পেতে ছোটোবেলা
    যেখানে নেই পড়াশুনো শুধুই আছে খেলা।


    রোজ বিকেলে খেলতে বসে রাধতাম আমি ভাত
    ধুলো বালির মিথ্যে খাবার খেতাম সারা রাত।



    চারিদিকে ঘুরে ঘুরে নিতাম কাদার খোজ
    কাদার পুতুল গড়তে দিতাম ঠাম্মুকে রোজ রোজ।


    হঠাৎ করে খেলার মাঝে যখন ডাকে মা
    এখন আমি খেলা ছেড়ে কোথাও যাবো না।


    আর তো এখন পাই না সেসব পুতুল গড়ার খেলা
    আবার আমি চাই সে  পেতে সেই ছোট্ট বেলা।


    এইভাবে কাটত  মোদের শৈশবের দিনগুলি
    কাদামাখা দিনগুলো সব কি করে যে ভুলি?


    ধারাবাহিক ভ্রমণ
    ব্যাংককের দুর্গাপুজো

    জয়তী রায়

     পুজোর আছে গভীর নিবিড় অর্থ। বিশেষকরে দুর্গাপুজো। দেশে বিদেশে যেখানে যত বাঙালি আছে দুর্গাপূজার মহালগ্নে মেতে ওঠে উৎসবে , আলোর মত ছড়িয়ে পড়ে মন্ত্র। ভুলিয়ে দেয় সমস্ত দুঃখ। সৃষ্টি করে নতুন এনার্জির। নতুন করে বেঁচে উঠতে শেখায় দেবীশক্তি। ইয়া দেবী সর্ব ভূতেষু / শক্তি রুপেনু সংস্থিতা

      কোথায় আছে এমন মন্ত্র? যা উচ্চারণ মাত্র ধমনীতে ফুটে ওঠে নতুন প্রাণ? নতুন ভাবনা? নতুন শক্তি?


     ২
        
    প্রতিটি দুর্গাপূজা জন্ম দেয় আলাদা আলাদা গল্পের। সে গল্প কখনো রূপকথা কখনো চুপকথা। পুজো থাকে, দেশ বদলে যায়, দেশ বদলে যায়, গল্পের মধ্যে আসে নতুন চমক। আজ আমরা তেমন এক গল্প বলব। থাইল্যান্ড তথা শ্যামদেশের গল্প। ব্যাংককের কিছু জন বাঙালি আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরবে এমন এক সংস্কৃতির কথা, যা থেকে বুঝতে পারবেন, ব্যাংকক সুদু নাইট ক্লাব নয়, ফুর্তিতে ঘুরে বেড়ানোর জায়গা নয়, এখানেও প্রদীপ জ্বলে, ফুলে ফুলে সাজিয়ে তুলে আরাধনা করা হয় দেবী দুর্গার।

     
      
         এখানে  একটাও শিউলি গাছ নেই। নদী আছে। কাশফুল নেই।  নেই তো নেই!  যা আছে তাই কম কি! আছে নীল আকাশ। সাদা মেঘ আর সেই এক আশ্চর্য আলো, যে আলো কেবল শরতকালের নিজের সম্পত্তি। ঘরে জানালায়, বারান্দার টবে , লুটোপুটি খেতে খেতে আলো বলে , এসে গেছি। মন খারাপ ছুঁড়ে ফেলে সেজে ওঠো এবার। সেই আলোতে ব্যাংকক সেজে ওঠে, আর জন্ম হয় নতুন গল্পের। নতুন রূপকথার। 


        ৩

     সে সাজে বটে ব্যাংকক। একটাই বাঙ্গালী পুজো। হই হই রৈ রৈ করে এলাহি প্রস্তুতি শুরু হয়। মূর্তি থেকে পুরোহিত  , মহিলা পুরুষের সাজ পোশাক থরে বিথরে আসতে থাকে কলকাতা থেকে।  ব্যাংকক তো আর আমেরিকা নয় , যে, কলকাতা আসতে গেলে  হাজার হাঙ্গামা পোয়াতে হবে। টুক করে আকাশে উড়াল দাও আর ফুক করে পৌঁছে যাও, তারপর সারাদিন বাজার ঘুর ঘুর , শাড়ী রে, টিপ রে, দুল রে___কিনে কেটে আবার পাখা মেলো। পাঁচদিন পাঁচরাত সাজ। সকালে একরকম। রাতে আরেকরকম। ছবি উঠবে। চার পাঁচ ক্যামেরা রেডি। কলকাতায় যায় বলে কেউ যেন ভেবো না, ব্যাংককে শাড়ী বা সালোয়ার মেলে না। স অ ব  মেলে। পহুরাত  _এক জায়গা। যেখানে ইন্ডিয়ার সব মিলবে। দামটা কেবল দুই গুণ। আর দেখতেও চড়া গোছের।  পোষায় না। 
         সেই সময় নবরাত্রি  শুরু হয়। অনেকগুলো অঞ্চল আলোয় আলোয় সেজে ওঠে।  সিলোম...নামে, এক জায়গার রাস্তা জুড়ে কালী গণেশ শিব দুর্গার বড় বড় মূর্তি। লোকের ঢল নামে সেখানে। রাতের বেলায় দলে দলে থাই নারী পুরুষ আসে। পুজো দেয়। কি উৎসাহ। কি ভক্তি। কি নিষ্ঠা। আবেগের জোয়ারে ভেসে যায় , ভাষার বাধা, সংস্কারের বাধা। তোমারও যা , আমারও তাই। ভেদ নেই। না ধর্মে। না মানুষে। ভেদ শুধু চিন্তনে। অসুররূপী নেতিবাচক চিন্তা বর্জন করে, ইতিবাচক চিন্তার আলোয় সাজানোর প্রয়াসের নাম হল পূজা। নতুবা মূর্তি বলো সাজ বলো সব অর্থহীন। 

          
      ৪

    পুজো তো শুধু পাঁচদিনের জন্য হয় না। তিনমাস ধরে তার প্রস্তুতি চলে। অফিসে যারা কট্টর সাহেব, বিরাট বিরাট দায়িত্ব পালন করে, তারাই আগমনীগানের প্র্যাকটিস করছে গম্ভীর হয়ে। নাটকের কঠিন কঠিন বাংলা শব্দ ইংরেজি অক্ষরে লিখে নিয়ে দুলে দুলে মুখস্থ করছে। নাটকের দিন,  কুশী লবের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রম্পটারের। সে দিন তাদের দেমাক কত! অভিনেতা অভিনেত্রীদের লাইন ধরিয়ে দিতে গিয়ে প্রম্পটারের কি কায়দা! সে এক মজা বটে। 
    ছোটদের / বড়দের ... কত যে প্রোগ্রাম। আমরা সকলেই সেগুলো পরিচালনা, মেকাপ, স্টেজ সাজানো করতাম। ব্যাংকক এবং ভারতী বাঙালি ক্লাব বিশ্বাস করত না বাইরের ট্যালেন্ট খুঁজে আনতে, তারা নিজেদের মধ্যে থেকেই প্রতিভা খুঁজে দারুণ সমস্ত প্রোগ্রাম উপহার দিত। 

     সবচেয়ে মজার ছিল , রিহার্সাল। ঘুরে ঘুরে প্রত্যেক বাড়ি হত, আর এলাহী খাওয়া দাওয়া। মনে রাখতে হবে, মিষ্টি পযর্ন্ত বাড়িতে তৈরি করা। 
    রিহার্সালের আনন্দ সাংঘাতিক। বাড়ি একেবারে গম গম করত। 
    এই প্রসঙ্গে হয়ে যাক এক আনন্দের গান।

      ৫

     তবে যত যাই হোক, বিসর্জনের মত উত্তেজনা আর কোনোদিন নেই। ভারতী ক্লাবের বাঙ্গালীরা উত্তম মধ্যম খেটে খুটে পরিশ্রম করে পকেট খালি করে অর্থ দিয়ে পুজোটা দাঁড় করায়, বিসর্জনের দিন , চোখের জল আর ধরে রাখা যায় না। সক্কলের মন খারাপ।  তবু যেতে তো হবে। চল দুগ্গি জলের তলে/ ফিরে আসিস মায়ের কোলে/ চল দুগগি হিমালয়ে/ নিজের পতির আশ্রয়ে।।
       মিষ্টি শান্ত আর আদুরে নদী হল ছাও প্রা। তার বুকের উপর দিয়ে তর তর করে বয়ে চলছে দুটো নৌকা। থেকে থেকে উঠছে জয়ধ্বনি__বলো বলো দুগ্গা মাই কি । আসছে বছর আবার হবে। সে এক ব্যাপার বটে। মাঝনদীতে ব্যালান্স রেখে, মাকে বিসর্জন দিয়ে, জল ছিটিয়ে__ফিরে এসে, মিষ্টি মুখ। গলা জড়াজড়ি আরো কত কি। 
    ( গান)
          শিউলি গাছ নেই তো কি হল? মনের বাগানে শিউলি ফুটলেই হল। দেশে নেই তো কি হল? ভালোবাসার অমোঘ টানের জোয়ার ঘুচিয়ে দেবে দেশ বিদেশের ফারাক। 
      

    কত ঘটনা ঘটল। বিপর্যস্ত হয়ে গেল ব্যাংকক।  এবারের পুজো নিয়ে আসবে কেমন গল্প? গল্পের তো মৃত্যু হয়না। তবে সে রূপকথা হবে না কি চুপকথা? সে কথা কেউ জানে না। প্রার্থনায় থাকি, অপেক্ষায় থাকি, মা এসো মা, কাটিয়ে দাও সব সংকট। ফিরিয়ে দাও প্রাণ।


    স্মরণীয়
    (মতি নন্দী)
    কলমে - পীযূষ প্রতিহার


       বাংলা সাহিত্যের জগতে মতি নন্দী তাঁর খেলাধূলা নিয়ে অসাধারণ সব লেখার জন্য বিখ্যাত। ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করলেও বাংলায় খেলাধূলাকে বিষয় করে সাহিত্য সৃষ্টির জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর আগে এ বিষয়ে বাংলায় খুব একটা উল্লেখযোগ্য লেখা কিছু ছিল না। মতি নন্দী উত্তর কলকাতার তারক চ্যাটার্জী লেনে ১৯৩১ সালের ১০ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন চুনিলাল নন্দী ও মা ছিলেন মলিনাবালা দেবী। তাঁর স্কুলের খাতায় নাম ছিল মতিলাল নন্দী। তিনি স্কটিশ চার্চ স্কুল থেকে ১৯৪৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন।

     ১৯৫০ সালে আই এস সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর যথাক্রমে ১৯৫১ সালে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং এ ডিপ্লোমা অর্জন করেন এবং ১৯৫৭ সালে মনীন্দ্র চন্দ্র কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫২ সালে স্টেট ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির এপ্রেন্টিস হিসেবে কাজ শুরু করলেও তা বেশিদিন করেননি। ১৯৬৯ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন। এরপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর এই পেশায় ছিলেন। শেষের দিকে আনন্দবাজার পত্রিকার ক্রীড়া বিভাগের সম্পাদক হিসেবেও সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন। তিনি কলকাতা স্পোর্টস জার্ণালিস্ট ক্লাবের সভাপতি ছিলেন বেশ কিছুদিন।

        সাহিত্য সৃষ্টিতে গোড়া থেকেই অত্যন্ত গোছানো ও খুঁতখুঁতে ছিলেন তিনি। সাহিত্য রচনা বেশ কিছু বছর ধরে করলেও ১৯৫৬ সালে প্রথম ছোটোগল্প প্রকাশিত হয় 'দেশ' পত্রিকায় 'ছাদ'। ঐ বছরই 'পরিচয়' পত্রিকায় 'চোরা ঢেউ' নামে অন্য একটি গল্প প্রকাশিত হয়। ১৯৫৮ সালে 'শারদীয়া পরিচয়' পত্রিকায় মতি নন্দীর লেখা গল্প 'বেহুলার ভেলা' ভীষণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তাঁর রচিত বিখ্যাত কয়েকটি উপন্যাস হল - 'কোনি', 'নায়কের প্রবেশ ও প্রস্থান', 'দূরদৃষ্টি', 'ছায়া', 'সাদা খাম' প্রভৃতি। শিশু কিশোরদের জন্যও লিখেছেন অসাধারণ সব জনপ্রিয় উপন্যাস ও গল্প। তাঁর রচিত কয়েকটি বিখ্যাত শিশু সাহিত্য হল- 'স্ট্রাইকার', 'স্টপার', 'ননীদা নট আউট', 'অপরাজিত আনন্দ', 'কলাবতী সিরিজ', 'বুড়ো ঘোড়া', 'শিবা' প্রভৃতি। মতি নন্দীর লেখা বিখ্যাত কয়েকটি গল্প সংকলন হল- 'বেহুলার ভেলা', 'নির্বাচিত গল্প', 'শ্রেষ্ঠ গল্প', 'গল্পসংগ্রহ', 'আম্পায়ারিং' ইত্যাদি। প্রবন্ধ সাহিত্যেও তিনি খেলাধূলাকে জুড়ে নিয়েছেন আপন ভালবাসায়। তাঁর লেখা কয়েকটি বিখ্যাত প্রবন্ধ সংকলন হল- 'খেলার যুদ্ধ', 'ক্রিকেটের আইনকানুন', 'ক্রিকেটের রাজাধিরাজ' ইত্যাদি। ক্রীড়া বিষয়ক ছাড়াও মতি নন্দীর লেখার মধ্যে রয়েছে সামাজিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাঁর লেখায় উত্তর কলকাতার নগর জীবনও স্থান পেয়েছে গুরুত্বের সঙ্গে। তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি উপন্যাস চলচ্চিত্র হিসেবেও প্রশংসিত হয়েছে। এর মধ্যে 'কোনি' এবং 'স্ট্রাইকার' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। 'ফাইট কোনি, ফাইট' - সংলাপটি তো খেলাধূলার জগতে ভীষণভাবে ব্যবহৃত হয় উৎসাহদানের জন্য। 

        মতি নন্দী ১৯৭৪ সালে সাহিত্যে অবদানের জন্য আনন্দ পুরস্কার পান। তাঁর লেখা 'সাদা খাম' উপন্যাসের জন্য ১৯৯১ সালে সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার লাভ করেন তিনি। ২০০০ সালে শিশু কিশোর সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য 'বাংলা একাডেমী' পুরস্কার পান তিনি। এছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'শরৎ স্মৃতি' পুরস্কার পান ২০০২ সালে।

          ২০১০ সালের ৩ জানুয়ারি এই মহান স্রষ্টার জীবনাবসান হয়।


    পাঠপ্রতিক্রিয়া

    (ছোটোবেলা ৮৯ পড়ে দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে যা লিখলেন।)

    জ্বলদর্চি  ছোটবেলার বিশেষ সংখ্যা ৮৯ আসার পরে সেটি আগাপাশতলা পড়ে ফেললাম। কারণ পত্রিকাটি আমার ভীষণ ভালো লাগে। ছোটবেলা লেখা থাকলেও আমাদের বড়দেরও পড়তে বেশ ভালো লাগে কারণ বড়দের মধ্যেও তো একটা ছোটবেলা লুকিয়ে থাকে।

    প্রথমেই বলি ফটোগ্রাফি অত্যন্ত সুন্দর, মৃণাল ঘোষের তোলা। কলকাতায় এখনো দেখা যায় মানুষের টানা রিক্সা যা আমাদের নস্টালজিক করে তোলে।
    ধারাবাহিক "জয়াবতীর জয়যাত্রা" তে দেখি জয়াবতীর সাহসী কথা। সত্যি তো আগুন দেবতা হলে তা কখনোই পুড়িয়ে মারত না, দেবতার সন্তান তো আমরা। এখানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের "বিসর্জন" নাটকের রঘুপতি পুরোহিত ও ভিখারিনী বালিকা অপর্ণা র কথা মনে পড়ে গেল।
    ছোট্ট মেয়ে অষ্টম শ্রেণীর শ্রীপর্ণা ঘোষের আঁকা ছবিটিও বেশ সুন্দর।
    এরপরে বন্দনা সেনগুপ্তের "জুটি" গল্পে দেখি কালু-ভুলু অর্থাৎ একটি বছর বারো ছেলে আর কালো রঙের নেড়ি কুত্তার এক সুন্দর বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
    এরপরে আছে মিষ্টি মেয়ে স্নেহা দাসের আঁকা একটি নৌকার ছবি, যেন এই পত্রিকাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, সেই কথায় বলছে।
    তারপরই অদ্রিজা সাঁতরার  লেখা একটি সুন্দর কবিতা সেখানে সে আগের দিনের সঙ্গে এখনকার পরিবেশের পার্থক্য খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছে।
    তারপরে আবার একটি ছোট্ট বন্ধু জয়দীপ সাহারা  আঁকা একটি গ্রাম্য পরিবেশের ছবি যা মন ভরিয়ে দেয়।
    এরপর দেখি নবম শ্রেণীর ছাত্র অঙ্কিত ঘোষের লেখা এক কল্প বিজ্ঞানের গল্প সেখানে অঙ্কিত একটি ভালো মেসেজ দিয়েছে, এটি পড়ে মন ভরে গেল। এইটুকু বাচ্চা এত ভাবতে পারছে গাছের জন্য, পরিবেশের জন্য, আর আমরা বড়রা তা বাস্তবে পরিণত করতে পারছি কই!

    এরপরেই জয়তী রায়ের লেখা ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনীতে এবারে শ্যাম দেশ তথা থাইল্যান্ডের কথা উঠে এসেছে, প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি আমিও থাইল্যান্ডে ২০০৭ এবং ২০০৯ দুবার গেছি, এক সুন্দর দেশ সুন্দর সংস্কৃতি। তবে লেখিকা ওখানে অনেক দিন আছেন । তিনি সেখানকার ঘুমন্ত রাজ্যের কথা বলেছেন এবং সুমেরু মাউন্টেন প্যালেসের মত এক অদ্ভুত জায়গার কথাও তিনি বলেছেন। তার বর্ণনা  এত সুন্দর মনে হয় যেন আমরা চোখের সামনে দেখছি।

    স্মরণীয় ধারাবাহিকে পীযূষ প্রতিহার এক সুন্দর প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে খুব সুন্দর বিশ্লেষণ করেছেন।

    সবশেষে বলি মাননীয় সম্পাদক মহাশয়া মৌসুমী দি (ঘোষ) এর জন্য পত্রিকাটি দিন দিন অলংকরণে ও আঙ্গিকে খুব সুন্দর হয়ে উঠছে। "জ্বলদর্চি" র শ্রীবৃদ্ধি কামনা করি।

    পাঠপ্রতিক্রিয়া -২
    (জ্বলদর্চি ছোটোবেলা ৮৯ পড়ে অসীম হালদার যা লিখলেন) 

    প্রতি সংখ্যার নতুন নতুন প্রচ্ছদ দিয়ে সাজিয়ে তোলা ওয়েব পত্রিকাটির সাথে সখ্যতা বহুদিনের। ছোট্ট বন্ধুরা, তোমাদের এখন কত্তো পড়াশুনোর চাপ! শুধু কি পড়া, কোচিংএও দৌড়াতে হচ্ছে রুদ্ধশ্বাসে। তারপর তো লেগেই আছে ক্লাস টেস্ট। সেখান থেকে তোমরা যেভাবে সৃজনমূলক কাজকর্মেও সময় দাও, তা অবশ্যই তোমাদের নিজস্ব প্রতিভা। তাও কেমন বকাবকিও খেয়ে যাও বাবা মায়েদের কাছে, তাই না! আরে জানি রে বাবা। আমিও তো আমাদের বাড়িতে সেইরকম এক আধটু করে থাকি তোমাদের বন্ধুদের সাথে। ব্যস্, তারপর একটু রাগ, অভিমান আর কি। আবার কিছুক্ষণ বাদে যেই কি সেই। তোমাদের কর্মকাণ্ড কিন্তু সেই চলছেই। আর তাতেই আমাদের আনন্দ, তোমাদের খুশি। 

    জানতে পারলাম যে মৃণাল আঙ্কেলের পাঠানো এবারের প্রচ্ছদের ছবিটা দেখে তোমাদের কষ্ট হচ্ছে। হবে নাই বা কেন ... টানা রিক্সায় চালকের হাঁটা বা দৌড়ানোর গতির ওপরেই নির্ভর করে কোন জায়গায় পৌঁছানো। গায়ে একটা স্যাণ্ডো গেঞ্জি, লুঙ্গিটাকে ভাঁজ করে খালি পায়ে সাধারণতঃ যাঁদের এখনও দেখা যায় কোলকাতার কিছু নির্দিষ্ট এলাকায়, তাঁদের কথা নিয়ে লেখা কাহিনী তো আমার পড়া নেই। তোমাদের সন্ধানে যদি থাকে, আমায় জানিও। কাঁধে রাখা গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে আরোহীকে নিয়ে দৌড়ে চলা মানুষটির দৃষ্টি থাকে কত তাড়াতাড়ি গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেবে। দক্ষিণ কোলকাতার বালিগঞ্জ দিয়ে স্কুলে যাওয়ার পথে একবার এই রিক্সায় চড়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। কারণ তখন সময় কম, সময়ে পৌঁছাতে না পারলে প্রেয়ার লাইনে ঢোকা যাবে না। বুঝতে পারি, কত জোরে সেই চালক রিক্সা নিয়ে দৌড়েছিলেন, যার জন্য সেদিন স্কুল করা সম্ভব হয়েছিলো। পারিশ্রমিক হিসাবে যা দেওয়া হয়েছিল, তার চাইতে প্রয়োজন মিটেছিলো অনেক বেশি। এটা স্বীকার না করলে নিজেকে অপরাধী মনে হবে। তবে কি জানো তোমরা, এই ছবিটা দেখে আমার দুঃখটা অন্য কারণে লাগছে। আমরা তো এখন দৌড়ানোর গতি বলো, মাধ্যম বলো, সবকিছুতেই এগিয়ে যাচ্ছি। পাশে, পিছনে কে বা কারা পড়ে থাকলো, তাদের পানে চাইছি না। তাই এখন নিজের প্রয়োজনমতো গাড়ি পেয়ে যাচ্ছি হাতের এক চুটকিতে। ফলে তাঁদের দৌড়ানোর গতির ওপর আর ভরসা করতে হচ্ছে না, পয়সার ভারে দর কষাকষির ঝামেলাও ভোগ করতে হচ্ছে না। বলা যেতে পারে, তাঁদের প্রয়োজনীয়তা দুরন্ত গতির কাছে ম্রীয়মান হয়ে পড়ছে নিয়ত। ট্র্যাজেডি সেখানেই। সেই ভাবনায় মন তাই ভারাক্রান্ত।

    সৃজন নিয়ে এবার দু চার কথা। শুরু করতে চাই বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে। সায়নীর আঁকা ছবির প্রসঙ্গে বলতেই হয়, এই মহাপুরুষের ছবি এঁকে প্রমাণ করে দিয়েছে যে আজও ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে এই প্রজন্মের কচিকাঁচারাও কতখানি আবেগপ্রবণ। বিশেষ করে একটি কথা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায় আমার কথা, প্রতি সংখ্যাতেই পীযূষবাবুর কলমে উঠে আসা বিভিন্ন মনীষীদের কথা। এবারের সংখ্যায় যেমন, বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে লেখাটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ১৮৪ বছর আগে এই মহামানবের আবির্ভাবে সত্যই ধন্য হয়েছিলো দেশের মাটি, মুখে মুখে আজও ধ্বনিত হয় 'বন্দে মাতরম্' গানটি। এ তো গেলো কিছু বক্তব্য তাঁর সৃজন নিয়ে। 
    কিন্তু লেখার স্বাধীনতায় কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও তোমাদের জানাই। ক্লাসে তখন 'বঙ্কিমচন্দ্র' প্রসঙ্গ এলেই সবাই বলাবলি করতাম, 'বাপ্ রে যা কঠিন কঠিন ভাষা!' তা একদিন হলো কি, মাতৃভাষায় যদি সেরকম শক্ত ভাষা থাকে আর যদি তা জানার আগ্রহ থাকে, তাহলে কি আর সমস্যা! কিনেই ফেললাম, বঙ্কিম রচনাবলী। শুরু হলো গল্পগুলো প্রথম থেকে পড়া। কিন্তু কঠিন ভাষার অর্থ দুর্বোধ্য লাগছে। নোট করতে লাগলাম এবং স্যারের কাছ থেকে তার অর্থ জেনে লেখা শুরু করলাম।  আমার কাছে তখন তা আর কঠিন মনে হলো না। আসলে তখন বঙ্কিমচন্দ্রকে ভালবাসার মধ্যে যেটা আমার মনে হয়েছিলো, তা হলো তাঁর উল্লিখিত কঠিন ভাষাকে সুস্পষ্টভাবে জানা, তাতেই ছিল আনন্দ। বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন দিকে তাঁর বিচরণ নিঃসন্দেহে নজরকাড়া। সময়টাই তো তখন ছিলো কতো কঠিন, তা তো তোমরা জেনেছো।

    এবার আসি স্নেহার আঁকা নৌকা নিয়ে। দাঁড় বাইতে বাইতে ক্লান্ত মাঝি হয়তো একটু বিশ্রাম নিচ্ছে গাছের তলায়। আর তার ফাঁকে ঘাটে বাঁধা নৌকাখানি ভাসতে ভাসতে চলেছে জলের স্রোতের সাথে খেলা করতে করতে। দুঃখময় জীবনে মাঝিদের বুঝি এভাবেই সংগ্রাম চলে নিয়ত! 

    'অনুযোগ' এর কথা আর কি বলি অদ্রিজা, তোমায়! গ্রামছাড়া, সবুজ মাঠছাড়া মানুষকে চলে আসতে তো হয় কখনো শহুরে জীবনে। যেখানে শ্রীপর্ণার আঁকা ছবির মতন রাস্তায় রাস্তায় বিদ্যুতের লাইন আছে, আলোয় ঝলমলে গোটা পরিবেশে শুধু গাড়ি আর গাড়ি। মানুষের ব্যস্ততার মধ্যে দু দণ্ড কথা বলার মতো ফুরসতই মেলে না। তাই মন পড়েই থাকে গ্রামের মেঠোপথের দিকে। একমত হয়ে বলতে চাই:-

    তৃষ্ণা জেগে ওঠে বার বার
    গাঁয়ের মেঠো পথের তরে।
    স্নিগ্ধ ছায়ায় বসবো কবে ..
    ভাবি তাই চার প্রহরে।
    অচেনা সব লাগে কেবল
    বুঝি না কিছুই রহস্য।
    গতির জোরে খুশি উধাও
    মোবাইলে বাড়ে আলস্য।

    অদ্রিজার মতো কষ্ট পাওয়ার দলে আমিও ছিলাম। ছোটবন্ধু জয়দীপ সেই কষ্ট থেকে আমাদের মুক্তি দিল। তার হাত ধরে চলে গেলাম গ্রামের বাড়িতে। খোলা দাওয়ায় পা ছড়িয়ে বসে মা কাকিমাদের সকালবেলা ফুল তোলা, উঠোনভর্তি ধানের গোলা, পুকুরের জলে মাছেদের অবাধ ঘুরে বেরানো ইত্যাদি দেখতে বড়ো ভাল লাগে আমারও যে। তেমন কিছু ছবির কল্পনা করে তার ছবি আঁকার চেষ্টাকে সেলাম।

    টাইম মেশিনের সাহায্যে এবার চলে যাই শ্যামরাজ্যে, যেখানে জড়িয়ে আছে প্রাচীন যুগের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা। সেইসব খুঁজে নিয়ে ঘোরার আনন্দ সার্থক হয়। জয়তী রায় আলোকপাত করেছেন এমনভাবে যে সেখানে বেরাতে যাওয়ার আগ্রহ তৈরী হলো। তোমরা কেউ হয়তো সেখানে ঘুরেও এসেছো। আর ব্যাঙ্কক মানেই পাটায়া! মানে ফিল্মি দুনিয়ার তারকাদের চোখে পড়ে যাওয়া কোন আশ্চর্যের বিষয়ও নয়। যাইহোক, যারা আমার মতো না যাওয়ার দলে, চলোই না হয় একবার টাইম মেশিনে করে চলে যাই। 
    সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু অঙ্কিত আমাদের সকলের মাথায় একটা প্রশ্ন ঢুকিয়ে দিলো যে! আমরা, মানে ধরো যারা শুধু দৌড়েই চলেছি এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে, সবটাই তো নিজের জন্য। তাই তো! আর সেজন্য কোন কিছু বাড়তি চিন্তাও করছি না; যেটা মনে হচ্ছে, করেও ফেলছি স্মার্টলি। মাঝখানে যেটা হচ্ছে, তা হলো আমরা উন্নতির শিখরে পৌঁছে গিয়ে ধারেকাছে কোত্থাও সবুজের দেখা পাচ্ছি না। কী সাংঘাতিক ব্যাপার স্যাপার বলো তো! অম্বলেশ্বরের কথা তো জানলে। এর শিক্ষা কে নেবে বা দেবে গো! প্রশ্নটা কিন্তু মাথাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু উত্তর? কে দেবে? 'মানুষজাত' বড়ো নিষ্ঠুরই।

    তবু বলবো বন্দনা সেনগুপ্ত আমাদের একটু স্বস্তি দিলেন। কালু ভুলুর এই জুটি আছে বলেই না এখনও আমরা বেঁচে। না হলে কবে কোন দুষ্টুদের উৎপাতে সারা দেশটা ধ্বংস হয়ে যেতো। এ গল্প আবার প্রমাণ করলো "জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।" প্রেমহীন সমাজে এমন গল্পের ভাবনা থেকে আমাদের শেখার আছে যে একটা মানুষের যেমন বাঁচার অধিকার আছে, তার সমান অধিকার আছে একটি প্রাণীর বেঁচে থাকার। যে শিক্ষিতের অবয়বে কিছু মানুষের দুরভিসন্ধি সহজে ধরে ফেলেছে একটি সারমেয়। এরাই আসল হিরো, আমিও বলবো।

    কথায় কথায় বেলা যখন সারা হলো, মনে পড়লো তৃষ্ণা বসাকের সেই দীর্ঘ ধারাবাহিক উপন্যাসটির কথা বলা হলো না। এটা ২৫তম পর্ব। সংস্কার ভেঙ্গে তর্পণ করার প্রসঙ্গে জয়াবতীর সোজাসাপটা আলোচনা নিঃসন্দেহে 'জয়াবতীর জয়যাত্রা'কে সিদ্ধ করেছে। বলা বাহুল্য, জয়াবতীর কপালে বিজয়টীকা পড়ানো শুধু সময়ের অপেক্ষা। এই তো ধরো না কেন, গত বছর একটি দুর্গাপুজোয় চারজন নারী কিভাবে সর্বপ্রথম প্রথা ভেঙ্গে পৌরোহিত্য করে দেখিয়ে দিলেন যে কোনকিছুই নারীদের কাছে অসম্ভবের নয়। সমাজে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় এই উপন্যাস পাঠকের কাছে সমাদৃত হবে, আমার বিশ্বাস।

    আমার কথাটি ফুরোল, তবে নটেগাছটি মুড়োনো গেল না; কারণ জ্বলদর্চির পাতা রঙীন হয়ে আবার আসছে আগামী রবিবার, যার যাত্রাপথে মৌসুমীদির অবাধ বিচরণ তোমাদের সৃজন নিয়ে। দেশজুড়ে এখন প্রভু জগন্নাথদেব আলোচনার কেন্দ্রে। বিশ্বকর্মার গুরু অনন্ত বাসুদেব মহারানার হাতের জাদুতে কিভাবে জগন্নাথদেব অসম্পূর্ণ মূর্তিতে দেশবাসীর কাছে পূজিত হলেন, তাই নিয়ে কিছু পড়াশুনো করে নিও। ঠাম্মা দাদাভাইদের কাছ থেকেও শুনতে পারো সে সম্বন্ধে। কিন্তু এর মধ্যে সামান্য চিন্তা ধরাচ্ছে আবার করোনা। অতএব, বাড়তি সাবধানতার সাথে থাকা শুরু আবার। জ্বলদর্চির সবাইকে অনেক শুভেচ্ছা।


    আরও পড়ুন 

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇



  • নাস্তিকের ধর্মাধর্ম- পর্ব- ৫৭ /সন্দীপ কাঞ্জিলাল
  • নাস্তিকের ধর্মাধর্ম- পর্ব- ৫৭

    সন্দীপ কাঞ্জিলাল

    ধর্ম ও মুক্তচিন্তা


    প্রাচীন ভারতে যেমন ধর্মগুরু ও রাষ্ট্রশক্তির যৌথ উদ্যোগে, অর্থাৎ রাজন্য শ্রেণি ও পুরোহিত শ্রেণীর পারস্পরিক সমঝোতায় বেদবিরোধী 'পাষণ্ডদের' দমন করা হয়েছিলো, মধ্যযুগের ইউরোপে তেমনি রোমান ক্যাথলিক চার্চ এবং রাজতন্ত্রের যৌথ উদ্যোগে খ্রিস্ট ধর্মের প্রতিকূল সব রকম মতবাদকেই ধ্বংস করা হয়েছিলো। যদিও গির্জাতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের যৌথ শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে এ সময়ে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্মীয় সম্প্রদায়ই সোচ্চার এবং সক্রিয় হয়েছিলো, তথাপি এই আক্রমণের বিশেষ লক্ষ্য ছিলো অ্যালবিজেনসীয়রা (Albigensian) যারা জোরোয়াস্ট্রিয় ধর্ম এবং বৌদ্ধ ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলো। ১২১৬ খ্রিস্টাব্দে চতুর্থ ল্যাটেরান কাউন্সিল (Lateran Council) এই ডিক্রি জারি করে যে খ্রিস্ট ধর্মকে বাঁচিয়ে রাখবার জন্য সব ধর্মদ্রোহীকে হত্যা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য। এই উদ্যোগকে আরো জোরদার করবার উদ্দেশ্যে ১২৩৩ খ্রিস্টাব্দে সৃষ্টি হয় সেই ইনকুইজিশান (Inquisition) ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে অসংখ্য ধর্মদ্রোহীকে জীবন্ত দগ্ধ করে অথবা শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। মধ্যযুগীয় খ্রিস্ট ধর্মের তাত্ত্বিক দিকপাল সেন্ট টমাস অ্যাকুইনাস (১২২৫-১২৭৮) ইনকুইজিশনকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে 'খাঁটি ধর্মবিশ্বাস' বাঁচিয়ে রাখবার জন্য ধর্মদ্রোহীদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেন, এবং রাষ্ট্রশক্তির উপর এই বিধান বলবৎ করবার দায়িত্ব অর্পণ করেন। ১৪৭৮ সাল থেকে আবার স্পেনে আরেকটি ইনকুইজিশন চালু হয় যার নিয়ন্ত্রণ ছিল সরাসরি রাষ্ট্রশক্তির হাতে। অগণিত মুক্ত চিন্তক, অবাধ্য কিংবা বিদ্রোহী মানুষকে এভাবে ধর্মদ্রোহীতার নামে মধ্যযুগীয় ইউরোপে জীবন্ত দগ্ধ করা হয়েছে অথবা ফাঁসিকাঠে ঝোলানো হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই নৃশংস শারীরিক নির্যাতনের পরে। প্রকৃতপক্ষে মধ্যযুগীয় খ্রিস্ট ধর্মের মত অন্য কোন ধর্মে মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে এতো বড়ো নৃশংস এবং বর্বরচিত আক্রমণ কখনো সংঘটিত হয় নি। কিন্তু আমরা এখানে প্রধানত ইনকুইজিশনের ভিতরে ও বাইরে কয়েকজন খ্যাতনামা মুক্তচিন্তক মানুষের ধর্মের নামে নির্যাতন নিয়ে কিছুটা আলোচনা করবো। 

    মধ্যযুগীয় ইউরোপে রাষ্ট্র যেসব মুক্তচিন্তক এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বকে ধর্মের নামে নির্যাতন করেছে তাদের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখযোগ্য রজার বেকন (১২১৮-১২৯৪)। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক, এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁসের প্রথম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন, এবং গবেষণাগারে অনেক পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানচর্চা করতেন। তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বেকনের এই বৈজ্ঞানিক তৎপরতাকে ধর্মবিরোধী জ্ঞান করেন। ফলে একটি গির্জার কারাগারে তাকে অনেক বৎসর বন্দী থাকতে হয়েছিলো। অন্য ধরনের আরেকটি নির্যাতিত এবং নিহত অসাধারণ ব্যক্তিত্বের নাম জোয়ান অফ আর্ক (১৪১২-১৪৩১)। আর শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধের সময়ে তিনি ইংল্যান্ডের আগ্রাসনে পরাজিত ফরাসি যুবরাজকে সাহায্য করবার উদ্দেশ্যে পুরুষের পোশাক পরে অস্ত্রধারণ এবং সৈন্যবাহিনী পরিচালনা করেন। তার মনে হয়েছিলো যে এ কাজে পরলোক থেকে সেন্ট মাইকেল টাকে অনুপ্রাণিত করছেন। অনেকগুলো যুদ্ধে ইংরেজদের পরাজিত করবার পর তিনি নিজে পাশে দাঁড়িয়ে ফরাসি যুবরাজকে রাজপথে অভিষিক্ত করেন। কিন্তু পরে একটি যুদ্ধে ইংল্যান্ডের মিত্ররাজ্য বুরগান্ডির কাছে পরাজিত ও বন্দী হন। বুরগান্ডি তাকে ইংল্যান্ডের কাছে বিক্রি করে দেয়। তারপর তাকে যুদ্ধবন্দী রূপে গণ্য না করে একটি ধর্ম আদালতের মিথ্যা বিচারে ধর্মদ্রোহী এবং ডাইনি বলে ঘোষণা করে পুড়িয়ে মারা হয়, মাত্র আঠারো-উনিশ বৎসর বয়সে। 

    পরবর্তী উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ইতালির জিওলারমো সাভানারোলা (১৪৫২-১৪৯৮)। তখন ইউরোপে বৌদ্ধিক নবজাগরণ বা রেনেসাঁস আরম্ভ হয়ে গেছে, কিন্তু তথাপি ধর্মের নামে মুক্তচিন্তার কণ্ঠরোধ শেষ হয়নি। সাভানারোলা নিজে ডোমিনেকানপন্থী ক্যাথলিক ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু তিনি ক্রমশ পোপ ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের কোর্টে যৌন ব্যাভিচার সহ অসংখ্য দুর্নীতি ও ভ্রষ্টাচারের তীব্র সমালোচক হয়ে দাঁড়ান। ফলে ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে পোপ তাকে ধর্মচ্যুত করেন। তারপর সরকারি আমলারা তাকে গ্রেফতার করে তার উপর শারীরিক নির্যাতন চালায়, এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ফাঁসি দেয়। এ ভাবেই সার্বভৌম জাগতিক ও ধর্মীয় অধিশ্বর পোপের সমালোচনার জন্য রাজন্য শ্রেণী ও পুরোহিত শ্রেণীর যৌথ উদ্যোগে ধর্মাসুরদের এক নির্ভিক সমালোচককে ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগে হত্যা করা হয়। 
    বৌদ্ধিক নবজাগরণের ফলশ্রুতি রূপে মুক্তচিন্তা এবং বিজ্ঞানমনস্কতার যুগ আরম্ভ হবার পর থেকে ইউরোপে ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে। এই সংঘাতের প্রথম বলি ইতালীয় দার্শনিক-বৈজ্ঞানিক জিওরদানো ব্রুনো (১৫৪৮-১৬০০)। জন্মসূত্রে ডোমিনিকানপন্থী রোমান ক্যাথোলি হলেও ব্রুনো ছিলেন ধর্মান্ধতা বিরোধী। তার দার্শনিক মত এই ছিলো যে প্রত্যেক মানুষই নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী পৃথিবীকে দেখে। জ্ঞান অন্তহীন, এবং চূড়ান্ত সত্য হলে কিছুই নেই।

     খ্রিস্ট ধর্মের ঈশ্বরতত্ত্ব এবং সৃষ্টিতত্ত্বের বিরোধিতা করে চার্বাকের মতো ব্রুনোও বলেন যে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বস্তুকণা (monad) সমূহের সমাহারে প্রাকৃতিক নিয়মে পৃথিবী এবং জীবজগতের সৃষ্টি হয়েছে। এ ধরনের 'ধর্মবিরোধী' স্বাধীন মতবাদ প্রচারের ফলে পোপের নির্দেশে এবং সরকারি আদেশে ভেনিস শহরে তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। কিন্তু পরবর্তী কালের দর্শন ও বিজ্ঞান চিন্তার উপরে, বিশেষত স্পিনোজা এবং লাইবনিৎসের চিন্তাধারায় ব্রুনোর গভীর প্রভাব পড়েছিলো।

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇



  • নারায়ণ মুখোপাধ্যায় /বিশ্বজিৎ পাণ্ডা
  • বাংলা গল্পের পালাবদল—১

    নারায়ণ মুখোপাধ্যায়

    বিশ্বজিৎ পাণ্ডা


    (বাংলা ছোটোগল্পের ইতিহাসের দিকে তাকালে দ্যাখা যাবে, মাঝে মাঝেই বাঁক বদল ঘটেছে তার। বিষয়—আঙ্গিক সমস্ত দিক থেকেই ব্যাপক বদল ঘটেছে। আর এই বদলের সঙ্গে গভীরভাবে সংযোগ রয়েছে সময়ের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে বিশ শতকের পঞ্চাশের বছরগুলিতে লিখতে আসা গল্পকারদের নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু পঞ্চাশ-পরবর্তী ছোটোগল্প ও গল্পকারদের নিয়ে তেমন আলোচনা আমাদের নজরে আসেনি। কিন্তু এই সময়ে বাংলা ছোটোগল্প বৈভব ও ঐশ্বর্যে ভিন্ন মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছে। এই সময়-পর্বে লিখতে আসা নির্বাচিত লেখকদের চারটি করে গল্প নিয়ে বিন্যস্ত হবে এই আলোচনা। কিন্তু ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় আলোচনা সম্ভব হবে না। বিভিন্ন সংখ্যায় বিভিন্ন সময়ের গল্পকার উঠে আসবেন। এভাবেই বাংলা গল্পের অভিমুখকে চিহ্নিত করবার চেষ্টা করা হবে।)

    নারায়ণ মুখোপাধ্যায়

    নারায়ণ মুখোপাধ্যায় (১৩ এপ্রিল ১৯৩৭—১৮ অক্টোবর ২০১৩)-এর গল্প রচনার ধারাটি প্রথমাবধি স্বতন্ত্র। তিনি তাঁর মতো করে গল্প লেখেন। সেখানে আদি-মধ্য-অন্ত্য যুক্ত কোনও নিটোল কাহিনি থাকে না ; থাকে প্রগাঢ় এক অনুভূতি। সূক্ষ্ম ও অনুপুঙ্খ সেই অনুভূতি কবিতার মতো গভীর ও ব্যঞ্জনাময়। তাঁর মনন-নির্ভর গল্পগুলি উঠে আসে বোধ থেকে। পরতে পরতে উন্মোচিত হয় বোধের এক একটি স্তর। এই স্তর-উন্মোচনই তাঁর গল্প। সেই গল্প পাঠককে কখনও বিপন্ন করে, কখনও-বা আবিষ্ট। আবার কখনও হয়ে ওঠে অনন্ত শুশ্রূষা। ভাবায়-কাঁদায়, আমাদের বোধের ওপর জলের মতো অবিরল ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়। আমরা তাকে এড়াতে পারি না।

    বিশ শতকের ষাটের দশক থেকে গল্প লিখলেও তাঁর প্রথম গল্প-সংকলন প্রকাশিত হয় ১৯৮০-তে। পাঁচটি ছোটোগল্পের সংকলন তাঁর—‘সমকালের উপকথা’ (১৯৮০), ‘পা’ (১৯৮০), ‘ছুঁয়ে দেখো’ (১৯৮৯), ‘বোধ-ই বৃক্ষ’ (১৯৯৭) এবং ‘ক্ষেত্রসম্ভব’ (২০০৩)। এছাড়া গল্পসমগ্র ‘১৯৩৭’ (২০১১)। ১৯৩৭ তাঁর জন্ম সাল।  

    আশ্চর্য গদ্যে রচিত তাঁর গল্পের ব্যাখ্যা অবান্তর। পাঠকের মেজাজ ও মানসিকতা অনুযায়ী তার ব্যঞ্জনা বদলে যায়। তাঁর অধিকাংশ গল্পেই বহির্বাস্তব কিছুটা ম্লান। মানুষের অন্তর্লোকের রহস্যময়তা, গহীনতা প্রাধান্য পায় সেখানে। সেই রহস্যময় অনুষঙ্গ থেকে উঠে আসে তাঁর গল্পগুলি। 
     
    ডিসেম্বর, ২০০৩-এ প্রকাশিত নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘ক্ষেত্রসম্ভব’ গল্প সংকলনটি বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল ও দুর্লভ একটি গ্রন্থ। সচেতন পাঠককে হতচকিত করেছিল। গল্পের আখ্যান, ভাষা এরকম হতে পারে তা বাঙালি পাঠক আগে জানত না। ন-টি গল্পের প্রথম চারটি গল্পের আখ্যান গৃহীত হয়েছে রামায়ণ-মহাভারত থেকে। 

    প্রথম গল্প ‘পিতামহ’-র শুরু এরকম— “আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। বাতাসে আজ প্রগাঢ় অশ্রুবিন্দুর মতো জলকণার ভার। এক অনন্ত আয়ত আঁখির ন্যায় আকাশ যেন কোনও এক অতল বিষাদে দুই চক্ষু অশ্রুতে অশ্রুতে ভরিয়া রাখিয়াছে।...।” 

    এ-তো সাধারণ বর্ণনার ভাষা নয়, এ যেন বাণী। ধ্যানগম্ভীর এই উচ্চারণ মন্ত্রমুগ্ধ করে আমাদের। এই গল্পে দেখি শরশয্যায় শুয়ে আছেন ভীষ্ম। রাতের অন্ধকারে কুন্তী এসেছেন তাঁর কাছে। প্রতিদিন কুন্তী পিতামহর পা মুছিয়ে পরমুহূর্তে দেখেন— “আপন অশ্রুতে তাহা একেবারে সিক্ত, যেন ঈশ্বরের চরণ হইয়া উঠিয়াছে।” একদিন কুন্তী দেখলেন অদূরে পাতলা ধূসরকালো রক্ত বেয়ে একটা বন্য জন্তুর মতো দ্রুত এগিয়ে আসছে। তিনি ভয় পেয়ে যান। ভীষ্ম ভয় দূর করে বলেন, জন্তু নয়, মানুষ, দুর্যোধন। তার চারপায়ে হেঁটে আসার কারণ হিসেবে তিনি বলেন— “অন্তর্দাহ! অন্তর্দাহ! অন্তর্দাহ মানুষকে চার পায়ে হাঁটায়”। তিনি আরও জানান সে কাঁদতে আসছে। প্রতি রাতে এসে অঝোরে কাঁদে আর বলে— “ভারতবর্ষে কাহারও ব্যক্তিগত অধিকার নাই ; ইহা সর্বমানবের।” 

    গল্পটি শেষ হচ্ছে এভাবে— “কুন্তী দেখিলেন— তাঁহার সম্মুখে চিরকালের দুঃখ দুই কাঁধে লইয়া দাঁড়াইয়া দুর্যোধন। দুই চক্ষু তাহার অশ্রুতে ভাসিয়া যাইতেছে। শরশয্যার আবরণ ভেদ করিয়া, পিতামহ শালপ্রাংশু ভারতবর্ষের মতো উঠিয়া দাঁড়াইয়া এক হাতে কুন্তীর অন্য হাতে দুর্যোধনের অশ্রু মুছাইয়া দিয়া মনে মনে কহিলেন, ইহা কী আর মুছানো যায়!” 

    গল্পের চরিত্রের নামগুলিই মহাভারতের। বলা ভালো, মহাকবি বেদব্যাসের। আর বাকিটা নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের। তিনি মহাভারতের নতুন ব্যাখ্যা করেননি, নতুন মহাভারত লিখেছেন। তাই তো তিনি দুর্যোধনকে চার পায়ে হাঁটিয়েছেন। আর এই চার পায়ে হাঁটার কারণ তার ভগ্ন ঊরু নয়, অন্তর্দাহ। বেদব্যাসের আখ্যান অনুযায়ী ভীষ্ম আটান্ন দিন শরশয্যায় ছিলেন। সে সময় কৌরব-পাণ্ডব ছাড়াও কর্ণ-কৃষ্ণ-ব্যাস-নারদ-অসিতদেবল আরও বহু রাজা এসেছিল তাঁর কাছে। কিন্তু কুন্তী আসেননি। কুন্তী তো শুধু রমণী নন, একজন জননী। নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের নতুন মহাকাব্যে আমরা দেখলাম সেই জননীকে। 

    লেখার বিষয়ের সঙ্গে এ গল্পের ভাষার বিন্যাসও মহাকাব্যিক মূর্ছনা পেয়ে গেছে। উপমাও প্রচলিত পাঠাভ্যাসে নতুনমাত্রা নিয়ে এসেছে। “সর্বকালের ভারতবর্ষের ন্যায় ভীষ্ম”, “বাতাসে আজ প্রগাঢ় অশ্রুবিন্দুর মতো জলকণার ভার”, “এক আয়ত আঁখির ন্যায় আকাশ যেন কোনও এক অতল বিষাদে দুই চক্ষু অশ্রুতে ভরিয়া রাখিয়াছে”, “অস্তগামী সূর্য যেরূপ পশ্চিমাকাশে প্রণামের ভঙ্গিতে ঢলিয়া পড়ে, সেইরূপ কুন্তীও খুল্লতাতর চরণে প্রণাম করিয়া”... এরকম বহু উপমাই উদ্ধৃত করা যায়। 

    এ গল্পের এক জায়গায় লেখক বলেছেন— “কবি! জগতে অন্য কেহ যাহা পারে না, একজন কবি তাহা পারেন।” আর এক জায়গায় বলছেন— “মহাকবি জানেন। তিনি সবই জানেন। কিন্তু তাঁহাকে সবকিছু খোলাখুলি প্রকাশ করিতে নাই, আভাসটুকু রাখিয়া যান মাত্র।” এতো শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে অমোঘ উচ্চারণ। কবি নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যভাবনা। এভাবেই একজন কবি, একজন মরমী দার্শনিক পা টিপে টিপে গল্পের ভিতরে ঢুকে পড়েছেন। কিছু গভীর ও গহন কথা বলে পাঠকের অজান্তেই ফিরে গেছেন আবার। তাই কারও কারও এই গল্প সংকলনকে দর্শনের গ্রন্থও মনে হয়।     

    পুরাণ এবং লোকভাবনা অনুযায়ী চাঁদ পুরুষ চরিত্র। আর নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘পাণ্ডুর চাঁদ’ গল্পে সে যুবতী নারী, মহাভারতের পাণ্ডুর প্রেমিকা। চাঁদের যা সৌন্দর্য তা তো যুবতী নারীর-ই। তাই লেখকের চিন্তায় সে সুন্দরী রমণী। অথচ সে স্বামী পেল না। “কোনও কোনও রূপ আছে যাহার খুব কাছে যাওয়া যায় না। একটি স্বভাবজ দূরত্ব আপনা হইতেই রচিত হয়। ইহার পর্যাপ্ত বৈভব ইহার রহস্য। ইহার মায়া। এই-ই নিয়মিত ইহার—স্বামী চাইতে দেয় না। প্রেমিক তাহাকে কামনা করে, কিন্তু কাছে যাইতে দেয় না। নয়নে নয়ন মিলিয়া যাইবার পরেও না।”

    পাণ্ডুর মৃত্যুর পর কুন্তী নিদ্রাহীন। রাতে মাঝে মাঝে “ঈশ্বরের দেহের ন্যায় প্রকৃতির নির্জনতায় এসে বসেন। চাঁদকে ডেকে গল্প করেন। চাঁদ ও কুন্তী দুই সপত্নী (?)-র অসূয়া-ঈর্ষা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে গল্পে। সুযোগ পেলেই উভয়েই উভয়কে খোঁচা দেবার চেষ্টা করেন। চাঁদকে কুন্তী পান সাজতে বললে তিনি বলেন “মহারাজ পাণ্ডু এক-একদিন কত যে পান খাইতেন!” অথচ স্বামীর পান খাওয়ার কথা কুন্তীর অজানা। বিস্মিত কুন্তী খোঁচা দিয়ে বললেন— “পান কি আর নিজ নারী সাজিয়া দিলে নেশা হয়।”

    পাণ্ডুর প্রেমিক হৃদয়ের বেদনা মূর্ত হয়েছে এ গল্পে। পাণ্ডু যে নিজ নারীর কাছেও প্রতারিত তার ইঙ্গিত আছে। তিনি বিশ্বাস করতে ভালোবাসতেন। “ইহা যে মৃত্যুর কারণ হইতে পারে, এই ক্ষত্রিয়বোধ তাঁহার ছিল না। তাঁহার ন্যায় সরল বালক লইয়া মহাকবি কী করিবেন, ভাবিয়া না পাইয়া, যাহা করিলেন তাহা চিরকালীন অবগুণ্ঠনে ঢাকা রহিয়া গেল।”

    এই গল্পে দুটিমাত্র লাইনে বিদুরের প্রসঙ্গ এনে কুন্তীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গভীরতার ইঙ্গিত দিয়েছেন লেখক। রাতে কুন্তী ঘর ছেড়ে নির্জন প্রকৃতির মধ্যে এসে বসলে, মাঝে মাঝে বিদুর এসে পাশে বসতেন। কুন্তী তাঁর আঁচল পেতে দিলে বিদুর খুশি হতেন। লেখক বিদুরের মুখে বসিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের গান— “কাঁদালে তুমি মোরে...”। বিদুর এ প্রসঙ্গে বলেছেন— “বহুদিন পর বেদব্যাসের উত্তরপুরুষ ইহাকে সম্পূর্ণ করিবেন।” বলা বাহুল্য এখানে রবীন্দ্রনাথকেই ইঙ্গিত করেছেন লেখক।

    রামায়ণ-মহাভারতের মহাকবিরা আভাসে-ইঙ্গিতে যে কথা বলেছেন অথবা বলেননি, তাঁদের উত্তরপুরুষ নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের হাতে তা পূর্ণতা পেয়েছে। মহাকাব্যের খলচরিত্রগুলিও তাঁর হাতে মহৎ হয়ে উঠেছে। এই গল্পগুলির আবেদন চিরন্তন, সময়ের সঙ্গে তা ফুরিয়ে যাবে না। 

    নারায়ণ মুখোপাধ্যায় আশৈশব রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণের ভাবনায় মগ্ন থেকেছেন। এই গল্প লেখার অনেক আগে থেকেই তাঁর ভাবনালোকে চলেছে মিথ-কিংবদন্তীর এহেন পুনর্নির্মান। আত্মজীবনী ‘অনুধ্যান’-এ এই প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে এসেছে বারবার। 

    “সেই ঘন বর্ষার রাতে আমি মনে মনে এক অদ্ভুত রামায়ণ রচনা করতাম। সে রামায়ণের সঙ্গে মহাকবির মহাকাব্যের তেমন কোনও মিল থাকা তো সম্ভব নয়, থাকতও না। তা ছিল আমারই অ-লিখিত কাব্য...

    সীতা কহে এই বনে রাক্ষসের ঘর।
    কোথায়, দেখাও মোরে, ও আমার বর।।
    এই যে গাছেরে দেখি দেখি লতাপাতা।
    একবারও শুনি না তো রাক্ষসের কথা।।
    কী কও লক্ষ্মণ ভাই, দেখাও রাক্ষস।
    ঘুমাতে না পারি রাত্রে শুনি খস খস।।

    আসলে, রামায়ণ-মহাভারত-মনসামঙ্গল এবং ভূতের গল্প, পরির গল্প, পাতালপুরীর গল্প এবং আঞ্চলিক রহস্যময় কাহিনি শোনার পরই মন থেকে তারা ধুয়ে মুছে যেত না। প্রকৃতিজগতের এমন একটা ঘনত্ব ছিল যে তাদের সত্য সত্যই একবার দেখতে চাইত মন। মন দেখত : বেহুলা পান সাজছেন শ্বশুর চাঁদ সদাগরের জন্যে। কী সবুজ নিটোল পান ; কত প্রকারের মশলা! শ্বশুর গল্প করছেন, সাগরের গল্প। সেই গল্প শুনতে শুনতে অসতর্কে জাঁতিতে আঙুল কেটে ফেলেছেন বেহুলা। কী রক্ত কী রক্ত! পিতার মতো করে কোলে বসিয়ে চাঁদ বেহুলার কাটা আঙুলে চুন লাগিয়ে দিচ্ছেন। সনকার দুই চোখে জল আর ধরে না বেহুলার আঙুল কেটে রক্তপাতে।

    না, কোনো যোগ থাকত না বাস্তবতার সঙ্গে। বিয়ের রাতেই তো বিধবা বেহুলা। শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে ঘর করবার সুযোগই তো আসেনি তার জীবনে। সে কবে, কখন চাঁদকে পান সেজে দেবার সুযোগ পেল, এসব কোনো কথাই কল্পনার কাছে কিছু নয়। রামায়ন-মহাভারত-মনসামঙ্গল— এই তিন মহাকাব্য আমাদের শৈশবকে প্রাচুর্যে ভরিয়ে রেখেছিল। আমার তো এখন একটা কথা খুবই মনে হয়, তা হল, এই তিন মহাকাব্য কি মায়ের স্থান গ্রহণ করেছিল! 

    কত কী কত কিছু ভাবতাম এসব নিয়ে! মনে হত— যুধিষ্ঠিরকে দুপুরে ভাত বেড়ে দিয়েছেন কুন্তী। অন্য চার ভাই ভাত নিয়ে বসে আছে, দাদা ভাত মাখবে আলুভাতে ও ঘি দিয়ে। সেই মাখাভাত চার ভাই একমুঠো করে পাবে সবার আগে এবং এভাবেই শুরু হবে মধ্যাহ্নভোজনপর্ব। মাটির দাওয়া। মধুর দক্ষিণাবাতাস আর শান্ত সবুজ চারদিক— এর মধ্যে একটা রাজপরিবার কেন খেতে বসবে, যাঁরা তখনও বনগমন করেনি, এর কোনো যুক্তি নেই।” 

    নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের গল্পে সবসময় বাস্তব যুক্তি খুঁজলে হতাশ হতে হবে। শুধু পুরাণ অনুষঙ্গে লেখা গল্পে নয়, তাঁর কোনও গল্পেই বহির্বাস্তব গুরুত্ব পায়নি। প্রাধান্য পেয়েছে অন্তর্বাস্তব এবং কল্পনা। গল্পগুলিতে মায়াবি ও রহস্যময় আবহ তৈরি হয়েছে এই লেখকের আত্মদর্শন ও বোধের প্রগাঢ়তায়। সমগ্র গল্প নয়, গল্পের এক-একটি অংশ, কখনও-বা এক-একটি লাইন বা একটি শব্দ— তার অপার ব্যঞ্জনা ও রহস্য নিয়ে পাঠককে ভাবায়। সেই ভাবনার বৃত্ত ভেঙে সহজে নিষ্কৃতি পান না দীক্ষিত পাঠক। তাই বহুদিন পর্যন্ত পাঠকের চৈতন্যে এবং অস্তিত্বে মিশে থাকে গল্পগুলির পাঠ-অনুভূতি।

    যেমন ‘বৃষভ’ গল্পটি। রক্তের সম্পর্কহীন তিন জা সম্পর্কিত নারীর সংসারে লালিত বছর পঁয়তিরিশের এক স্বভাব বালক একদিন বুঝল— “এই জগতে গরুই একমাত্র প্রাণী যাহার সত্তায় কোথাও চতুরতা নাই এবং এই অর্থে আত্মার মুক্তি।” স্কুলছাড়া গরুতে নিমগ্ন এই বালকটিকে স্নান করিয়ে দেওয়া হয়, খাইয়ে দেওয়া হয়। তার যৌনানুভূতি দেখা যায়নি। একদিন-ই শুধু মেজ জা দেখেছিল— “বালকের পুরুষাঙ্গ হইতে গলিত হীরকের মতো শুক্র নির্গত হইতে এবং তাহা গড়াইবার কালে বালকের মধ্যে ধীর স্থির শান্ত সমাহিত এক দুর্জ্ঞেয় পুরুষের দ্যুতিময় প্রকাশ।”

    তারপর বালক বলে “বাঁশি বাজিল।”  
    আপাতভাবে একটি বালকের যৌবনোদ্গমের এই গল্পে পুরাণের অনুস্মৃতি রয়েছে। এই রূপকধর্মী গল্পেও তিনি সময় সচেতন। বালকটিকে রেখে পাকিস্তান চলে যাবার সময় তার বাবাকে বলতে শুনি— “সংখ্যালঘু না হইলে সভ্যতার স্বরূপ চেনা যায় না।” 

    এই ছোট্ট একটি মন্তব্যে বোঝা যায় সময় ও রাজনীতি সচেতন লেখকের অবস্থান ও মানসিকতা। নারায়ণ মুখোপাধ্যায় তাঁর লেখায় সমসময়কেও ছুঁয়ে থাকেন। কিন্তু শুধু সমসময়ের চৌহদ্দিতে তা আটকে থাকে না। সমকালকে আবহমানেরই অনিবার্য অঙ্গ হিসেবে দেখেন তিনি।

    লেখকের এই সময় সচেতনতার স্বাক্ষর ‘শ্যামবাবু’ গল্পটি। শ্যামবাবু আসলে একটি ফোটো। কার ফোটো কেউ জানে না। বাড়ি বদলের সময় অন্যান্য জিনিসপত্রের মতো এই ফোটোটিকেও নিয়ে যাওয়া হয়। পারিবারিক যে কোনও উৎসবে অনুষ্ঠানে, শাদ্ধে, পূজায় চন্দনের ফোঁটা পড়ে শ্যামবাবুর ফোটোয়। অথচ কেন মানুষটি সম্মানীয় তা কেউ-ই জানে না।  

    আধুনিক মানুষের যান্ত্রিকতা ও বিভাজিত সত্তার চরম রূপটি প্রকাশিত এই গল্পে। আমাদের চমকে উঠতে হয় যখন দেখি, দু-কাপ চা এনে এক কাপ লেখক নেন আর এক কাপ চা রাখেন শ্যামবাবুর ফোটোর নীচে। নির্বিকার শ্যামবাবু তখনও স্থির। নিবিড় নির্জন এই স্থিরতা। এই ফোটোতে যেন আবহমানকে ধরা রয়েছে। একটিও কথা না বলে শ্যামবাবু বাঙ্‌ময় এ গল্পে। 


    নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের গল্পে বড়ো জায়গা জুড়ে থাকে নৈঃশব্দ্য। কখনও-বা তা বিষয় হয়ে ওঠে। আর গল্পের পাঠক্রিয়ায় বোঝা যায় বাঙ্‌ময় সেই নীরবতার অপার ঐশ্বর্য। সাধারণ ঘটনা দিয়ে যে গল্পের শুরু হল তা শেষ পর্যন্ত অন্য এক মাত্রায় উন্নীত হয়ে গেল। শুধু শোনার চাকরি করা একটা সাধারণ মানুষ কোনও কিছু না বলেও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারল। নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের মুনশিয়ানা এখানেই।   

    নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের গল্পে এক ধরনের আলো-আঁধার ক্রিয়া করে। জীবন-রহস্যের গহন থেকে উঠে আসা তাঁর গল্প আমাদের চেতনাকে আচ্ছন্ন করে। কখনও বা সুররিয়ালিস্টিক সিনেমার মতো দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজানো এই গল্পের পাঠক্রিয়ায় বুনুয়েল বা তারকোভস্কির ছবি মনে পড়ে কারও কারও। আবার কখনও মনে হয় এক-একটি কবিতাই পড়ছি যেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্রকে ছাপিয়ে, কবিতাকে ছাপিয়ে তা হয়ে ওঠে ছোটগল্প। সেই গল্পের আঙ্গিকে এক ধরনের দেশজতা আছে। ছোটোগল্পের প্রচলিত ধারণাকে অতিক্রম করে গেছে এই গল্প। এভাবেই এগিয়ে চলে একটি ভাষার সাহিত্য। বাংলা ছোটোগল্পকে সমৃদ্ধ করেছে নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের অতি বিশিষ্ট গল্পগুলি। আর এই গল্পগুলি পাঠককে শুধু গল্পপাঠের আনন্দই দেয় না, কখনও শিহরিত করে, কখনও আচ্ছন্ন করে, আবার কখনও-বা তাকে স্রষ্টাও করে তোলে।   

    শুধু গল্প নয়, তাঁর গদ্য, এমনকী আত্মজীবনীর ভাষাও একাধারে কাব্যময়, মায়াবী, বোধ ও দার্শনিকতায় মোড়া। সন-তারিখের প্রামাণ্যতা সেখানে নেই। তাঁর লেখক জীবনের সাফল্য ব্যর্থতার প্রসঙ্গও পাওয়া যাবে না সেখানে। নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘অনুধ্যান’-কে আত্মজীবনী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তা আত্মচরিতের থেকে বেশি কিছু। একে আত্মগত স্মৃতিকথন বলা অধিকতর সঙ্গত। নিজের জীবন— বেঁচে থাকা— স্মৃতি সম্পর্কে তিনি বলছেন— “আয়ু থেকে জীবনকে আমি অনেকটাই তো বের করে আনতে পেরেছি। আয়ুকে বলেছি : আপনি দীপ-টিপ নিবিয়ে অনন্ত নিদ্রা যান। আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আমারই ‘অসীমে প্রাণমন লয়ে’ থাকব। এ আমার নিজের থাকা। এর কোনো দাগ নেই, স্মৃতি থাকবে না, বন্ধু থাকবে, যেন খেয়া। কোনো কারণ, কোনো উদ্দেশ্য, কোনো তাগিদ নয়— আমি আত্মার কানে কানে কওয়া অস্পষ্ট কিছু কথার প্রকৃত অর্থ না বুঝতে পেরে ভেবেছি— বুঝি আমার স্মৃতি, নিজের জীবনের স্মৃতি আমি নিজেই শুনতে চাইছি।” 

    ধ্যানলোকে নিজেই শুনেছেন নিজের কথা। নিজের সঙ্গে নিজের সংলাপ। এরই নাম ‘অনুধ্যান’। এখানে লেখকের প্রাত্যহিক ঘটনা প্রবাহ প্রাধান্য পায়নি। বিশেষ কোনও চরিত্রও নয়। তবুও ভিড় করে অজস্র মুখ। স্মৃতির সরণী বেয়ে উঠে আসা মুখশ্রীকে লেখক নিজেই ফিরে ফিরে দেখেন। মনের মাধুরী মিশিয়ে কথায় কথায় আঁকা সেই সব চরিত্র। খুঁজতে চান মানুষের ভিতরের এক অচিন মানুষকে। জীবন-অভিজ্ঞতার সূত্রেই তদ্‌গত এবং নির্জন তাঁর সেই অন্বেষণ। 

    “এখন খোঁজ-এ পেয়েছে আমাকে। কোনোকিছুই অ-সার হয় না। এই প্রকার অবস্থা যাকে বীভৎস বলে সবাই; আমার যেন মনে হয় এসব মিথ্যা। এসব ছলনা। শুধু ভয় দেখানোর একটা চলমান চলচ্চিত্র। একে সিরিয়াল ছাড়া কিছুই মনে হয় না।

    আবার, এই যে সিরিয়াল, যারা দেখে, আমার সংসারের লোকেরাও দেখে, তাদের মনে এর এফেক্ট কই, দেখি না তো! একটু দুর্বৃত্ত স্বভাবের হবে তারা। কিন্তু, দেখতে পাই, একদিন যে রমণী ভারতীয় নারীত্ব তুচ্ছজ্ঞান করে কিছুটা পাশ্চাত্য স্বভাব ধারণ করে প্রতিহিংসাপরায়ণ, হিংস্র প্রকৃতির বিলোপনীতির পথে আত্মধ্বংসের দিকে ছুটেছিল,— আজ সে শিশির যেমন করে পত্ররাজিতে নিজেকে ঢেলে দেয় নীরব রাত্রির বসুন্ধরায়, সেইভাবে, কী একটা মুদ্রায়, নিভৃতে কিছু একটা করছে। এটি অনুশীলন পর্ব। অনুশীলনপর্বে শব্দ করতে নেই। নৈঃশব্দ্য ধারণ পত্ররাজির আত্মার ধর্ম। মানুষ পারে না তেমন।  

    আমার মনে পড়ে, এমন করে মনে পড়ে যেন আমি নিজের চোখে দেখি— কৃষ্ণকে। কুরুক্ষেত্র-টেত্র সব মিটে গেলে কৃষ্ণের এই নৈঃশব্দ্যধারণপর্ব শুরু হল, অগোচরে। এমনকী, যাঁর অবলোকন থেকে জগৎ সংসারের একটি রেণুকারও অগোচর কিছু নেই,— সেই মহাকবিরও অগোচরে। সেই, সে-ই অগোচরে বসে নৈঃশব্দ্য ধারণ করছেন কৃষ্ণ। চতুর্দিকে, প্রথমে পেলেন দুর্গন্ধ।

    যে যত বড় লোভী তার মৃতদেহের গন্ধ তত তীব্র, তত বমন উদ্রেককারী। একটা যেন হা হা হা। অথচ যার মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁর সাধের কদম্ববৃক্ষ নির্বিকার। তার বাঁশি নীরব হলেও, অন্য কী একটা সুর যেন গাইছে যার নিথর বাণী অনেকটা নৈবেদ্য বুঝি-বা। 

    কেউ তাঁর মনের খবর জানলে খণ্ড জীবন অখণ্ডের পানে ধায় না। তাই জানিয়ে দিলেন তিনি—কে এক আধুনিকতার ব্যাধ তাঁকে আড়ষ্ট করে দিয়েছে। জানল সবাই— নাই সে পথদ্রষ্টা নাই। কিছু করবার নেই— কাঁদালে তুমি মোরে— এ হল আত্মোপলব্ধির জানান।

    দেখলেন কৃষ্ণ অঙ্কুরের মতো নির্বাপণপর্বের শ্বেত স্ফটিক উদ্ভাসের একেবারে সংগোপনে প্রাণ উঠছে জেগে। তার কাঁপন এমন ছাঁদে যে কাঁপন নিজেই কিছু টের পায় না। শ্যামল হয়ে থাকা তাঁর শুভ্র শ্বেত ধ্বনিবিহীন শুদ্ধ কান্না যেন-বা।”

    চমৎকার গদ্য, ব্যঞ্জনা, প্রসাদগুণ, আখ্যান, চরিত্র সব বাদ দিলেও নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের গল্প-আত্মজীবনী— সমগ্র রচনায় যা পড়ে থাকে তা হল দর্শন। তাঁর সমগ্র রচনায় নিহিত রয়েছে এক ম্যাজিক্যাল ইউনিভার্স-এর অতল জগত। এখানেই তিনি স্বমহীম। তিনি বাস্তববাদী নন কোনোকালেই। বরং তিনি বিশ্বাস করেন যে—“যা ঘটছে তার সবই মিথ্যা। মিথ্যার কি এত বড় ধৃষ্টতা হতে পারে যে তা সত্যকার জীবনে অতিথি হয়েও কাটাতে পারে!”(‘অনুধ্যান’)  তিনি যে সত্যে বিশ্বাস করেন তা চোখে দেখার সত্য নয়। এই বোধ এবং চেতনার সত্যতাই তাঁর গল্প এবং আত্মজীবনীর বড় সম্পদ। গভীর বিশ্বাস থেকেই উঠে আসে বলে তাঁর রচনাগুলি পড়তে পড়তে আমরাও কোন্‌ গহনে তলিয়ে যাই। শুধু রচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা যায় না আর। তাঁকে পড়তে গিয়ে আমরা যেন নিজেকেই পড়ে ফেলি। এ এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। আশ্চর্য অনুভব। এই ধ্রুপদী অনুভবই আমাদের ভবিষ্যতের অন্নজল।

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
     


  • প্রকৃতির মিউজিক থেরাপি /নিশান চ্যাটার্জী
  • জীবনের গভীরে বিজ্ঞান-৭

    প্রকৃতির মিউজিক থেরাপি

    নিশান চ্যাটার্জী


    কথায় বলে সঙ্গীত মনের সব যন্ত্রণা দূর করে দিতে পারে। তাই সঙ্গীতকে অনেকেই "pain killer"  হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অনেক  ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যবস্থায় "মিউজিক থেরাপি" নামক পদ্ধতিরও প্রচলন রয়েছে। এই "থেরাপি" সাধারণত অবসাদগ্রস্ত রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু জানেন কি এই সঙ্গীত বা মিউজিক সম্পর্কে ধারণা মানুষ কোথা থেকে পেয়েছে? অর্থাৎ আমাদের প্রকৃত সঙ্গীত শিক্ষক কে? যদি না জেনে থাকেন তাহলে তার উত্তর হলো পাখি। হ্যাঁ, অনেকের মতে পাখিদের কাছ থেকেই মানুষ গান গাওয়ার প্রেরণা লাভ করেছিল। কারণ বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মানুষের যে সকল পূর্বপুরুষ রয়েছে যেমন অষ্ট্রালোপিথেকাস প্রভৃতিদের মিউজিক সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। 

    ধ্বনি বিশারদ স্যার মিলমস রেসের মতে-"  মানুষের ভোকাল কর্ডে এমন কোনো জন্মগত বা উৎপত্তিগত বৈশিষ্ট্য নেই যা থেকে বলা যেতে পারে মানুষ একটি জন্মগত গাইয়ে প্রাণী"। পাখিদের এই বৈশিষ্ট্য জন্মগত। বিভিন্ন জাতের পাখিদের নিজস্ব ডাক আছে এবং তা বিভিন্ন সুর সমৃদ্ধ। কোনো মানবশিশু জন্মেই, পাখিদের মতো নির্দিষ্ট সুরে গাইতে পারেনা। কষ্ট করে গান শিখতে হয়। ভোকাল কর্ডের বিভিন্নতার জন্য অনেকে চেষ্টা করেও গান শিখে উঠতে পারেনা। পাখিরা তাদের এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে নানা ধরনের মনোভাব ব্যক্ত করে। এটাকে আমরা পাখিদের "কথা বলা"ও বলতে পারি। এই কথা বলার পদ্ধতি মোটামুটি ভাবে দু-ধরনের। কাক, শালিক প্রভৃতি পাখি, যারা একসাথে দলবেঁধে বসবাস করে, তারা অপেক্ষাকৃত ছোট জায়গার মধ্যেই নিজদের কে আবদ্ধ রাখে। তারা শুধুমাত্র ডাকে কিন্তু তাদের ডাকে সুর এবং ছন্দের তেমন খোঁজ মেলেনা। একে বলা হয় " নন্ মিউজিক্যাল কল"। এর মাধ্যমে তারা মনের ক্ষোভ, প্রেম, আনন্দ, সতর্কীকরণ বার্তা, উড়ে চলার নির্দেশ প্রভৃতি আদান-প্রদান করে থাকে। 

     আবার কোকিল, পিউ-কাহা, ভীমরাজ প্রভৃতি পাখি অতন্ত্য সুরেলা গান করে, যাকে বলে "মিউজিক্যাল কল"। এই গান কয়েক সেকেন্ড থেকে এক মিনিট স্থায়ী হতে পারে এবং নির্দিষ্ট ছন্দে বারবার শোনা যায়। এই ধরনের গায়ক পাখিদের এলাকা সাধারণত অনেক বড় হয়ে থাকে। এলাকার দখল দারিত্ব এবং আগন্তুক পাখিদের সতর্ক করতে এই গান ব্যবহৃত হয়। আবার সেলুলয়েডে যেমন গানের দৃশ্যে নায়ক এবং নায়িকা এক এক লাইন করে গান গেয়ে তাদের প্রেমের বার্তা প্রেরণ করে তেমনি প্রেম স্পন্দন বোঝাতে দুই লাইন গানের প্রথম লাইনটি যদি একটি পাখি গায়, দ্বিতীয় লাইন ভেসে আসে অন্য পাখির তরফ থেকে। যদি দ্বিতীয় পাখিটি কাছাকাছি না থাকে তাহলে প্রথম পাখিটিই দুটি লাইন গেয়ে তার সঙ্গীত সম্পন্ন করে। আবার পাখি যে শুধু একরকম সুরেই ডাকে তা কিন্তু ঠিক নয়। কাকেদের ক্ষেত্রে প্রায় সাত রকম স্বর রেকর্ড করা হয়েছে। উত্তেজনায় তারস্বরে চিৎকার করে, খিদের সময় প্রার্থনা করে ডাকে, আবার বিশ্রামরত অবস্থায় শান্ত অথচ গভীরভাবে ডাকে। 

    পাখিদের গান বিশ্লেষণ করার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রটিকে বলা হয় সাউন্ড স্পেক্টোগ্রাম। এই যন্ত্রটির মাধ্যমে পাখিদের গানের ভাষার তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে এও দেখা গেছে যে বিভিন্ন অঞ্চল ভেদে পাখিদের ভাষা বদলে যায়। অনেক সময় পাখি নিজের স্বর ছাড়াও অন্য পাখিদের স্বর ও নকল করে। আবার কাকাতুয়া  প্রভৃতি পাখি যে মানুষের ভাষায় কথা বলে তা কিন্তু এরা না বুঝেই বলে। এইসব পাখি যদি কোনো কারণে কালা হয়ে যায় তাহলে তাদের কথা বলার ও গান করার ইচ্ছেও নষ্ট হয়ে যায়। তবে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে একথা বলা যায় যে এদের প্রাথমিক গান গাওয়ার ক্ষমতাটুকুই জন্মগত বাদ বাকি সুরের সৌন্দর্য তাদের শিখতে হয় বাবা-মা বা অন্য পাখিদের কাছ থেকে। তাই আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত খাঁচায় বন্দী করে পাখিদের দৃশ্যপট সৌন্দর্য আহরণ অপেক্ষা, প্রকৃতির বুকে তাদের শিখে আসা নতুন নতুন গান যদি আমরা শুনি এবং তা যাতে শোনা যায় সেই পরিবেশ রক্ষা করার চেষ্টা করি তাহলে তা চিরকালীন অবসাদ নিরাময়ের উপাদান হিসেবে আমরাই ফেরত পাবো।

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
     


  • ভূতেদের কথা /বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়

  • ভূতেদের কথা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়


    ভূতের দেশে

    দিনের বেলায় আজব ছলায় লুকায় ওরা ঝাড় ঝোপেতে,
    রাতের বেলায় প্রেতের মেলায় নামে সবাই এক rope-এতে।
    দেখতে পেলে বন্ধু স্বজন,
    এক লাফেতেই যায় যে তখন
    কালো মেঘের  ছায়ার  মত আসবে ওরা রোদ জলেতে।,
    ভয় যদি পাও পালিয়ে যাবে এক নিমেষের এক পলেতে।।

     অশরীরী মূর্তি ওরা নেমে আসে  রাত-আঁধারে,
    খুঁজে খুঁজে ফেরে ওরা রাত  আঁধারে  হয়তো কারে,
    ভালোবাসার  পরশ দিয়ে ,
    নাও তোমাদের মন সাজিয়ে,
    লাল গোলাপের পাপড়ি ছুঁড়ে ডাকো এ সব দুর্ভাগারে
    মিথ্যে  ভয়ে পালিও  নাগো  হারিয়ে তোমার সব বিচারে।।

    মায়াবিনী প্রেতিনি সব আসবে এসে গান শোনাবে,
     খট খটি  সে তবলা নিয়ে  তোমাদেরও তাল গোনাবে ,
    দেখে শুনে পাও  যদি ভয় ,
    মামদো জিনের গাও তবে জয়,
    তখন ওরা আসবে কাছে উল দিয়ে সোয়েটার বোনাবে ,
      ঠিক ঠাক সব করো যদি তখন কি আর ফের ভোগাবে?



    ভূতের ছড়া

    স্বপ্নে সেদিন/ভূতের দেশে/হঠাৎ গেলাম/চলে ,
    আজগুবি নয়/স্বপ্ন জেনো/সত্যি কথাই/বলে,
    অনেক ভূতের/ ছানা দেখি /সেথায় খেলা/ করে,
    কেউ ছোটে আর/কেউবা লাফায়/কেউ বা লড়াই/করে।।

    ডান, ডাইনি,জিন, মামদো, অনেক ভূতের ছানা,
    খেলার মাঠে খেলে সবাই কেউ করে না মানা ,
    জলভূতের এক পোলা সেতো আমায় ডেকে নিলো,
    কি যেন এক বলের মতো আমার হাতে দিলো ।।

    বললো, "এ বল ছোঁড় দেখি তুই জটে বুড়ির দিকে,
    দেখবো কেমন নিশানা তোর মারতো বুড়িটিকে",
    দেখি চেয়ে বল নয় এটা মড়ার মাথার খুলি,
    "বাপরে" বলে জোরসে ছুটি ব'লে রামের বুলি ।।

    ধপাস করে আছড়ে পড়ি উঁচু সে খাট হতে,
    আর যাবো না ভূতের দেশে স্বপ্নে কোনও মতে,
    ভূতের দেশের কষ্ট অনেক বুঝেছি ঠিক আমি,
    বুঝেছি ভাই মরার চেয়ে বাঁচা অনেক দামী ।।



    মামদোর কান্না

    তেল গড়িয়ার জলার ধারে একলা আমি থাকি,
    রাত্রি হলে হাওয়ার সুরে লোক জনেদের ডাকি।
    হোতার সাঁকোর পাথের বাঁকে ,
    বন্ধু আমার লুকিয়ে থাকে ,
    আমার ডাকের আওয়াজ টা তার কানেই ঢোকে নাকি ?
    আমি শুধুই   ভাবতে থাকি কতো রাত আর  বাকি ।।

    দিনের বেলায় ঝাপসা চোখে যায় না কিছু দেখা,
    শিয়াল ভুতও কোথায় পালায়  আমায় ফেলে একা,
    জটে বুড়ি আসে তখন ,
    আদর করে ইচ্ছে মতন,
    বলে আমায়," কাঁদিস যদি যায় কি ঘরে টেকা ?"
    আমি বলি, "ও  আই মা লাগছে বড়ো একা ।।

    আমার মা'তো অনেক আগে স্বর্গে গেছে চলে,
    সেই খানে সে সবার কাছে আমার কথাই বলে ।
    কান্না কাটি করেও বুঝি ,
    তাইতো আমি মাকেই খুঁজি,
    চোখ থাকলে দু চোখ আমার উঠতো ভরে জলে,
    মামদো আমি শরীর টা নাই কাঁদবো না তা বলে ?"

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
     


  • যেতে যেতে পথে-২৬/রোশেনারা খান
  • যেতে যেতে পথে

    রোশেনারা খান

    পর্ব ২৬

    বাবার মৃত্যুর দিন ১৫ পরে যথারীতি শাশুড়িমাকে দেখতে গেলাম। উনি আমার বাবা-মা কেমন আছেন জানতে চাইলেন। আমি তখন কাঁদতে কাঁদতে বাবার চলে যাওয়ার কথা বললাম এবং এও বললাম আমাকে কয়েকদিন আগে যেতে দিলে বাবাকে জীবিত অবস্থায় দেখতে পেতাম। সব কথা শুনে উনি ছেলের ওপর খুব রেগে গেলেন, পরক্ষণেই পরম মমতায় আমার মাথায় হাত রেখে চোখ মুছতে  মুছতে বললেন, ‘কী করবি মা? মেয়েদের পরের ঘরে অনেক কিছুই যে বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হয়। এই একই গ্রামের মেয়ে ও বৌ হওয়া সত্ত্বেও গ্রাম্য বিবাদের কারণে আমিও আমার মায়ের মৃত্যুর সময় তাঁর শিয়রের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে  পারিনি। সেদিনের সেই বেদনাঘন মুহূর্ত থেকে সব ব্যবধান ঘুচে গিয়ে আমরা  অসমবয়স্ক ও অসম মানসিকতার দুটি নারী পরস্পরের সমব্যথী হয়ে উঠলাম। 

          সময়ের সাথে অনেককিছুই বদলে যায়, বদলে যায় পরিস্থিতি,বদলে যায় মানসিকতা ও চিন্তাধারা। আমার শাশুড়িমাও এখন অনেককিছু বুঝতে শিখেছেন। আমিও অনেককিছু মানিয়ে নিতে শিখেচ্ছি। যে সময় আমাদের কাছে আসতে দেয়নি, সেই সময়ই আমাদের দু’জনকে অনেকটাই মনের কাছাকাছি এনে দেয়।        ধিরে ধিরে খুলে যায় তাঁর মনের গোপন কুঠু্রির মরচে ধরা দরজা। জীবনের এই শেষবেলা পর্যন্ত যেখানে লুকোনো ছিল এক গ্রাম্য বধূর, এক অসহায় মায়ের লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও অপমানের করুণ কাহিনী। সেই সময়ে কেশপুর থানার অন্তর্গত  আমার শ্বশুরবাড়ির গ্রামের মোল্লাতান্ত্রিক সমাজের রীতি-নিয়ম ছিল অনেকটা পাকিস্তান, আফগানিস্তান ইত্যাদি ইসলামিক রাষ্ট্রের মত। সামান্য কারণে তালাক, পুরুষের বহুবিবাহ, স্ত্রী-পীড়ন ইত্যাদি ছিল খুব সবাভাবিক ঘটনা। গত শতাব্দীর ৭ এর দশকেও আমি একজন পুরুষকে একসঙ্গে তিনজন স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করতে।

        মোল্লাদের ফতোয়া অনুযায়ী গানবাজনা, সিনেমা-থিয়েটার, এক কথায় বিনোদন মানেই ‘হারাম’। তাই পুরুষেরা ইন্দ্রিয় সুখের উপকরণ হিসেবে নারী  শরীরকেই বুঝত। তবে পাপের পথে নয়, কামার্ত পুরুষ যাতে ব্যাভিচারী না হয়  সেই জন্যই তার একাধিক বিয়ের অধিকার রয়েছে। স্ত্রীর ব্যভিচারী হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সে কী করবে? ধর্মে সে বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই। বরং স্বামীর ডাকে সাড়া না দিলে ফেরেস্তারা(দেবদূত)সারারাত ধরে অভিশাপ দেবে, দোজখের আজাব ভোগ করতে হবে, এই ভয় দেখানো হয়। শাশুড়ি মায়ের ক্ষেত্রেও তার খুব একটা ব্যতিক্রম ঘটেনি। সারাদিন সংসারে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আর দু’বছর অন্তর সন্তানের জন্ম দেওয়া, এভাবে যে কত মাস, কত বছর কেটে গেছে, তা তিনি নিজেই ভুলে চগেছেন। ভুলে গেছেন নিজেকে। জানেন না কোন সন্তানের কত বয়স?  কোন মাসে জন্মেছে? সারাটা জীবনধরে সংসারের কাজ আর স্বামীসেবা  করে গেছেন। বিচ্যুতি ঘটলে শাসনও সহ্য করতে হয়েছে। সেই সময়কার বাড়ির বৌদের কাহিনী লিখলে আর একটা মহাকাব্য হয়ে যাবে।

        সংসারের সর্বময় কর্ত্রী ছিলেন খান সাহেবের তৃতীয় ঠাকুমা। ঠাকুরদার তিন  স্ত্রীর মধ্যে প্রথমা একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়ে মারা গেলে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর একমাত্র সন্তান আমার শ্বশুরমশাই ওয়ারিশ খান। আরও সন্তানের আকাঙ্ক্ষা থাকায় ঠাকুরদা তৃতীয় বিয়ে করেন। এই স্ত্রী এক পুত্র ও তিন কন্যা উপহার দিয়ে স্বামী ও সংসারকে নিজের আঁচলে বেঁধে ফেলেছিলেন। স্বভাবতই তাঁর নিজের ছেলের বউ, মানে ছোটবৌ ছিলেন ‘পটেরবিবি, গয়নাতে গা ঢাকা’। আর বড়বৌ, মানে আমার শাশুড়িমা বিনে পয়সার বাঁদি। ১৯ শতকের ৪/৫ এর দশকে গ্রামের নিরক্ষর মানুষেরা জমানো টাকাপয়সা ব্যাঙ্ক বা পোস্ট অফিসে রাখতেন না। ঠাকুরদার চাষআবাদ ছাড়াও তেজারতি ব্যবসা ছিল। ইসলামে সুদ নেওয়া হারাম, তাই টাকা ধার দিয়ে তিনি সুদ নিতেন না। তখন গরিবদের ব্যাঙ্ক থেকে  ঋণ পাওয়ার এত সুবিধা ছিল না। ঠাকুরদা এই গরিব চাষিদের ঋণ দিতেন ধানের আগাম দাম হিসেবে। পৌষমাসে ধান উঠলে বাজারের থেকে কম দামে সেই ধান আদায় করে মরাইয়ে তুলে রেখে শ্রাবণ-ভাদ্রতে চড়া দামে বিক্রি করতেন। লাভের টাকা ও গয়না চিলেকোঠায় সিন্দুকে এবং পিতলের কলসিতে জমিয়ে রাখতেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের সবার সামনে সেই সিন্দুক খোলা হলে দেখা গেল তাতে সামান্য কটা খুচরো পয়সা ছাড়া কিছুই নেই। শ্বশুর মশাই সবই বুঝতে  পারলেন, ছোটমা আর ভাই মিলে সমস্ত টাকাপয়সা আত্মসাৎ করেছে। তবুও তিনি চুপ থাকলেন। কিন্তু ছোটমা আর ভাই চুপ থাকলেন না।  ওঝা ডেকে শাশুড়িমা ও তাঁর  ১০ বছরের ছেলেকে(আমার স্বামী) চোর সাব্যস্ত করলেন। স্ত্রী ও ছেলের  এই মিথ্যে অপবাদ শ্বশুরমশাই নীরবে মেনে নেওয়াতে শাশুড়িমা প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিলেন। শ্বশুর মশায়ের প্রতিবাদ করার কোনো উপায় ছিলনা। তাঁর নিজস্ব কোনো রোজগার ছিল না। ছিল মামলা-মকদ্দমা করার নেশা। নিজের পরিবারটিও বেশ বড়। তাই সবসময় সৎমা, ভাই ও ভাইবৌয়ের মনজুগিয়ে চলার চেষ্টা করতেন। কোনোদিন জানার চেষ্টা করেননি নিজের স্ত্রীর কোনো সাধ বা ইচ্ছে আছে কিনা। পেটে সামান্য ভাত, আর পরনে মোটা কাপড় এ নিয়েই তাকে খুশি থাকতে হত। তবুও একদিন সংসার ভাগ হয়ে গেল।  শ্বশুরমশাইয়ের অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে উঠল। মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল থেকে বড়ছেলে পাশ করে বেরিয়ে কলেজে ভর্তির ফিয়ের জন্য শাশুড়ি মায়ের যেটুকু গয়না ছিল, তাও বিক্রি করতে হল।

          হয়ত এরকম আরও অনেক বেদনাদায়ক ঘটনা শাশুড়ি মায়ের জীবনে ঘটেছিল, যা আর আমার জানার সুযোগ হয়নি। বাবার মৃত্যু হয়েছিল ১৯৯৭ এর ২৭ নভেম্বর। তার ঠিক পরের বছর স্ট্রোক হয়ে একমাস মত কোমায় থেকে  ১৯৯৮ এর ২৮ নভেম্বর এই পৃথিবী থেকে তিনি চির বিদায় নিলেন। সাথে সাথে  আমার  শ্বশুর বাড়ির প্রতি আকর্ষণ কমতে লাগল। শাশুড়িমা কী যত্ন করে খেতে দিতেন। এতটা আদর অন্য বৌরা কেউ পাইনি। আমার ছোট পিসিশাশুড়ি বলতেন, বৌ, তোমাকে দেখে যে ভক্তি ভালবাসা মনে জাগে, অন্য বৌদের দেখে তা হয় না।

        যাইহোক, সেদিন শাশুড়ি মায়ের মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে  প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, নারীর ওপর, বিশেষ করে মুসলিম সমাজে নারীর ওপর এই শোষণ পীড়ন ও বঞ্চনার প্রতিবাদ জানাতে হবে। কিন্তু কীভাবে? আমিও যে এক অদৃশ্য শিকলে বাঁধা! তাই একদিন অপটু হাতে প্রতিবাদের কলম ধরলাম। এই কলম ধরতে আমাকে সাহস জুগিয়েছেন যে দু’জন মহীয়সী নারী, তাঁরা হলেন বেগম রোকেয়া ও আশাপূর্ণা দেবী। ওঁদের জীবন কথা আমাকে সব বিষয়েই অনুপ্রাণিত করেছে, এখনও করে চলেছে। তবে সমাজের রীতি নিয়ম বদলে ফেলা এত সহজ নয়, প্রতিবাদে প্রতিকার না হলেও এই একবিংশ শতাব্দীতেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা(মুসলিম মহিলারা) যে ১৪০০ বছর পূর্বের অবস্থায় রয়ে গেছি, এবং সেই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া যে খুব জরুরি তা অনেক সংস্কার মুক্ত মানুষ উপলব্ধি করতে পারছেন। আজ আমাদের বিষয় নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালিখি হচ্ছে, আমি নিজেও এসব বিষয়ে  লেখার সুযোগ পাচ্ছি, কলকাতা দূরদর্শনে ও অন্যান্য টিভি চ্যানেলের টকশোতে অংশগ্রহণ করছি, যার বেশিরভাগ বিষয়ই হল এদেশে মুসলিম নারীর অবস্থা। 

        এই পরিচিতি, এই সম্মান আমার কাছে তুচ্ছ মনে হয় যখন আমি আমার ঘর ভর্তি সুখের সরঞ্জামের দিকে তাকায়, তখন মনে হয় ওরা আমাকে বিদ্রুপ  করে বলছে, তোমার এই সুখ ভোগের  কোনও অধিকার নেই, যার জীবনভর  ত্যাগের বিনিময়ে এসব পেয়েছ, তাঁর জন্য তুমি কী করেছ? সত্যিই আমি এখন পর্যন্ত তাঁর জন্য কিছুই করতে পারিনি। এ আমার জীবনের চরম পরাজয়। তবে এ  পরাজয়ে কোনো আপমান নেই। আছে বেদনা, বুক ভরা বেদনা। এর পরেই ধিরে ধিরে আনন্দবাজার, আজকাল, সংবাদ প্রতিদিন, বর্তমান, দেশ, নবকল্লোল ইত্যাদি পত্রপত্রিকায় এই সমস্ত বিষয়ের ওপর চিঠি লেখা শুরু করি। চিঠি থেকেই নিবন্ধ ও প্রবন্ধ লেখায় অভ্যস্থ হয়ে উঠতে থাকি।        
     
                                        ক্রমশ


    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
     


  • মারণবীজের আজব ধাঁধা পর্ব ৭ /বাসুদেব গুপ্ত

  • মারণবীজের আজব ধাঁধা পর্ব ৭

    বাসুদেব গুপ্ত


    ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে আলপনা দেখে বোঝা গেল এটা পূর্ণিমারই ফ্ল্যাট। অর্চি নভীনকে দেখালো, একবার দেখ কি সুন্দর রংগোলী করেছে। 
    -রংগোলী নয়, ওরা বলে কোলম। রংগোলী বা আলপনা হল মুক্ত হাতে আঁকা ফুল লতাপাতা। কোলম আঁকা শুরু হয় নির্দিষ্ট দূরত্বে প্রথমে ছোট ছোট বিন্দু এঁকে। তারপর সেই বিন্দুগুলো জোড়া হতে হতে ফুটে ফুটে ওঠে এক জ্যামিতিক ডিজাইন। একেবারেই আলাদা আলপনার থেকে। যেমন হিন্দুস্থানী গান কর্ণাটকির থেকে মত আলাদা। 
    নভীন তফাতটা বুঝিয়ে দেয়।
    -দেখা যাক আমাদের পূর্ণিমা কি কি পয়েন্ট খুঁজে পায়। তারপর আমাদের কাজ হবে সেগুলো জুড়ে বার করা এইসব কোলমের পেছনে কোন ভয়ংকর ডিজাইন লুকিয়ে আছে। 
    বেল টিপতেই পূর্ণিমা দরজা খুলে অভ্যর্থনা করে। স্নান সেরে একটা রূপালী রঙের কাসাভু শাড়ী পরেছে, তার উজ্জ্বল সোনালী রঙের পাড়ের আভায় তাকে মন্দির থেকে বেরিয়ে আসা পূজারিণী মনে হয়। চোখ স্নিগ্ধ হয়। তার সংগে হাল্কা চন্দন ধূপের সুবাস। অর্চি ও নভীন চোখ চাওয়া চাওয়ি করে সোফায় বসতে বসতে। নীচু কাঠের সোফা ডান দিকে একটা কাঠের তৈরী লম্বা নৌকো, মনে হয় বোট রেসের। বাঁ দিকে দুটো ল্যাপটপ। একটা আইম্যাকে কিছু একটা চলে যাচ্ছে, পরিবেশের সংগে ঠিক যেন মিলছে না। ফেসবুকে পূর্ণিমার প্রোফাইলের ফেডেড জিনস আর টি শার্টের সংগে মেলানো আরও কঠিন। 

    পূর্ণিমা তিনটে জুসের গ্লাস একটা কাঠের ট্রেতে নিয়ে এসে সামনে রেখে বসে। কিছু বলে না। 
    -কি ব্যাপার? তোমার কম্পিউটার কোয়ারী কি বলল? নভীন সোজা সুজি কথা পাড়ে। 
    -আপনারা যে বলেন find a snake when looking for worms, সেরকম। 
    -কেঁচো খুঁড়তে সাপ? মানে?
    -মানে বললে বুঝতে পারবেন। গত দুমাসে একসিডেন্ট হয়েছে রোড প্রায় ১ লাখ। ডেথ প্রায় ৩৫০০০। 
    -দুমাস আগে এটা ছিল ৮০০০০ একসিডেন্ট। ডেথ ২৪০০০
    -তাহলে কি বোঝা যাচ্ছে?
    পূর্নিমা ল্যাপটপে গিয়ে কি খটখট করল প্রিন্টার থেকে বেরিয়ে এলো কিছু গ্রাফ। 
    -দেখুন। গত ছ মাসের। গ্রাফে দুর্ঘটনার পাশাপাশি আনুমানিক জনসংখ্যার গ্রাফও রয়েছে। চারমাস গ্রাফগুলো প্রায় সমান্তরাল। হঠাৎ গত দুমাসে প্রায় করোনার গ্রাফের মত দুর্ঘটনা বেড়ে গেছে। আর ডেথের সংখ্যা তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেড়েছে। 
    -এ থেকে বোঝা যাচ্ছে কোন একটা এক্সটারনাল প্রভাবে দুর্ঘটনা বেড়ে গেছে। কিন্তু মৃত্যুর অনুপাত প্রায় একই। অর্থাৎ ইচ্ছে করে কেউ মানুষ মারার জন্য এটা করাচ্ছে না। যা হচ্ছে তার পেছনে প্রাকৃতিক কারণ আছে। 
    -আচ্ছা এতো গেল রোড। ট্রেন বা প্লেন দুর্ঘটনা? 
    -প্লেনে একটাই হয়েছে। ট্রেনে চারটে। প্লেনে কো পাইলটের জন্য উর্বীরা বেঁচে গেছে। ট্রেনে সেটা হয় নি। কিন্তু ট্রেনের গতিবেগের তফাত ছিল। তিনটে কেসে স্টেশন থেকে ট্রেন বেরিয়েই দুর্ঘটনা। একটা কেসে ড্রাইভার বদল হবার পর মাঝ রাস্তায়। 

    -এ থেকে কি বোঝা যায়?
    -ওয়াইল্ড গেস করছি। মনে হয় ট্রেনের ইঞ্জিন বা ড্রাইভারের কেবিনে কোনরকম কেমিক্যাল পয়জনিং হয়েছে। টারমিনাল থেকে গাড়ী ধীরে ধীরে পিক আপ নিয়েছে আর মাঝপথে খুব তাড়াতাড়ি হাই স্পীডে চলে গেছে। সেইজন্য তিনটে ট্রেনে দুর্ঘটনা তেমন ভয়ংকর হয় নি। চার নম্বরটার হয়েছে। 
    নভীন হাঁ করে শুনছিল। যা প্রশ্ন করার অর্চিই করছিল। কিছুই মাথায় ঢুকছে না ওর। অগত্যা ও পরের মন্তব্যটা যাচাই করতে যায়,
    -এগুলো কেঁচো না মনে হয়ে স্নেক মনে হল কেন?
    -না এগুলো স্নেক না। স্নেক আলাদা। সেটা আমার অতিরিক্ত কৌতূহলের জন্য দেখা দিয়েছে। আমি দেখলাম এই সময়ে সুইসাইড হয়েছে ২ লাখ। অর্থাৎ দু গুণ। আর পলিটিকাল মার্ডার হয়েছে ৫ লাখ। এরেস্ট হয়েছে অনেক। কিন্তু কোন কেসের কোন কিনারা হয় নি। অর্থাৎ পলিটিকসের ইজ দি বিগেস্ট কিলার। আমরা কেমন দেশে বাস করছি নভীন ভাই, ভয় লাগে। প্রায় ককিয়ে ওঠে পূর্ণিমা। 
    -সেটা তো বটেই। পলিটিকস মানেই ওয়ার। আর ওয়ার মানেই সমস্ত যুক্তির মুখে ঝামা ঘষে অকারণ মৃত্যুর মিছিল। অর্চি একটু উত্তেজিত হয়ে বলে আবার গুটিঁয়ে যায়। মনে হয় ভিতরে লুকোন কোন গভীর ক্লান্তি ওর রাশ টেনে ধরে।
    আবহাওয়াটা হঠাৎ খুব গম্ভীর। কেউই কি বলবে কিছুক্ষণ ঠিক করতে পারে না। ভিতরের ঘর থেকে চাপা স্বরে ভেসে আসে, হিমাদ্রি সুতে পাহিমাম…
    ধূপের গন্ধের মতই এই কণ্ঠস্বর। হাওয়ায় অদৃশ্য শরীরে অধিকার করতে থাকে শ্রবণ। 
    -এম বালমুরলী কৃষ্ণা না ? নভীন চিনতে পারে। 
    -হ্যাঁ হমসগীতে ছবির গান। বেস্ট প্লেব্যাক সিংগার হয়েছিলেন। 
    -কি সুর। আর কি দরাজ melifluous গলা। 
    পূর্ণিমা অবাক হয় এরা চিনতে পেরেছে দেখে। ওর মুখের রেখাগুলোও একটু নরম হয়। বলে।
    -কফি আনি?
    -থ্যাংক ইউ। আচ্ছা মণিকার চ্যানেলটা একটু চালাও তো। শুনি The news কি বলে?

    The news কিছুক্ষণ এড দেখায়, নীচের লাইনে রেল দুর্ঘটনার খবর চলতে থাকে। 9-30 এর রোজের প্রোগ্রাম মর্নিং উইথ মণিকা। 
    কিন্তু মণিকা আজ নেই। মণিকার জায়গায় দেখা যায় ইন্দারজিত সিং। খুব ছটফটে, প্রাণ শক্তিতে ভরপুর থাকে রোজ। আজ মুখটা একটু অন্যমনস্ক। ও খেলার খবর বলে। এই বিভাগটির সে কোনদিন করে না তাই একটু অস্বস্তি। কিন্তু আশ্চর্য মণিকা আজ কেন আসে নি এ নিয়ে একটাও লাইন চ্যানেল থেকে বলে হয় না। 

    - বোধহয় এরেস্ট হয়ে গেছে। আচ্ছা সরকার কি মুখ বন্ধ করে বিপদ বন্ধ করতে পারবে? কিছুদিন নিজের পদে হয়ত টিকে থাকবে তারপর? 
    নভীনের খুব চিন্তা হয়। সরকার যত ভালো কাজই করুক একবার নাম খারাপ হলে মানুষের মুখ বন্ধ হলেও, মন তো বন্ধ করা যায় না। সন্দেহ হতে থাকে। 
    -মুখ বন্ধ করেই তো চলছে। করোনার সময় অক্সিজেন চাই বলে বিজ্ঞাপন দিলেও এরেস্ট হয়েছে। 
    -এরেস্ট হলে নাকি তাদের বাড়ী বুলডোজার দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়?
    অর্চি উঠে পড়ে কফিটা কোনমতে শেষ করে। তার হঠাৎ মনে পড়ে গেছে একটা কথা। এক্ষুনি একবার খোঁজ লাগাতে হবে। মনে হচ্ছে হাতে সময় বেশি নেই। 
    পূর্ণিমাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে প্রায় দৌড়েই নভীনকে নিয়ে ওর গাড়ীতে ঢুকে পড়ে। জিজ্ঞাসা করলে বলে হোটেল এখন আর নিরাপদ নয়। তারপর গাড়ীটা নিয়ে দুজনে কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ৭০ কিমি গিয়ে একটা চায়ের দোকানে থেমে ফোন লাগায় ডঃ নীল অস্থানাকে। চক্ষু বিশারদ ডঃ অস্থানা, কানপুরের মানুষ কিন্তু কলকাতারই ডাক্তার। এইডস ও চোখের রোগ নিয়ে ওনার গবেষণা নিয়ে কাগজেও রিপোর্ট বেরিয়েছিল একসময়। 
    ফোন বেজে যায়। কেউ ধরে না। ডঃ অস্থানার আর একটা গুণ উনি ভালো সেতার বাজাতে পারেন। অর্চি একবার সুযোগ পেয়েছিল চোখের ডাক্তারদের অল ইনডিয়া মিট কভার করার। সেখানেই ওনার সেতার শুনে ইন্টারভিউ করতে গিয়েছিল, একটা ব্লগ করবে বলে। সেখানেই আলাপ। সেই সূত্রে ওর এসিস্ট্যান্ট মীনা পুরোহিতের সংগেও আলাপ হয়। বেশি কথা অবশ্য হয় কলকাতার রসগোল্লা আর মিষ্টি দই নিয়ে। মীনার ফোন নম্বর অনেকগুলো নোটবই খুঁজে অবশেষে বেরোয়। ফোন বাজে। চেনা গলার স্বর বেজে ওঠে। 
    -আরে মিঃ অর্চি কি মনে করে?
    -সে অনেক কথা। কিন্তু ডঃ অস্থানার ফোনটা কেউ ধরছে না। উনি কোথায়?
    -উনি তো একটা সরকারী কনফারেন্স এটেন্ড করতে গেছেন কালকের ফ্লাইটে। ফোন ধরছেন না? আশ্চর্য। কে জানে কোন সিকিউরিটি প্রটোকল আছে, হয়ত বাইরের ফোন জ্যাম করে দেওয়া হয়েছে। 
    -কি ব্যাপারে গেছেন, কতদিনের কনফারেন্স কিছু বলেছেন?
    -কি ব্যাপারে ঠিক বলেন নি। খালি বললেন একটা নতুন চোখের অসুখ নাকি ডিটেক্ট হয়েছে সেটা খুব সিরিয়াস। হেলথ মিনিসটার তাই আলোচনা ও পরামর্শের জন্য দেশের পাঁচজন আই স্পেসালিস্টকে ডেকেছেন ।

    -আপনারা তো রোজ এ নিয়েই কাজ করেন। আপনারা খবর পাননি বা এরকম পেশেন্ট আসে নি আপনাদের চরক নেত্রসেবালয়ে দেখাতে?
    -না তো। চোখের অসুখ তো আর ফেটাল কিছু নয়। তাড়াহুড়োর কিছু তেমন নেই। আচ্ছা হ্যাঁ একটা কেস এসেছিল বটে। চোখটা খুব ইনফ্লেমড ছিলো কেমন একটু বেরিয়ে আসছিল। আমরা আই এনটিবায়োটিক দিয়ে আবার আসতে বলেছিলাম। আর আসে নি। 
    -নাম বা ডিটেইল মনে আছে। অর্চির পেশি শক্ত হয়ে ওঠে। 
    -নাম দেখতে হবে। পেশায় বলেছিল ট্রাক ড্রাইভার। 
    -ঠিক আছে। অনেক ধন্যবাদ। আমি জানতে চাইছি কারণ আমার মাসখানেক আগে একটা একসিডেন্ট হয়। সেখানে ড্রাইভারের এরকম সমস্যা হয়েছিল। 
    -তাই নাকি? আপনার আঘাত লাগে নি তো?
    -খুব একটা না। রুচি মানে আমার ওয়াইফ, ওই ওই… ডেড। বলে চুপ করে যায়। 
    - সে কি! মীনা কি বলবে বুঝতে পারে না। খানিকটা চুপ করে বলে, আই এম ভেরী সরি। 
    - আপনার পেসেন্টের নাম ঠিকানা জোগাড় করতে পারলে আমাকে দেবেন প্লীজ। কি জানি আবার একটা কিছু হয় কিনা। একটা দীর্ঘশ্বাস হজম করে অর্চি। 
    সন্ধেবেলা ফোনে খবর আসে। ধীরজ সিং। ১৩১/৪ বাগমারী রোড। ফোন ৯৮….। 
    এক নিঃশ্বাসে ফোন লাগায় অর্চি। নভীন তখন ঊর্বীর সংগে ফোনে। মণিকা এখনও কোন ফোন করে নি। 
    -হ্যালো ধীরাজ জি? ম্যায় এক পত্রকার। আভি আভি আপকী আঁখোকা ডাক্তার সে বাত কিয়া। কেস কুছ গড়বড় হ্যায়। আপ ফির একবার আ সকতে?
    ধীরাজ সিং এরকম অদ্ভুত অনুরোধ শুনে পাত্তা দেয় না। বলে, 
    -আভি ম্যায় দিল্লী রোড মে। ফিরে এসে দেখাব দরকার হলে। বলে ফোন কেটে দেয়। 
    খাঁচায় পোরা বাঘের মত পায়চারী করে যায় অর্চি। আরো একবার ফোন লাগায়। বেজে উঠে কেটে যায়। নম্বর দেখে কেটে দিয়েছে। 
    -ফোন ধরছে না। এক্ষুনি যদি একসিডেন্ট করে? কি করি নভীন বল না কিছু একটা?
    নভীন বোঝায়,
    -এতটা যখন চালিয়েছে ওর নিশ্চয় এই অসুখ হয় নি। তুই বোস তো ঠাণ্ডা হয়ে। একটা বিয়ার বার কর ফ্রিজ থেকে। কি করা যায় ভেবে লাভ নেই। আমরা চুনোপুঁটি। বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমাদেরই ধরে পুরে দেবে। 
    -তুই বুঝছিস না। আমার মন বলছে আজ একটা ঘটনা ঘটাবে এই সিংজী। আর আমরা জেনেও সেটা আটকাতে পারবো না। হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে। আমরা ভাগ্যের হাতে এত অসহায়?
    সারা দিন ছটফট করে কাটে। কাজের কাজ হয় না। 
    সন্ধে ছটার ব্রেকিং নিউজ। সাংঘাতিক ট্রাক দুর্ঘটনা। কন্ট্রোল হারিয়ে উল্টো দিকের ট্রাফিকে ঢুকে পড়ে ট্রাকের তাণ্ডব। ট্রাক চালকের মৃত্যু। বরযাত্রী দলের দুটি গাড়ী চুরমার। হতাহতের সংখ্যা অজানা। 
    দুই বন্ধু দুই মমির মত চুপ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আরো একটা খবর শোনে। নামকরা সাংবাদিক মণিকার মৃতদেহ জংগলে আবিষ্কার। বুকে দুটো গুলির চিহ্ন। মনে করা হচ্ছে উগ্রপন্থীদের ডেরায় তিনি খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে বিপদে পড়েন। তথ্যমন্ত্রী টুইট করে তাঁর শোকবার্তা জানিয়েছেন। 
    অর্চি আর নভীন দুটো হুইস্কির গ্লাস নিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে । গ্লাস যেমন কে তেমন। মুখে তুলে নেওয়ার শক্তিটাও যেন কেউ সিরিঞ্জ দিয়ে টেনে নিয়ে গেছে। 
     -ক্রমশঃ-

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
     


  • গওহরজান - এক বিস্মৃত অধ্যায় পর্ব - ১৫ /দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী
  • গওহরজান - এক বিস্মৃত অধ্যায় 
    পর্ব - ১৫                                

    দেবী প্রসাদ ত্রিপাঠী    

    সারা জীবন যে মানুষটি বিভিন্ন মামলা ও ঝামেলাতে অহেতুক ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন মৃত্যুর পরেও তিনি সেখান থেকে রেহাই পাননি। যে গওহরজান জীবিতকালে কারও ভালবাসার স্পর্শ পাননি, তাঁর জন্য সামান্য এক ফোটা চোখের জল কেউ ফেলেন নি, বিপদের সময়ে সামান্যতম সমবেদনাও কেউ জানায়নি। তাঁর মৃত্যুর পরে তার অগণিত আত্মীয় এসে মামুলী শোক প্রকাশ করে কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন দিয়ে তাঁর সম্পত্তির বা গচ্ছিত টাকার দাবীদার বলে নিজেদের প্রতিপন্ন করতে শুরু করলেন। প্রথম যে আত্মীয় তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে মহীশূরের মহারাজের কাছে দাবী জানান তিনি হলেন ব্যক্তিগত জীবনে গওহরজানের জন্মদাতা আর্মেনীয় রবার্ট উইলিয়াম ইয়েওয়ার্ড, যিনি গওহরের পাঁচ বৎসর বয়সে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার জন্ম বৃত্তান্ত অস্বীকার করে তার মাকে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে গওহরের জন্মপরিচয় আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য গওহরের কাছে ন' হাজার টাকা দাবী করেছিলেন। ১৯৩০ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারী অর্থাৎ গওহরের মৃত্যুর ১৭ দিন পরে তার লিখিত চিঠিতে তিনি নিজেকে গওহরজানের একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী বলে জানিয়েছিলেন। দ্বিতীয়জন হলেন সৈয়দ গোলাম আব্বাস সওযোয়ারি যার সাথে গওহরের 'মুটা ম্যারেজ' হয়েছিল এবং বহু তিক্ততার ফলে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছিল। তার আইনজীবী  কলকাতার এন সি বোস অ্যান্ড কোম্পানীর অফিস থেকে একই দিনে তার চিঠিটিও এসেছিল এবং চিঠিতে গওহরজানের স্বামী বলে আব্বাসকে উল্লেখ করা হয়েছিল। তৃতীয় চিঠিটি মহীশূর রাজ্য সরকারের কাছে এসে পৌঁছে ছিল মহীশূর শহরের জনৈক কুম্ভরহালের আইনজীবী মহম্মদ ওয়ালিউল্লাহের কাছ থেকে যেখানে দাবী করা হয়েছিল গওহরজান তার বিবাহিত স্ত্রী এবং চিঠিতে উল্লেখ হয়েছিল সম্ভবত জানুয়ারী মাসের ১৭ তারিখে তার স্ত্রী মারা গেছেন। মজার ব্যাপার হল মৃতার স্বামী মৃত্যুর সঠিক তারিখ জানেনা যার জন্য তার আইনজীবী সম্ভবত কথাটি উল্লেখ করেছিলেন। চতুর্থ ও শেষ চিঠিটি এসেছিল মহীশূরে থাকাকালীন গওহরজানের পরিচারক আব্দুল রহমানের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্যের জন্য যে নিজেকে উল্লেখ করেছিল গওহরজানের শেষ জীবনের পরিচারক হিসেবে বর্তমানে কলকাতায় কর্মহীন। সংসারের গ্রাসাচ্ছাদন এবং গওহরের মৃত্যুতে বিভিন্ন ধর্মীয় ক্রিয়া কর্ম সম্পাদনের জন্য সে কেবলমাত্র আর্থিক সাহায্যের আবেদন করেছিল, অবশ্য সম্পত্তির কোন দাবি-দাওয়া জানায় নি। মহীশূর সরকার এইভাবে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে অজস্র চিঠি পেয়ে মহীশূরের সিটি ম্যাজিস্ট্রেট এম চেন্নারাজ উরসের হাতে সমস্ত পত্রগুলি অর্পণ করেছিলেন সে ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। তিনি বিভিন্ন ব্যক্তির দুরভিসন্ধিমূলক ও মিথ্যা দাবি-দাওয়া সমন্বিত চিঠিগুলির আইন সম্মত ভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে বিষয়টির মীমাংসা করেছিলেন এবং সেইসঙ্গে এই অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটান।   

    গওহরজানের মূল্যায়ন করতে গিয়ে মিস ইন্দুবালার কথাতে ফিরে আসি। "গওহরজান এমনই এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন যাঁর সম্বন্ধে মানুষের প্রতিক্রিয়া তীব্র ছিল। যারা তাঁকে পছন্দ করতেন তাঁরা গভীরভাবে তাকে ভালবাসতেন, কিন্তু যারা তাঁকে পছন্দ করতেন না তাঁরা তাঁর খুঁটিনাটি প্রত্যেক ব্যাপারে তীব্র অসন্তোষ ব্যক্ত করতেন। কিন্তু গওহরজান তাঁর নিজস্ব মতে জীবন-যাপন করে গেছেন। সময়ের সাথে  সাথে তিনি ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন।"
    এই বিস্মৃতপ্রায় শিল্পীর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বর্তমান যুগের স্বনামধন্য গায়ক শ্রী রাম কুমার চট্টোপাধ্যায় মহাশয় ১৪০৪ খ্রিস্টাব্দের শারদীয়া বর্তমান পত্রিকায় তাঁর লেখা বিশেষ রচনা 'জলসাঘর'-এ গওহরজানের সম্বন্ধে যে মূল্যায়ন করেছেন সেটি পাঠকের উপলব্ধির জন্য এখানে উল্লেখ করছি।                    
    "মালকাজানের মেয়ে গওহরজান। ওই রূপ আর ওই কোকিল কন্ঠ তখন গোটা কলকাতাকে মাতিয়ে রাখতো। তাঁর এক রাতের মুজরো ছিল পনেরশো টাকা তখনকার দিনে। এই গওহরজানকে নিয়ে কম ঘটনা আছে নাকি? তার কিছু কিছু তো আমার নিজের চোখে দেখা। এখনো মনে আছে বৃন্দাবন বসু লেনের বিখ্যাত গুহবাড়ির জলসাঘরে ঐরকম একটি গানের আসর বসেছে। গোটা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেছেন সঙ্গীতসাধক বিজয়লাল মুখোপাধ্যায়। তিনি আবার গান শিখতেন গওহরজানের কাছে। আসর শুরু হলো রাত করে। জমাট আসরে গান ধরলেন গওহরজান। তখন বেশ বয়স হয়ে গেছে তাঁর, ঘুরে ঘুরে আসরের নাচ বন্ধ করে দিয়েছেন। হাঁফিয়ে যেতেন তাই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে মুদ্রা করে শুধু গাইছেন। কি অপরুপ কন্ঠ তখনো পর্যন্ত। বেনারসী ঘরানায় কি সপাট তান। শ্রোতারা সব মন্ত্রমুগ্ধ। এমন সময়ে গওহরজান ধরলেন এক খাম্বাজ ঠুমরি। আরোহন অবরোহনের সঙ্গে সঙ্গে ভাও। ওই বয়সে ভাও করে গাওয়া কি চাট্টিখানি কথা? এখনও মনে আছে গানের কলি ছিল- ' কৌন গলি যায়ে মোরে শ্যাম'।   
    এতো অনেক পরের কথা। যাঁরা প্রবীণ ব্যক্তি তাঁরা গওহরজানের আরো অনেক কথাই জানতেন।      নিজের ইংরেজি ভাষা ছাড়াও সাত-আটটি ভারতীয় ভাষায় তিনি গান গাইতে পারতেন। খেয়াল, ঠুমরি, দাদরার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা আগমনী শ্যামাসঙ্গীত এমনকি লোকসংগীতও তিনি গাইতেন। গওহরজানের মা মালকাজান উর্দু শায়েরীও রচনা করতে পারতেন। তাঁর কাছ থেকে শিখে অসংখ্য উর্দু শায়েরী গওহরজান নিজে রচনা করেছিলেন। গওহরজানের রচনা করা সেসব খেয়াল, ঠুমরি বহু বিজ্ঞ ওস্তাদ পরবর্তীকালে গেয়েছেনও। কিন্তু গওহরের নাম উচ্চারণ করতে তাদের বুঝি বাধতো, কারণ ওস্তাদদের মুখ যে কতবার চূণ করে দিয়েছেন গওহর তার ইয়ত্তা নেই।             
    সেবারে ঝামাপুকুরে মহারাজা দিগম্বর মিত্তিরের বাড়িতে আসর বসলো তাঁর বিরাট বৈঠকখানায়। বহু মানুষ এসে হাজির হলেন সেখানে, কিছু জানকর ওস্তাদও। গহরজান একে একে গেয়ে চলেন। 'আজ কাঁহা মেরি হৃদয় কি রাজা' কখনো বিশুদ্ধ ঠুমরি - ' ও ঘাটে যাব না সই লো পানিয়া ভরণ'। আসর মাৎ ততক্ষণে। ডুগি তবলায় কানির কাজ চলতে চলতে তেহাই পড়ে, শ্রোতারা হাঁ হাঁ করে উঠে। সারেঙ্গীর ছড় সুরকে টেনে বার করে আনছে যেন। এরপরে গওহরজান ধরলেন তাঁর বহু সাধের দাদরা গান - 'ফাঁকি দিয়ে প্রানের পাখি উড়ে গেল আর এলো না বুঝি, কে প্রেমের ডোরে বেঁধে রাখলে প্রাণ ময়না'। গওহরজান ভাও করেন তো, মহারাজা 'আহা' 'আহা' করে ওঠেন। থেকে থেকে ঝাড়লন্ঠনের আলোয় ঝলসে ওঠে গওহরজানের হাতের সেই হীরের আংটি, কোহিনুরের মতোই যার গড়ন, তবে ছোট। প্রত্যেক আসরেই ওটা পরে আসতেন গওহরজান। হাত তুলে গান শুরু করলেই ওতে ঝাড়লন্ঠনের আলো লেগে ঝলসে উঠত, আর তাই না দেখে নাচ ঘরের বড় বড় রইস আদমিরা তাদের হীরের আংটিগুলো পাঞ্জাবি, শেরওয়ানির পকেটে ঢুকিয়ে ফেলতেন। কি লজ্জা! তবায়েফ গওহরজনের আংটির হীরের পাশে আর সবই যেন ঝুটো পাথর।
                                                                   ক্রমশঃ…….

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
     


  • পরিব্রাজক পঞ্চানন রায় কাব্যতীর্থ /ভাস্করব্রত পতি
  • মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ৯

    পরিব্রাজক পঞ্চানন রায় কাব্যতীর্থ

    ভাস্করব্রত পতি

    মাটির উপর চাটাই পাতা। তার উপর মাদুর আর বিছানার চাদর। দুখানা মাথার বালিশ। নিজে নিজেই খেলতেন লুডো, বাঘবন্দী কিংবা গোলোকধাম গুটি। অসম্ভব দানশীল মানসিকতার এই মানুষটি কিন্তু 'মেদিনীপুরের মানুষ রতন' হিসেবেই সম্মানিত! তিনি পরিব্রাজক পঞ্চানন রায় কাব্যতীর্থ।

    "স্বদেশের সমুন্নতি সাধনে সূচির প্রতি
    পরহিতে সদাব্রতী সতীশ ধরায়।
    ভবানী ছোটপো তারনন্দকন্যা গাথাকার
    জৈষ্ঠ্য পঞ্চু পুত্র যার শ্রী প্রনব রায়" --
    এভাবেই তিনি তাঁর নিজের বংশ পরিচয় দিয়েছেন কাব্যাকারে। ১৯০২ এর ১৩ ই সেপ্টেম্বর ঘাটালের বাসুদেবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সতীশচন্দ্র রায় এবং যাজ্ঞসেনী দেবীর পুত্র পঞ্চানন রায়। তাঁরা ছিলেন সামবেদীয় ভরদ্বাজ গোত্রের বিখ্যাত ফুলিয়া মুখুটি বংশের প্রতিনিধি। যে বংশের একজন মহাকবি কৃত্তিবাস (সেইখানে বংশে তাঁর হৈলা বঙ্গ অলঙ্কার / কবি কৃত্তিবাস যার গ্রন্থ রামায়ণ) ছিলেন রামায়ণকার। আর একজন রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায় (সেই বংশে কালক্রমে বিধাতার সুনিয়মে / পূত করি স্বজনমে রায় গুণাকর / অন্নদামঙ্গল গীতি রচিলেন মহামতি / ভারতচন্দ্রের খ্যাতি দেশ দেশান্তর) ছিলেন 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যের লেখক। এছাড়া এই বংশের কৃতি সন্তান ছিলেন গড়ভবানীপুরের রাজা কৃষ্ণরাম, পেঁড়োর রাজা শ্রীমন্তরাম, সদানন্দ, নৃসিংহ প্রমুখ। এহেন বংশের জনৈক রাজচন্দ্র দয়াময়ী দেবীকে বিয়ে করে পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরের বাসুদেবপুর গ্রামে বসবাস শুরু করেন। সেই বিখ্যাত বংশের একজন প্রতিনিধি হয়ে তুলে ধরেছেন নিজেকে। আর গর্বিত করেছেন মেদিনীপুরকে। তাঁর লেখনীতে পাই -- "পৃথিবীর ক্ষুদ্র রূপ / মেদিনীমণ্ডলে ভূপ / ধন্য জেলা এ মেদিনীপুর! // পর্ব্বতে প্রান্তরে বনে / সমুদ্র মরুর সনে / শোভা যার অপূর্ব্ব প্রচুর।"

    কর্মজীবন শুরু করেছিলেন চাকদহ রামলাল একাডেমী থেকে। বিদ্যাসাগর প্রতিষ্ঠিত বাসুদেবপুর হাইস্কুলেও পড়িয়েছেন। এরপর বহু বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে করতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন 'পণ্ডিতমশাই'। শিক্ষার আলো জ্বালাতে বহু ছাত্র ছাত্রীদের বিনা পয়সায় পড়াতেন বাড়িতে ডেকে এনে। একসময় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন 'দেশসেবী' সংঘ। যে সংঘ যুবসমাজকে স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি নানা কর্মসূচিতে এবং সমাজমনস্ক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পেরেছিলেন। সেই 'পণ্ডিতমশাই' পঞ্চানন রায়ের কথায়, "একদিন গ্রামের কয়েকজন যুবককে লইয়া দেশসেবী সংঘ স্থাপন করি। উহাতে সাধারণ সেবা ও গ্রন্থাগার, দরিদ্র ভাণ্ডার প্রভৃতিরও ব্যবস্থা ছিল"।

    একাধারে তিনি ছিলেন স্বদেশ সেবক। নিজের অর্থ খরচ করে স্বদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির গৌরব প্রচারে সচেষ্ট ছিলেন। দেশের ইতিহাস জানার তুমুল আগ্রহ ছিল মননে এবং চিন্তনে। তাঁর অসাধারণ অনুসন্ধিৎসু মন সম্পর্কে জানা যায় ডেভিড ম্যাকাচ্চিয়ানের LATE MEDIEVAL TEMPLES OF BENGAL বইতে। ডেভিড ম্যাকাচ্চিয়ান পঞ্চানন রায় সম্পর্কে লিখেছিলেন, "Of these I must single out for special gratitude two local scholars who have done much to preserve and creat understanding of the culture of their home areas Sri Panchanan Ray Kavyatirtha in the Daspur। বিনয় ঘোষ লিখেছেন, "আপনাকে মেদিনীপুর জেলার একটি জীবন্ত গেজেটিয়ার বলে আমি মনে করি। আপনার 'দাসপুরের ইতিহাস' পড়তে পড়তে এই কথাই মনে হচ্ছিল। দেশ এখন বিভ্রান্ত এবং দেশের লোকেরাও বেশ কিছুটা মতিভ্রম ও রুচিবিকার হয়েছে। তাই -- তা না হলে আপনার মতো মানুষের আরও অনেক বেশি সম্মান পাওয়া উচিত ছিল। অবশ্য একথাও ঠিক যে যাঁরা প্রকৃত দেশীয় সংস্কৃতি কর্মী তাঁরা কাজ করেন নিঃস্বার্থভাবে"।

    তিনি ছিলেন আঞ্চলিক ইতিহাসের সৃজনশীল গবেষক। তাঁর নামের সাথে প্রত্নতাত্বিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, গীতিকার, কবি, প্রবন্ধকার, ঐতিহাসিক ইত্যাদি শিরোপা দেওয়া যায়। ১৩২৫ বঙ্গাব্দে বিখ্যাত 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকায় তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। সংস্কৃতে ব্যুৎপত্তি লাভ করে 'কাব্যতীর্থ' উপাধি এবং জ্যোতিষশাস্ত্রে 'জ্যোতির্বিনোদ' উপাধি পান। কিন্তু তিনি মন্দির, মসজিদ, স্থাপত্য, পুরাতত্ত্ব, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাসের প্রতি মনপ্রাণ নিবেদিত করেছিলেন।

    কেন তাঁকে 'পরিব্রাজক' বলা হয়? আসলে পূর্ব থেকে পশ্চিম, হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা -- ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন খালি পায়ে। আর এই ভ্রমনের সময় সংগ্রহ করেছেন অজস্র পুঁথি, নথিপত্র, প্রত্নতাত্বিক সামগ্রী ইত্যাদি। তিনি ১৩২৯ এ নিজের গ্রামেই বানিয়েছিলেন 'ভারতচন্দ্র কৃষ্টিকেন্দ্র' নামে সংগ্রহশালা। পরবর্তীতে এর অধীনে গড়ে ওঠে 'সুরনাথ সংগ্রহশালা' এবং 'ন্যায়ভূষণ পুঁথিঘর' নামে আরো দুটি সংগ্রহশালা। যেখানে তুলে ধরা হয়েছিল মেদিনীপুরের লুপ্তপ্রায় ইতিহাসকে। ১৯৭৬ এর ৩ রা ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর বাসুদেবপুর গ্রামেই এই পরিব্রাজকের স্মৃতিরক্ষায় নতুন করে তৈরি হয় 'পরিব্রাজক পঞ্চানন রায় কাব্যতীর্থ সংগ্রহশালা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র'। দুই পুত্র ড. প্রনব রায় (সদ্য প্রয়াত) এবং ড. পুলক রায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ জেলার গর্ব‌। কামানের গোলা থেকে নব্যপ্রস্তর যুগের অস্ত্র, ফসিল, বর্গীর বাঁটুল, টেরাকোটা মন্দিরলিপি, অসংখ্য পুঁথি সহ প্রাণবল্লভ ঘোষের অপ্রকাশিত 'জাহ্ণবীমঙ্গল' পুঁথি, ভাগবতের পুঁথি ইত্যাদি সংরক্ষিত এখানে। আজ থেকে বহু বছর আগে বিজ্ঞানের এতো রমরমা না থাকা সত্ত্বেও যেভাবে নানা বিষয়ের অন্বেষনে কীর্তিমান ছিলেন তা এক কথায় অনবদ্য। তথ্যের সন্ধানে এবং জ্ঞানের আহরণে ঘুরে বেড়িয়েছেন আসমুদ্রহিমাচল।

    সেই ১৩৬৫ বঙ্গাব্দে তিনি লিখেছিলেন "দাসপুরের ইতিহাস"। 'মন্দিরনগরী' বলা যায় দাসপুরকে। একটা বর্ধিষ্ণু জনপদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ লিখে গৌরবান্বিত করেছিলেন দাসপুরকে। তথা মেদিনীপুরকে। আরো বেশি করে আঞ্চলিক ইতিহাস রচনায় অন্যদের অনুপ্রেরণা ছিল এই বইটি। এ প্রসঙ্গে রোহিণীনাথ মঙ্গলের উক্তি প্রণিধানযোগ্য -- "গ্রন্থটির আকার মাত্র নব্বুই পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ হলেও এটি লেখকের এক পরিব্যাপী ও গভীর বিস্তারী অনুসন্ধান। এ অনুসন্ধান শুধু তথ্যের নয়, তারিখের নয়, শুধু ঘটনার বা রটনার। এ অনুসন্ধান প্রাণের, রসের, মানবিকতার পুঙ্খানুপুঙ্খ থেকে তুঙ্গাতিতুঙ্গ পর্যন্ত। এক কথায় বলা যায় এও এক বিশাল ব্রম্ভের সন্ধান। এই সন্ধানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবিষ্কার ও প্রতিষ্ঠা। এ রচনা নিষ্ঠার নির্মান, সংগ্রহের সৃষ্টি।"

    ১৩৮১ বঙ্গাব্দে লিখেছেন 'বাংলার মন্দির'। আর ১৯৭৭ সালে পুত্র ড. প্রনব রায়ের সাথে যৌথভাবে লিখেছেন 'ঘাটালের কথা'। ৭৪ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি নিজেকে ব্যাপৃত রেখেছিলেন আঞ্চলিক ইতিহাসের সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে। কোনো পুরস্কারের আশায় নয়, মাতৃভূমিকে ভালোবেসে আর আঞ্চলিক ইতিহাসের প্রতি অমোঘ টানে তাঁর লেখনী সচল ছিল দীর্ঘদিন।

    এছাড়াও লিখেছেন দুর্গায়ণ (১৩৫৯), শীতলায়ণ (১৩৫৬), রমায়ণ, তাতায়ণ, নামায়ণ, সত্যায়ণ, ভগবন্নামশতক (১৩৩৪), সংসপ্তক সতীশচন্দ্র (১৩৭৫), রতিমঞ্জরী (১৩৫৬), প্রাতঃস্মরণীয় তারকনাথ প্রামাণিক (১৩৪৪), কর্মযোগী ক্ষিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৩৪৪), গঙ্গাসাগর পদ্ধতি (১৩৬৪), ভারতভ্রমণ, চেতুয়া বৈকুন্ঠপুর অস্থল (১৪১৬) ইত্যাদি। বাংলা, সংস্কৃত এবং ইংরেজিতে তিনি সাহিত্য চর্চা করে গিয়েছেন নিরলসভাবে। সাহিত্যের প্রতি টান ছিল বরাবরই। তাঁর বংশধারায় যুক্ত ছিলেন বাংলার দুই প্রোথিতযশা কবি। ফলে পঞ্চানন রায় সেই ধারায় স্নাত হয়ে গৌরবান্বিত করেছেন তাঁর বংশকে। মহিমান্বিত করেছেন মেদিনীপুরের মাটিকে।

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
     


  • মেয়েজন্ম /শ্রীজিৎ জানা
  • শিল্পী -মেঘা দাস



    মেয়েজন্ম

    শ্রীজিৎ জানা


    দ্বিতীয় সন্তান যখন আবার মেয়েই হল একেবারে ভেঙে পড়ে অসীম। ভীষণ আশা করেছিল এবারে ছেলেই হবে।তাছাড়া আশা করাটা বোধহয় অসীমের পক্ষে অমূলক নয়।বাবার একমাত্র ছেলে অসীম।তার ঠাকুমা বোলতো শিবরাত্রির সলতে। বংশ রক্ষাকারী বলে বাড়িতে অসীম দুধেভাতে আহ্লাদে বড় হয়েছে। গ্রামে অকুড় সম্পত্তি। ধানিজমি, পুকুর,সব্জীআনাজ, আম, জাম কাঁঠালের বাগান, সবেমিলে মিনি ভূস্বামী বলা যায়। লেখাপড়াতে বরাবরই চৌকস সে। স্কুলের চাকরী পেতে খুব একটা ঝক্কি পোয়াতে হয়নি তাকে। বাবা অবিনাশ ঘোষাল তো যারপরনাই খুশী ছেলের চাকরীর সুবাদে। দু'পুরুষ বাদে তাদের বংশে কেউ একজন সরকারী চেয়ারে বোসলো। অম্নি অবিনাশ চন্দ্র গোঁ ধরল বৌমা করবে চাকরীয়ালা। যেমন ভাবনা তেমন তার দৌড়ঝাঁপ। গিন্নী প্রভা খানিকটা বেঁকে বসে।
    --- চাকরীয়ালা বৌমা এলে কে সংসার সামলাবে! কলম ঠেলে এসে খুন্তি নাড়তে যাবে কেন! মাস ফুরোলে মোটা টাকা মাইনে তার , শুনবে কারুর কথা!
    ---আরে আপ ভালো তো জগৎ ভালো। তুমি খামখা বাড়াবিস্তর ভাবছ। খোকা আমাদের একমাত্র ছ্যানা। ভালো হলেও সই আর খারাব হলেও সই।
    প্রভার কথা ফুৎকারে উড়িয়ে পাঁচ-সাতখানা ঘটক লাগিয়ে দেয় অবিনাশ। শেষ অব্দি চাকরী করা বৌমাও জুটিযে ফেলে। শিপ্রা একটা প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা।
    বিয়ের দু'বছরের মাথায় শিপ্রার কোলে আসে অদ্রিজা। কী টুকটুকে মুখখানা। ঘোষাল গিন্নী প্রভার মুখে হাসি ধরে না।বলে,
    --দ্যাখো দ্যাখো পুন্নিমার চাঁদ কেটে যেন বসিয়ে দিয়েছে দিদুনের মুখে।
    অবিনাশ চন্দ্র মিয়ানো হাসি মুখে মেলে ধরে। মনের ভিতরে যে তার অন্য আশা হাঁ করে বসেছিল তা ঘোষাল কত্তার মুখ দেখলে বোঝা যায়।রাতে বিছানায় গিন্নীকে ধমকে উঠে অবিনাশ।
    --- হয়েছে তো নাতনি! তাতেই দেখি খুশিতে খলখলিযে উঠেছো! নাতি তো হয়নি! হলে তাহলে কী নাই করতে।
    ---মেয়ে ঘরের লক্ষ্মী সেটা যদি তুমি বুঝতে।
    ---আমার বোঝার দরকার নেই। আর তুমি হযেছো শাউড়ী, বলিহারি! কোন কিছুই কী বৌমাকে শিখাতে নেই!
    ---অরা আজকালকার বৌমা। মোদের কথা শুনবে কেন? অরা তিথি-বার দেখে মেলা মেশা,ঠাকুর থানের ওষুধ খাওয়া কুনুদিন মানবে নি।
    ---মানে নি বলেই যাউ বংশ উজাড় হয়ে। এত সম্পত্তি ভূতের বাসা হয়ে জাউ।
    --- কেন হবে? বৌমার আর কি বাচ্চাকাচ্চা হবেনি!
    ---দেখ আবার অরা  ভিতরে ভিতরে কীসব প্যালান করে রেখেছে।

    অসীম ভেবেই রেখেছিল আরেকটা সন্তান তারা নেবে। শিপ্রারও ইচ্ছে অদ্রিজার একটা ভাই হোক। তবে ওরা দুজনেই কিছুটা সময় নিচ্ছিল। মাঝে দেরি হচ্ছে দেখে শিপ্রার দিদা একদিন বলেই ফ্যালে,
    ---আর ছ্যানাপনা তমরা লিবেনি না কী? কথায় আছে এক টাকাও টাকা আর একটা ছ্যানাও ছ্যানা নাকি!
    প্রথমে মেয়ে হওয়া মানেই পরের সন্তান কে আসবে, এ নিয়ে মারাত্মক একটা চাপ মা-বাবাদের ঘিরে রাখে সারাক্ষণ। কমন রুমে স্কুলের কলিগদের অনেকেই চোখ নাচিয়ে অসীমকে বলে,
    ---সেকেন্ড ইস্যু নিচ্ছো নাকি ব্রাদার।
    ইঙ্গিত স্পষ্ট অসীমের কাছে। শিপ্রাকেও শুনতে হয় কত গালগল্প। তার ছোট মাসীর ছেলের তো পরপর দুটোই মেয়ে। কলিগ অপর্ণার দাদারও পরপর তিনটে। মিড ডে মিলের রাঁধুনিরা পর্যন্ত শিপ্রাকে জোর করে বলতে ছাড়েনা,
    ---জান ত ম্যাডাম ভগমান একচোখা।যাকে ব্যাটা দ্যায় ত ব্যাটাই দিয়ে যায়। আর যাকে মেইছ্যানা দিবে তাকে শুধু মেইছ্যানা।
    শিপ্রা কারো কথার উত্তর দ্যায় না। অদ্রিজার বয়স পাঁচ পেরোতেই ডাক্তারের পরামর্শ নেয় ওরা দুজনে।  বন্ধু জয়ন্ত একদিন অসীমকে ডেকে বলে,
    ---শোন্ ব্যাটাচ্ছেলে  পুত্র জন্ম দেওয়া ইজি ব্যাপার না।  সেকালে রাজারা পুত্রেষ্টি যজ্ঞ কোরতো।সেসব সেকেলে ব্যাপার। তবে এক্ষেত্রে বস্ পুরোটাই ফিজিক্যাল প্রোসেস। তার জন্য একটা ডিফারেন্ট সেক্সচুয়াল মেথড ফলো করতে হয়। কখন সেক্স করবি,কীভাবে করবি সবই প্রেসকাইব করে দেব। ওটা ফলো কর। পরে একটা পার্টি দিয়ে দিস।
    অসীম কথাটাকে উড়িয়ে দিতে পারে না। জয়ন্তর দুটোই ছেলে। অগত্যা উৎসাহ ভরে জয়ন্তর নির্দেশ মানতে রাজি হয়।
    এদিকে শিপ্রার উপরে চলে প্রভার জোরজুলুম। পঞ্চানন্দ ঠাকুরের কলা বেলপাতা খেতে হবে। তার খাওয়ার নিয়মে অন্যথা করা যাবেনা। মুখে পুরে পুকুরে ডুব দিতে হবে।আর সেদিন থেকে কাঁঠালি কলা খাওয়া বন্ধ।ওদিকে শিপ্রার মা মানত করে বসে তাদের বুড়ো শিবের থানে। ছেলে হলে দন্ডী কাটবে শিপ্রা। মেজ মাসি তাদের গ্রামের মহাপ্রভু থানে শিপ্রাকে নিয়ে গিয়ে পুজো দেন। থানের মাটি মুখে নিতে বলে শিপ্রাকে। জয়ন্তর সেজ জেঠিমা কোথাকার এক পীরের থান থেকে তাবিজ এনে শিপ্রার হাতে বেঁধে দেন। শিপ্রার ভেতর থেকে গর্জে উঠতে চায়। কিন্তু পারে না। সাতপাঁচ ভেবে সবার সবরকম নিয়মকানুন মুখ বুজে মেনে নেয়।
    পিসি শ্বশুড়ি বাড়িতে এলেই শিপ্রার কানের কাছে একই কথা প্যান প্যান করে শোনাতে থাকে,
    ---পুত্র না হলে পুত নরকে ঠাুঁই হয়ে পুরাণে বলে। বৌ একটা ব্যাটাছ্যানা কর দিখি।
    কথা শুনে গা-পিত্তি জ্বলে শিপ্রার। নিজের অথচ তিন ছেলে থাকতেও কেউ ভাত দ্যায় না। আজ এর ঘর কাল ওর ঘর ঘুরে মরে। তবু ছেলের আশ করতে ছাড়েনা। শিপ্রারও মনে মনে একটা ছেলেই চায়।

    সকলের সবটা মেনেই সন্তান আসে শিপ্রার গর্ভে। ন'মাসে সাধের ভোজে পাড়ার বয়স্ক মহিলারা মুখ বুজায় না,
    ---বুইলি পভা তোর ইবার লাতিই হবে।
    --মোরও তায় মনে হয়। পেটটা বোতুলা লাউ হয়ে ঝুলে গ্যাছে।
    ---ঠিকই বোলছো। শরীলটা ত একেবারে ভেঙে গ্যাছে।চোখের গর্তে দুমুঠা চাল ধরে যাবে।
    প্রভা তাদের কথা শুনে খুশিতে ডগমগ করে। দ্বিগুন খাতির যত্ন করে তাদের। শিপ্রারও চোখের কোণে খুশির আলো ঝিকিয়ে ওঠে।

    সেদিন শিপ্রা একটু যন্ত্রণা অনুভব করতেই জয়ন্ত নার্সিংহোমে ভর্তি করে দ্যায়। ডাক্তার পরীক্ষা করে বলেন,
    ---আজই ডেলিভেরি হবে।বাট্ সিজার কেস।
    জয়ন্ত সম্মতি দেয়। ঘোষাল কর্তা বারবার ফোন করতে থাকে। শিপ্রা তখন লেবার রুমে। হঠাৎ ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়।  তারই মাঝে এক সিস্টার এসে জানায়,
    ----জয়ন্ত ঘোষালের বাড়ির কে আছেন?
    ---আমি
    বলেই ঝটিতে দৌড়ে যায় জয়ন্ত সিস্টারের দিকে। সিস্টার হাসিমুখে জানায়,
    ----আপনার মেয়ে হয়েছে। লাইগেশন কি করাবেন?
    শোনামাত্রই জয়ন্ত অনুভব করে যেন পায়ের তলার মাটিটা নড়ে উঠল চরম কম্পনে।

    জয়ন্তর মন থেকে পুত্র সন্তান লাভের ইচ্ছেটুকু মুছে গ্যাছে এক্কেবারে। ইতিমধ্যে বাবা গত হয়েছেন।শিপ্রাও তেমন কোন উৎসাহ দেখায় না আর। বড় মেয়ে অর্ণা পড়ছে সেভেনে। অদ্রিজা ক্লাস ফোরে। গ্রাম ছেড়ে বাড়ি করেছে সড়ক পথের ধারে শহরতলি এলাকায়। দুজনেই স্কুল আর মেয়েদের পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত।এরই মধ্যে জয়ন্তর এক কলিগ সুমন্ত তাকে বোঝায়।জীবনে ছেলে কেন দরকার। জয়ন্ত তার কথাকে প্রথম দিকে পাত্তা দ্যায় না। শিপ্রাকে শোনানো মাত্রই ঝাঁঝিয়ে উঠে সে। দ্বিতীয় বার মেয়ে হতে তাকে কত কথা শুনতে হয়েছে।হাসাহাসি করেছে অনেকেই মুখটিপে। কেউ কেউ আড়ালে অপয়া বলতেও ছাড়েনি। ঝরঝরিয়ে কেঁদেছে শিপ্রা। জয়ন্তকেও কম হ্যারাস হতে হয়নি। আড্ডায় বন্ধুরা কথায় কথায় বলছে,
    ---তোর দ্বারা ছেলে করা হবে না।
    ---আরে ওর যন্ত্রে জোর নেই।জং ধরে গ্যাছে।
    কেউ তো ইয়ার্কির চরম সীমা ছাড়াতে কুন্ঠাবোধ করেনি,
    ---ভাল একটা এডভাইস দিচ্ছি ব্রাদার।  নিজে না পারলে গোয়াল বদলে দে।

    কথাটা শোনাতে যেন জয়ন্তর কানে কে যেন গরম সীসা ঢেলে দিল। তাতেও মুখে হাসি রেখে সব মেনে নেয়।
    তবে মাঝে মাঝে মনটা ভারাক্রান্ত হয় তার। বয়সকালে কী হবে তাদের দুজনের। কে দেখবে তাদের। গাঁয়ের অত সম্পত্তি!  এখানে এতবড় বাড়ি! কিন্তু দুটো সন্তানের পর আবার সন্তান নিলে লোকের কাছে মুখ দেখাবে তারা কিভাবে! অথবা আবার যদি মেয়েই হয় তবে একেবারে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে তারা। এই ক'বছরে কিছুটা ধাক্কা তারা কাটিয় উঠতে পেরেছে। 
    কিন্তু সুমন্ত পিছি ছাড়ে না। কোন একটা অছিলায় জয়ন্তর বাড়ি এসে শিপ্রাকে বোঝায়। শিপ্রা মুখের উপর বলে,
    ---আর কোন রিস্ক নিতে মোটরই রাজি নয় আমরা।
    হাল ছাড়ে না সুমন্ত। বলে,
    ---কলকাতার এক নার্সিংহোমের সাথে আমার পরিচিত। ওরা খুব গোপনে এবং পরিচিতদের জন্য করে থাকে। আমি সেটার দায়িত্ব নিচ্ছি।  ছেলে হলে রাখবে,আর নাহলে…।
    প্রথমটা বেঁকে বসলেও, পরে জয়ন্তর স্বর কিছুটা নরম শোনায়। শিপ্রা তবে কোনমতেই সায় দেয় না।

    রাতে বিছানায় জয়ন্ত তার মনের কথা বলে। শিপ্রা রুখে উঠে,
    ---লিঙ্গ নির্ধারণ আর ভ্রুণহত্যা দুটোই তো অপরাধ।
    ---সে তো জানি কিন্তু আমাদের ফিউচারটা তো ভাববে।
    ---কেন? মেয়েরা তো আছে?ওরা কম কিসে? তাছাড়া লোকে কি বলবে। দুজনে টিচার হয়ে তিনটে বাচ্চা নেব!
    জয়ন্ত গুচ্ছের লোকের নাম ধরে ধরে শিপ্রাকে বোঝায়। তার বাবার ইচ্ছের কথা শোনায়। অবশেষে শিপ্রা অরাজির মতো করে রাজি হয়। সুমন্তর সাথে কলকাতা গিয়ে নার্সিংহোমে কথা বলে জয়ন্ত। একটা মোটা টাকায় রাফা হয় চুক্তি। কিন্তু পুরোটাই ভীষণ গোপনে। 
    এদিকেও গোপন রাখে জয়ন্ত। কেউ টের পায় না তাদের তৃতীয় সন্তান গ্রহণের কথা

    চার মাস পর যথারীতি নার্সিংহোমে যায় দুজনে। ডাক্তারবাবু  একটা টেস্ট করেন শিপ্রার। রেজাল্ট শুনে দুজনের মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ে। শিপ্রার গর্ভে যে ভ্রুণ বেড়ে উঠছে আসলে সে একটি মেয়ে। এবার কী করবে তারা। দিশেহারা লাগে দুজনকে।
    সুমন্তকে ফোনে জানায় জয়ন্ত। সুমন্ত সব শুনে আশ্বস্ত করে তাদের,
    ---আরে টেনশন কোরো নাতো। কথা তো হয়েই আছে।মেয়ে হলে অ্যাবরশান করাবো।তোরা ফিরে আয়। আমি বাকিটা কথা বলে নিচ্ছি।
    জয়ন্ত স্বাভাবিক হতে পারেনা। তবে শিপ্রার কাছে পুরোপুরি নিজেকে প্রকাশ করতে চায় না।  দুজনে বাড়ি ফিরে আসে।

    পরের দিন সুমন্তকে সাথে নিয়ে জয়ন্ত আবার রওনা দেয় কলকাতা। নার্সিংহোম মালিক সুমন্তর ভীষণ ক্লোজ। তার অফিসে কথাবার্তা হয়। কিন্তু ডাক্তার বাবু একটা কন্ডিশন সামনে রাখেন। তিনি স্পষ্ট জানান,
    ---বেবি চার মাসের মানে, অলরেডি তার হাত ও পায়ের অবয়ব তৈরী হয়ে গ্যাছে। এই সিচুয়েশনে বেবিকে ডেলিভেরি করাতে হবে। ওটা আমার দায়িত্ব বাট মারতে আমি পারবো না। বেবির বাবাকে ওই কাজটা করতে হবে।

    নার্সিংহোম মালিক মিস্টার দত্ত বলেন,
    --বাট স্যার ওরা আমাদের ভীষণ ফ্যামিলিয়। তাছাড়া ওদের সাথে একটা চুক্তি হয়েছে। ওরা পুরোটাই পেমেন্ট করেছে অলরেডি।
    ----সরি মিস্টার দত্ত। এটা আমি পারবো না। বেবিকে মারার কাজটা ওর বাবাই নিক। তাছাড়া আমাকে না জানিয়ে এই ডিসিশন আপনার নেওয়া ঠিক হয়নি মিঃ দত্ত।
    ---কিন্তু স্যার….
    ----কোন কিন্তু নয়। তেমন হলে আমি আপনার হোমে আসা বন্ধ করে দেব। প্রাণ বাঁচানো আমার কাজ,হত্যা নয়। আয় এম ও ডক্টর -নট বুচার! একজন বাব হিসেবে কেনই বা এই ডিসিশন নিচ্ছেন। যাকে জন্ম দিয়েছেন,তাকে সানন্দে স্বাগত জানান। ছেলে বা মেয়ে আজকের দিনে সবাই তো ইকুয়াল। মেধায়,কার্যক্ষমে এভরি হোয়ার। এই অনৈতিক কাজ আপনি কেন করছেন?
    চুপ করে যায় মিস্টার দত্ত। তিনি বিলক্ষণ জানেন ডাক্তারের মেজাজ-মর্জি। চোখ ইশারা করে জয়ন্তদের বেরিয়ে যেতে বলেন। ডাক্তারবাবু চলে গেলে,মিস্টার দত্ত্ জানা,
    ---চিন্তা নেই সুমন্তবাবু। আগামীকাল আসুন অন্য কাউকে দিয়ে করানোর অ্যারেঞ্জ করে রাখছি। ডোন্ট ওরি।

    একরাশ ভাবনা নিয়ে বাড়ি ফিরে জয়ন্ত। শিপ্রাকে সত্যিটা জানায় না। তবে অনেক রাত অব্দি চোখে-পাতায় এক করতে পারে না। হাজার ভাবনা হুড়মুড়িয়ে তার চোখে ঝেঁপে আসে। একটা পুত্র সন্তানের আশায় কী বিভৎস হয়ে উঠছে তারা। কী নিষ্ঠুরতার পথ বেছে নিতে হবে তাকে। ধীর পায়ে উঠে যায় পাশের ঘরে। যেখানে শুয়ে আছে তার দুই মেয়ে।সারাক্ষণ তাদের দুজনকে জড়িয়ে থাকে মেয়ে দুটি। জয়ন্ত বিরক্ত হয় কথায় কথায়। শিপ্রাও মুখ ঝামটা দ্যায় তাদের। তারা সহজে রাগে না। মাথা নীচু করে সরে যায়। জয়ন্তর কত কলিগ এসে তাদের ছেলেদের বদমাইশির কথা বলে। আশেপাশে দেখে মা-বাবদের উপর ছেলেদের অত্যাচা। নিউজ দেখতে দেখতে শিউরে উঠে। তার মা বলে,
    ---জানু কচি মেয়েদের মায়া বড় মায়া। আজ অদের হেলাছেদ্দা কোরছু একদিন দেখবি অরাই তোদের চোখের মণি হবে।

    বিছানায় ফিরে আসে জয়ন্ত। নিজেকে নিজেই যেন ঘৃণা করতে থাকে। পরক্ষণেই ভাবে আবার মেয়ে হলে চারপাশ থেকে যারপরনাই বিদ্রুপ ছুটে আসবে। রাস্তাঘাটে বেরোনো দায় হয়ে যাবে। কিন্তু তাবলে নিজের হাতে মারতে হবে সন্তানকে। শিউরে উঠে জয়ন্ত।
    কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল সে মনে নেই।শিপ্রার ঠ্যালায় ধড়ফড় করে উঠে বসে। সেই মুহুর্তে বেজে উঠে সুমন্তর ফোন। আজ শিপ্রাকে নিয়ে কলকাতা যেতে হবে। মিস্টর দত্ত সব অ্যারেঞ্জ করে রাখবেন। চটপট করে রেডি হয়ে শিপ্রাকে আসছি বলে বেরিয়ে যায় জয়ন্ত। রাস্তার মোড়ে এসে সুমন্তর মোবাইলে কল করে সে। ওই প্রান্ত থেকে সুমন্ত বলে উঠে,
    ---আরো কোথায় তোমরা। কুইক এসো আটটার ট্রেনটা না ধরতে পারলে টাইমলি পৌঁছাতে পারবো না।
    ---তুমি দাঁড়াও আমি আসছি। একটু কথা আছে।
    বলেই ফোনটা পকেটে রেখে বাইকটা ঘুরিয়ে নিয়ে স্টার্ট দ্যায় জয়ন্ত। শর্টকাট রাস্তাটা মারাত্মক থারাপ। অন্যদিকে দিয়ে তাই পৌঁছবে সে আজকে। দেরি হলেও ক্ষতি নেই। ট্রেন ছেড়ে যাক স্টেশন দুঃখ নেই,বাকি সব থাকলেই তো হোলো তাদের।

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
     


  • উই ছাতু /সূর্যকান্ত মাহাতো
  • জঙ্গলমহলের জীবন ও প্রকৃতি

    পর্ব - ২৬

    উই ছাতু

    সূর্যকান্ত মাহাতো

    এ যেন হিমালয়ের ঠিক ক্ষুদ্র রূপ। আছে হিমালয়ের মতোই উঁচু উঁচু শৃঙ্গ। তবে হিমালয়ের মতো শক্ত ও ভরাট নয়। একেবারে নরম। আদুরে। অনেকটা আবার ঝুরঝুরেও। আছে অজস্র চোরা কুঠুরি। বায়ু চলাচলের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অসংখ্য রন্ধ্র পথ। কারণ ওখানে একজন রাজা থাকেন। একজন রাণীও থাকেন। আর থাকেন তাদের হাজারো সৈন্য সামন্ত। কাঠ, মাটি, শুকনো পাতাকে মুখের লালা রসে ভিজিয়ে ভিজিয়ে হিমালয় সদৃশ এই রাজ্য ও রাজপ্রাসাদ ওরা গড়ে তোলে।

    কিংবা এক টুকরো দুবাইয়ের বাড়িগুলোর সঙ্গেও তুলনা করা যেতে পারে। সেখানকার সুউচ্চ ইমারতগুলো যেমন আকাশে মুখ তুলে থাকে, জঙ্গলমহলে শাল গাছের পাদদেশেও তেমনি সেগুলো মুখ তুলে আছে। গগনচুম্বী ইমারতগুলোর মতোই আকাশ পানে তাকিয়ে আছে। দুবাইয়ের বাড়িগুলোকে মানুষ আধুনিক যন্ত্র ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে গড়ে তুলেছে। কিন্তু জঙ্গলমহলের গম্বুজাকার এই বাড়িগুলো কেবলমাত্র মুখের লালা রস মিশিয়ে মাটিকে কাদামাটি বানিয়ে নির্মিত হয়েছে। তফাত কেবল এটুকুই।

    ঠিক ধরেছেন। উইপোকা ও উই ঢিবির কথাই এতক্ষণ বলছিলাম। উইপোকা। ওরা অন্ধ। ওরা চোখে দেখতে পায় না। সূর্যের আলো তো ওরা একেবারেই সহ্য করতে পারে না। তাই এমন আলোহীন বদ্ধ বাড়ি বানায়। সেখানে খোলা জানালা নেই। বরং ভিতরের কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের জন্য অজস্র বায়ুপথ আছে। সে কারণেই এমন বদ্ধ বাড়িতে ওরা সহজেই বসবাস করতে পারে। জঙ্গলমহলে এই উইপোকার বাসা বা উইপোকার ঢিবিগুলোকে অনেকে "টিলা" বলেও ডাকে। অনেকটা লাল তামাটে রঙের হয় এই টিলাগুলো।

    যদি ধরেই নিই হিমালয়, তাহলে তার পর্বত শৃঙ্গের শ্বেত শুভ্র বরফের দৃশ্য প্রথমেই চোখে পড়ে। সেখানে সূর্যের আলো পড়ে সেই শুভ্র বরফের হীরক দ্যুতি যেন বহুলাংশে বেড়ে যায়। জঙ্গলমহলে বর্ষার শুরুতে কিছু কিছু উইঢিবিগুলোও তেমনি। শৃঙ্গভাগটা শ্বেতশুভ্র হয়ে ওঠে। সকালের নরম আলোয় তখন তার শোভা অনিন্দ্য সুন্দর হয়ে উঠে। অনেকসময় শরীরের অন্য অংশেও যেভাবে গজিয়ে উঠে, দেখে মনে হবে সাদা সাদা বরফের গুচ্ছ যেন লেপ্টে আছে। তবে বরফ নয় ওগুলো হল "উই ছাতু"।

    আবার যদি দুবাইয়ের গগনচুম্বী বাড়ি গুলোর মতো মনে করা হয় তাহলেও বেশ মিল পাই। সে বাড়িগুলোর মাথায় যেমন অজস্র সাদা সাদা টুনি বাল্ব জ্বলে ওঠে। জঙ্গলমহলের উইঢিবিগুলোও ঠিক তেমন। অজস্র প্রস্ফুটিত উই ছাতুর দ্যুতি সেই টুনি বাল্বকেও হার মানায়। সকালের নরম আলো মেখে অসাধারণ শোভা বৃদ্ধি করে। 

    হ্যাঁ "উইছাতু"-র কথাই বলছি। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম-Termitomyces microcarpus(টারমিটমাইসিস মাইক্রোকারপাস)। একে উই ছাতু বাদেও আরও অন্যান্য কএকরি নামে ডাকা হয়। যেমন "টিলা ছাতু", "মেকা ছাতু" বলেও ডাকা হয়। উইয়ের বাসাকে এখানকার মানুষ "মেকা" বলেও ডাকে। শুধু তাই নয় অনেকে একে ছোট বালি ছাতু বলেও ডাকে। আসলে বালির উপর হলেও তার নিচে উইপোকার বাসার কোনও না কোনও একটা বাসা থাকেবেই। তবেই এই ধরনের ছাতুগুলো  তৈরি হয়।

    উইয়ের ঢিবিগুলোতে কীভাবে এই ছাতু গড়ে ওঠে? আসলে কয়েক হাজার উইপোকা এই ঢিবিগুলোতে বসবাস করে। তাদের বিষ্ঠা এই ঢিবিগুলোর গায়ে জমতে থাকে। এরপর বর্ষায় বৃষ্টির জল পেলেই তখন ছাতু তৈরি হওয়ার একটা উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে ওঠে। বিষ্ঠা,  জল ও মাটির সংমিশ্রণে গজিয়ে ওঠে এই ছাতুগুলো। প্রথমে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শ্বেত শুভ্র ছাতুর ডিম তৈরি হয়। এরপর সেই ডিমগুলো একটু একটু করে বাড়তে থাকে। আসলে এগুলো ডিম নয়। ছাতুগুলোর একেবারে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়। তারপর বাড়তে বাড়তে একসময় কড়ি হয়ে ফুটে ওঠে। কড়ির সময় মাথাটা দেখতে অনেকটা টুপির মতো হয়। তবে এই ডিম থেকে কড়ি হয়ে ফুটতে একদিনের বেশি সময় লাগে না। ডিমগুলো দেখলে মনে হবে যেন হাজারো মুক্তোর বিন্দু কোন এক দেওয়ালে থরে থরে সুসজ্জিত ভাবে বসানো আছে।

    ডিমগুলো ক্রমশ বড় হতে থাকে। একটু একটু করে গজিয়ে ওঠে একটা শিক বা ডাঁটা বা দন্ড। তখন অনেকটা আলপিনের মতো দেখায়। মাথাটা পিনের আকার থেকে ধীরে ধীরে গোল হয়ে বড় হতে শুরু করে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন উই এর ঢিবিগুলোতে ছাতুগুলো পিনের মত গাথা হয়ে হয়ে আছে। এদের শরীর খুবই নরম হয়। একটু চাপেই ভেঙে পড়ে। নয় তো পিষে যায়। ফোটা অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকে না। খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়।

    আরও সহজ ভাবে বললে বলা যায়, এর আকার হল একটি ছাতার একেবারে ক্ষুদ্রতম রূপ। উপর ভাগটা বেশ মসৃণ হয়। তবে ভেতরের অংশটা দারুণ। মেয়েদের শাড়ির ভাঁজ করা কুচির মতো অসংখ্য খাঁজ কাটা কাটা। ফোটা অংশটা আবার অনেক সময় পাপড়ির মতো স্তবকেও অনেক সময় ভাগ হয়ে যায়।

    এবার আসি এই ছাতুর স্বাদের কথায়। এর স্বাদের কথা বলার আগে একটা প্রচলিত প্রবাদের কথা বরং শোনা যাক----

    মাছের মধ্যে রুই
    শাকের মধ্যে পুই
    এবং ছাতুর মধ্যে উই

    প্রচলিত এই প্রবাদের কথা থেকে সহজেই আন্দাজ করা যায় যে উই ছাতুর স্বাদ ঠিক কেমন হতে পারে। রুই মাছ ও পুঁইশাক যেমন স্বাদে ও গন্ধে অসাধারণ খেতে। ঠিক তেমনি এই ছাতু। স্বাদে একেবারে অতুলনীয়। আসলে ছাতুর এই স্বাদের আসল রহস্যটা লুকিয়ে আছে তার রন্ধন প্রণালীর উপর। অন্যান্য ছাতুর মতো একটু পিচ্ছিল ভাব তো একটা আছেই। সেটা বরং এই ছাতুর স্বাদকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

    এই ছাতু তুলে বা কুড়িয়ে এনে প্রথাগতভাবে রান্না করা যায় না। ছাতুর ডাঁটার মাটি লেগে থাকা অংশটা ভালো করে হাতের দুই আঙুলে কেটে দিতে হয়। ছাতুগুলোর আকার খুবই ছোট হওয়ায় পরিষ্কার করে বাছতে দীর্ঘ সময় লাগে। তাই অনেক বেশি ধৈর্য নিয়ে একাজ করতে হয়। ছাতু এত বেশি নরম যে স্বাভাবিক ভাবে রান্না করতে গেলে এর অস্তিত্বই তেমন একটা থাকে না। এ ছাতু রান্নার সর্বশ্রেষ্ঠ দুটি পদ্ধতি হল "বাটিপোড়া" এবং "পাতাপোড়া"। এই দুটো রান্নাতেই গুঁড়ো মশলা নয়, বরং গোটা মশলা ব্যবহার করা হয়। গোটা জিরে, গোটা হলুদ, কাঁচা লঙ্কা ভালো করে শিলে বেঁটে সরষের তেল মাখিয়ে "বাটিপোড়া" করে খেলে এর স্বাদ অসম্ভব রকমের বৃদ্ধি পায়। ঠিক একইভাবে মশলা মাখিয়ে "পাতাপোড়া" করে খেলেও এর স্বাদ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। শালপাতার মতো যেকোনও পাতায় পোড়ালে সেই পাতার একটা সুন্দর ফ্লেভার ছাতুর সঙ্গে মিশে যায়। তখন তো এর স্বাদ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। 

    এবার এর পুষ্টি গুণের কথা একটু বলা যাক। এই ছাতু যেমন সুস্বাদু তেমনি পুষ্টিগুণেও ভরপুর। এই ধরনের ছাতুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে উদ্ভিজ্জ প্রোটিন। সাধারণত নিরামিষভোজীদের কাছে যা খুবই উপকারী। সেইসঙ্গে খনিজ পদার্থ ও একাধিক ভিটামিন তো আছেই। আছে ক্যালসিয়াম সহ অন্যান্য খাদ্য গুণাগুণ।

    এই ছাতু কুড়িয়ে এনে বেশিক্ষণ রাখা যায় না। তাই বাজারে এই ছাতু সহজে বিক্রী করতে দেখা যায় না।

    এই ছাতু কেবল মানুষেই খায় না। যাদের কারণে এই ছাতুর জন্ম সেই উই পোকাদেরও অত্যন্ত প্রিয় খাবার। সব ছাতু কুড়ানো সম্ভব নয়। তাই অবশিষ্ট ছাতুগুলো তখন ওদেরই প্রাপ্য। এছাড়াও যেগুলো মানুষের চোখের আড়ালে রয়ে যায় সেগুলো তো পুরোটাই ওদের।

    এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। লক্ষ্মীর মায়ের সেবার খুব অভিমান হয়েছিল। ওর নিজের মরদের সঙ্গে। তরকারি নিয়ে খুব খোঁটা দিচ্ছিল স্বামী। কিন্তু লক্ষ্মীর মা পাবেই বা কোথায়? তাকে যা এনে দিবে, সে তো তাই রান্না করে খাওয়াবে! কিন্তু কে শোনে সে কথা। তাই লক্ষ্মীর মায়ের সেদিন থেকে খুব অভিমান হয়েছিল। একদিন পর স্বামী মাংস কিনে এনে রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু লক্ষ্মীর মা পাত্তা দেয়নি। মাংস ওভাবেই পড়েছিল। স্বামী কয়েকটা খারাপ খারাপ কথা বলে তখন বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। 

    এদিকে তারপর থেকেই লক্ষ্মীর মায়ের একটু একটু করে অনুশোচনা হতে লাগল। ভাবল, এতটা বাড়াবাড়ি না করলেও হত। বেচারা খাবে বলে কত শখ করে মাংস কিনে এনেছিল! একমাত্র তার জন্যই খেতে পেল না। সেদিন রাত্রিতে লক্ষ্মীর মায়ের আদর মাখা হাতটাও এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়েছিল ওর স্বামী। কী আর করবে! একবুক কষ্ট নিয়েই পাশ ফিরে শুয়েছিল লক্ষ্মীর মা।

    পরদিন সকালে ছাগলের দড়ি আনতে গিয়েই চোখে পড়েছিল টিলা ভর্তি ছাতু। এমন দৃশ্য দেখেই খুশিতে নেচে উঠল। যত্ন করে তুলে এনেছিল বাড়িতে। তুলতে তুলতে ভাবছিল,  উই ছাতুর "বাটিপোড়া" পেলে তার স্বামীর আর কোনও রাগ অভিমান থাকবে না। কারণ ও যে এই ছাতু খেতে ভীষণই ভালোবাসে।

    হলও তাই। উই ছাতুর তরকারি পেয়ে স্বামীর সব মান অভিমান কেটে গেল। 

    উই ছাতুর এই মরসুমে জঙ্গলমহলের প্রতিটি পরিবারেই এমন কত খুশি ও আবেগ যে ছড়িয়ে থাকে তা বলে বোঝানো যাবে না। সেটাই বা কম কী!

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
     


  • খর্জুর বীথির ধারে- ২/মলয় সরকার
  • খর্জুর বীথির ধারে

    মলয় সরকার

    (২য় পর্ব )দ্বিতীয় পর্ব


    রিয়াধ বেশ ফর্সা, লম্বা, চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা, শক্ত পোক্ত অথচ ভদ্র গোছের চেহারার মানুষ।ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজী বলে, তবে বেশ বোঝা যায়। নিজেই কথা বলে। অর্থাৎ, কথা বলতে যে খুব অসুবিধা হবে না, তা বুঝলাম।

    গাড়িতে উঠেই সে কথা বলতে বলতে চলল, আজ প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, আপনারাও ক্লান্ত। আজ হোটেলে বিশ্রাম করুন। কাল সকাল থেকে আমাদের যাত্রা আরম্ভ।

    প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে এমন সময় গাড়ী গিয়ে থামল আম্মান ম্যারিওট হোটেলের সামনে। এই সব পাঁচতারা হোটেলের উপর আমি খুব বিরক্ত। এদের কেতা কানুন, রঙ ঢং , টিপস এসব বেশি। কিন্তু ভিতরে ভিতরে অনেক অসুবিধা হয়, যা আমি এর আগে অনেক বড় বড় জায়গায় অনেকবার পেয়েছি। সে জন্য আমার নিজের মনে হয়, এর থেকে কম মানের তিন তারা হোটেল ভাল। 

    যাই হোক, রিয়াধ নামার সময় হাতে একটা মোবাইল ফোন ধরিয়ে বলল, আপনারা যতদিন এখানে থাকবেন, এই ফোনে আমাকে যোগাযোগ করে নেবেন। কাল সকাল ঠিক ন’টার সময় আসব।নীচে থাকব। আপনারা রেডি হয়ে নেবেন।
    অন্যান্য জায়গায় আমাকে নতুন জায়গার নতুন সিম নিতে হয়, এখানে সে ঝামেলাটা আর রইল না।

    ও চলে গেল। 
    আমরা ঢুকতে গিয়ে দেখি হোটেলের গেটের মুখে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। প্রথম দর্শনে চমকে ও থমকে গেলাম। এটা কি রকম ব্যাপার, সিকিউরিটির গেটের পাশে আগুন কেন? খেয়াল করে দেখি, ওটি সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য। আগুনটি বোধ হয় গ্যাসে চলছে, বদ্ধ জায়গায়, অনেকটা আমাদের রাজঘাটে গান্ধী সমাধিতে যেমন আছে তেমন।

    যাই হোক, প্রাথমিক টেবিলের কাজকর্ম সেরে ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিলাম। 

    আমরা তৈরী পরদিন সকালে।  ঠিক সময়ে দেখি, রিয়াধও হাজির, ফোনে জানাল। আমাদের এক মুখ হেসে তাজা গোলাপের মত ‘ফ্রেস’ স্বাগত জানিয়ে গাড়িতে তুলল রিয়াধ।  উঠেই বলে দিল, গাড়িতে প্রচুর জলের বোতল আছে, যত খুশী জল খাবেন।আর একটা কথা, আমার গাড়িতে ওয়াইফাই আছে।আপনারা যেখানে খুশী ফোন করতে পারবেন।

     আমাদের এই সব ব্যবস্থা গুলো খুব ভাল লাগল। সত্যি কথা বলতে , আমি এর আগে একটা গাড়ীতেও ‘ওয়াইফাই’ দেখি নি । বাড়িতে দেখেছি। অনেক পরে আমাদের দেশে ট্রেনে, বা বাসেও হয়েছে শুনেছি।
    যাক, খুব ভাল হল। আজকের গন্তব্য, মাউন্ট নেবো। মাঝে পড়বে মাডাবা, এ ছাড়া আছে Shobak Castle ইত্যাদি।

    চলেছি রাস্তা দিয়ে।মাঝে ধূ ধূ মরুভূমির মত রাস্তা।মরুভূমির বুক চিরে একেবারে পরিপাটি চুলের মাঝে সুন্দর কাটা সিঁথির মত পথ দিয়ে চলেছি।সমস্ত বাড়ী, যা দেখা যাচ্ছে, কোন বিশেষ রঙ নেই।কেমন সাদাটে ধূসর রঙের পাথর দিয়ে তৈরী, আর বাড়ী গুলোর কোন বৈচিত্র্য নেই। শুধু একেবারে চৌকো বাক্সের মত পরপর সাজানো রয়েছে।ইউরোপের বাড়িগুলোর একটা সৌন্দর্য্য আছে, অনেক জায়গাতেই। হয় প্রাচীনত্বের ছাপ, নয়ত আকৃতি বা রঙের কিছু বিশেষত্ব। এখানে তা নয়, ঘরেরও কোন রঙ নেই সব একই রঙ, এর গঠনেরও কোন বৈচিত্র্য নেই।অনেক ফাঁকা ফাঁকা জায়গা। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ধূ ধূ ফাঁকা।

    জর্ডন খুব ছোট জায়গা। মানচিত্রে অনেক ছোট। কিন্তু তার গুরুত্বটা অনেক বেশী। এখানে সেই তুলনায় লোকসংখ্যাও যে খুব বেশি তা নয়, মাত্র ১১৫ জন এক বর্গ কি মি তে। 

    রায়েধ বেশ কথা বলে। চুপচাপ থাকা ওর স্বভাব  নয়। ও প্রথমেই বলে নিল, আপনাকে ‘স্যর’ বলব কিন্তু মিসেস কে ‘সিস্টার’ বলব। আমি বললাম, বল, আপত্তি কি।  ও বলল,না- আসলে আমার একটাই দিদি ছিল, যাকে আমি খুব ভাল বাসতাম। কিন্তু সে দিদি ছোটবেলায় মারা গিয়েছিল। এজন্য আমার সিস্টারের প্রতি একটা আলাদা দুর্বলতা মাখা ভালবাসা আছে। আমার, মিসেসকে দেখে ‘সিস্টার’ ডাকতে ইচ্ছা হয়েছে। 

    শুনে আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। আমি ভাবছিলাম, এক ভগ্নীহারার গোপন মনোবেদনার কথা। মানুষের অন্তরতম কোণের কথা তো আমরা জানতে পাই না। সেখানে কত দুঃখ, কত গোপন ব্যথা জমা হয়ে থাকে, যা একটু টোকা দিলেই বেরিয়ে আসে, আমরা নিজেরাই জানি না। আজ  সুদূর বিদেশে এসে এক ভিন্ন ভাষা ভাষী , ভিন্ন ধর্মী মানুষ, সব ভুলে শুধু তার অন্তরের দুর্বলতম স্থানটিকে প্রাধান্য দিয়ে  আমাদের আপন করে নিচ্ছে যা তার দৈনন্দিন রুজি রোজগারের  থেকে অনেক দূরে।এবং সেটি প্রথম পরিচতির মুখেই।আমাদের মধ্যে ও কি দেখেছে জানি না। আমিও তো বেরিয়েছি এই মানুষের মনের গুপ্তধনের সন্ধানে।এই সমস্ত পরশপাথরই তো আমার সঞ্চয়।
    এই সমস্ত টুকরো ছবিগুলোই জমা হয়ে থাকে মনের কোণে।আসলে, মন একটা বড় চালুনী। যেটি ধরে রাখবার সেটি ঠিক রেখে দেয় আবার কত বড় বড় অপ্রয়োজনীয় কথা ঝেড়ে ফেলে দেয়।

    এগোচ্ছিলাম Madaba Al Gharbi Street দিয়ে । যেতে যেতে এক জায়গায় দেখলাম , দূরে অনেক ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। আর একটা ছোট পাহাড় কাটা হচ্ছে। সেই পাহাড়ের পাথরের টুকরো নিয়ে যাচ্ছে ট্রাকের পর ট্রাক। পাথর গুলির রঙ ঐ সাদাটে ধূসর রঙের। আমি সেদিকে রায়েধের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। ও বলল, ওগুলো ফসফেট ফার্টিলাইজার।

     আমি বইতে ব্যাপারটা পড়েছিলাম। দেখি নি কখনও।সেটাও দেখলাম আশ্চর্য হয়ে।এখানকার মাটি পাথরে আছে ফসফেট । সেই ফসফেট সার হিসাবে প্রচণ্ড কাজে লাগে। সেগুলিই চলে যাচ্ছে, ফ্যাক্টরী হয়ে নানা দেশে। এখানে এই ফসফেটের বড় বড় ফ্যাক্টরী আছে ।সেটি এই দেশের এক বিশাল বড় রপ্তানী যোগ্য সামগ্রী। হিসাব করে দেখা গেছে, দেশের মাটির প্রায় ৬০ ভাগ ফসফেটে তৈরী। কাজেই এরা দেশের মাটি পাথরই বিক্রী করছে।একটা ব্যাপার! এত সার এখানে, অথচ এখানে এত মরুভূমি। সৃষ্টিকর্তার কি অদ্ভূত লীলা। যত দেখি আর ভাবি,আশ্চর্য হই।

    অনেকে আগে মাদাবা যায়, পরে নেবোতে। আমরা আগে গেলাম মাউন্ট নেবো। পাহাড়ে ওঠার সময় দেখি শুকনো লাল রঙের এক পাথরের পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে ঘুরে ঘুরে ওঠার রাস্তাটি বেশ সুন্দর লাগল। অনেকটা আমাদের দেশের জুলুক যাওয়ার রাস্তার পাহাড়ের মত।এখানে আগে খুব ভিড় হত না, কিন্তু সম্প্রতি খুব পর্যটকরা যাচ্ছেন। জায়গাটি অনেকটা পরিত্যক্ত জায়গার মত বেশ কিছুটা জনহীন। এটি একটি পাহাড়ের উপরে। প্রায় ৭০০ মিটার উঁচু পাহাড়ের উপরে এই জায়গা । এটি আবারিম পর্বতমালার একটি অংশ।দূর থেকে এটি একটি শুকনো বৃক্ষহীন উঁচু পাথরের ঢিবির মত লাগে। আসলে, ২০০০ খ্রীষ্টাব্দে পোপ জন পল  এটি পরিদর্শন করার পর থেকে মাদাবার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। পরে ২০০৯ সালে পোপ ষোড়শ বেনেডিক্টও এখানে আসেন। এখানে দ্রষ্টব্য যে অনেক আছে তা নয় , তবে এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ যে,  ইহুদী ধর্মগুরু মোজেস  জীবনের শেষ দিনগুলোতে এখানেই থাকতেন এবং এখান থেকেই দূরের খ্রীষ্টিয়ানদের ঈপ্সিত পূণ্যভূমি জেরুজালেমের দিকে দেখিয়েছিলেন। কিন্তু জীবদ্দশায় তিনি সেখানে যেতে পারেন নি। তিনি এখানেই মারা যান।বলা হয় তাঁর সমাধি আছে এখানেই। তবে সঠিক সমাধির জায়গা কোথায় আছে সেটি সঠিক জানা যায় নি। বাইবেলে এবং ইতিহাসে মোজেসের অনেক অলৌকিক ক্ষমতার কথা বলা আছে।

    এখানে আছে একটি চার্চ। যেটি বাইজান্টাইন যুগ থেকে দাঁড়িয়ে রয়েছে।এই চার্চটি ১৯৩৮ সালে মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয়। চার্চটি চতুর্থ শতাব্দীতে তৈরী হয়েছিল। এটি ১৯৮৪ সালে  বেশ কিছু সংস্কার করা হয়।পরে ২০০৭ সালে এটি সম্পূর্ণ ভাবে তৈরী করা হয়। এই চার্চে রয়েছে সেই যুগের বেশ কিছু বাইজান্টাইন ধরণের মোজাইকের  কাজ। তবে চার্চটি যে খুব একটা বিশাল দর্শনীয়, এমন নয়। ভিতরে কিছু মোজাইকের কাজ ও ছবিও রয়েছে। খুব বেশি সাজানো গোছানোও নয়।এই অঞ্চল যে মোজাইকের কাজের জন্য প্রাচীন যুগ থেকেই বিখ্যাত ছিল তা বোঝাই যায়। এখানে ঢোকার মুখে একটি বেশ বড় পাথর দাঁড় করানো রয়েছে যার গায়ে এখানকার সম্বন্ধে খোদাই রয়েছে। চার্চের দেওয়ালে , মেঝেতেও মোজাইকের কাজ রয়েছে।যীশুখৃষ্টের ক্রুশের দ্যোতক একটি জড়ানো সর্পস্তম্ভও রয়েছে। এটি নাকি ইটালিয়ান শিল্পী গিওভানি ফান্তোনি (Giovanni Fantoni) তৈরী করেছিলেন।

    আমাদের এখানে ছেড়ে দিয়ে রায়েধ বলেছিল, আপনারা দেখুন, আমি গাড়িতে আছি। হয়ে গেলে চলে আসবেন। আমি বুঝলাম, ও কেমন গাইড! আসলে এই সব সাধারণ অশিক্ষিত মানুষগুলোর তো এত ইতিহাসের জ্ঞান নেই।সব জানি ভাবটা যতটা, আসলে ততটা নয়। যাক গে’ মানুষটা ভাল মনে হচ্ছে, এটাই ভাল। 

    এখান থেকে দূরে দেখা যাচ্ছে জেরুজালেম। পাহাড়ের মাথা থেকে দূরে চারিদিকের দৃশ্য বেশ সুন্দর। ডেড সী ও এখান থেকে দেখা যায়।

    এখানে একটি পাথর রয়েছে, যেটি এক পাথরে তৈরী একটি বিরাট চাকার মত। এটি নাকি কোনও এক সময় এখানে চার্চের দরজা হিসাবে ব্যবহৃত হত। কিন্তু কি করে যে তা হত, আমার সন্দেহ রয়েই গেল।বুলবুল বলল, এটাতে কোন ফুটোও নেই , কব্জা লাগানোর জায়গা নেই, এটা দরজা কি করে হতে পারে? তাছাড়া পাথরটা এতই বড় মোটা আর ভারী, যে দরজা হিসাবে ব্যবহার করাও মুস্কিল।আমি বললাম, তাই তো ভাবছি। তবে ইতিহাস সব সময়েই, কিছু অনুমান, কিছু সত্যি, কিছু উদ্দেশ্যমূলক ভাবনা, এসব দিয়েই হয়। আজ যা বলা হচ্ছে তাকেই মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।
    তবে একটা কথা ঠিক যে, একটা পাথর থেকে নিটোল এত বড় গোল চাকার আকৃতিতে তৈরীর পিছনে যথেষ্ট দক্ষতা নিশ্চয়ই আছে। এরকম এর একটি পাথর আমি দেখেছিলাম অবশ্য, তুরস্কের মাটির নীচের পাথর কাটা শহর কায়মাকলি তে । সেখানে যে কি করে গোলাকৃতি পাথরটা লাগানো আছে, যা একটা দরজার কাজ করছে, তা আজও বিজ্ঞানীরা বোঝেন নি।

    এর পরে চলুন যাব পরের পর্বে–

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
     


  • 'বল মেথড' : (এক ক্ষণজন্মা বিজ্ঞান-সাধিকা মিস অ্যালিস অগাস্টা বল-এর জীবনের অজানা কাহিনী)/পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা
  • বিজ্ঞানের অন্তরালে বিজ্ঞানী ।। পর্ব ― ৬৫

    পর্ব ― ৬৫

    'বল মেথড' : 
    (এক ক্ষণজন্মা বিজ্ঞান-সাধিকা মিস অ্যালিস অগাস্টা বল-এর জীবনের অজানা কাহিনী)

    পূর্ণচন্দ্র ভূঞ্যা

    আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ অধিবাসীদের একটি নামকরা দৈনিক নিউজ পেপার 'দ্য কালার্ড সিটিজেন' (The Colored Citizen)। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রো-আমেরিকানদের সুখ-দুঃখ প্রকাশের প্রথম দলিল ছিল পত্রিকাটি। এ হেন জনপ্রিয় নিউজ পেপারের ততোধিক জনপ্রিয় এডিটর ছিলেন জেমস প্রেসলি বল। তিনি একাধারে নিউজপেপার এডিটর, ফটোগ্রাফার আর আইনজীবী। তাঁর সুযোগ্য অর্ধাঙ্গিনী মিসেস লরা লুইস বলও পেশায় একজন চিত্র-সংগ্রাহক। বাপ-ঠাকুর্দার আমল থেকে বংশ পরম্পরায় ফটোগ্রাফি বল-পরিবারের পেশা ও নেশা। সিনিয়র জেমস বল একজন নামজাদা ফটোগ্রাফার ছিলেন। ধাতব পাতের উপর ছবি প্রিন্টিং-এ সুনামের সঙ্গে দারুণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন তিনি। এ কাজে রীতিমতো এক্সপার্ট।

    সিলভার প্লেটের উপর পারদবাষ্প আর আয়োডিন মৌল পদার্থের সক্রিয়তা কাজে লাগিয়ে সুন্দর ছবি প্রকাশ করতে সিদ্ধহস্ত। শুধু ফটোগ্রাফি নয়, জুনিয়র জেমস বল আর তাঁর স্ত্রী শ্রীমতি লরা বল 'আফ্রিকান-আমেরিকান কম্যুনিটি'-এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। কমিটির সম্মাননীয় সদস্য আর আইনজীবী হওয়ার সুবাদে কালো চামড়ার মানুষ বল-দম্পতির বার্থ-সার্টিফিকেটে জ্বলজ্বল করছিল 'শ্বেতাঙ্গ' লেখাটি। সেজন্য শ্বেতাঙ্গ সমাজে তাদের অবাধ যাতায়াত-মেলামেশা স্বীকৃত ছিল। এ হেন বল-দম্পতির চার-চারজন সন্তান-সন্ততি। দুজন ছেলে আর দুজন মেয়ে। দুজন ছেলের বড় উইলিয়াম ও মেজো রবার্ট। মেয়েদের মধ্যে বড় তথা সেজো অ্যালিস আর ছোট অ্যাডি।

    মধ্যবিত্ত পরিবারটির বাস ওয়াশিংটনের সিটল-এ। চার ছেলেমেয়ের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী অবশ্য তৃতীয় জন ― কন্যা অ্যালিস বল। জন্ম ১৮৯২ সালের চব্বিশে জুলাই। বাল্যকাল থেকে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে তুখোড় সে। তাঁর মেধার রত্নখচিত দ্যুতি ক্রমশ ঝলমলিয়ে ওঠে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজের দোরগোড়ায়। যদিও বিংশ শতকের ভোর লগ্নে আমেরিকায় কালো চামড়ার মানুষের প্রতি এক তীব্র বিদ্বেষ, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ তথা রেসিজম মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে আমেরিকার ভঙ্গুর সমাজে। শয়ে শয়ে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী রাস্তাঘাটে, বাসে-ট্রেনে, অফিস-আদালতে হেনস্থার স্বীকার। এ হেন জাতি-বিদ্বেষ মেধাবী কৃষ্ণাঙ্গ ছেলে-ছোকরার শিক্ষালাভের পথে অন্তরায়। কিন্তু অ্যালিস-এর মেয়েবেলা বেশ স্বচ্ছন্দে কাটে। কারণ বাবা-মায়ের জন্মের প্রমাণপত্রে ওই 'শ্বেতাঙ্গ' শব্দবন্ধের উপস্থিতি। শ্বেতাঙ্গ সমাজে তার যাতায়াত সুনিশ্চিত করে। 

    অ্যালিস-এর ঠাকুর্দা সিনিয়র জেমস বল তখন খুব অসুস্থ। আর্থ্রাইটিস-এর সমস্যায় কাবু। ঠাণ্ডা বাড়লে আর্থ্রাইটিস-এর প্রকোপ বাড়ে। অসহনীয় লাগে তখন। সেটা ১৯০৩ সালের ঘটনা। অ্যালিস-এর বাবা-মা স্থির করল― সিটল ছেড়ে হনুলুলু পাড়ি দেবে পুরো ফ্যামিলি। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। সেবছর শীত পড়ার আগেই গোটা পরিবার আরও দক্ষিণে পাড়ি দিল। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে হনুলুলু'র আবহাওয়া অধিকতর গরম। পরিবেশের উষ্ণতা হয়তোবা খানিক স্বস্তি এনে দেবে বৃদ্ধ মানুষটিকে। আশায় মরে চাষা! শেষমেশ হনুলুলু পাড়ি দেয় তারা। তাদের সে আশায় অবশ্য গুড়েবালি! হনুলুলু আসার অল্প ক'দিন পর বৃদ্ধের অকস্মাৎ দেহাবসান ঘটে। ছোট্ট অ্যালিস তখন বারো বছরের কিশোরী। 
             
    এ হেন শোক সন্তপ্ত পরিবারটি বয়োজ্যেষ্ঠের মৃত্যুতে দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাদের সমস্ত পরিশ্রম-পরিকল্পনা পণ্ডশ্রম হয়ে যায়। ১৯০৪ সালে সারা বছর হনুলুলু'তে অতিবাহিত করে তারা। শোক ভুলে পুনরায় ১৯০৫-এ সিটল-এ ফিরে আসে পুরো ফ্যামিলি। পুরনো জায়গায় ফিরে এসে কিশোরী অ্যালিস-এর ব্যস্ততা বহুগুণ বেড়ে গেল। স্থানীয় সিটল হাইস্কুলে ভর্তি করা হল তাকে। পড়াশুনায় সে বরাবরই অত্যন্ত ভালো। প্রিয় বিষয় অবশ্যই বিজ্ঞান। মাধ্যমিক সে-স্কুলে বিজ্ঞানের বিষয়গুলিতে নজরকাড়া ফলাফল তাঁর। সায়েন্সে হামেশাই টপ গ্রেড সুনিশ্চিত করে সে। ১৯১০ সালের ঘটনা। সেবছর সিটল হাইস্কুল থেকে ভালো গ্রেড সমেত গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি পায়। রসায়ন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। কেমিস্ট্রি নিয়ে উচ্চতর পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া মনস্থির করে সে। এর অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি ডাবল গ্র্যাজুয়েশন। ১৯১২ সালে ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রিতে ব্যাচেলরস ডিগ্রি এবং ১৯১৪ সালে ফার্মাসি বিজ্ঞানে ডাবল ব্যাচেলরস ডিগ্রি তাঁর সাফল্যের মুকুটে যুক্ত হল। দ্বৈত-গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর তাঁর গন্তব্য ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি। লক্ষ্য ফার্মাসিতে উচ্চ ডিগ্রি লাভ। সেজন্য ওয়াশিংটন পাড়ি দিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মাসি বিভাগে পরামর্শদাতা তথা গাইড ড. উইলিয়াম ডেন-এর সংস্পর্শে আসেন। ড. ডেন-এর সঙ্গে ফার্মাসি বিষয়ে একটি দশ পাতার আর্টিকেল প্রকাশ পায় আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটি পরিচালিত জার্নালে। জার্নালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ছিল― ইথার দ্রবণে বেনজোইলেশন (Benzoylation in Ether Solution)। সেসময় আমেরিকার ওই নামকরা জার্নালে এক কৃষ্ণাঙ্গ নারীর প্রবন্ধ প্রকাশের ঘটনা রীতিমত ঈর্ষণীয়। বেশ গর্বেরও বটে! যদিও আর্টিকেল ছাপার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি তাঁর বিজয় রথের ঘোড়া। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায় সম্বল করে উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে তাঁর গবেষণায়। 

    সেজন্য গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিটের পর তাঁর কাছে উচ্চ শিক্ষার দ্বার হাট করে খুলে গেল আকস্মিক। গ্র্যাজুয়েটে ভালো রেজাল্টের সুবাদে মিলে গেল একগুচ্ছ স্কলারশিপ। বেশ কিছু কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির দারুণ অফার এল।  শেষমেশ তাঁর পছন্দের দুটি প্রতিষ্ঠান বার্কলেতে ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি আর হাওয়াই কলেজ (অধুনা হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়)-এর অফার গ্রহণীয় মনে হল তাঁর। দিনের শেষে হাওয়াই কলেজ বেছে নেওয়া তাঁর প্রথম পছন্দ। রসায়নের মাস্টার ডিগ্রিতে অনায়াসে ভর্তির অভাবনীয় সুযোগ পেয়ে গেল হাওয়াই কলেজে। কাভা প্ল্যান্ট স্পেসিসের রাসায়নিক গুণাগুণ সংবলিত গবেষণায় ঠাসা ছিল তাঁর মাস্টার ডিগ্রির থিসিস। এ হেন থিসিসের সৌজন্যে হাওয়াই কলেজ থেকে মিলল এম. এসসি. (M. Sc.) ডিগ্রি। সেটা ১৯১৫ সাল। এর আগে কোনও মহিলা হাওয়াই কলেজ থেকে এম. এসসি. (M. Sc.) হয়নি। ১৯১৫ সালে হাওয়াই কলেজের প্রথম গ্র্যাজুয়েট নারী তথা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা তিনি।
             
    কেমিস্ট্রিতে এম. এসসি. (M. Sc.) ডিগ্রি লাভের অব্যাহতি পরে হাওয়াই কলেজের রসায়ন বিভাগে প্রথম আফ্রো-আমেরিকান 'রিসার্চ কেমিস্ট ও ইনট্রাক্টর' হিসাবে কাজে যোগ দিলেন তিনি। কাভা গাছের রাসায়নিক সক্রিয়তা নিয়ে নতুন করে তাঁর পথচলা শুরু। এসময় হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের কালিহি হাসপাতালের ডাক্তার মিস্টার হ্যারি হলম্যান সদ্য যৌবন উত্তীর্ণ কুমারী অ্যালিস-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ড. হলম্যান একজন উপযুক্ত সহকারী খুঁজছিলেন, যে তাকে কুষ্ঠ রোগ নিরাময় গবেষণায় সাহায্য করবে। 

    কুষ্ঠ রুগীরা কি সমাজে দুচোখের বিষ? বিংশ শতাব্দীর প্রথম দু"দশক পর্যন্ত অন্তত তেমনটাই মনে করা হত। কারণ কুষ্ঠ আক্রান্ত মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত। কোনও চিকিৎসা নেই। আবিষ্কার হয়নি ওষুধ। সেজন্য সমাজ-সংসার থেকে, পরিবার-পরিজন থেকে দূরে একান্তে মৃত্যুর দিন গোনা ছাড়া অন্য গত্যন্তর নেই তাদের। চিকিৎসার ন্যূনতম পরিসেবা অমিল। কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত মানুষজনকে সেসময় হাওয়াই-এর মোলোকাই দ্বীপপুঞ্জে স্থানান্তরিত করে দেওয়া হত। এ হেন দ্বীপান্তর মৃত্যু পরোয়ানার নামান্তর মাত্র! কুষ্ঠ রুগীতে যেন মোলোকাই দ্বীপপুঞ্জে উপচে পড়ছে। দীর্ঘ সাতশ বছর ধরে চালমুগরা তেল দিয়ে কুষ্ঠ রোগ প্রতিকারের চেষ্টা চলছে বটে। তবে তা লোকের মন ভোলানো ব্যাপার স্যাপার বই অন্য কিছু নয়। কারণ রোগ নিরাময়ের প্রাচীন এই পদ্ধতিটি একেবারে ফলপ্রসূ নয়। ফলে উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে রুগীর মৃত্যু অবধারিত। 
                
    কুমারী অ্যালিস-এর তখন নামমাত্র বয়স। সদ্য তেইশ পেরনো তরতাজা এক তরুণী। তিনি একটা টেকনিক আবিষ্কার করে বসলেন। বিভিন্ন জৈব কিংবা অজৈব অ্যাসিড থেকে প্রস্তুত করলেন 'এস্টার' নামক এক রাসায়নিক যৌগ পদার্থ। এস্টার জাতীয় সরলীকৃত ওই যৌগ পদার্থকে সহজেই মানব শরীরে প্রবেশ করানো যায়। আর, একবার এ হেন এস্টার মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে কুষ্ঠ রুগীর শরীরে অনেক অসাধ্য সাধন ঘটে। অভূতপূর্ব শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। রোগ থেকে, নিশ্চিত মৃত্যুর ছোবল থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে কুষ্ঠ রুগী। হাতে গরম ফল মিলল ওষুধের প্রয়োগে। এ যেন সোনার চাঁদ হাতে পাওয়ার সামিল! অভাবনীয় সাফল্য। অথচ নিয়তির কী পরিহাস! সাফল্যের এ বিশাল ঈর্ষণীয় খতিয়ান প্রবন্ধ আকারে কোনও জার্নালে প্রকাশ পেল না। গবেষণা লব্ধ দস্তাবেজগুলি আবিষ্কারকের গোপন খাতায় বন্দি হয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে পড়ে রইল বহুদিন।

    কি এমন ঘটল যে আর্টিকেল আকারে প্রকাশ পেল না তাঁর গবেষণা? নিয়তির চরম অভিশাপ নেমে এল কুমারী অ্যালিস-এর উপর। অভিশপ্ত সে-দিনটা ছিল ৩১ ডিসেম্বর ১৯১৬ সাল। সেবার ডিসেম্বরের হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় মৃত্যুলোকে পাড়ি জমান তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র চব্বিশ বছর। ক'দিন আগে রিসার্চের সময় হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন তিনি। শরীর এত খারাপ হল যে নিরুপায় হয়ে কয়েক মাসের জন্য অসুস্থ শরীরে অ্যালিস দেশবাড়ি সিটল-এ চলে আসেন নিজের চিকিৎসার প্রয়োজনে। তারপর আর তাঁর ফেরা হল না নিজ কর্মক্ষেত্রে। অকালে ঝরে গেল তাঁর প্রাণের স্পন্দন। চোখে নেমে এল চিরঘুম। অথচ, আজও তাঁর মৃত্যুর কারণ পুরো রহস্যে মোড়া। কেউ বলেন ― গবেষণায় ব্যবহৃত বিষাক্ত ক্লোরিন বাষ্প তাঁর মৃত্যুর জন্য দায়ী। আবার কারও মতে ― টিউবারকিউলোসিস-এ আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। পুরোটাই ধোঁয়াশা! তাঁর মৃত্যুর সঠিক কারণ আজও অজ্ঞাত। যেমন অজ্ঞাত থেকে গেল শেষ সময়ে করা তাঁর গবেষণার রেজাল্ট। ছাপার অক্ষরে প্রকাশের আলো দেখল না তাঁর আর্টিকেল।

    ইতিমধ্যে, ১৯২০ সালে একটা মজার ঘটনা ঘটল। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো অবাক করা সে-ঘটনা! আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে ফলাও করে ছাপা হল হাওয়াই-এ কর্মরত এক ফিজিসিয়ানের রিপোর্ট। রিপোর্টে প্রকাশ― মিরাকল! হাওয়াই-এর কালিহি হাসপাতাল থেকে ৭৮ জন কুষ্ঠ রুগী সম্পূর্ণ সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরে গেছে। স্বাস্থ্য পরীক্ষকগণ ভালো মতো পরীক্ষা নিরীক্ষার পর অভিমত প্রকাশ করে বলেছেন― তাদের শরীরে কুষ্ঠ রোগের লেশমাত্র উপসর্গ আর নেই। এ যে অভাবনীয় খবর! অবিশ্বাস্য ব্যাপার! 

    ইতিপূর্বে, ১৯১৯ সালে হাওয়াই কলেজের ডিন রসায়নবিদ ড. আর্থার এল. ডিন একটি আর্টিকেল প্রকাশ করলেন। শুধু প্রবন্ধ ছাপিয়েই ক্ষান্ত ছিলেন না তিনি। স্বল্পায়ু অ্যালিস-এর দেখানো পথে অধিক পরিমাণে এস্টার উৎপাদনে উৎসাহী হয়ে পড়লেন। এভাবে উৎপাদিত এস্টার কুষ্ঠ রুগীর শরীরে প্রয়োগ করলেন। তারপর যা ঘটল, তা এক কথায় মিরাকল! নজরকাড়া ফল মিলল। ধীরে ধীরে সুস্থ হতে শুরু করল কুষ্ঠ আক্রান্ত লোকজন। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে তারা সবাই বাড়ি ফিরে গেল। সবাই ধন্য ধন্য করল অধ্যাপক ড. আর্থার ডিন-এর এ হেন আবিষ্কারে। আরও এক ধাপ এগিয়ে অধ্যাপক ড. আর্থার ডিন এস্টার উৎপাদনের পদ্ধতিটির নাম রাখলেন 'দ্য ডিন মেথড'। তিনি নিজে পুরো কৃতিত্ব নিয়ে গেলেন। আর্টিকেলের ছত্রে ছত্রে কেবল তাঁর নিজের গুণগান; কোথাও কুমারী অ্যালিস-এর নাম পর্যন্ত উল্লেখ নেই! সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। হঠাৎ ছন্দপতন ঘটল ১৯২২ সালের দোরগোড়ায় এসে। কী ব্যাপার! কী ঘটেছিল সেবছর? 
                
    ক্ষণজন্মা অ্যালিস-এর মৃত্যুর পর ছয় বছর অতিক্রান্ত। নিস্তরঙ্গ ইথার তরঙ্গে হঠাৎ ঢেউ উঠল! ১৯২২-এ হাটে হাঁড়ি ভাঙলেন মিস্টার হলোম্যান। অ্যালিস-এর একসময়ের সহকর্মী ছিলেন মি. হলোম্যান। এস্টার নিস্কাশনে দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছিলেন তিনি এবং অ্যালিস। সেই কাজের সূত্রে তরুণী অ্যালিস-এর গবেষণার নাড়িনক্ষত্র তাঁর নখদর্পণে। বিভিন্ন জৈব ও অজৈব অ্যাসিড থেকে কীভাবে এস্টার উৎপাদন করেছিলেন অ্যালিস, সবকিছু তাঁর জানা।  হুবুহু সেই একই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে অধ্যাপক ড. আর্থার ডিনও এস্টার তৈরি করলেন আর আর্টিকেল প্রকাশ করে তাঁর নাম দিয়ে দিলেন দ্য ডিন মেথড। প্রকৃত উদ্ভাবক রয়ে গেল লোকচক্ষুর আড়ালে। ঢাক ঢোল পিটিয়ে নাম-যশ নিয়ে গেল অন্য কেউ। আসল সত্য-রহস্য রইল পর্দার আড়ালে। এ অসম্ভব! বিবেকের দংশনে আক্রান্ত মি. হলোম্যান। তিনি কোনও মতে মানতে পারছেন না এ অন্যায়। তাঁর দৃঢ় সংকল্প― এস্টার নিষ্কাশনে অ্যালিস-এর কৃতিত্ব জনসমক্ষে তুলে ধরবেন তিনি। অ্যালিসকে পুরো কৃতিত্ব দিয়ে ছাপলেন একখানা আর্টিকেল। ১৯২২ সালে। সে-প্রবন্ধে অ্যালিস-এর উদ্ভাবিত কুষ্ঠ নিরাময় টেকনিকের নাম রাখলেন 'বল মেথড' (Ball Method)। পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সকল অন্ধকার-ছলচাতুরি নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। দিনের আলোয় স্পষ্ট প্রতিভাত হল আসল সত্য ঘটনা। গোটা বিশ্ব জানল কুষ্ঠ নিরাময়ে একজন কৃষ্ণাঙ্গ তরুণীর ত্যাগ, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় আর লড়াই-এর গল্প ও ফলাফল। 

    ডিন মেথড আর বল মেথড-এর মধ্যে চুলচেরা তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে ড. হলোম্যান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন ডিন মেথড। স্বীকৃতি পেল 'বল মেথড'। ড. হলোম্যান তাঁর আর্টিকেলে ডিন মেথডকে তুলোধুনো করে স্পষ্ট লিখলেন― 
    'I can't see that there is any improvement whatsoever over the original technique as worked out by Miss Ball. The original method will allow any physician in any asylum for lepers in the world, with a little study, to isolate and use the ethyl esters of chaulmoogra fatty acids in treating his cases, while the complicated distillation in vacuo will require very delicate, and not always obtainable, apparatus.'

    কুষ্ঠ রোগ নিরাময়ে ড. অ্যালিস বল-এর কৃতিত্ব আজকে সর্বজন স্বীকৃত। গোটা বিশ্বের মানুষ তাঁর অবদান নতমস্তকে স্মরণ করে। প্রতি চার বছর অন্তর ২৯শে ফেব্রুয়ারি দিনটিকে "অ্যালিস বল ডে" (Alice Ball Day) হিসাবে পালিত হয়। আগের দিন, অর্থাৎ ২৮শে ফেব্রুয়ারি দিনটি হাওয়াই ইউনিভার্সিটি তাদের ক্যাম্পাসে প্রতি বছর আলাদাভাবে "Alice Agusta Ball Day" পালন করে।

    জ্বলদর্চি পেজে লাইক দিন👇
     


Powered by Web RSS